আমার একটা প্রশ্ন আছে

  আনোয়ারা সৈয়দ হক ৩১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার মিসেস রাবেয়া খাতুন।

আমি আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক।

কিন্তু এ স্বাধীনতা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, কতখানি আত্মবিসর্জনের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে অনেকেই জানেন না। এ স্বাধীনতার পেছনে বাংলাদেশের নিষ্পাপ বালিকা, তরুণী ও অসংখ্য নারীর শরীরের তাজা রক্তের কতখানি অবদান তা অনেকেই সেভাবে জানেন না, যা আমি নিজের চোখে একাত্তরের পুরো নয়টা মাস প্রত্যক্ষ করেছি।

১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ সেই কালরাতে আমি ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাকেই ছিলাম। এটা ছিল আমার চরম নির্বুদ্ধিতা। কারণ আমি সকাল থেকে চারপাশে কানাঘুষা শুনছিলাম যে পাকিস্তানিরা আমাদের আক্রমণ করতে পারে।

তখন আমার এটুকু বুদ্ধি ছিল না যে ব্যারাক থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাই। কারণ আক্রমণ করলে তো পুলিশ লাইনেই আগে করবে। আমি ভেবেছিলাম বুঝি তারা বাইরের জনগণের ওপর কোনো আক্রমণ চালাবে। কারণ প্রতিদিনই তখন বিহারি-বাঙালিতে সংঘর্ষ লেগেছিল। পুলিশ লাইনকেই বরং আমি নিরাপদ আশ্রয় মনে করে সারা দিন ধরে লাইনের ব্যারাক ঝাঁট দিচ্ছিলাম।

সন্ধে গড়িয়ে রাত হলে ব্যারাকের এসএফ ক্যান্টিনে চুপ করে বসেছিলাম। কারণ পুলিশ ব্যারাক ছিল আমাদের মতো মানুষদের একটি নিরাপদ আশ্রয়। আমি সামান্য সুইপার হলেও বাঙালি পুলিশ স্যাররা সবাই আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন।

আমাকে ওভাবে চুপ করে বসে থাকতে দেখে এক পুলিশ স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কী রাবেয়া, তুমি তোমার কোয়ার্টারে আজ ফিরে যাওনি?

আমি মুখ নিচু করে বললাম, না, স্যার।

কেন? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

আমি বললাম, আমার মন ভালো লাগছে না, স্যার। আমার ভয় করছে।

আমার কথা শুনে স্যার হেসে বললেন, ভয়ের কী আছে মেয়ে? ভয় করলেই ভয়।

রাত হলে পরে আমি ক্যান্টিনের মেঝেয় চাদর পেতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

রাত প্রায় এগারোটার দিকে হঠাৎ রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের সঙ্গে ছিল কামান, গোলা, লাইটবোম, ট্যাঙ্ক আরও অনেক কিছু। কামান ও ট্যাঙ্কের কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলাম। আর চোখের সামনে দেখলাম আমাদের দেশের বীর পুলিশ ভাইয়েরা এক মুহূর্ত দেরি না করে ভারী অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত বিদেশি দস্যুদের সাধারণ রাইফেল হাতে মোকাবেলা করতে লাগলেন। নিজের জানের তোয়াক্কা পর্যন্ত করলেন না। আমার চোখের সামনেই অনেককে গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে দেখলাম। কিন্তু এসব দেখেও কোনো একজন পুলিশ স্যার ভয়ে পালিয়ে গেলেন না। দেখে আমার বুক গর্বে ভরে উঠল। কিন্তু তখন এতসব ভাববার সময় ছিল না, আমি এসএফ ক্যান্টিনের মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথর করে কাঁপতে লাগলাম।

আমার পুলিশ স্যাররা ওদের সামনে আর টিকে থাকতে পারলেন না। ওরা পুলিশ ব্যারাকের চারদিকে আগুন লাগিয়ে দিল। তারপর ব্যারাকের মধ্যে একে একে প্রবেশ করতে লাগল। কিছু পুলিশ স্যার শেষ মুহূর্তে পালাতে পেরেছিলেন, কিছু মারা গিয়েছিলেন, আর বেশ কিছু ধরা পড়ে গেলেন।

হানাদার পাঞ্জাবি সেনারা ব্যারাকে ঢুকেই বাঙালি পুলিশ স্যারদের নাকে, মুখে, পুরো শরীরে বেয়োনেট ও বেটন চার্জ করতে করতে ও বুটের লাথি মারতে মারতে ব্যারাক থেকে বের করে আনছিল। এসব দেখে আমার তখন হুশ-জ্ঞান ছিল না। কীভাবে যে সেখান থেকে পালাব সে চিন্তাও মাথায় কাজ করছিল না। এর মধ্যেই কিছু বর্বর পাকিস্তানি হানাদার ক্যান্টিনে ঢুকেই আমার চুলের মুঠি ধরে হিড় হিড় করে বাইরে বের করে নিয়ে এলো।

তারপর প্রকাশ্যে সেই দিনের আলোতেই সবার চোখের সামনে বর্বর বিজাতীয় শয়তানগুলো আমার শরীরের ওপরে চড়াও হয়ে অত্যাচার শুরু করে দিল। এ স্মৃতি আমার মনে হলে এখনও আমি বমি করে ফেলি। রাতের পর রাত জেগে থাকি। আমার দয়ালু স্বামী আমকে সান্ত্বনা দেন, কিন্তু আমি তখন কোনো সান্ত্বনাতেই নিজেকে সামলাতে পারি না।

সেই সময় নির্যাতন করতে করতে তারা পাশবিক আনন্দে ফেটে পড়ছিল। একের পর এক অত্যাচার চলছিল। যখন আমি প্রায় মৃত্যুর প্রান্তে তখন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, আমাকে আপনারা মারবেন না, আমি ব্যারাকের সুইপার, আমি ব্যারাকের পায়খানা-পেসাবখানা, নর্দমা এসব পরিষ্কার করি। আমাকে মেরে ফেললে এসব পরিষ্কার করার মানুষ থাকবে না। তারপর এত রক্ত, এত লাশ সব একটু পরই গন্ধ ছড়াতে শুরু করবে, তখন এসব পরিষ্কার করার জন্য সুইপার নেহি মিলেগা!

আমার আকুতি আর কান্না শুনে এক হানাদার পাঞ্জাবি চামার বলে উঠল, ঠিক হ্যায়, তোমকো ছোড় দেঙ্গে। মগর তোম বাহার নেহি নিকলেগি, হরওয়াক্ত লাইন পর হাজির রহেগি।

এরপর শুরু হল আমার নিষ্ঠুর বন্দি জীবন।

আমি একজন নারী। নিজের জীবন দিয়ে আমি বুঝেছি নারী তার শরীরের সম্মান হারালে সে সম্মান আর ফিরে পাওয়া যায় না।

সেই নয় মাসে আমার এ দুটি পোড়া চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখেছি শতশত নারীর সম্মানহানি, তাদের চোখের পানি, আত্মহত্যা করে জীবনের অসম্মান ভুলে যাওয়ার অবিরত চেষ্টা।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমি সারা দিন ধরে এসএফ ক্যান্টিনে কাজ করতাম, কখনও ড্রেন পরিষ্কার করতাম, কখনও নর্দমার ময়লা পরিষ্কার করতাম, কখনও ক্যান্টিনের মেঝে পরিষ্কার করতাম আর গোপনে তাকিয়ে দেখতাম পাক হানাদাররা দেশের বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়ে বাঙালি কন্যাদের ট্রাক ও জিপ ভর্তি করে নিয়ে আসত ব্যারাকে। তারা কেউ তরুণী, কেউ যুবতী, কেউ বা একেবারে বালিকা।

একদিন দেখলাম আমাদের দেশের বহু অভিজাত মহিলা ও যুবতীকে ধরে নিয়ে এলো। ধরে এনে তাদের এসএফ ক্যান্টিনের ভেতর দিয়ে ব্যারাকে নিয়ে গেল। আবার কিছু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের উপরতলায় রুমে নিয়ে আটকে রাখা হল। কিছু মেয়ে অবশিষ্ট ছিল যাদের ব্যারাকে জায়গা দেয়া গেল না, তাদের ব্যারাকের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হল।

আমি দেখলাম কয়েকজন মেয়ের হাতে স্কুল বা কলেজের খাতা ও বই। অনেক যুবতী মেয়ের গায়ে সোনার অলঙ্কার দেখলাম, যেমন মেয়েরা কোথাও যাওয়ার সময় পরে। অধিকাংশ মেয়ের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরছিল। কিছু মেয়ে ভয়ে ও আশঙ্কায় চোখ মুখ শুকনো করে চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল। যেন তারা তখনও বুঝতে পারছিল না, কী আছে তাদের ভাগ্যে।

একটু পরই আমার চোখের সামনে শুরু হয়ে গেল সেই নারকীয় কাণ্ড।

পুলিশ লাইন থেকে পাঞ্জাবি সৈন্যরা কুকুরের মতো জিভ লালা ফেলতে ফেলতে বন্যার স্রোতের মতো ব্যারাকে এসে উপস্থিত হল। তারা ব্যারাকে উপস্থিত হয়েই প্রতিটি তরুণী, মহিলা ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিল। তারপর তাদের ওপরে অত্যাচার শুরু করল। ধর্ষণ শব্দটি আমার মুখ দিয়ে সহজে বের হতে চায় না। আমাকে মাফ করবেন। আমার মনে হয় এ শব্দটির মতো অশ্লীল শব্দ পৃথিবীতে আর একটা তৈরি হয়নি।

আমি তখন ব্যারাকে ড্রেন পরিষ্কার করার অভিনয় করছিলাম। আমার বুকের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখলাম হামলে পড়া কুকুরগুলো সেই মেয়েদের বুকের ওপরে উঠে দাঁত দিয়ে কামড়ে তাদের স্তনের ও গালের মাংস ছিঁড়ে ফেলছে এবং উল্লাসে দানবের মতো হল্লা করছে।

মেয়েগুলো আতঙ্কে আর্তচিৎকার করছিল। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। ওদের উদ্ধত ও উন্মত্ত দাঁতের কামড়ে অনেক কচি মেয়ের গাল, পেট, ঘাড়, বুক, পিঠ ও কোমর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। যে মেয়েগুলো তাদের পাশবিকতার শিকার হতে বাধা দিয়েছিল তাদের অবস্থা হল আরও ভীষণ। পাঞ্জাবি কুকুররা ওদের চুল ধরে টেনে ওদের স্তন, বুক ও তলপেটে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করল।

মেয়েগুলোকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেও দেখলাম।

আমার চোখের সামনেই একটি বালিকাকে পাশবিক অত্যাচার করার পর ওর অসাড় রক্তাক্ত দেহটা বাইরে টেনে এনে দুই পাঞ্জাবি কুকুর দুদিক থেকে তাদের দুই পা ধরে চড়চড় করে মাঝখান থেকে ছিঁড়ে ফেলল। সর্বক্ষণ তারা শয়তানের হাসি হাসছিল এবং দানবের মতো উল্লাসে ফেটে পড়ছিল।

সেপাইরা সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ার পর এলো পাঞ্জাবি অফিসারের দল।

ভালো মানুষের বেশে তারা আদতেই ছিল বুকে তকমাধারী পাঞ্জাবি কুকুর। তারাও দুই হাত ভালুকের মতো নাচাতে নাচাতে বালিকা, যুবতী ও মহিলাদের ওপরে পালা করে অত্যচার চালাতে শুরু করল। তাদের পাশবিক নির্যাতনে কত কচি মেয়ে যে কাতরাতে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে তার হিসাব নেই। আমি ভয়ে তাদের মুখে পানিটুকুও তুলে দিতে পারিনি।

যেসব মেয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য ওদের আজ্ঞাবহ হয়ে নিজেদের সঁপে দিয়েছে তাদেরও তারা ছাড় দেয়নি। মেজাজ খারাপ হলে তাদেরও নির্মমভাবে আপমান করে মেরে ফেলেছে

আমি ছোটবেলায় আমার নানির কাছে ‘রক্তের পিপাসা’ বলে একটা কথা শুনেছিলাম। আমার নানি একজন বুদ্ধিমান মহিলা ছিলেন। তিনি বলতেন, কোনো কোনো মানুষের ভেতরে নাকি রক্তের পিপাসা থাকে। তারা চেহারায় মানুষ হলেও আসলেই তারা রক্তচোষা বাদুড়। সুযোগ পেলেই তারা মানুষের ঘাড় ফুটো করে রক্ত চুষে খায়। নানির সেই গল্প কথা শুনে তখন আমি কত না ভয় পেয়েছিলাম।

কিন্তু এখন আমি দেখলাম আমার নানির কথা সত্য। তবে আমার প্রশ্ন হল একজন দু’জন হয়তো রক্তচোষা হতে পারে, পুরো জাতি কীভাবে রক্তচোষা হয়, এটা আমি ভেবে পেলাম না।

আমি জানি আপনারা এসব বিবরণ পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। আপনাদের আর ভালো লাগছে না। না লাগাই স্বাভাবিক। কারণ স্বাভাবিক সময়ে অস্বাভাবিক কোনো পরিবেশের কথা শুনতে মানুষের আর ভালো লাগে না। মনে হয় কখন এসব শেষ হবে।

এরপর আরও আছে। বিবস্ত্র মেয়েদের তারা গরুর মতো পেটাতে পেটাতে পুলিশ হেডকোয়র্টারের দোতলা, তিনতলা ও চারতলায় নিয়ে গিয়ে বারান্দার মোটা তারের সঙ্গে চুল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখত প্রতিদিন। আর যাতায়াতের পথে পাঞ্জাবি কুকুরগুলো, তাদের নিতম্বের মাংসে বেটন দিয়ে পাগলের মতো পেটাত। কেউ তাদের যোনীপথে লাঠি ঢুকিয়ে মজা করত। তারপর হাসতে হাসতে করিডোর পার হয়ে চলে যেত।

মেয়েরা যন্ত্রণায় আল্লাহ, আল্লাহ করত, রাসূল, রাসূল করত, কিন্তু নরপশুদের তাতে বিন্দুমাত্র বিকার হতো না। ওরা কি মুসলমান? এ প্রশ্নও আমার মনে উঠত। ওরা কি মসজিদে যায়? আমি মূর্খ মানুষ তবু আমার মনেও এসব প্রশ্ন উঠত।

উলঙ্গ মেয়েরা এভাবে আমার চোখের সামনে দিনের পর দিন ঝুলে থাকত। আর আমি বারান্দা, ঘর, করিডোর, পায়খানা পরিষ্কার করে চলতাম।

অত্যাচারিত এবং লাঞ্ছিত মহিলাদের পেসাব ও পায়খানা যখন লাগত তখনও তাদের হাতের ও চুলের বাঁধন খুলে দেয়া হতো না। তারা ওভাবে ঝুলে থেকেই পেসাব পায়খানা করত। পাঞ্জাবি কুকুরেরা কখনই এসব মেয়েদের বিন্দুমাত্র মানুষ হিসেবে গণ্য করেনি। আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে এসব মেয়েদের পেসাব পায়খানা পরিষ্কার করতাম। আমি নিজের চোখে দেখেছি অনেক মেয়ে অবিরাম অত্যাচারিত হয়ে ঝুলন্ত অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে।

আমার তখন দিন ও রাত বলে কিছু ছিল না। কারণ পাঞ্জাবিরা অন্য কোনো সুইপারকে সেখানে ঢুকতে দিত না, শুধু আমি ছাড়া আর কারও সেখানে প্রবেশের হুকুম ছিল না। আমার চোখের সামনেই পাঞ্জাবিরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাক থেকে এবং ব্যারাকের হেডকোয়ার্টার অফিসের উপরতলা থেকে অত্যাচারিত ও মৃত মেয়েদের ক্ষতবিক্ষত লাশ পায়ে রশি বেঁধে নিয়ে যেত এবং তাদের ভাগাড়ে ফেলে দিত। রাজধানী এবং শহরতলীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নতুন নতুন মেয়ে ধরে এনে তাদের সেই আগের মতো আবার চুলের সঙ্গে ঝুলিয়ে এবং পেছনে হাত বেঁধে নির্মমভাবে অত্যাচার শুরু করত।

এসব কথা যখন আমি স্বাধীন দেশে বসে আপনাদের কাছে বলছি, কারণ আমি লিখতে জানি না, আপনাদের কাছে আমি নিজে থেকেই এসব কথা বলছি, তখন আমার মনের ভেতরে ভীষণ এক অপরাধবোধ হচ্ছে।

কেন?

কারণ আমার হাজার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি আমার বাঙালি কোনো মা, বা বোন, বা মেয়েকে কোনো সাহায্য করতে পারিনি। শুধু গোপনে নীরবে চোখ মেলে এসব অসহনীয় দৃশ্য দেখেছি, আমার মনের ভেতরে দুঃখের রক্ত অনবরত বয়ে চলেছে, অপমানে আমি ক্ষতবিক্ষত হয়েছি, তবু আমি মাত্র একজন ছাড়া আর কোনো মেয়েকেই বাঁচাতে পারিনি।

সেটা ছিল এপ্রিল মাস। আমি রাতের অন্ধকার পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হেডকোয়ার্টারের উপরতলায় সারা রাত ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা মেয়েদের মলমূত্র পরিষ্কার করার জন্য গিয়েছিলাম। এমন সময় কলেজে পড়া এক ছাত্রীর কাতর আবেদনে আমি খুব বিচলিত হয়ে পড়ি এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে মেথরের কাপড় পরিয়ে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে মেয়েকে আমি চোখে দেখিনি, যদিও সে বলেছিল বেঁচে থাকলে আমার সঙ্গে সে দেখা করবে। আজও সে বেঁচে আছে কি না জানি না!

তবে আমার মনে একটা গভীর অনুযোগ আছে। একটা কঠিন প্রশ্নও আছে। আর সেটা হল, বিজয়ের দিনে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে প্রবেশ করামাত্র এসব পাঞ্জাবি কুকুরের দল অস্ত্র জমা দিয়ে নিরীহ মুখে আত্মসমর্পণ করল। আর পরবর্তীতে তারা সসম্মানে বহাল তবিয়তে নিজের দেশে ফিরে গেল। কেন? কেন? কেন?

আমি মিসেস রাবেয়া খাতুন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার। ১৯৭১-এর সেই কালরাতে আমি পুলিশ লাইনের ব্যারাকেই ছিলাম। আমি সব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।

অথচ আমার মনের এ প্রশ্নের জবাব আমি এতদিনেও কারও কাছ থেকে পেলাম না, না আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা, না আমার সরকার, না আমার দেশবাসী। এখন মনে হয় এ প্রশ্ন বুকে নিয়েই আমাকে এ পৃথিবী ছাড়তে হবে।

আপনাদের কাছে কাতর আবেদন রইল, আমার এই জবানবন্দির সঙ্গে ‘কেন’ প্রশ্নের জবাবটাও আপনারা সুস্থিরভাবে ভেবে দেখবেন।

সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত