ঈদের স্মৃতি
jugantor
ঈদের স্মৃতি

  সাইফুর রহমান  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে ঈদ উদযাপনের যে দীর্ঘ চর্চা, করোনা মহামারি তা নিমিষেই ম্লান করে দিয়েছে। মানুষ কি কখনো এমন ঈদ দেখেছে! যেখানে কোলাকুলি প্রায় নিষেধ? কাছে বসে বন্ধু আত্মীয়ের সঙ্গে গল্প করা নিষেধ?

মানুষ যা কল্পনাও করেনি তেমন একটি বিচ্ছিন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ইসলাম ধর্মের সর্ববৃহৎ ঈদ উৎসব। অথচ এই ঈদ ছিল ধনী-গরিবের মিলনের উৎসব। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কাছে ঈদের উৎসব যে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতো তা এখন কল্পনাতীত।

তখন গ্রামগঞ্জ কিংবা মফস্বল শহরে দেখা যেত গৃহকর্ত্রী মাঝরাতে উঠে রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছেন। তারপর রান্না শেষ হলে সবকিছু টাটকা খাওয়া। তবে শহর অঞ্চলে বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এক সময় ‘কাশিদা’ গেয়ে রোজাদারদের জাগিয়ে তোলার প্রচলন ছিল। আরবি ভাষায় পরিজনদের প্রশংসামূলক কবিতাকে বলে কাশিদা। তখনও মসজিদে মসজিদে মাইকের ব্যবহার শুরু হয়নি। আর সেজন্য রমজান মাস এলেই তরুণেরা পাড়া-মহল্লায় হেঁটে হেঁটে হামদ, নাত ও উর্দু কাশিদা গেয়ে রোজাদারদের ডেকে তুলতেন। কাশিদা দলের সদস্য ঠিক করতেন সেই মহল্লার পঞ্চায়েতরা। ঢাকায় পাঠান ও মুঘল আমল থেকেই কাশিদা গেয়ে সেহরি খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। রফিকুল ইসলাম লিখিত ‘যুগে যুগে ঢাকায় ঈদ মিছিল’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায়, কাশিদার এই প্রচলনটি খাজা আহসান উল্লাহর সময় আরও উৎকর্ষ লাভ করেছিল।

ছোটবেলায় প্রায়ই আমাদের ঈদ করা হতো নানাবাড়ি ঢাকার বাড্ডায়। আমার বয়স তখন কত হবে, বড়জোর ছয়-সাত বছর, ১৯৮৩-৮৪ সালের কথা বলছি। আমার নানা ছিলেন বাড্ডা আলাতুননেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আমার বাবাও সরকারি চাকুরে। কতই বা বেতন পান। সেবার ঈদে বাবা আমাদের নতুন কোনো জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেননি। ঈদের আগের সব দিন জামা-জুতোর জন্য কান্নাকাটি করলাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ঈদের দিন খুব ভোরে উঠে বর্ষার মেঘের মতো মুখ কালো ও ভার করে বসে রইলাম। নানার মনে হয়তো একটু দয়া হলো। তিনি সেই সকাল ৬টার দিকে আমাকে নিয়ে বের হলেন বাজারে। নিয়ে গেলেন একটি দর্জির দোকানে। ১৯৯০ সালের পূর্বেও বেশিরভাগ মানুষজনদের দেখতাম দর্জি দিয়ে জামা-কাপড় তৈরি করে পরতেন। এখন অবশ্য দিন বদলেছে। একটা সময় ছিল যখন খলিফা কিংবা দর্জিরা সব চাঁদ রাত জেগে খদ্দেরদের জন্য জামা-কাপড় সেলাই করতেন। অনেকে ঈদের দিন সকালেও পোশাক-পরিচ্ছেদ ডেলিভারি নিতেন। তো হয়েছে কি নানা ও আমি সেই দর্জির দোকানে গিয়ে হাজির। দেখলাম সেখানে অনেক মানুষ সারিবদ্ধভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জামা-কাপড় ডেলিভারি নিতে। দর্জি বেচারা ক্লান্ত দেহে সবার হাতে সদ্য নির্মিত কাপড়-জামাগুলো তুলে দিচ্ছিলেন এক এক করে। নানাকে দেখেই দর্জি সালাম দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সেসময় স্কুলের শিক্ষকদের মানুষ অসম্ভব শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন। নানা আমাকে দেখিয়ে বললেন, আমার নাতিটার খুব মন খারাপ। এবার ঈদে ওর জন্য কোনো নতুন জামা-কাপড় কেনা হয়নি। তুমি ভাই কষ্ট করে এক্ষুনি একটি ফুল হাতা শার্ট তৈরি করে দাও। দর্জি লোকটা বেশ উসখুস করতে লাগল। অন্য কেউ হলে হয়তো জোর গলায় ফিরিয়ে দিতেন। কিন্তু মহল্লার একমাত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলে কথা। দর্জি লোকটার ছেলেও সম্ভবত পড়তেন নানার স্কুলে। অতি সস্তা দামের ট্রেটনের একটি বড় থান থেকে কাপড় কেটে আমার জন্য দর্জি লোকটি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৈরি করে দিলেন একটি ফুলহাতা শার্ট। লাল, সবুজ ও হলুদ প্রিন্টের সেই শার্টটি যেন আমি এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই। আঁকিয়ে হলে সেই শার্টটির ছবি আমি এখনও হুবহু এঁকে দিতে পারতুম। আমার মনে হয় নাকে লাল টমেটো গোঁজা সার্কাসের ক্লাউনরাও এর চেয়ে ভালো রংচঙে জামা পরে খেলা দেখায়। স্মৃতিপটে শার্টটির ছবি হুবহু লেপটে আছে এ কারণে যে, সে বয়সে অর্ধেক পৃথিবীর সম্পদ আমার হাতে তুলে দিলেও বোধ করি এতটা খুশি আমি হতাম কিনা সন্দেহ। যা আমি হয়েছিলাম ঈদের সকালে সস্তা দামের সেই শার্টটি গায়ে চড়িয়ে।

পরিতাপের বিষয় এই, এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে ঈদের দিনও যেন অন্যান্য দিনের মতোই আরেকটি দিন। আমাদেরইবা কত বয়স হয়েছে। মাত্র তো চল্লিশ পেরলো। কিন্তু আমাদের সময়ে ঈদ যে কি পরিমাণ খুশির বার্তা নিয়ে আসতো সেটা আমাদের ছেলেমেয়েদের বোঝাই কি করে।

ঈদের নতুন চাঁদ দেখার কথাই প্রথম বলি- উনত্রিশ কিংবা ত্রিশ রোজার শেষে আমরা ছোট ছেলেপুলেরা তীর্থের কাকের মতো আকাশ পানে তাকিয়ে থাকতাম কখন দেখা দেবে ঈদের নতুন চাঁদ। শুভ্র সরু সুতোর মতো বাঁকা একফালি চাঁদ দেখার পর কি যে আনন্দ উল্লাস হতো সেটা মনে হলেই এখন আশ্চর্য লাগে।

আমরা ছোটরা দলবেঁধে সব ছড়া কাটতাম। চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে/দেখবি কে কে আয়/নতুন চাঁদের আলো এসে/পড়লো সবার গায়। টিভি, রেডিওতে গান শুরু হতো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুমি আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।’ এখন ভাবি কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ কবিতাটি না লিখলে ঈদের আনন্দটাই বোধকরি সম্পূর্ণ হতো না।

ভাগ্যিস কবির ভাবশিষ্য শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদের অনুরোধে ১৯৩১ সালে কবি এ গানটি আমাদের জন্য রচনা করেছিলেন। পাশাপাশি চারদিকে শুরু হতো বাজি ফোটানোর ধুম। আমরা দোকান থেকে কিনে নিতাম হরেকরকমের পটকা। কোনোটি ছিল বর্তুলাকার, কোনোটি আবার চ্যাপ্টা ধরনের। তারাবাতি নামে একটি বাজি ছিল যেটা আতশবাজির মতো চারদিক আলো ছড়াত। ওটাতে আগুন জ্বেলে হাতে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছুড়ে দিতাম আকাশে। ওটা থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতো পানির ফোয়ারার মতো। আরেকটি ছিল মরিচা বাতি, ওটার এক প্রান্তে আগুন ধরিয়ে দিলে সেটি চড়ুই পাখির মতো ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ করে ঘুরপাক খেয়ে ঈষৎ আলো ছড়িয়ে দড়াম শব্দে কাঁপাতো চারদিক। আবার আরেক ধরনের পাকটার নাম ছিল রকেট বোম। ওটার পশ্চাদে আগুন ধরিয়ে দিলে শো শো করে ওটা উঠে যেত আকাশের দিকে। তারপর বিকট শব্দে প্রকম্পিত হতো চারপাশ। পৃথিবীর অন্য মুসলিম দেশগুলোতে কিন্তু আমাদের মতো এমনভাবে পটকা কিংবা আতশবাজি ফুটিয়ে ঈদ উদযাপনের রীতি-রেওয়াজ চোখে পড়ে না। ঈদ উৎসবে এসব রীতি রেওয়াজের প্রচলন শুরু হয়েছিল মুঘল আমলে। রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, মুঘল সুবেদারগণ ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের সময় থেকেই ঈদের আনন্দ উৎসব উৎকর্ষ লাভ করতে শুরু করে। সুবেদার ইসলাম খাঁ যে বছর প্রথম ঢাকা আসেন তখন ছিল রমজান মাস। সে বছরই ঈদ উৎসব জাঁকজমকভাবে উদযাপিত হয়েছিল। একদিকে যেমন ছিল রাজধানী স্থাপনের আনন্দ অন্যদিকে ঈদের আনন্দ। মুঘল আমলে আকাশে নতুন চাঁদ দেখে কিভাবে আনন্দ উৎসব করা হতো সে বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন মির্জা নাথান। দিনের শেষে ঈদের নতুন চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠতো শাহীতুর্য। গোলন্দাজ বাহিনী শুরু করতো আকাশে আগুন লাগানো নয়নাভিরাম আতশবাজির উৎসব। সন্ধ্যার প্রথম প্রহর থেকে মধ্য রাত্রি পর্যন্ত একটানা বন্দুকের গুলি ছুড়ে এলাকাবাসীর মনে ঈদের আনন্দের রং মাখিয়ে দিত। রাতের শেষ প্রহরের দিকে বন্দুক ছোড়া বন্ধ করে গোলন্দাজ বাহিনী বড় কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ শুরু করত। তাতে করে দ্রাম দ্রাম শব্দে প্রকম্পিত হতো দূর-দূরান্ত পর্যন্ত। একটা সময় ছিল যখন হোটেল, রেস্তোরাঁর পাশাপাশি ঘরেও তৈরি হতো সুস্বাদু ও মজাদার হরেকরকমের সব ইফতার। শহরের বেশিরভাগ মানুষই এখন আর এসব ঝামেলা পোহাতে চান না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বাইরে থেকে তারা কিনে আনেন যাবতীয় ইফতার। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে বাড়িতে পিঁয়াজু, বেগুনি, মাংসের নানাবিধ চপ, কশা মাংস, পরোটা প্রভৃতির খোশবাই রোজার খিদেকে দ্বিগুণ, ত্রিগুণ বাড়িয়ে তুলত। ট্রেতে নানা রঙের ইফতার সাজিয়ে সাদা রঙের কাপড়ের উপর লাল, নীল ফুল আঁকা রুমালে ঢেকে ইফতার বিলানো হতো এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। আরেকটি কথা, বর্তমানে এই যে, আমাদের ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ ছোলা ও মুড়ি এটি কিভাবে আমাদের খাদ্য সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ল এ বিষয়টি জানার জন্য আমি বেশ কিছু কাল ধরে অনেক চেষ্টা তদ্বির করছিলাম। শিবনারায়ণ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ পণ্ডিতদের বই পড়ে যতটুকু জানা গেল তা হলো, ইংরেজ আমলে চলাচলের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। দুই কিংবা চার চাকার গাড়িগুলো টানতো তাগড়া ও হৃষ্টপুষ্ট সব ঘোড়া। অসুরের মতো শক্তি জোগাতে সেসব ঘোড়াকে সকাল-সন্ধ্যা খাওয়ানো হতো প্রচুর পরিমাণ ছোলা। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের ছোটবড় সব জমিদারের কাজকর্ম, বিষয় আশয় তদারকি করার জন্য প্রয়োজন হতো প্রচুর লোকলস্কর, পাইক-পেয়াদা ও কুলি-কামিন। জমিদারদের ধারনা হলো ঘোড়াদের ছোলা খাওয়ালে যদি শক্তি বাড়ে তবে এসব লোকলস্করদের দৈনন্দিন আহার্য খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে বেশ পরিমাণ ছোলা খাওয়ানো গেলে হয়তো তাদেরও পরিশ্রম ক্ষমতা বাড়বে। এভাবেই আস্তে আস্তে বাংলায় নিুবিত্তের মধ্যে ছোলা খাওয়ার প্রচলন শুরু হলো। প্রথম দিকে ছোলা খাওয়া হতো কাঁচা, দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে। পরবর্তী সময় ছোলা সেদ্ধ করে খাওয়ার চল শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ছোলার সঙ্গে যুক্ত হয় তেল মসলা প্রভৃতি অনুষঙ্গ। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, পূর্ববঙ্গের বেশিরভাগ হিন্দু জমিদারদের প্রজা ও কাজকর্মের অন্যান্য সব লোকজন ছিলেন মুসলিম। গরিব ও দরিদ্র মুসলমান সারাদিন রোজা রেখে ইফতারের সময় ছোলা খেতেন এ জন্য যে, তাতে হয়তো সারাদিনের শারীরিক দুর্বলতা দূর করে শরীরে শক্তি জোগাতে সহায়ক হবে ছোলা। এরপর ছোলার সঙ্গে যুক্ত হলো মুড়ি। অন্যদিকে পিঁয়াজু, ফুলুরি, বেগুনি এগুলো তো আমাদের দীর্ঘদিনের বাঙালি ঐতিহ্যময় খাবারেরই অনুষঙ্গ। আমি যখন ওয়ান টু’তে পড়ি তখন রোজা হতো গ্রীষ্মকালে। প্রচণ্ড গরমে ও তেষ্টায় রোজাদারদের হাসফাঁস অবস্থা। রোজা ভাঙতে প্রয়োজন সুশীতল বরফগলা পানি। ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে খুব কম মানুষের বাসাতেই ফ্রিজ ছিল। আমাদের বাড়িতেও ফ্রিজ আসে সম্ভবত ১৯৮৫ সালের দিকে। সে সময় দেখেছি বিকাল হলেই বরফওয়ালারা মাথায় করে কিংবা কখনও কখনও সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বরফের বাক্স চাপিয়ে বরফ বিক্রি করতে বেরুতো। কখনও কখনও বরফওয়ালাদের দেখা না পাওয়া গেলে বাবা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, ‘যা তো বাবা বরফ কল থেকে দু’চার টাকার বরফ নিয়ে আয় জলদি’। আমি তখনই আমার একটি লাল রঙের এ্যাভোন সাইকেল ছিল সেটাতে প্যাডেল চেপে দ্রুত চলে যেতাম আমাদের বাসা থেকে একটু দূরে আইসক্রিম ফ্যাক্টরিতে। সেখান থেকে বরফ নিয়ে আসতাম ফ্ল্যাক্সের ভেতর ভরে। প্রসঙ্গক্রমেই মনে পড়ে গেল ভারতবর্ষে প্রথম বরফ আমদানির ইতিহাস। বরফের মতো এমন একটি বস্তু দিয়েও যে ব্যবসা করা যায় সেটাও ইংরেজরাই আমাদের দেখিয়ে ছেড়েছিলেন। ভারতবর্ষে প্রথম বরফ আমদানি হয় কলকাতায়। ১৮৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকালে আমেরিকার বোস্টন থেকে বরফবোঝাই একটি জাহাজ কলকাতা বন্দরে এসে ভিড়ল। চারদিকে খবর রটে গেল মুহূর্তেই। আর অমনি কলকাতার লোকজন ঊর্ধ্বশ্বাসে সব ছুটল বন্দরের দিকে। বরফ জিনিসটা নিজ চর্ম চোখে না দেখা পর্যন্ত মনে শান্তি নেই যেন কারও। ওয়েনহাম হ্রদের জমাট বাঁধা বরফের চাঁই আমেরিকা থেকে কলকাতায় আনানোর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব লর্ড উলিয়াম বেন্টিঙ্কের। ভারতের শৌখিন ও বিলাসি সম্প্রদায় কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি যে ১৫ হাজার মাইল দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ভারতে বরফ আমদানি সম্ভব হবে। একবার বরফ ব্যবসায়ী টিউডর সাহেবের একখানা জাহাজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের পথে চড়ায় আটকে যায়। ওই ভাবে কাটে চার মাস। চার মাস পর যখন মালপত্র খালাস করা হয় তখন দেখা গেল যে, বরফের তেমন কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অন্যান্য মালপত্রের মধ্যে বরফও ছিল। এই ঘটনার পর টিউডর সাহেব ভারতবর্ষে বরফ রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিলেন।

এক সময় ঈদের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল মেলা। ঈদ উপলক্ষ্যে শুধু যে গ্রামগঞ্জেই মেলা হতো তা কিন্তু নয়। খোদ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বসত ঈদ মেলা জমজমাট সব আয়োজন। ধানমন্ডির ঈদগাহের পাশে ঈদ উপলক্ষ্যে একটি মেলার আয়োজন করা হতো। এ ছাড়াও রমনার ময়দান, চকবাজার, ইসলামপুর, ধূপখোলা মাঠ এবং পল্টন ময়দানে ঈদের মেলা হতো। পাঠক শুনে আশ্চর্যান্বিত হবেন যে, ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে গুলশানের ২ নাম্বারে কয়েকদিন আগেও যেখানে ওয়ান্ডার ল্যান্ড নামক একটি পার্ক ছিল। সে সময় ওটা ছিল জনসাধারণের জন্য অবারিত একটি পার্ক। নানা গাছ-গাছালিতে ছাওয়া ছিল পার্কটি। ওখানেই বসত বিরাট মেলা। নাগরদোলা থেকে শুরু করে বাঁশের বাঁশি, টিনের তলোয়ার, প্লাস্টিকের ছোট বাইস্কোপ, লাল-নীল কাগজের হরেকরকমের খেলনা কত কিছু যে পাওয়া যেত মেলায় সেটা বলে শেষ করা যাবে না। থাকত নানা রকম খাবার-খই, কদমা, মন্ডা, মুড়ি, মুড়কি, মোয়াসহ অন্যান্য মুখরোচক সব খাদ্যদ্রব্য। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মনের আনন্দে বরফওয়ালার কাছ থেকে কিনে নিত কুলফি বরফ, রাঙা শরবত, গোলাপি লজেন্সচুস কিংবা হাওয়াই মিঠাই। সেসময় এক টাকা ঘণ্টা সাইকেল পাওয়া যেত। আমি আর আমার সমবয়সি মামা দুজন দুটো সাইকেল ভাড়া করে বাড্ডা থেকে ছুটে যেতাম মেলায়। তখনও গুলশান এতটা জাতে ওঠেনি। বেশিরভাগ ইমারত-ই ছিল দু’তিন তলা ও সাধারণ মানের। গুলশান এক নাম্বার থেকে দুই নাম্বার পর্যন্ত পাকা সড়কটি ছিল একেবারে ফাঁকা। মাঝে মধ্যে শুধু দু-একটা টয়েটা পাবলিকা কিংবা ডেটসান জাতীয় প্রাইভেট কারগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে যেত। আমরা ভয়ে সাইকেল নিয়ে দ্রুত সরে যেতাম রাস্তার এক প্রান্তে। এ কথা আজ ধ্রুব সত্য যে মানুষের মধ্যে ঈদের আনন্দ দিনকে দিন পান্সে হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঈদের সব ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মানুষের মধ্যে অতিশয় আত্মকেন্দ্রিকতা, নানাবিধ ভার্চুয়াল আমোদ-প্রমোদ সভ্যতার চরম বিকাশ প্রভৃতি বিষয়গুলো এর প্রধান কারণে বলে আমার কাছে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা মনে পড়ে গেল নাম- সভ্যতার প্রতি। দার ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর/লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর/হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বাগ্রাসী/দাও সেই তপোবন পুন্যচ্ছায়ারাশি/গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান। রবি ঠাকুরের কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয় ফিরে আসুক ঈদ উৎসবের সেই পুরনো সুর। ঈদের আনন্দের রঙে রাঙুক প্রতিটি মানুষের হৃদয়।

ঈদের স্মৃতি

 সাইফুর রহমান 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে ঈদ উদযাপনের যে দীর্ঘ চর্চা, করোনা মহামারি তা নিমিষেই ম্লান করে দিয়েছে। মানুষ কি কখনো এমন ঈদ দেখেছে! যেখানে কোলাকুলি প্রায় নিষেধ? কাছে বসে বন্ধু আত্মীয়ের সঙ্গে গল্প করা নিষেধ?

মানুষ যা কল্পনাও করেনি তেমন একটি বিচ্ছিন্ন সময়ের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ইসলাম ধর্মের সর্ববৃহৎ ঈদ উৎসব। অথচ এই ঈদ ছিল ধনী-গরিবের মিলনের উৎসব। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কাছে ঈদের উৎসব যে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতো তা এখন কল্পনাতীত।

তখন গ্রামগঞ্জ কিংবা মফস্বল শহরে দেখা যেত গৃহকর্ত্রী মাঝরাতে উঠে রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছেন। তারপর রান্না শেষ হলে সবকিছু টাটকা খাওয়া। তবে শহর অঞ্চলে বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এক সময় ‘কাশিদা’ গেয়ে রোজাদারদের জাগিয়ে তোলার প্রচলন ছিল। আরবি ভাষায় পরিজনদের প্রশংসামূলক কবিতাকে বলে কাশিদা। তখনও মসজিদে মসজিদে মাইকের ব্যবহার শুরু হয়নি। আর সেজন্য রমজান মাস এলেই তরুণেরা পাড়া-মহল্লায় হেঁটে হেঁটে হামদ, নাত ও উর্দু কাশিদা গেয়ে রোজাদারদের ডেকে তুলতেন। কাশিদা দলের সদস্য ঠিক করতেন সেই মহল্লার পঞ্চায়েতরা। ঢাকায় পাঠান ও মুঘল আমল থেকেই কাশিদা গেয়ে সেহরি খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। রফিকুল ইসলাম লিখিত ‘যুগে যুগে ঢাকায় ঈদ মিছিল’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায়, কাশিদার এই প্রচলনটি খাজা আহসান উল্লাহর সময় আরও উৎকর্ষ লাভ করেছিল।

ছোটবেলায় প্রায়ই আমাদের ঈদ করা হতো নানাবাড়ি ঢাকার বাড্ডায়। আমার বয়স তখন কত হবে, বড়জোর ছয়-সাত বছর, ১৯৮৩-৮৪ সালের কথা বলছি। আমার নানা ছিলেন বাড্ডা আলাতুননেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আমার বাবাও সরকারি চাকুরে। কতই বা বেতন পান। সেবার ঈদে বাবা আমাদের নতুন কোনো জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেননি। ঈদের আগের সব দিন জামা-জুতোর জন্য কান্নাকাটি করলাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ঈদের দিন খুব ভোরে উঠে বর্ষার মেঘের মতো মুখ কালো ও ভার করে বসে রইলাম। নানার মনে হয়তো একটু দয়া হলো। তিনি সেই সকাল ৬টার দিকে আমাকে নিয়ে বের হলেন বাজারে। নিয়ে গেলেন একটি দর্জির দোকানে। ১৯৯০ সালের পূর্বেও বেশিরভাগ মানুষজনদের দেখতাম দর্জি দিয়ে জামা-কাপড় তৈরি করে পরতেন। এখন অবশ্য দিন বদলেছে। একটা সময় ছিল যখন খলিফা কিংবা দর্জিরা সব চাঁদ রাত জেগে খদ্দেরদের জন্য জামা-কাপড় সেলাই করতেন। অনেকে ঈদের দিন সকালেও পোশাক-পরিচ্ছেদ ডেলিভারি নিতেন। তো হয়েছে কি নানা ও আমি সেই দর্জির দোকানে গিয়ে হাজির। দেখলাম সেখানে অনেক মানুষ সারিবদ্ধভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জামা-কাপড় ডেলিভারি নিতে। দর্জি বেচারা ক্লান্ত দেহে সবার হাতে সদ্য নির্মিত কাপড়-জামাগুলো তুলে দিচ্ছিলেন এক এক করে। নানাকে দেখেই দর্জি সালাম দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সেসময় স্কুলের শিক্ষকদের মানুষ অসম্ভব শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন। নানা আমাকে দেখিয়ে বললেন, আমার নাতিটার খুব মন খারাপ। এবার ঈদে ওর জন্য কোনো নতুন জামা-কাপড় কেনা হয়নি। তুমি ভাই কষ্ট করে এক্ষুনি একটি ফুল হাতা শার্ট তৈরি করে দাও। দর্জি লোকটা বেশ উসখুস করতে লাগল। অন্য কেউ হলে হয়তো জোর গলায় ফিরিয়ে দিতেন। কিন্তু মহল্লার একমাত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলে কথা। দর্জি লোকটার ছেলেও সম্ভবত পড়তেন নানার স্কুলে। অতি সস্তা দামের ট্রেটনের একটি বড় থান থেকে কাপড় কেটে আমার জন্য দর্জি লোকটি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৈরি করে দিলেন একটি ফুলহাতা শার্ট। লাল, সবুজ ও হলুদ প্রিন্টের সেই শার্টটি যেন আমি এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই। আঁকিয়ে হলে সেই শার্টটির ছবি আমি এখনও হুবহু এঁকে দিতে পারতুম। আমার মনে হয় নাকে লাল টমেটো গোঁজা সার্কাসের ক্লাউনরাও এর চেয়ে ভালো রংচঙে জামা পরে খেলা দেখায়। স্মৃতিপটে শার্টটির ছবি হুবহু লেপটে আছে এ কারণে যে, সে বয়সে অর্ধেক পৃথিবীর সম্পদ আমার হাতে তুলে দিলেও বোধ করি এতটা খুশি আমি হতাম কিনা সন্দেহ। যা আমি হয়েছিলাম ঈদের সকালে সস্তা দামের সেই শার্টটি গায়ে চড়িয়ে।

পরিতাপের বিষয় এই, এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে ঈদের দিনও যেন অন্যান্য দিনের মতোই আরেকটি দিন। আমাদেরইবা কত বয়স হয়েছে। মাত্র তো চল্লিশ পেরলো। কিন্তু আমাদের সময়ে ঈদ যে কি পরিমাণ খুশির বার্তা নিয়ে আসতো সেটা আমাদের ছেলেমেয়েদের বোঝাই কি করে।

ঈদের নতুন চাঁদ দেখার কথাই প্রথম বলি- উনত্রিশ কিংবা ত্রিশ রোজার শেষে আমরা ছোট ছেলেপুলেরা তীর্থের কাকের মতো আকাশ পানে তাকিয়ে থাকতাম কখন দেখা দেবে ঈদের নতুন চাঁদ। শুভ্র সরু সুতোর মতো বাঁকা একফালি চাঁদ দেখার পর কি যে আনন্দ উল্লাস হতো সেটা মনে হলেই এখন আশ্চর্য লাগে।

আমরা ছোটরা দলবেঁধে সব ছড়া কাটতাম। চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে/দেখবি কে কে আয়/নতুন চাঁদের আলো এসে/পড়লো সবার গায়। টিভি, রেডিওতে গান শুরু হতো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুমি আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।’ এখন ভাবি কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ কবিতাটি না লিখলে ঈদের আনন্দটাই বোধকরি সম্পূর্ণ হতো না।

ভাগ্যিস কবির ভাবশিষ্য শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদের অনুরোধে ১৯৩১ সালে কবি এ গানটি আমাদের জন্য রচনা করেছিলেন। পাশাপাশি চারদিকে শুরু হতো বাজি ফোটানোর ধুম। আমরা দোকান থেকে কিনে নিতাম হরেকরকমের পটকা। কোনোটি ছিল বর্তুলাকার, কোনোটি আবার চ্যাপ্টা ধরনের। তারাবাতি নামে একটি বাজি ছিল যেটা আতশবাজির মতো চারদিক আলো ছড়াত। ওটাতে আগুন জ্বেলে হাতে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছুড়ে দিতাম আকাশে। ওটা থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতো পানির ফোয়ারার মতো। আরেকটি ছিল মরিচা বাতি, ওটার এক প্রান্তে আগুন ধরিয়ে দিলে সেটি চড়ুই পাখির মতো ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ করে ঘুরপাক খেয়ে ঈষৎ আলো ছড়িয়ে দড়াম শব্দে কাঁপাতো চারদিক। আবার আরেক ধরনের পাকটার নাম ছিল রকেট বোম। ওটার পশ্চাদে আগুন ধরিয়ে দিলে শো শো করে ওটা উঠে যেত আকাশের দিকে। তারপর বিকট শব্দে প্রকম্পিত হতো চারপাশ। পৃথিবীর অন্য মুসলিম দেশগুলোতে কিন্তু আমাদের মতো এমনভাবে পটকা কিংবা আতশবাজি ফুটিয়ে ঈদ উদযাপনের রীতি-রেওয়াজ চোখে পড়ে না। ঈদ উৎসবে এসব রীতি রেওয়াজের প্রচলন শুরু হয়েছিল মুঘল আমলে। রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, মুঘল সুবেদারগণ ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের সময় থেকেই ঈদের আনন্দ উৎসব উৎকর্ষ লাভ করতে শুরু করে। সুবেদার ইসলাম খাঁ যে বছর প্রথম ঢাকা আসেন তখন ছিল রমজান মাস। সে বছরই ঈদ উৎসব জাঁকজমকভাবে উদযাপিত হয়েছিল। একদিকে যেমন ছিল রাজধানী স্থাপনের আনন্দ অন্যদিকে ঈদের আনন্দ। মুঘল আমলে আকাশে নতুন চাঁদ দেখে কিভাবে আনন্দ উৎসব করা হতো সে বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন মির্জা নাথান। দিনের শেষে ঈদের নতুন চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠতো শাহীতুর্য। গোলন্দাজ বাহিনী শুরু করতো আকাশে আগুন লাগানো নয়নাভিরাম আতশবাজির উৎসব। সন্ধ্যার প্রথম প্রহর থেকে মধ্য রাত্রি পর্যন্ত একটানা বন্দুকের গুলি ছুড়ে এলাকাবাসীর মনে ঈদের আনন্দের রং মাখিয়ে দিত। রাতের শেষ প্রহরের দিকে বন্দুক ছোড়া বন্ধ করে গোলন্দাজ বাহিনী বড় কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ শুরু করত। তাতে করে দ্রাম দ্রাম শব্দে প্রকম্পিত হতো দূর-দূরান্ত পর্যন্ত। একটা সময় ছিল যখন হোটেল, রেস্তোরাঁর পাশাপাশি ঘরেও তৈরি হতো সুস্বাদু ও মজাদার হরেকরকমের সব ইফতার। শহরের বেশিরভাগ মানুষই এখন আর এসব ঝামেলা পোহাতে চান না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বাইরে থেকে তারা কিনে আনেন যাবতীয় ইফতার। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে বাড়িতে পিঁয়াজু, বেগুনি, মাংসের নানাবিধ চপ, কশা মাংস, পরোটা প্রভৃতির খোশবাই রোজার খিদেকে দ্বিগুণ, ত্রিগুণ বাড়িয়ে তুলত। ট্রেতে নানা রঙের ইফতার সাজিয়ে সাদা রঙের কাপড়ের উপর লাল, নীল ফুল আঁকা রুমালে ঢেকে ইফতার বিলানো হতো এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। আরেকটি কথা, বর্তমানে এই যে, আমাদের ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ ছোলা ও মুড়ি এটি কিভাবে আমাদের খাদ্য সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ল এ বিষয়টি জানার জন্য আমি বেশ কিছু কাল ধরে অনেক চেষ্টা তদ্বির করছিলাম। শিবনারায়ণ শাস্ত্রী, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ পণ্ডিতদের বই পড়ে যতটুকু জানা গেল তা হলো, ইংরেজ আমলে চলাচলের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। দুই কিংবা চার চাকার গাড়িগুলো টানতো তাগড়া ও হৃষ্টপুষ্ট সব ঘোড়া। অসুরের মতো শক্তি জোগাতে সেসব ঘোড়াকে সকাল-সন্ধ্যা খাওয়ানো হতো প্রচুর পরিমাণ ছোলা। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের ছোটবড় সব জমিদারের কাজকর্ম, বিষয় আশয় তদারকি করার জন্য প্রয়োজন হতো প্রচুর লোকলস্কর, পাইক-পেয়াদা ও কুলি-কামিন। জমিদারদের ধারনা হলো ঘোড়াদের ছোলা খাওয়ালে যদি শক্তি বাড়ে তবে এসব লোকলস্করদের দৈনন্দিন আহার্য খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে বেশ পরিমাণ ছোলা খাওয়ানো গেলে হয়তো তাদেরও পরিশ্রম ক্ষমতা বাড়বে। এভাবেই আস্তে আস্তে বাংলায় নিুবিত্তের মধ্যে ছোলা খাওয়ার প্রচলন শুরু হলো। প্রথম দিকে ছোলা খাওয়া হতো কাঁচা, দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে। পরবর্তী সময় ছোলা সেদ্ধ করে খাওয়ার চল শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ছোলার সঙ্গে যুক্ত হয় তেল মসলা প্রভৃতি অনুষঙ্গ। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, পূর্ববঙ্গের বেশিরভাগ হিন্দু জমিদারদের প্রজা ও কাজকর্মের অন্যান্য সব লোকজন ছিলেন মুসলিম। গরিব ও দরিদ্র মুসলমান সারাদিন রোজা রেখে ইফতারের সময় ছোলা খেতেন এ জন্য যে, তাতে হয়তো সারাদিনের শারীরিক দুর্বলতা দূর করে শরীরে শক্তি জোগাতে সহায়ক হবে ছোলা। এরপর ছোলার সঙ্গে যুক্ত হলো মুড়ি। অন্যদিকে পিঁয়াজু, ফুলুরি, বেগুনি এগুলো তো আমাদের দীর্ঘদিনের বাঙালি ঐতিহ্যময় খাবারেরই অনুষঙ্গ। আমি যখন ওয়ান টু’তে পড়ি তখন রোজা হতো গ্রীষ্মকালে। প্রচণ্ড গরমে ও তেষ্টায় রোজাদারদের হাসফাঁস অবস্থা। রোজা ভাঙতে প্রয়োজন সুশীতল বরফগলা পানি। ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে খুব কম মানুষের বাসাতেই ফ্রিজ ছিল। আমাদের বাড়িতেও ফ্রিজ আসে সম্ভবত ১৯৮৫ সালের দিকে। সে সময় দেখেছি বিকাল হলেই বরফওয়ালারা মাথায় করে কিংবা কখনও কখনও সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বরফের বাক্স চাপিয়ে বরফ বিক্রি করতে বেরুতো। কখনও কখনও বরফওয়ালাদের দেখা না পাওয়া গেলে বাবা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, ‘যা তো বাবা বরফ কল থেকে দু’চার টাকার বরফ নিয়ে আয় জলদি’। আমি তখনই আমার একটি লাল রঙের এ্যাভোন সাইকেল ছিল সেটাতে প্যাডেল চেপে দ্রুত চলে যেতাম আমাদের বাসা থেকে একটু দূরে আইসক্রিম ফ্যাক্টরিতে। সেখান থেকে বরফ নিয়ে আসতাম ফ্ল্যাক্সের ভেতর ভরে। প্রসঙ্গক্রমেই মনে পড়ে গেল ভারতবর্ষে প্রথম বরফ আমদানির ইতিহাস। বরফের মতো এমন একটি বস্তু দিয়েও যে ব্যবসা করা যায় সেটাও ইংরেজরাই আমাদের দেখিয়ে ছেড়েছিলেন। ভারতবর্ষে প্রথম বরফ আমদানি হয় কলকাতায়। ১৮৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকালে আমেরিকার বোস্টন থেকে বরফবোঝাই একটি জাহাজ কলকাতা বন্দরে এসে ভিড়ল। চারদিকে খবর রটে গেল মুহূর্তেই। আর অমনি কলকাতার লোকজন ঊর্ধ্বশ্বাসে সব ছুটল বন্দরের দিকে। বরফ জিনিসটা নিজ চর্ম চোখে না দেখা পর্যন্ত মনে শান্তি নেই যেন কারও। ওয়েনহাম হ্রদের জমাট বাঁধা বরফের চাঁই আমেরিকা থেকে কলকাতায় আনানোর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব লর্ড উলিয়াম বেন্টিঙ্কের। ভারতের শৌখিন ও বিলাসি সম্প্রদায় কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি যে ১৫ হাজার মাইল দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ভারতে বরফ আমদানি সম্ভব হবে। একবার বরফ ব্যবসায়ী টিউডর সাহেবের একখানা জাহাজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের পথে চড়ায় আটকে যায়। ওই ভাবে কাটে চার মাস। চার মাস পর যখন মালপত্র খালাস করা হয় তখন দেখা গেল যে, বরফের তেমন কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অন্যান্য মালপত্রের মধ্যে বরফও ছিল। এই ঘটনার পর টিউডর সাহেব ভারতবর্ষে বরফ রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিলেন।

এক সময় ঈদের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল মেলা। ঈদ উপলক্ষ্যে শুধু যে গ্রামগঞ্জেই মেলা হতো তা কিন্তু নয়। খোদ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বসত ঈদ মেলা জমজমাট সব আয়োজন। ধানমন্ডির ঈদগাহের পাশে ঈদ উপলক্ষ্যে একটি মেলার আয়োজন করা হতো। এ ছাড়াও রমনার ময়দান, চকবাজার, ইসলামপুর, ধূপখোলা মাঠ এবং পল্টন ময়দানে ঈদের মেলা হতো। পাঠক শুনে আশ্চর্যান্বিত হবেন যে, ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে গুলশানের ২ নাম্বারে কয়েকদিন আগেও যেখানে ওয়ান্ডার ল্যান্ড নামক একটি পার্ক ছিল। সে সময় ওটা ছিল জনসাধারণের জন্য অবারিত একটি পার্ক। নানা গাছ-গাছালিতে ছাওয়া ছিল পার্কটি। ওখানেই বসত বিরাট মেলা। নাগরদোলা থেকে শুরু করে বাঁশের বাঁশি, টিনের তলোয়ার, প্লাস্টিকের ছোট বাইস্কোপ, লাল-নীল কাগজের হরেকরকমের খেলনা কত কিছু যে পাওয়া যেত মেলায় সেটা বলে শেষ করা যাবে না। থাকত নানা রকম খাবার-খই, কদমা, মন্ডা, মুড়ি, মুড়কি, মোয়াসহ অন্যান্য মুখরোচক সব খাদ্যদ্রব্য। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মনের আনন্দে বরফওয়ালার কাছ থেকে কিনে নিত কুলফি বরফ, রাঙা শরবত, গোলাপি লজেন্সচুস কিংবা হাওয়াই মিঠাই। সেসময় এক টাকা ঘণ্টা সাইকেল পাওয়া যেত। আমি আর আমার সমবয়সি মামা দুজন দুটো সাইকেল ভাড়া করে বাড্ডা থেকে ছুটে যেতাম মেলায়। তখনও গুলশান এতটা জাতে ওঠেনি। বেশিরভাগ ইমারত-ই ছিল দু’তিন তলা ও সাধারণ মানের। গুলশান এক নাম্বার থেকে দুই নাম্বার পর্যন্ত পাকা সড়কটি ছিল একেবারে ফাঁকা। মাঝে মধ্যে শুধু দু-একটা টয়েটা পাবলিকা কিংবা ডেটসান জাতীয় প্রাইভেট কারগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে যেত। আমরা ভয়ে সাইকেল নিয়ে দ্রুত সরে যেতাম রাস্তার এক প্রান্তে। এ কথা আজ ধ্রুব সত্য যে মানুষের মধ্যে ঈদের আনন্দ দিনকে দিন পান্সে হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঈদের সব ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মানুষের মধ্যে অতিশয় আত্মকেন্দ্রিকতা, নানাবিধ ভার্চুয়াল আমোদ-প্রমোদ সভ্যতার চরম বিকাশ প্রভৃতি বিষয়গুলো এর প্রধান কারণে বলে আমার কাছে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা মনে পড়ে গেল নাম- সভ্যতার প্রতি। দার ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর/লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর/হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বাগ্রাসী/দাও সেই তপোবন পুন্যচ্ছায়ারাশি/গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান। রবি ঠাকুরের কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয় ফিরে আসুক ঈদ উৎসবের সেই পুরনো সুর। ঈদের আনন্দের রঙে রাঙুক প্রতিটি মানুষের হৃদয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন