বই পড়তে ভুলে গেছি আমরা!

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তুফান মাজহার খান

সংগ্রহীত ছবি

বই মানুষের পরম বন্ধু। বই মানুষকে বিনয়ী করে, ভালো-মন্দের শিক্ষা দেয়, জ্ঞান বৃদ্ধি করে, আত্মপ্রত্যয়ী করে, সামাজিকতা শেখায়, অপরাধ থেকে দূরে রাখে, হিংসা-বিদ্বেষ-কলুষতা থেকে মুক্তির পথ দেখায়। তদুপরি বই মানুষকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ করে গড়ে তোলে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমরা বই পড়তে ভুলে গেছি! একটা সময় ছিল যখন মানুষের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বই ছিল অপরিহার্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। উদ্ভাবিত হয়েছে নানা বিনোদন প্রযুক্তি। টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ আরও অনেক কিছু। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং স্মার্টনেস বাড়াতে সবাই ঝুঁকে পড়ছে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর। ইন্টারনেটনির্ভর হয়ে পড়ছে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সবাই।

প্রযুক্তির সর্বশেষ ও সহজলভ্য আবিষ্কার হল স্মার্টফোন। বর্তমানে যে কোনো বয়সের মানুষের হাতে থাকে এটি। পথেঘাটে, হাটে-মাঠে, অফিসে, গাড়িতে, কাজের ফাঁকে যে যখনই সুযোগ পায়- শুরু করে ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইমো বা ইউটিউবের ব্যবহার। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে যেন এটিই একমাত্র অবলম্বন। বেঁধে দেয়া হাতেগোনা কিছু পাঠ্যপুস্তক ছাড়া আর কোনো বই সচরাচর পড়তে দেখা যায় না শিক্ষার্থীদের। আগে মানুষের ভ্রমণসঙ্গী ছিল বই। কোথাও যাওয়ার আগে ট্রাভেল ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে স্থান পেত দুয়েকটি গল্প-উপন্যাসের বই। স্মার্টফোন যেন সেসব আমাদের ভুলিয়েই দিয়েছে।

প্রযুক্তি আমাদের জন্য অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার বা অবাধ ব্যবহারে আমাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হচ্ছে। আমরা হয়ে যাচ্ছি সংকীর্ণমনা। ফোন বা কম্পিউটারের বাইরে আমরা তেমন কিছু নিয়ে ভাবার সময় পাই না। আমাদের সব চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে ফোন বা কম্পিউটার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব বই বেঁধে দেয়া হয় সেগুলো অপাঠ্যপুস্তক। আর যেসব বই আমরা কিনে পড়ি অর্থাৎ বাইরের বই সেগুলোই পাঠ্যপুস্তক। এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল, যেসব বই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় অথবা পড়তে বাধ্য করা হয়, সেসব বই তারা পড়ে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা বা জানার আগ্রহ নিয়ে পড়ে না। শুধু পরীক্ষায় পাস করা অথবা ভালো ফলাফলের জন্য পড়ে। বেশিরভাগই মুখস্থবিদ্যা, যার স্থায়িত্ব মস্তিষ্কে খুবই কম। কিন্তু যে বই কিনে পড়া হয় তা অবশ্যই জানা ও শেখার জন্য অতি আগ্রহের সঙ্গে পড়া হয়। তাই বাইরের বই অবশ্যই বেশি পড়া উচিত।

জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের মাস কয়েক আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন তার সাক্ষাৎকার নেয়ার একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করেছিল, বর্তমানে যে ই-বুক বের হয়েছে এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, যতই ই-বুক বা আধুনিক প্রযুক্তি বের হোক না কেন, কাগজে ছাপা বইয়ের যে একটা গন্ধ বা পড়ার যে আনন্দ এটা কিন্তু ই-বুক থেকে কখনই পাওয়া সম্ভব নয়।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আধুনিক হব এটাই স্বাভাবিক। তবে তা যেন আমাদের বই পড়তে না ভুলিয়ে দেয় সে বিষয়ে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। বইয়ের বাজারে আবার সুদিন ফিরে আসবে, মানুষ বই পড়বে, বইকে সঙ্গী বানাবে, কবি-লেখকরা সাহিত্যচর্চার সুযোগ পাবেন, প্রকাশকরা বই ছাপিয়ে স্বস্তি পাবেন, এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

তুফান মাজহার খান : প্রাবন্ধিক, ঢাকা