রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাচ্ছিল্য নয়

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আব্দুর রউফ সালাফী

সন্তান কোলে এক রোহিঙ্গা নারী। ছবি-সংগৃহীত

প্রাচীন বার্মার (মিয়ানমার) আরাকানে (রাখাইন) বহুকাল আগে আরবদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মাঝে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই মুসলমান।

আরাকানদের খুব প্রসিদ্ধ সমুদ্রবন্দর ছিল আকিয়াব। এ বন্দরের মাধ্যমে শুধু আরবরা নয়, বহু জাতির মানুষ আরাকানে ভিড় জমাতো।

অনেকে আরাকানি মেয়েদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো। ফলে বহু জাতির সংমিশ্রণ ঘটেছে আরাকানিদের মধ্যে। সেদিকে ইঙ্গিত করে মধ্যযুগের মহাকবি আলাওল তার পদ্মাবতী কাব্যে লিখেছেন-

নানা দেশে নানা লোক-শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ

আইসেন্ত নৃপ ছায়াতল।।

আরবী মিশরী শাসী তরকি হাবশী রুমী

খোরাসানী উদ্বেগ সকল।।

লাহুরী মুলতানী সিন্ধী-কাশ্মিরী দক্ষিণি হিন্দী

কামরূপী আর বঙ্গ দেশী।।

বঙ্গ শেখ সৈয়দ জাদা মোগল পাঠান যোদ্ধা

রাজপুত হিন্দু নানা জাতি।।

আজ সেই আরাকানিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে সর্বস্বান্ত করেছে বৌদ্ধ বর্মীরা। তারা মানবতার চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে বিশ্ববিবেককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ শুরু করে। রোহিঙ্গাদের শত শত লাশের সাক্ষী হয়েছে নাফ নদী। মানবতা ভেসে গেছে এই নদীতে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুর কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।

আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। আজ তারা আমাদের অতিথি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছাত্র-শিক্ষক, ছোট-বড়, রিকশাচালক-ভ্যানচালকসহ অনেক বাঙালির মুখে রোহিঙ্গা যেন একটা গালি! একজন অপরজনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শব্দটিকে গালির মতো ব্যবহার করে বলছে, ‘তুই তো রোহিঙ্গা’। তাচ্ছিল্যের স্বরে একজন অপরজনকে সম্বোধন করছে, ‘কিরে রোহিঙ্গা’!

প্রশ্ন জাগে, রোহিঙ্গা নামটি কেন তাচ্ছিল্যের হবে? কেন একে বিকৃত করা হবে গালির অর্থে? এই রোহিঙ্গাদেরই পূর্বপুরুষদের শাসনামলে আরাকানের রাজসভা অলঙ্কৃত করেছেন শাহ মহান্মদ সগীর, শাহ আবদুল হাকিম, মহাকবি আলাওলের মতো খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকরা।

আরাকানে তাদের সাহিত্যচর্চায় বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা তাদের কাছে ঋণী। আজ তাদের ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ পেয়ে আমরা মানুষকে রোহিঙ্গা বলে গালি দিচ্ছি- এ কেমন কথা!

আমরা বাঙালিরা অতীত ভুলে গেছি। একদিন আমরাও রোহিঙ্গাদের মতো উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমরাও পিতা হয়ে চোখের সামনে নির্যাতিত হতে দেখেছিলাম স্ত্রী-কন্যাকে, মা হয়ে সন্তানের লাশ দেখে বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম। অথচ আমরা সেদিনের কথা ভুলে গেছি।

আমাদের নাক থেকে উবে গেছে অত্যাচারীর খড়গ হস্তে নিহত হওয়া স্বজনদের গলিত শবের গন্ধ। তাই সমব্যথি হওয়ার বদলে নাক উঁচু করে রোহিঙ্গা গন্ধ শুঁকছি।

অথচ আমাদের মতো তারাও পেছনে রেখে এসেছে রাইফেলের গুলিতে, চাপাতির আঘাতে প্রাণ হারানো আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর শত সহস্র লাশের সারি। শোকে মুহ্যমান হয়ে জীবনের সমস্ত শক্তি হারিয়ে তারা আজ অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত।

মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী দেশ। আরাকান আর বাংলাদেশের সম্পর্ক বহু প্রাচীন। রোহিঙ্গারা আজ আমাদের দেশে শরণার্থী। তবে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল- তারা মানুষ। তাই আসুন আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করি। কিছু দিতে না পারলেও অন্তত গালি না দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাই বলতে অভ্যস্ত হই।

আব্দুর রউফ সালাফী : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়