ডাঙ্গা
jugantor
ডাঙ্গা

  মোহিত কামাল  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কষ্টটাকে ঘিরে রেখেছে মুগ্ধতা, ঘৃণাকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা- হঠাৎ স্বপনের মনে এমন ভাবনাতত্ত্বের উদয় হলো। গ্রামে বেড়াতে এসে পড়ন্ত বিকালে গাছতলায় বসে আকাশের দিকে তাকাতে গিয়ে চমকে উঠলেও ভাবনারা পালিয়ে গেল না। গাছটার অদ্ভুত ডাল আর শাখা-প্রশাখার কোথাও পাতা নেই। পাতাশূন্য ডালগুলোর একটার ভেতর আরেকটা ঢুকে এক জ্যামিতিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। কোথাও কোথাও প্রশাখাগুলো শাখা-ডাল প্যাঁচিয়ে রেখেছে, জিলাপির প্যাঁচকেও হার মানায় এ প্যাঁচ। কোথাও একডাল আরেক ডালকে এমনভাবে ক্রস করেছে যে খোলা চোখে মনে হয় গাছে ফুটে আছে অসংখ্য ত্রিভুজ, কোথাও আছে আয়তক্ষেত্র, কোথাও বর্গক্ষেত্র।

প্রকৃতির নান্দনিক এ উপহার ত্রিভুজ আর বর্গক্ষেত্রের সংখ্যা গোনা শুরু করল ও। গোনা শেষ করতে পারল না, হিজিবিজি লেগে যাচ্ছে, চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে, বিভ্রমেও ডুবে যাচ্ছে স্বপন। চোখের ধোঁয়াশা কাটাতে গোনার আগ্রহ বাদ দিয়ে ছোট-বড় ত্রিভুজের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল ও!

কী সুন্দর নীলমাখানো ঝলমলে আকাশ দেখা যাচ্ছে! দৃষ্টিসীমা শাখা-ত্রিভুজ পেরিয়ে যাওয়ার পর দূর আকাশে চোখে আর ত্রিভুজের তিন রেখা ধরা পড়ছে না। পুরো আকাশ দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জ্যামিতিক রেখার মধ্য দিয়ে! দেখার কষ্টের মধ্যেও স্বপন আবিষ্কার করল মুগ্ধতা! প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের পরিচয় পেয়ে নিজেকেই প্রকৃতির অংশ ভাবতে-ভাবতে মগ্ন হয়ে পড়েছিল ও। সামনের বাধা পেরোতে পারলে, ত্রিকোণাকৃতি পথের ঘেরমুক্ত হতে পারলে জীবনের মূল সড়কেও ওঠার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে উঠে দাঁড়াল গাছতলা থেকে। সামনে হেঁটে এলো কিছুটা পথ। পথের দু’পাশের ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম এবং নানা জাতের ঘাসফুল অনাদরে বড় হয়েও কী শোভা ছড়িয়ে দিয়েছে পথে-ঘাটে! এ পথে আসা-যাওয়া করেছে আরও অনেকবার। এমন করে তো চোখে ধরা পড়েনি এসব! আজ চোখে গেঁথে যাচ্ছে কেন প্রকৃতির অবহেলিত এ শোভা! এ মায়া!

মনের মধ্যে জেগে ওঠা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই খসখস পায়ের আওয়াজ পেয়ে পেছনে তাকাল স্বপন। তারপরেই চমকে উঠল হুল ফোটানো কথা শুনে :

‘আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে? জীবনের দিকে তাকাতে হবে না?’

‘কে! কে বলছেন?’ প্রশ্ন করে চারপাশটা অনুসন্ধানী চোখে দেখে নিল স্বপন। না, চারপাশে কেউ নেই। ওপরে তাকাল এবার। ওপরে রয়েছে খোলা আকাশ। সামনে এগোতে গিয়ে ভয় পেলেও থেমে গেল না। হাঁটুসমান ঝোপঝাড় পেরিয়ে চলে এলো ও খালপাড়ে। লোনা জলের খালে সাধারণত গতিশীল সে াত বয়ে যায়, শুকায় না এখানে খাল। এখন শুকিয়ে গেছে। ভরাট খালে তির তির করে বয়ে চলেছে সরু জলের ধারা। আর খালের শুকনো ঢালের তটে বসে আছে শুকনো বালির ঢেউ। স্থির চোখে তাকানোর আগে একবার মনে হয়েছিল জলের স্রোতের সঙ্গে একই রকমভাবে বয়ে যাচ্ছে এ ঢেউ।

খালের দিকে তাকিয়ে ওর মনে উদাস চিন্তার ঢেউ খেলে গেল। ঢেউগুলো লোনা জলের ঢেউয়ের মতো তির তির করে বইতে বইতে আচমকা উঠে গেল নিজ জীবনের বালু ঢেউয়ের তটে। আর তখনই শুনল, ‘তুমিও তো আগের মতো নাই গো!’

স্পষ্ট কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে একচক্কর ঘুরে আকাশের দিকে তাকাল। কোথাও কেউ নেই!

কে কথা বলছে! বিস্ময়জড়ানো প্রশ্ন নিয়ে নিজের দেহের দিকে তাকাল। না, ভুল শুনেছে। নিজের দেহটা আগের মতোই আছে। ডান বাহুর দিকে তাকিয়ে দেখল হাফহাতা শার্টের হাতার নিচে লুকিয়ে আছে সুঠাম বাহু। বললেই হলো আগের মতো নেই! পাত্তা দিল না শোনাকথা।

বালির ঢেউ পেরিয়ে জলের কাছাকাছি এসে হাঁটুমুড়ে বসে আঁজলা ভরে পানি তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তির তির বয়ে চলা জলস্রোত এলোমেলো হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর শৃঙ্খলা ফিরে এলো চলমান স্রোতে। খালের তলদেশে ছোটাছুটি করছে নাম-না-জানা অসংখ্য ছোট ছোট মাছ। স্বচ্ছ আয়নার মতো পুরো তলটা ভেসে উঠেছে! চোখ জুড়িয়ে গেল তা দেখে।

কী শোভা! কী ছায়া! কী মায়া গো নদীর কূলে কূলে! রবীন্দ্রনাথকে মনে মনে স্মরণ করল স্বপন। বসেই রইল এক সময়ের যৌবনদীপ্ত খালের বর্তমান শীর্ণ স্রোতের সামনে।

আর তখনই শুনল, ‘তোমারও এমন হাল হয়েছে গো! যৌবন চলে গেছে, শীর্ণ হয়ে গেছে তোমার দেহ, মনও।’

বয়স হয়েছে তাতে কী, পেশী তো মজবুতই আছে। পুরুষ্ট দেখাচ্ছে। মনও তো সচল, গাড়ির দুরন্ত চাকার মতো চলছে।

আকাশের রোদ এসে গালে গরম কামড় বসিয়ে দেওয়ার পর শূন্য আকাশ পানে আবার তাকাল স্বপন।

‘তোমার পূর্ণ জীবন শূন্য দিয়ে ভরা, খোলা আকাশের শূন্যতার চাইতেও বড় শূন্য সে-জীবন।’

আবারও শুনল কঠিন কথা। রুদ্রতাপে পুড়ে না-গেলেও শব্দের ঝাঁজালো উত্তাপে পুড়ে যেতে লাগল দেহ-কোষ। অবিশ্বাস্য আজগুবি কথা ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিতে চাইল। পারল না। মুখ দিয়ে ফুঁ দেওয়ার জন্য ঠোঁটের যে কারিশমা তৈরি হওয়ার কথা তা হলো না। বরং স্তব্ধ হয়ে স্বপন আবার তাকাল জীর্ণশীর্ণ স্রোতের দিকে। জলের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। ত্বকের ভাঁজ দেখতে পেল চোখের পাশে; আর নিচের ফোলা অংশ স্পষ্ট ঘোষণা করছে বয়স বাড়ার নিনাদ, গলার ত্বকের ভাঁজও জানান দিল সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত। তখনই রিংটোন বেজে উঠল পকেটে রাখা মুঠোফোনে।

‘কোথায় তুমি ?’ মার প্রশ্ন শুনে চমকে উঠলেও উত্তর না-দিয়ে বলল, ‘কী বলবে, বলো।’

‘তোমার জন্য কনে দেখেছি। কনেপক্ষ সব জেনে-শুনে বিয়েতে রাজি। ওরা তোমাকে ছেলেবেলা থেকে চেনে।’

আকাশের দিকে তাকাল স্বপন। সঙ্গে সঙ্গে কড়া রোদ হামলে পড়ল চোখে। জ্যোতি হারিয়ে গেল ক্ষণকালের জন্য। অন্ধকার ঘেঁটেঘুঁটে আলো ফিরে পেতে চাইল ও। পাচ্ছে না ফিরে। দিনেও গাঢ় হতে লাগল আঁধার। সূর্য কি আঁধারের পাহারা তুলে নিয়েছে? আরও গভীর খাদে ডেবে যেতে লাগল স্বপ্ন।

‘কী? কথা বলছ না কেন?’ মার দ্বিতীয় প্রশ্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরগ্রস্ত চোখের জ্যোতি ফিরে এলো। দেখতে পাচ্ছে ও, আলো দেখতে পাচ্ছে এখন। খালের শীর্ণ স্রোতে ধুয়ে নিতে জলে পা ডোবাতে গিয়েও তুলে নিল বাড়ানো ডান পা।

জুতো ভেজাতে চাইল না ও। অথচ মন-প্রাণ সঁপে চাইল জলের স্পর্শ পেতে।

‘জুতো না-খুললে জলের স্পর্শ কি পাবে পায়ের ক্লান্ত আঙুল!’ স্পষ্ট শুনল কথাটা। এটা মার কথা নয়, আলগা কথা। শূন্যতার গাঢ় স্তর ভেদ করে ভেসে আসা কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্বপন জুতোসহ পা ডুবিয়ে দিল জলে। আর তখনই পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেল।

মার উদ্দেশ্যে বলল, ‘ঢাকায় এলে কথা বলব, এখন না।’

॥ দুই ॥

“মা বলেছেন, ‘আপনাদের পরিবার ছেলেবেলা থেকে চেনেন আমাকে।’ তারা কীভাবে চেনেন? আপনি কি কখনো দেখেছেন আমাকে?” স্বপন প্রশ্ন করল কনে বিথীকে। তারা কনে দেখার সামাজিক-রীতি মেনে একান্তে কথা বলছে আলাদা ঘরে বসে।

‘আমিও বালিগ্রামের মেয়ে। আপনাদের আদি বাড়ির পাশেই আমাদের বাড়ি। শহরে থাকেন আপনি, আমিও। কিন্তু গ্রাম-প্রীতি আপনাকে ছাড়ে না, আমাদেরও না। প্রায় আপনাদের পরিবার বালিগ্রামে যাওয়া-আসা করে। আপনিও। সে হিসাবে আমার টিনেজে আপনাকে দেখেছি দূর থেকে।’

‘দূর থেকে দেখেছেন? আমি তো দেখিনি?’

‘আপনার চোখ তো উঁচুতে থাকে। সব সময় মাথা উঁচিয়ে গাছপালা দেখতেন, পাখির ঝাঁক দেখতেন, পেয়ারা গাছে বসে পেয়ারা খেতেন। আপনাদের বাড়িতে গিয়ে আমি দেখেছি আমার নিচু মাথা উপরে তুলে।’

স্পষ্ট কথা শুনে চমকে উঠল স্বপন। বিথীর কথায় কোনো জড়তা নেই দেখে ঘাবড়ে গিয়ে চুপ হয়ে রইল ও। কোন দিকে তার কথার মোড় ঘুরে যায় ভেবে কথা চালিয়ে যেতে বাধা পেতে লাগল ভেতর থেকে।

‘আপনার গ্রাম-প্রীতির গল্প আমার ভালো লাগে। ঝোপঝাড়ের মধ্যে আপনার ঘুরে বেড়ানোর গল্পটাও। আর আপনি নাকি আমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে আনমনে বসে থাকতেন। গ্রামে গেলেই একাকী বসে বসে সময় কাটাতেন। সেই দৃশ্য আমি দেখেছি একবার ঢাকা থেকে ঈদে বাড়ি গিয়ে। সেবার আপনাদের পুরো পরিবার গিয়েছিল বাড়িতে। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হতো। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখেছি। আপনি মাছের দাপাদাপি দেখে খুশি হতেন না, অন্যদের মতো হইচই করে চিৎকার জুড়ে দিতেন না। বরং বেছে বেছে মা-মাছগুলোকে পানিতে ছেড়ে দিতেন।’

চুপ হয়ে রইল স্বপন। সব সত্য বলছে বুঝতে পারল ও। প্রতিটি কথা মিলে যাচ্ছে। বাড়তি কিছু বলছে না। ওকে খুশি করার জন্যও না।

‘তখন আপনাকে দয়ালু ভাবতে পারিনি। লোভী ভেবেছি। বেশি মাছ চাষের আশায় মা-মাছদের সন্তান-মাছ থেকে আলাদা করে ফেলতেন দেখে আপনাকে দয়ামায়াহীন নির্দয় আর হিংস মনে হতো।’

ওরে বাপরে, কী সাংঘাতিক মেয়েরে! মুখের ওপর বলে দিচ্ছে সব কথা। একবার মনে মনে বলল, তোমাকে পছন্দ হয়েছে, বলতে পারল না। স্বপনের মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। ব্রেন স্ট্রোকের পর প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের মতো মনে হতে লাগল নিজেকে। ভেতরে অনেক কথা ফুটছে টগবগ করে। অথচ বাইরে কিছুই প্রকাশ করতে পারছে না ও।

‘আপনি এ বয়সেও বিয়ে করেননি কেন, জানি আমি। বিয়ে-ভীতি রোগ আছে আপনার, শুনেছি। মেয়েদের দেখলে নাকি থর থর করে কাঁপতে থাকেন, তাও শুনেছি। এখন দেখছি, না, কাঁপছেন না। তবে চুপ করে আছেন। ভেতরে ভেতরে মনে হয় কাঁপছেন। ঠিক বললাম, না?’

প্রশ্ন শুনে স্বপনের মাথা নিচে নেমে গেল। সবই জানে এ মেয়ে। তার কাছে লুকানোর কিছু নেই। তবু কথার জবাব দিতে পারছে না ও।

‘হয়তো ভাবছেন, আপনার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে, বুড়ো ভাবছেন নিজেকে। আমার বায়োডাটাও নিশ্চয়ই দেখেছেন, এবার চব্বিশ পেরোলাম। আপনার তুলনায় এত কম বয়সি মেয়েকে পাত্রী হিসাবে ভাবতে পারল কেন আমার গার্জেনরা, প্রশ্ন আসছে না মনে?’

স্বপন মাথা তুলল। মুখ ফুটে মনের কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারল না। অথচ মেয়েটা গরগর করে সব বলে যাচ্ছে।

‘ঘাটতি। ঘাটতি। কোনো ঘাটতি থাকলে, শহুরে ভাষায় বলে সমস্যা থাকলে অল্প বয়সি মেয়েদের বুড়ো জামাইয়ের হাতে তুলে দিতে হাত কাঁপে না গার্জেনদের।’

কী ঘাটতি তোমার, কী ত্রুটি, কী সমস্যা আছে তোমার? প্রশ্নটা স্বপনের বুকের মধ্যে জালে ধরা-পড়া বড় কাতলের মতো ঢুস মারতে লাগল, ঠিক যেন ইটালি-ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলায় মাত্তোরাজিকে মারা জিনেদিন জিদানের মতো ঢুস। তবু ওর মুখ খুলল না।

‘আমি নিশ্চিত আমার ঘাটতি আর সমস্যার কথা শুনলে আপনি পালাবেন। আমাকে কনে হিসাবে বাতিল করে দেবেন। তবু বলা উচিত আপনাকে, সৎ থাকা উচিত হবু জীবনসঙ্গীর সঙ্গে, যাকে ছেলেবেলা থেকে ভালো লাগতো তার সঙ্গে। কী বলেন আপনি?’

ছেলেবেলা থেকে ওকে বিথীর ভালোলাগার কথাটা শুনে আকাশ ঝলমল করে উঠল, অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে গেল বাতাসে, প্রবল প্রতাপে একটা শ্বাস টেনে নিল ও, টেনে নিল শুদ্ধ জীবনের নির্মল শ্বাস। তারপর চোখ তুলে তাকাল স্বপন। বলতে চাইল থাক, সব কথা বলার দরকার নেই। আর বিয়ে করা এবং তা টিকিয়ে রাখার জন্য সত্য এড়িয়ে যাওয়া জায়েজ আছে, মিথ্যা বলাও। এটা ধর্মের কথা। কিন্তু বলতে পারল না মনের কথাটা মুখ ফুটে।

বীথি এবার স্পষ্ট করে বলতে লাগল, “আমার ষোলো বছর বয়সে একবার বালিগ্রামে বালুনদীর পাশে ঝোপের মধ্যে এক হিংস মাছ শিকারি আমাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। ভয়ে কাউকে বলিনি ঘটনাটা। বলেছি যখন সবাই দেখতে পেল আমার পেট উঁচু হয়েছে, তখন। কী যে অত্যাচার চলল আমার ওপর দিয়ে! বড়দেরও যে কী হিংস আর নির্মম মনে হলো তখন, বলে বোঝাতে পারব না। ওরা আমার অ্যাবরশন করাল। চিকিৎসক বলে দিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতে আমার পেটে বাচ্চা নাও হতে পারে।’ এখন বলুন, অধিক বাচ্চার লোভে আমাকে জলে ছেড়ে দেবেন, নাকি আপনার ডাঙ্গায় তুলে রাখবেন, ভেবে বলুন। আমার কথা শেষ।”

স্ট্রোকে প্যারালাইসিসের রোগীর মুখে যখন কথা ফোটে তখন ভাঙা ভাঙা স্বরে কথা বলে।

এখন নিজেকে আর প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগী মনে হলো না স্বপনের। নিজের বিয়ে-ভীতিও মুহূর্তে উড়ে গেল। ওর মনে হতে লাগল বালুনদীর জীর্ণ নদীতে জোয়ার এসে গেছে। নদীর শুকনো তটে আসন গেড়ে বসে থাকা বালির ঢেউ ভেসে গেছে সেই জোয়ারে। পাতাহীন ডালে ডালে গজিয়ে গেছে পাতার পর পাতা, কচিসোনা নতুন পাতা! সব ত্রিভুজ ও আয়তক্ষেত্র, সত্যবাদিতার আলো পেয়ে হয়ে গেছে বর্গক্ষেত্র! সম্পাদ্য আর উপপাদ্যের জটিল গিট খুলে গেছে সততার নতুন আলোর পরশে। মুখ খুলে গেল স্বপনের। প্যাঁচখোলা জ্যামিতিক নতুন রেখাচিহ্ন বুকে নিয়ে শুদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে পরানের গহিন থেকে থেকে জেগে উঠে ও জবাব দিল, ‘ডাঙ্গায়।’

ডাঙ্গা

 মোহিত কামাল 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কষ্টটাকে ঘিরে রেখেছে মুগ্ধতা, ঘৃণাকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা- হঠাৎ স্বপনের মনে এমন ভাবনাতত্ত্বের উদয় হলো। গ্রামে বেড়াতে এসে পড়ন্ত বিকালে গাছতলায় বসে আকাশের দিকে তাকাতে গিয়ে চমকে উঠলেও ভাবনারা পালিয়ে গেল না। গাছটার অদ্ভুত ডাল আর শাখা-প্রশাখার কোথাও পাতা নেই। পাতাশূন্য ডালগুলোর একটার ভেতর আরেকটা ঢুকে এক জ্যামিতিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। কোথাও কোথাও প্রশাখাগুলো শাখা-ডাল প্যাঁচিয়ে রেখেছে, জিলাপির প্যাঁচকেও হার মানায় এ প্যাঁচ। কোথাও একডাল আরেক ডালকে এমনভাবে ক্রস করেছে যে খোলা চোখে মনে হয় গাছে ফুটে আছে অসংখ্য ত্রিভুজ, কোথাও আছে আয়তক্ষেত্র, কোথাও বর্গক্ষেত্র।

প্রকৃতির নান্দনিক এ উপহার ত্রিভুজ আর বর্গক্ষেত্রের সংখ্যা গোনা শুরু করল ও। গোনা শেষ করতে পারল না, হিজিবিজি লেগে যাচ্ছে, চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে, বিভ্রমেও ডুবে যাচ্ছে স্বপন। চোখের ধোঁয়াশা কাটাতে গোনার আগ্রহ বাদ দিয়ে ছোট-বড় ত্রিভুজের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল ও!

কী সুন্দর নীলমাখানো ঝলমলে আকাশ দেখা যাচ্ছে! দৃষ্টিসীমা শাখা-ত্রিভুজ পেরিয়ে যাওয়ার পর দূর আকাশে চোখে আর ত্রিভুজের তিন রেখা ধরা পড়ছে না। পুরো আকাশ দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জ্যামিতিক রেখার মধ্য দিয়ে! দেখার কষ্টের মধ্যেও স্বপন আবিষ্কার করল মুগ্ধতা! প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের পরিচয় পেয়ে নিজেকেই প্রকৃতির অংশ ভাবতে-ভাবতে মগ্ন হয়ে পড়েছিল ও। সামনের বাধা পেরোতে পারলে, ত্রিকোণাকৃতি পথের ঘেরমুক্ত হতে পারলে জীবনের মূল সড়কেও ওঠার সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে উঠে দাঁড়াল গাছতলা থেকে। সামনে হেঁটে এলো কিছুটা পথ। পথের দু’পাশের ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম এবং নানা জাতের ঘাসফুল অনাদরে বড় হয়েও কী শোভা ছড়িয়ে দিয়েছে পথে-ঘাটে! এ পথে আসা-যাওয়া করেছে আরও অনেকবার। এমন করে তো চোখে ধরা পড়েনি এসব! আজ চোখে গেঁথে যাচ্ছে কেন প্রকৃতির অবহেলিত এ শোভা! এ মায়া!

মনের মধ্যে জেগে ওঠা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই খসখস পায়ের আওয়াজ পেয়ে পেছনে তাকাল স্বপন। তারপরেই চমকে উঠল হুল ফোটানো কথা শুনে :

‘আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে? জীবনের দিকে তাকাতে হবে না?’

‘কে! কে বলছেন?’ প্রশ্ন করে চারপাশটা অনুসন্ধানী চোখে দেখে নিল স্বপন। না, চারপাশে কেউ নেই। ওপরে তাকাল এবার। ওপরে রয়েছে খোলা আকাশ। সামনে এগোতে গিয়ে ভয় পেলেও থেমে গেল না। হাঁটুসমান ঝোপঝাড় পেরিয়ে চলে এলো ও খালপাড়ে। লোনা জলের খালে সাধারণত গতিশীল সে াত বয়ে যায়, শুকায় না এখানে খাল। এখন শুকিয়ে গেছে। ভরাট খালে তির তির করে বয়ে চলেছে সরু জলের ধারা। আর খালের শুকনো ঢালের তটে বসে আছে শুকনো বালির ঢেউ। স্থির চোখে তাকানোর আগে একবার মনে হয়েছিল জলের স্রোতের সঙ্গে একই রকমভাবে বয়ে যাচ্ছে এ ঢেউ।

খালের দিকে তাকিয়ে ওর মনে উদাস চিন্তার ঢেউ খেলে গেল। ঢেউগুলো লোনা জলের ঢেউয়ের মতো তির তির করে বইতে বইতে আচমকা উঠে গেল নিজ জীবনের বালু ঢেউয়ের তটে। আর তখনই শুনল, ‘তুমিও তো আগের মতো নাই গো!’

স্পষ্ট কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে একচক্কর ঘুরে আকাশের দিকে তাকাল। কোথাও কেউ নেই!

কে কথা বলছে! বিস্ময়জড়ানো প্রশ্ন নিয়ে নিজের দেহের দিকে তাকাল। না, ভুল শুনেছে। নিজের দেহটা আগের মতোই আছে। ডান বাহুর দিকে তাকিয়ে দেখল হাফহাতা শার্টের হাতার নিচে লুকিয়ে আছে সুঠাম বাহু। বললেই হলো আগের মতো নেই! পাত্তা দিল না শোনাকথা।

বালির ঢেউ পেরিয়ে জলের কাছাকাছি এসে হাঁটুমুড়ে বসে আঁজলা ভরে পানি তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তির তির বয়ে চলা জলস্রোত এলোমেলো হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর শৃঙ্খলা ফিরে এলো চলমান স্রোতে। খালের তলদেশে ছোটাছুটি করছে নাম-না-জানা অসংখ্য ছোট ছোট মাছ। স্বচ্ছ আয়নার মতো পুরো তলটা ভেসে উঠেছে! চোখ জুড়িয়ে গেল তা দেখে।

কী শোভা! কী ছায়া! কী মায়া গো নদীর কূলে কূলে! রবীন্দ্রনাথকে মনে মনে স্মরণ করল স্বপন। বসেই রইল এক সময়ের যৌবনদীপ্ত খালের বর্তমান শীর্ণ স্রোতের সামনে।

আর তখনই শুনল, ‘তোমারও এমন হাল হয়েছে গো! যৌবন চলে গেছে, শীর্ণ হয়ে গেছে তোমার দেহ, মনও।’

বয়স হয়েছে তাতে কী, পেশী তো মজবুতই আছে। পুরুষ্ট দেখাচ্ছে। মনও তো সচল, গাড়ির দুরন্ত চাকার মতো চলছে।

আকাশের রোদ এসে গালে গরম কামড় বসিয়ে দেওয়ার পর শূন্য আকাশ পানে আবার তাকাল স্বপন।

‘তোমার পূর্ণ জীবন শূন্য দিয়ে ভরা, খোলা আকাশের শূন্যতার চাইতেও বড় শূন্য সে-জীবন।’

আবারও শুনল কঠিন কথা। রুদ্রতাপে পুড়ে না-গেলেও শব্দের ঝাঁজালো উত্তাপে পুড়ে যেতে লাগল দেহ-কোষ। অবিশ্বাস্য আজগুবি কথা ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিতে চাইল। পারল না। মুখ দিয়ে ফুঁ দেওয়ার জন্য ঠোঁটের যে কারিশমা তৈরি হওয়ার কথা তা হলো না। বরং স্তব্ধ হয়ে স্বপন আবার তাকাল জীর্ণশীর্ণ স্রোতের দিকে। জলের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। ত্বকের ভাঁজ দেখতে পেল চোখের পাশে; আর নিচের ফোলা অংশ স্পষ্ট ঘোষণা করছে বয়স বাড়ার নিনাদ, গলার ত্বকের ভাঁজও জানান দিল সময় চলে যাচ্ছে দ্রুত। তখনই রিংটোন বেজে উঠল পকেটে রাখা মুঠোফোনে।

‘কোথায় তুমি ?’ মার প্রশ্ন শুনে চমকে উঠলেও উত্তর না-দিয়ে বলল, ‘কী বলবে, বলো।’

‘তোমার জন্য কনে দেখেছি। কনেপক্ষ সব জেনে-শুনে বিয়েতে রাজি। ওরা তোমাকে ছেলেবেলা থেকে চেনে।’

আকাশের দিকে তাকাল স্বপন। সঙ্গে সঙ্গে কড়া রোদ হামলে পড়ল চোখে। জ্যোতি হারিয়ে গেল ক্ষণকালের জন্য। অন্ধকার ঘেঁটেঘুঁটে আলো ফিরে পেতে চাইল ও। পাচ্ছে না ফিরে। দিনেও গাঢ় হতে লাগল আঁধার। সূর্য কি আঁধারের পাহারা তুলে নিয়েছে? আরও গভীর খাদে ডেবে যেতে লাগল স্বপ্ন।

‘কী? কথা বলছ না কেন?’ মার দ্বিতীয় প্রশ্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরগ্রস্ত চোখের জ্যোতি ফিরে এলো। দেখতে পাচ্ছে ও, আলো দেখতে পাচ্ছে এখন। খালের শীর্ণ স্রোতে ধুয়ে নিতে জলে পা ডোবাতে গিয়েও তুলে নিল বাড়ানো ডান পা।

জুতো ভেজাতে চাইল না ও। অথচ মন-প্রাণ সঁপে চাইল জলের স্পর্শ পেতে।

‘জুতো না-খুললে জলের স্পর্শ কি পাবে পায়ের ক্লান্ত আঙুল!’ স্পষ্ট শুনল কথাটা। এটা মার কথা নয়, আলগা কথা। শূন্যতার গাঢ় স্তর ভেদ করে ভেসে আসা কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্বপন জুতোসহ পা ডুবিয়ে দিল জলে। আর তখনই পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেল।

মার উদ্দেশ্যে বলল, ‘ঢাকায় এলে কথা বলব, এখন না।’

॥ দুই ॥

“মা বলেছেন, ‘আপনাদের পরিবার ছেলেবেলা থেকে চেনেন আমাকে।’ তারা কীভাবে চেনেন? আপনি কি কখনো দেখেছেন আমাকে?” স্বপন প্রশ্ন করল কনে বিথীকে। তারা কনে দেখার সামাজিক-রীতি মেনে একান্তে কথা বলছে আলাদা ঘরে বসে।

‘আমিও বালিগ্রামের মেয়ে। আপনাদের আদি বাড়ির পাশেই আমাদের বাড়ি। শহরে থাকেন আপনি, আমিও। কিন্তু গ্রাম-প্রীতি আপনাকে ছাড়ে না, আমাদেরও না। প্রায় আপনাদের পরিবার বালিগ্রামে যাওয়া-আসা করে। আপনিও। সে হিসাবে আমার টিনেজে আপনাকে দেখেছি দূর থেকে।’

‘দূর থেকে দেখেছেন? আমি তো দেখিনি?’

‘আপনার চোখ তো উঁচুতে থাকে। সব সময় মাথা উঁচিয়ে গাছপালা দেখতেন, পাখির ঝাঁক দেখতেন, পেয়ারা গাছে বসে পেয়ারা খেতেন। আপনাদের বাড়িতে গিয়ে আমি দেখেছি আমার নিচু মাথা উপরে তুলে।’

স্পষ্ট কথা শুনে চমকে উঠল স্বপন। বিথীর কথায় কোনো জড়তা নেই দেখে ঘাবড়ে গিয়ে চুপ হয়ে রইল ও। কোন দিকে তার কথার মোড় ঘুরে যায় ভেবে কথা চালিয়ে যেতে বাধা পেতে লাগল ভেতর থেকে।

‘আপনার গ্রাম-প্রীতির গল্প আমার ভালো লাগে। ঝোপঝাড়ের মধ্যে আপনার ঘুরে বেড়ানোর গল্পটাও। আর আপনি নাকি আমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে আনমনে বসে থাকতেন। গ্রামে গেলেই একাকী বসে বসে সময় কাটাতেন। সেই দৃশ্য আমি দেখেছি একবার ঢাকা থেকে ঈদে বাড়ি গিয়ে। সেবার আপনাদের পুরো পরিবার গিয়েছিল বাড়িতে। পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হতো। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখেছি। আপনি মাছের দাপাদাপি দেখে খুশি হতেন না, অন্যদের মতো হইচই করে চিৎকার জুড়ে দিতেন না। বরং বেছে বেছে মা-মাছগুলোকে পানিতে ছেড়ে দিতেন।’

চুপ হয়ে রইল স্বপন। সব সত্য বলছে বুঝতে পারল ও। প্রতিটি কথা মিলে যাচ্ছে। বাড়তি কিছু বলছে না। ওকে খুশি করার জন্যও না।

‘তখন আপনাকে দয়ালু ভাবতে পারিনি। লোভী ভেবেছি। বেশি মাছ চাষের আশায় মা-মাছদের সন্তান-মাছ থেকে আলাদা করে ফেলতেন দেখে আপনাকে দয়ামায়াহীন নির্দয় আর হিংস মনে হতো।’

ওরে বাপরে, কী সাংঘাতিক মেয়েরে! মুখের ওপর বলে দিচ্ছে সব কথা। একবার মনে মনে বলল, তোমাকে পছন্দ হয়েছে, বলতে পারল না। স্বপনের মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। ব্রেন স্ট্রোকের পর প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের মতো মনে হতে লাগল নিজেকে। ভেতরে অনেক কথা ফুটছে টগবগ করে। অথচ বাইরে কিছুই প্রকাশ করতে পারছে না ও।

‘আপনি এ বয়সেও বিয়ে করেননি কেন, জানি আমি। বিয়ে-ভীতি রোগ আছে আপনার, শুনেছি। মেয়েদের দেখলে নাকি থর থর করে কাঁপতে থাকেন, তাও শুনেছি। এখন দেখছি, না, কাঁপছেন না। তবে চুপ করে আছেন। ভেতরে ভেতরে মনে হয় কাঁপছেন। ঠিক বললাম, না?’

প্রশ্ন শুনে স্বপনের মাথা নিচে নেমে গেল। সবই জানে এ মেয়ে। তার কাছে লুকানোর কিছু নেই। তবু কথার জবাব দিতে পারছে না ও।

‘হয়তো ভাবছেন, আপনার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে, বুড়ো ভাবছেন নিজেকে। আমার বায়োডাটাও নিশ্চয়ই দেখেছেন, এবার চব্বিশ পেরোলাম। আপনার তুলনায় এত কম বয়সি মেয়েকে পাত্রী হিসাবে ভাবতে পারল কেন আমার গার্জেনরা, প্রশ্ন আসছে না মনে?’

স্বপন মাথা তুলল। মুখ ফুটে মনের কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারল না। অথচ মেয়েটা গরগর করে সব বলে যাচ্ছে।

‘ঘাটতি। ঘাটতি। কোনো ঘাটতি থাকলে, শহুরে ভাষায় বলে সমস্যা থাকলে অল্প বয়সি মেয়েদের বুড়ো জামাইয়ের হাতে তুলে দিতে হাত কাঁপে না গার্জেনদের।’

কী ঘাটতি তোমার, কী ত্রুটি, কী সমস্যা আছে তোমার? প্রশ্নটা স্বপনের বুকের মধ্যে জালে ধরা-পড়া বড় কাতলের মতো ঢুস মারতে লাগল, ঠিক যেন ইটালি-ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলায় মাত্তোরাজিকে মারা জিনেদিন জিদানের মতো ঢুস। তবু ওর মুখ খুলল না।

‘আমি নিশ্চিত আমার ঘাটতি আর সমস্যার কথা শুনলে আপনি পালাবেন। আমাকে কনে হিসাবে বাতিল করে দেবেন। তবু বলা উচিত আপনাকে, সৎ থাকা উচিত হবু জীবনসঙ্গীর সঙ্গে, যাকে ছেলেবেলা থেকে ভালো লাগতো তার সঙ্গে। কী বলেন আপনি?’

ছেলেবেলা থেকে ওকে বিথীর ভালোলাগার কথাটা শুনে আকাশ ঝলমল করে উঠল, অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে গেল বাতাসে, প্রবল প্রতাপে একটা শ্বাস টেনে নিল ও, টেনে নিল শুদ্ধ জীবনের নির্মল শ্বাস। তারপর চোখ তুলে তাকাল স্বপন। বলতে চাইল থাক, সব কথা বলার দরকার নেই। আর বিয়ে করা এবং তা টিকিয়ে রাখার জন্য সত্য এড়িয়ে যাওয়া জায়েজ আছে, মিথ্যা বলাও। এটা ধর্মের কথা। কিন্তু বলতে পারল না মনের কথাটা মুখ ফুটে।

বীথি এবার স্পষ্ট করে বলতে লাগল, “আমার ষোলো বছর বয়সে একবার বালিগ্রামে বালুনদীর পাশে ঝোপের মধ্যে এক হিংস মাছ শিকারি আমাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। ভয়ে কাউকে বলিনি ঘটনাটা। বলেছি যখন সবাই দেখতে পেল আমার পেট উঁচু হয়েছে, তখন। কী যে অত্যাচার চলল আমার ওপর দিয়ে! বড়দেরও যে কী হিংস আর নির্মম মনে হলো তখন, বলে বোঝাতে পারব না। ওরা আমার অ্যাবরশন করাল। চিকিৎসক বলে দিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতে আমার পেটে বাচ্চা নাও হতে পারে।’ এখন বলুন, অধিক বাচ্চার লোভে আমাকে জলে ছেড়ে দেবেন, নাকি আপনার ডাঙ্গায় তুলে রাখবেন, ভেবে বলুন। আমার কথা শেষ।”

স্ট্রোকে প্যারালাইসিসের রোগীর মুখে যখন কথা ফোটে তখন ভাঙা ভাঙা স্বরে কথা বলে।

এখন নিজেকে আর প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগী মনে হলো না স্বপনের। নিজের বিয়ে-ভীতিও মুহূর্তে উড়ে গেল। ওর মনে হতে লাগল বালুনদীর জীর্ণ নদীতে জোয়ার এসে গেছে। নদীর শুকনো তটে আসন গেড়ে বসে থাকা বালির ঢেউ ভেসে গেছে সেই জোয়ারে। পাতাহীন ডালে ডালে গজিয়ে গেছে পাতার পর পাতা, কচিসোনা নতুন পাতা! সব ত্রিভুজ ও আয়তক্ষেত্র, সত্যবাদিতার আলো পেয়ে হয়ে গেছে বর্গক্ষেত্র! সম্পাদ্য আর উপপাদ্যের জটিল গিট খুলে গেছে সততার নতুন আলোর পরশে। মুখ খুলে গেল স্বপনের। প্যাঁচখোলা জ্যামিতিক নতুন রেখাচিহ্ন বুকে নিয়ে শুদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে পরানের গহিন থেকে থেকে জেগে উঠে ও জবাব দিল, ‘ডাঙ্গায়।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন