অনুপের মৃত্যু অতঃপর
jugantor
অনুপের মৃত্যু অতঃপর

  সরকার মাসুদ  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দিন শেষে সন্ধ্যায় আবেগ থিতু হয়ে এসেছে যখন, মুন্না ভাবল, কী আর করা! জীবন তো এমনই। আর জীবনের সমাপ্তি হবে কীভাবে তা কে বলতে পারে? আমরা কেউ কি ভেবেছি, অনুপটা ওভাবে মরে যাবে? আরও অনেক বছর ও বাঁচবে এমনই তো আশা করেছিলাম আমরা, যারা ওর কাছের মানুষ।

খবরটা পেয়েছিল সকাল দশটার দিকে। না, কেউ ফোন করে জানায়নি। জানিয়েছে মুন্নার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কচি যে অনুপেরও ঘনিষ্ঠ ছিল। মুন্না এখন ভাবে, সজ্জন কচি বন্ধুবৎসল কচি কথাসাহিত্যিক কচি তোর কেমন লেগেছিল রে যখন তুই আমাকে দুসংবাদটা দেওয়ার জন্য মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করছিলি? আসলে তুই তো তখন কাঁদছিলি কিন্তু চোখে পানি ছিল না। তোর বুকের ওপর তখন একটা ভারী পাথর চেপে বসেছিল। কে জানে ক’দিন পর ওটা নেমে গেছে!

দশটা চল্লিশে ছিল ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস। ক্লাসে গিয়েও ছিল মুন্না। গত ক্লাসে বলেছিল, আজ কথা হবে আধুনিক কবিতা নিয়ে। কিন্তু কিসের কী? মনের ওই অবস্থায় পড়ানো সম্ভব? ভেবেছিল রোল কলটা শেষ হলে ছাত্রদের বলে বেরিয়ে যাবে। হাজিরা খাতার কভার ওল্টাতেই ছাত্রদের নামের তালিকা নয়, সে এক ঝলক দেখতে পেল অনুপের বিষণ্ন মুখ। অনুপের বিষণ্ন হাসি। দরজা খুলে দিয়েই অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গিতে মুন্নাকে বলছে, আয়! মুন্না আবার দেখতে পাচ্ছে মেসেজ বডিতে লেখা শব্দগুলো- our close friend Anup Kumar

Sarker is no more! This morning he fell down on the floor of the washroom. He did not get

back his sense finally. এটেন্ডান্স রেজিসটার হাতে নেওয়ার ২-৩ মিনিট পরও রোল কল শুরু হচ্ছে না দেখে একজন ছাত্র বলে, স্যার, আজ রোল কল হবে না? মায়া নামের এক ছাত্রীর চোখে পড়ে, তাদের প্রিয় শিক্ষকের মুখ আজ খুবই ভার, তার চোখজোড়া ছলছল এবং প্রশ্ন করতে দেরি করে না, স্যার, কী হইছে আপনার? আপনার কি শরীর খারাপ?

হ্যাঁ! কী বললে? যেন চমকে ওঠে মুন্না।

না, ঠিক আছে। আমার শরীর ভালো আছে। আমাদের এক বন্ধু মারা গেছে আজ সকালে। আধা ঘণ্টা আগে জানলাম।

মায়া জিজ্ঞেস করে, আপনার ক্লোজ ফ্রেন্ড?

মুন্না বলে, শোনো, যদি সামর্থ্য থাকত আমি হেলিকপ্টার ভাড়া করে রাজশাহী রওনা হয়ে যেতাম, বুঝেছ?

সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে খবরটা শোনার পর সুষমা খালি বলেছিল, আল্লাহ! তোমাদের রাজশাহীর বন্ধু অনুপ? অনুপ দা? তারপর চুপ করে থেকেছে অনেকটা সময়। হতে পারে মুন্নার সঙ্গে ওর ষষ্টীতলার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি- ওখানে অনেকক্ষণ কাটানোর কথা মনে পড়েছিল তার। মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অনেক কম সময়ে মানুষ চিনতে পারে। অনুপ- যে কেবল ভালো মানুষ নয়, ওর মধ্যে আরও নানা ভালো দিক আছে সেটা অল্প সময়েই টের পেয়েছিল সুষমা। তখন কেবল ন’টা বাজে। এর ভেতরেই ওরা অনুপের বাসায় হাজির। কেননা এগারোটার মধ্যে কামাল আসবে। কামালকে সঙ্গে নিয়ে ওরা শাড়ি কিনতে যাবে। সুষমার অনেক দিনের ইচ্ছা, রাজশাহী গেলে সিল্কের শাড়ি কিনবে। ওখানে অসংখ্য দোকান। দামও হয়তো সাশ্রয়ী হবে। মুন্না তো মাঝেমাঝে রাজশাহী আসে, এই প্রথম এলো ভাবিকে নিয়ে। আপ্যায়ন না করা খুবই অভদ্রতা হবে, ভেবে কিচেনের দিকে এগোয় অনুপ। তারপর খুটখাট শব্দ আসছিল। চা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বোধ হয়। ব্যাচেলর মানুষ। কী করবে না করবে! বেচারা এখনো নাশতা খায়নি হয়তো। সুষমা কিচেনে গিয়ে ঢুকল। দ্যান অনুপ দা, আমিই করি। আপনি বসেন। বন্ধুর সঙ্গে গল্প করেন।

চমৎকার বেতের সোফায় বসে আছে মুন্না। সামনে ছোট নিচু টেবিলের ওপর ‘দেশ’ কারেন্ট সংখ্যা। ৩-৪টা ইংরেজি বই। অনুপ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে মুন্নার দিকে চেয়ে স্মিত হাসে। বলে, ম্যাগাজিন দেখতে থাক। আমি একটু নিচে যাচ্ছি। এই ১০-১৫ মিনিট।

মুন্না ভাবল, ও বোধ হয় চায়ের সঙ্গে খাওয়া চলে এমন কিছু আনতে গেল। পারুটিও আনতে পারে। ব্রেড ওর পছন্দ। সুষমার কমনসেন্স খুব ভালো। এই যে ও অনুপকে চা বানাতে দিল না, নিজেই কাজটা নিয়ে নিল, এমনটাই তো হওয়া উচিত। ওর এই দিকগুলো ভালো লাগে মুন্নার। মেয়েটা ছোটখাটো কারণে খুব রেগে যায়। নিজে ভুল করলেও কখনও ‘সরি’ বলে না, উল্টো স্বামীর ঘাড়ে দোষ চাপায়। এই দু-একটা বিষয় ছাড়া আর সব কিছু ওর ভালো। তুচ্ছ বিষয়ে আগ্রহ দেখানো, বেশি আবেগী হওয়া, ফোনালাপের সময় এক কথা বারবার বলা এসব মেয়েলি প্রবণতার কথা বলে লাভ নেই। এগুলো সব মেয়ের মধ্যেই আছে ।

ঘাড়ের পেছনে দু’হাতের তালু রেখে বসে ছিল মুন্না।

হঠাৎ সামনে ঝুঁকে হাতে নেয় দেশটা। কয়েটা পাতা উল্টিয়ে ‘গ্রন্থলোক’-এ এসে থামে। ওরহান পামুকের ‘ইস্তাম্বুল’ উপন্যাসের ওপর লেখাটা পড়ে ফেলে। নাতিদীর্ঘ রিভিয়ু, কিন্তু কি চমৎকার! অল্প কথায় লেখকের ইতিহাসবোধ ও গদ্যশৈলী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনুপ ভাবে, এই মানের একটা পত্রিকা বাংলাদেশে আজও হলো না। আর হবে কী করে? প্রতিভাবান পরিশ্রমী লেখকের এত অভাব এখানে! তার ওপর আছে স্বজনপ্রীতি। আরে বাবা, সম্পাদকদের পছন্দের লোক তো থাকতেই পারে, চিরকালই ছিল। কিন্তু তারও লেখার ন্যূনতম একটা মান থাকতে হবে তো, নাকি? বস্তাপচা মাল ছাপলে কাগজ ভালো হবে কী করে?

দুই বেডরুমের ছোট বাসা। একটায় অনুপ থাকে। অন্যটায় ওর ভাগ্নে সবুজ। সবুজ ইউনিভার্সিটি গেছে। সকালে ওর ক্লাস ছিল। অনুপের দায়িত্ববোধের বিষয়টা ভালো লাগে মুন্নার। ও স্বার্থপর হতে পারেনি। এ ধরনের মানুষ তা হতেও পারে না। তা ছাড়া ওর বাবা ছিলেন তেমন এক মানুষ যার কাছ থেকে ও ভালো অনেক কিছু শিখেছিল। এ সৌভাগ্য সবার হয় না।

শেষ কয়েকটা বছর অনুপ খুব একা হয়ে গিয়েছিল। সবুজ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। একই শহরে থাকত তবুও কচির সঙ্গে দেখা হতো না। হতো না মানে এত কম দেখা হতো! পাঞ্জাবি দুলিয়ে কামাল আসত অনেকদিন পর পর। ওদের নিউমার্কেটের সান্ধ্যকালীন আড্ডাটাও ততদিনে উঠে গেছে। আর মুন্না তো ঢাকায় অনেক বছর হলো। ও হ্যাঁ, আরেকজন আসত। পীযুষ তরফদার। সেও তখন রাজশাহীতে। ফ্যামিলি নিয়ে থাকে। অনুপ মুন্না পীযুষরা ভার্সিটিতে ক্লাসমেট ছিল। শুধু ক্লাসমেট না, রীতিমতো ক্লোজ ফ্রেন্ড। অনুপের মৃত্যুর কয়েক মাস পর মুন্না রাজশাহী গিয়েছিল। যথারীতি উঠেছিল কচির বাসায়। সন্ধ্যায় সাহেববাজার বড় মসজিদের মোড়ে পীযুষের সঙ্গে দেখা। মুন্না বলে, কী ব্যাপার বল তো! অনুপের শরীরটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল?

আর বলিস না! শরীর তো আগে থেকেই খারাপ। কয়েক বছর আগে ডায়াবেটিস ধরা পড়ল। পরে হার্টের সমস্যাও দেখা দিল।

ওষুধ খেত না নিয়মিত?

তা খেত, পীযুষ বলে, খেলে কী হবে, এসব কেসে রেগুলার ইন্টারভ্যাল দিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয়।

মুন্না বলে, ও সেটা করেনি, তাই তো?

একদম ঠিক ধরেছিস। তুই তো ওকে জানিস মুন্না, অভিমান ছিল তো। ফলে শেষের দিকে

একগুঁয়ে হয়ে উঠেছিল। কথা বেশি সময় হয়নি। পীযুষের তাড়া ছিল। ‘স্যরি’ বলে বিদায় নিতে হয়েছিল ওকে। মুন্না কিন্তু অল্প সময়েই যা বোঝার বুঝে গেছে ।

ওরা যখন লেখাপড়া শেষ করে বেরোয় তখন ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্সধারীদের অনেক ডিমান্ড। পাশ করে বেরোতে না বেরোতেই চাকরি হলো অনুপের। পোস্টিং লালমনিরহাটে, কৃষি ব্যাংকের প্রধান অফিসে। কয়েক মাসের মধ্যেই সে বুঝেছিল, ওই কাজ তার নয়। ফলে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই রাজশাহী ফিরে আসে। প্রথমে এক-দেড় বছর পড়ায় আড়ানি কলেজে। ট্রেনে করে যেত আসত। তারপর যোগ দেয় বানেশ্বর ডিগ্রি কলেজে। আমৃত্যু ওখানেই ছিল। বানেশ্বরে থাকাকালীন ওর একটা প্রমোশনও হয়েছিল। নাটোর-রাজশাহী বাস রুটের মাঝামাঝি জায়গা বানেশ্বর ঠিক শহর না, আবার আড়ানির মতো গন্ডগ্রামও না। বাসা থেকে বেরিয়ে পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে কলেজে পৌঁছে যেতে পারত। অনুপ মোটামুটি মানিয়ে নিতে পেরেছিল। কেননা লোকাল ট্রেনে যাতায়াতের হ্যাপা ছিল না। অনেকটা সময় বাঁচত। সেই সময়টাতে নিজের ইচ্ছামতো কাজে লাগাত।

সেবার রাজশাহী থেকে ফিরে আসার পর আর পাঁচটা মেয়ের মতোই সুষমা জিজ্ঞেস করেছিল, অনুপ দা বিয়ে করল না কেন?

মুন্না বলেছে, সেটা বলা মুশকিল। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু বটে, কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে খুব কমই কথা হতো। ওর চরিত্রে একটা অন্যরকম স্বাতন্ত্র্র্য ছিল। গড়পড়তা বাঙালি মেয়ে ওকে বুঝবে না। ওরকম কাউকে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি হওয়ার খুবই সম্ভাবনা। আবার একই সঙ্গে সুশিক্ষিতা, ব্যক্তিত্বময়ী ও ব্যতিক্রমী টাইপের পাত্রী পাওয়াও খুব কঠিন। পাওয়া গেলেও সেই মেয়ে অনুপকে বিয়ে করতে রাজি হবে তার নিশ্চয়তা কী? তা ছাড়া ওকে অনেক

কিছু দেখতে হয়। একটা ভাগ্নে ওর সঙ্গে থাকে। তার পড়ার খরচ জোগায় সে। আরও অনেক কিছু আছে। এসব সাত-পাঁচ ভেবেই হয়তো বিয়ে করতে রাজি হলো না।

সুষমা অবাক কণ্ঠে বলে, বিয়ের কথাবার্তাও ওঠেনি কখনো? মানে সম্বন্ধের আলাপটালাপ?

যদ্দূর জানি, ও লালমনিরহাটে থাকতে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। ওর বাবা দু-তিনবার চেষ্টা করেছিলেন। রাজশাহীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

অনুপকে নিয়ে যখন ভেবেছে, একটা কথা মুন্নার প্রায়ই মনে হয়েছে, বিয়ে-শাদি সময়মতো না করলে বা আদৌ না করলে মানুষের শরীর ও মনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সবকিছুরই তো একটা নিয়ম আছে। পয়তাল্লিশের কাছাকাছি এসে অনুপের শরীরটা কেমন ভেঙে গেল। নানারকম অস্বস্তিও দেখা দিল শরীরে। তা ছাড়া নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়ার ব্যাপার তো ছিলই। একটা ছবি মুন্নার মাথায় সেঁটে আছে। ডিসেম্বর মাস। রাজশাহীতে খুব শীত পড়েছে। অলকা সিনেমার পাশের গলিতে একটা বাড়ির দোতলায় থাকত অনুপ। ভার্সিটি বন্ধ। সবুজ বাড়ি গেছে। বাসায় অনুপ একা। ফুলহাতা সোয়েটারের ওপর শাল জড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বিছানার মাঝখানে বসে আছে। কান-মাথা মাফলারে টাইট করে বাঁধা। অনুপ একটু পর পর জোরে শ্বাস নিচ্ছে। যতটা সম্ভব বাতাস ভেতরে নিতে চাইছে। কিন্তু শ্বাসনালি সহযোগিতা করছে অল্পই। এক অসুস্থ, মধ্যবয়সী মানুষের বিপন্ন দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে আছে সামনের দেওয়াল পর্যন্ত ।

মুন্না প্রশ্ন করে, কী অবস্থা? খুব বেড়ে গেছে?

অনুপ বলে, আর বলিস না! গত পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় তিনবার ইনহেলার নিলাম। তারপরও তেমন

কাজ হচ্ছে না।

ডাক্তারের কাছে যাবি? চল আমার সঙ্গে।

তিন-চার দিন আগেই গিয়েছিলাম। সেলিমকে বলেছি ট্যাবলেট আনতে। ট্যাবলেটটা খেলে রিলিফ পাবো। তুই চিন্তা করিস না।

সারা দেশে ঘুরে বেড়ায় মুন্না। ভ্রমণ তার রক্তের মধ্যে। মুন্নার প্রবল আগ্রহের কথা শুনে অনুপ বলেছিল, বাড়ি যাওয়ার আগে তোকে জানাব। তুই সময়মতো রাজশাহী চলে আসিস। একসঙ্গে যাওয়া যাবে। গত পাঁচ বছরে মুন্না দেশে-বিদেশে কত জায়গায় ঘুরল, কত কিছু করল। অনুপের সঙ্গে যাওয়া আর হলো না। ওহ্! অনুপ আজ চিতায় ওঠার জন্য চলে গেছে নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানার সেই নিভৃত গ্রামে। ওদের বাড়ির পুকুরের পাকা ঘাটলার সিড়িতে অনুপ আর বসে থাকবে না ভাববিহ্বল। ওর ঘন অন্যমনস্কতার চারপাশে ঘুরে ঘুরে ফড়িং আর উড়বে না কখনই। আর কোনোদিন ব্যাগ কাঁধে ভ্রমণক্লান্ত অনুপ কুমার সরকার ফিরে আসবে না পৃথিবীতে।

প্ল্যান ছিল লাঞ্চের পর রেস্ট নিয়ে মুন্না ডিগ্রি ইনকোর্স পরীক্ষার দুটো প্রশ্নপত্র তৈরি করবে। কিন্তু যে মানুষ সকালবেলায়ই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃতুসংবাদ পায়, এমনকি দূরত্বের দৈর্ঘ্যবশত মৃত বন্ধুর মুখটা শেষবারের মতো দেখারও সুযোগ পায় না, তার কাজে মন বসে কী করে? সুতরাং সাদা কাগজ টেবিলের ওপরেই পড়ে থাকল। সারা দিন ওই এক মনোবেদনা। ভাবগম্ভীর মুন্না বারান্দায় পায়চারি করলো দীর্ঘ সময়। এমন যদি হতো ওর ছেলেমেয়ে আছে। তাদের একজন বিদেশে থাকে। সে দেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে নওগা পৌঁছে আবার বদলগাছির সেই গ্রাম পর্যন্ত যাওয়া- অনেকটা সময়ের ব্যাপার। তাহলে আমি রওনা যেতাম, সোজা নওগাঁ হয়ে বদলগাছি। হ্যাঁ, যেতামই। কেননা সে রকম হলে তো পারদিন দুপুরের আগে অনুপের সৎকার সম্পন্ন হতো না। মুন্না জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে। সে আসলে এখন কোনো কিছু দেখছে না। তার দৃষ্টি এখন নিজের ভেতরে।

কামাল এমনিতেই ধীরে কথা বলে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেগ। কুয়াশা মেশানো গলায় কামাল বলছে, ক্লাস থেকে বেরিয়ে মুন্না যখন ফোন করল, দুপুর নাগাদ আমরা ডেড বডি নিয়ে রওনা হয়ে যাব।

কে কে যাচ্ছে?

অনুপের ভাগ্নে, পীযুষ, কচি, আমি আর অনুপের ২-৩ জন কলিগ।

অসীম? অসীম যাবে না?

না না, ও তো দেখতেই আসেনি অনুপকে!

বলো কি! দেখতেই আসেনি? কিছু একটা গোলমাল আছে মনে হচ্ছে!

ধীর-স্থির, শীতল গলায় কামাল বলে, সে মেলা কথা। আজ থাক। তোমাকে পরে বলব।

সন্ধ্যার দিকে মুন্না বাইরে যায় এক-দেড় ঘণ্টার জন্য। আজ কোথাও গেল না। আজ অনুপের মুখটা ঘুরেফিরে মনে পড়ছে তার। আহা, এ রকম বন্ধু হয় না! ইউনিভার্সিটি লাইফে এবং তার পরও তো কতজনকে কাছে থেকে দেখলাম, এ রকম শিক্ষিত, সজ্জন, উদার মানুষ ক’জন আছেন? আরেকটা অনুপকে এ জীবনে আমরা আর পাবো না! ভালো-মন্দ সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু যার সঙ্গ এত ভালো লাগে, যার কথা ভাবতে ভালো লাগে, যার ভদ্রতা ও সুরুচির তারিফ না করে পারা যায় না এমন মানুষকে হারানোর কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে সারা জীবন?

ছ’টার দিকে মুন্না ফোন করেছিল। তিনবার চেষ্টা করার পর চতুর্থবার ফোন ধরে পীযুষ। মুন্না বলে, কী খবর বল তো! পীযুষের গলা, আ-র খবর! অন্যান্য কাজ শেষ। এখন শুধু দাহ করা বাকি। আধা ঘণ্টার ভেতর চিতায় ওঠানো হবে হতভাগাটাকে! আরও কি কি যেন জানতে চাইছিল মুন্না। পীযুষ বলে, আমি তোকে পরে ফোন দিচ্ছি। বলেই লাইন কেটে দেয়। বোঝা গেল অনুপকে চিতায় ওঠানোর প্রাককালের প্রস্তুতি চলছে। এখন বেশি আলাপের সময় নেই। মুন্না কিছু সময় বসে থাকল হতভম্বের মতো। তারপর টিভি অন করল। ২-৩ মিনিট পর টিভি অফ করল। তারপর ভেতরের বারান্দায় গিয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে দাঁড়িয়ে থাকল অনেকটা সময়। এ সবের কোনো কিছুই চোখ এড়াল না সুষমার। মুন্না তার বিছানায় এসে বালিশে পিঠ দিয়ে আধশোয়া ভঙিতে নিজেকে স্থাপন করল যখন, পাশে এসে বসলো সুষমা। আলত করে স্বামীর কাঁধে হাত রাখে, মনটাকে শক্ত কর প্লিজ। এমন করো না। আমার খারাপ লাগে!

এদিকে এখন মুন্নার গলা নিস্তেজ। পীযুষ বলল, আধ ঘণ্টার মধ্যে চিতায় আগুন দেবে। এখন ক’টা বাজে?

ক’টা আর? সাতটার মতো।

মুন্না ধরা গলায় বলে, এতক্ষণে পুড়তে আরম্ভ করেছে বডিটা ।

সুষমা বলে, আর মন খারাপ করো না। কী লাভ বলো তো? সবাই তো মরব একদিন, তাই না? অনুপ দা চিতায় পুড়তেছে। আমরা যাব মাটির নিচে।

কিন্তু মন কি প্রবোধ মানে? মুন্নার চোখে পানি নেই, চোখের ভেতরটা ধু-ধু! শীতকাতর মানুষের শরীরের ভেতরে একেবারে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া শীতের কনকনে শিরশির অনুভূতির মতো কিছু একটা লেগে থাকে তার মনে। আরও একবার মুন্না ফোন করেছিল পীযুষকে। ততক্ষণে চিতার আগুন লকলক করে উঠেছে আর অনেকখানি দগ্ধ হয়ে গেছে অনুপের মরদেহ। সেই কখন থেকে মুন্নার কানে বেজে চলেছে পীযুষের হাহাকার- সব শেষ হয়ে গেল রে! আমার চোখের সামনে অনুপটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে...!

শেষ বিকেলে মেঘ করেছিল আকাশে। মেঘ সন্ধ্যায় ঘন হয়ে উঠেছিল এবং সবার আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করার জন্য সেই মেঘ এক পশলা বৃষ্টি হয়ে নেমেওছিল। পীযুষের ভাষ্যমতে, বৃষ্টি ছিল ক্ষণস্থায়ী। হলে হবে কী? জ্বলে ওঠা কাঠ ভিজে গেলে তাকে জ্বালানো-যে কত কঠিন তা শুধু তারাই জানে যারা ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অনেক চেষ্টার পর স্যাঁতসেঁতে কাঠে আগুন জ্বালানো সম্ভব হয়েছে, মুন্না দেখতে পাচ্ছে, শ্মশানবন্ধুরা ওই আগুনকে ঘন, চওড়া শিখায় পরিণত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। আগুন জ্বলেছে বটে, ভালো করে কাঠে ধরছে না। শ্মশানবন্ধুরা লম্বা কাঠি দিয়ে চিতার কাঠগুলো নাড়াচাড়া করছে। কেরোসিন ঢালছে। মুন্না ভাবছে, অনুপটা সারা জীবন কত বাধা-বিঘ্ন মোকাবিলা করল, এখন ওর দাহটাও নির্বিঘ্ন হচ্ছে না! ভাবতে ভাবতেই সে দেখতে পায়, আগুন আবার ভল্ভল করে জ্বলে উঠল। এই তো! বাহ! দাউদাউ করে উঠেছে চিতা! আর চিন্তা নাই। এবার চিতা আর নিভবে না। আর একটুও কষ্ট করতে হবে না অনুপকে। হ্যাঁ, অনুপ এখন লেলিহান শিখার ভেতর দিয়ে চলেছে নদীর ওপারে। দাউদাউ আগুনের লেলিহান শিখায় ওই নশ্বর মানবশরীরের সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে অনুপের চিরনিঃসঙ্গতা, মনোবেদনা, ঔদাস্য, অপ্রেম!

অনুপের মৃত্যু অতঃপর

 সরকার মাসুদ 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দিন শেষে সন্ধ্যায় আবেগ থিতু হয়ে এসেছে যখন, মুন্না ভাবল, কী আর করা! জীবন তো এমনই। আর জীবনের সমাপ্তি হবে কীভাবে তা কে বলতে পারে? আমরা কেউ কি ভেবেছি, অনুপটা ওভাবে মরে যাবে? আরও অনেক বছর ও বাঁচবে এমনই তো আশা করেছিলাম আমরা, যারা ওর কাছের মানুষ।

খবরটা পেয়েছিল সকাল দশটার দিকে। না, কেউ ফোন করে জানায়নি। জানিয়েছে মুন্নার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কচি যে অনুপেরও ঘনিষ্ঠ ছিল। মুন্না এখন ভাবে, সজ্জন কচি বন্ধুবৎসল কচি কথাসাহিত্যিক কচি তোর কেমন লেগেছিল রে যখন তুই আমাকে দুসংবাদটা দেওয়ার জন্য মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করছিলি? আসলে তুই তো তখন কাঁদছিলি কিন্তু চোখে পানি ছিল না। তোর বুকের ওপর তখন একটা ভারী পাথর চেপে বসেছিল। কে জানে ক’দিন পর ওটা নেমে গেছে!

দশটা চল্লিশে ছিল ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস। ক্লাসে গিয়েও ছিল মুন্না। গত ক্লাসে বলেছিল, আজ কথা হবে আধুনিক কবিতা নিয়ে। কিন্তু কিসের কী? মনের ওই অবস্থায় পড়ানো সম্ভব? ভেবেছিল রোল কলটা শেষ হলে ছাত্রদের বলে বেরিয়ে যাবে। হাজিরা খাতার কভার ওল্টাতেই ছাত্রদের নামের তালিকা নয়, সে এক ঝলক দেখতে পেল অনুপের বিষণ্ন মুখ। অনুপের বিষণ্ন হাসি। দরজা খুলে দিয়েই অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গিতে মুন্নাকে বলছে, আয়! মুন্না আবার দেখতে পাচ্ছে মেসেজ বডিতে লেখা শব্দগুলো- our close friend Anup Kumar

Sarker is no more! This morning he fell down on the floor of the washroom. He did not get

back his sense finally. এটেন্ডান্স রেজিসটার হাতে নেওয়ার ২-৩ মিনিট পরও রোল কল শুরু হচ্ছে না দেখে একজন ছাত্র বলে, স্যার, আজ রোল কল হবে না? মায়া নামের এক ছাত্রীর চোখে পড়ে, তাদের প্রিয় শিক্ষকের মুখ আজ খুবই ভার, তার চোখজোড়া ছলছল এবং প্রশ্ন করতে দেরি করে না, স্যার, কী হইছে আপনার? আপনার কি শরীর খারাপ?

হ্যাঁ! কী বললে? যেন চমকে ওঠে মুন্না।

না, ঠিক আছে। আমার শরীর ভালো আছে। আমাদের এক বন্ধু মারা গেছে আজ সকালে। আধা ঘণ্টা আগে জানলাম।

মায়া জিজ্ঞেস করে, আপনার ক্লোজ ফ্রেন্ড?

মুন্না বলে, শোনো, যদি সামর্থ্য থাকত আমি হেলিকপ্টার ভাড়া করে রাজশাহী রওনা হয়ে যেতাম, বুঝেছ?

সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে খবরটা শোনার পর সুষমা খালি বলেছিল, আল্লাহ! তোমাদের রাজশাহীর বন্ধু অনুপ? অনুপ দা? তারপর চুপ করে থেকেছে অনেকটা সময়। হতে পারে মুন্নার সঙ্গে ওর ষষ্টীতলার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি- ওখানে অনেকক্ষণ কাটানোর কথা মনে পড়েছিল তার। মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে অনেক কম সময়ে মানুষ চিনতে পারে। অনুপ- যে কেবল ভালো মানুষ নয়, ওর মধ্যে আরও নানা ভালো দিক আছে সেটা অল্প সময়েই টের পেয়েছিল সুষমা। তখন কেবল ন’টা বাজে। এর ভেতরেই ওরা অনুপের বাসায় হাজির। কেননা এগারোটার মধ্যে কামাল আসবে। কামালকে সঙ্গে নিয়ে ওরা শাড়ি কিনতে যাবে। সুষমার অনেক দিনের ইচ্ছা, রাজশাহী গেলে সিল্কের শাড়ি কিনবে। ওখানে অসংখ্য দোকান। দামও হয়তো সাশ্রয়ী হবে। মুন্না তো মাঝেমাঝে রাজশাহী আসে, এই প্রথম এলো ভাবিকে নিয়ে। আপ্যায়ন না করা খুবই অভদ্রতা হবে, ভেবে কিচেনের দিকে এগোয় অনুপ। তারপর খুটখাট শব্দ আসছিল। চা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বোধ হয়। ব্যাচেলর মানুষ। কী করবে না করবে! বেচারা এখনো নাশতা খায়নি হয়তো। সুষমা কিচেনে গিয়ে ঢুকল। দ্যান অনুপ দা, আমিই করি। আপনি বসেন। বন্ধুর সঙ্গে গল্প করেন।

চমৎকার বেতের সোফায় বসে আছে মুন্না। সামনে ছোট নিচু টেবিলের ওপর ‘দেশ’ কারেন্ট সংখ্যা। ৩-৪টা ইংরেজি বই। অনুপ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে মুন্নার দিকে চেয়ে স্মিত হাসে। বলে, ম্যাগাজিন দেখতে থাক। আমি একটু নিচে যাচ্ছি। এই ১০-১৫ মিনিট।

মুন্না ভাবল, ও বোধ হয় চায়ের সঙ্গে খাওয়া চলে এমন কিছু আনতে গেল। পারুটিও আনতে পারে। ব্রেড ওর পছন্দ। সুষমার কমনসেন্স খুব ভালো। এই যে ও অনুপকে চা বানাতে দিল না, নিজেই কাজটা নিয়ে নিল, এমনটাই তো হওয়া উচিত। ওর এই দিকগুলো ভালো লাগে মুন্নার। মেয়েটা ছোটখাটো কারণে খুব রেগে যায়। নিজে ভুল করলেও কখনও ‘সরি’ বলে না, উল্টো স্বামীর ঘাড়ে দোষ চাপায়। এই দু-একটা বিষয় ছাড়া আর সব কিছু ওর ভালো। তুচ্ছ বিষয়ে আগ্রহ দেখানো, বেশি আবেগী হওয়া, ফোনালাপের সময় এক কথা বারবার বলা এসব মেয়েলি প্রবণতার কথা বলে লাভ নেই। এগুলো সব মেয়ের মধ্যেই আছে ।

ঘাড়ের পেছনে দু’হাতের তালু রেখে বসে ছিল মুন্না।

হঠাৎ সামনে ঝুঁকে হাতে নেয় দেশটা। কয়েটা পাতা উল্টিয়ে ‘গ্রন্থলোক’-এ এসে থামে। ওরহান পামুকের ‘ইস্তাম্বুল’ উপন্যাসের ওপর লেখাটা পড়ে ফেলে। নাতিদীর্ঘ রিভিয়ু, কিন্তু কি চমৎকার! অল্প কথায় লেখকের ইতিহাসবোধ ও গদ্যশৈলী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনুপ ভাবে, এই মানের একটা পত্রিকা বাংলাদেশে আজও হলো না। আর হবে কী করে? প্রতিভাবান পরিশ্রমী লেখকের এত অভাব এখানে! তার ওপর আছে স্বজনপ্রীতি। আরে বাবা, সম্পাদকদের পছন্দের লোক তো থাকতেই পারে, চিরকালই ছিল। কিন্তু তারও লেখার ন্যূনতম একটা মান থাকতে হবে তো, নাকি? বস্তাপচা মাল ছাপলে কাগজ ভালো হবে কী করে?

দুই বেডরুমের ছোট বাসা। একটায় অনুপ থাকে। অন্যটায় ওর ভাগ্নে সবুজ। সবুজ ইউনিভার্সিটি গেছে। সকালে ওর ক্লাস ছিল। অনুপের দায়িত্ববোধের বিষয়টা ভালো লাগে মুন্নার। ও স্বার্থপর হতে পারেনি। এ ধরনের মানুষ তা হতেও পারে না। তা ছাড়া ওর বাবা ছিলেন তেমন এক মানুষ যার কাছ থেকে ও ভালো অনেক কিছু শিখেছিল। এ সৌভাগ্য সবার হয় না।

শেষ কয়েকটা বছর অনুপ খুব একা হয়ে গিয়েছিল। সবুজ পাশ করে বেরিয়ে গেছে। একই শহরে থাকত তবুও কচির সঙ্গে দেখা হতো না। হতো না মানে এত কম দেখা হতো! পাঞ্জাবি দুলিয়ে কামাল আসত অনেকদিন পর পর। ওদের নিউমার্কেটের সান্ধ্যকালীন আড্ডাটাও ততদিনে উঠে গেছে। আর মুন্না তো ঢাকায় অনেক বছর হলো। ও হ্যাঁ, আরেকজন আসত। পীযুষ তরফদার। সেও তখন রাজশাহীতে। ফ্যামিলি নিয়ে থাকে। অনুপ মুন্না পীযুষরা ভার্সিটিতে ক্লাসমেট ছিল। শুধু ক্লাসমেট না, রীতিমতো ক্লোজ ফ্রেন্ড। অনুপের মৃত্যুর কয়েক মাস পর মুন্না রাজশাহী গিয়েছিল। যথারীতি উঠেছিল কচির বাসায়। সন্ধ্যায় সাহেববাজার বড় মসজিদের মোড়ে পীযুষের সঙ্গে দেখা। মুন্না বলে, কী ব্যাপার বল তো! অনুপের শরীরটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল?

আর বলিস না! শরীর তো আগে থেকেই খারাপ। কয়েক বছর আগে ডায়াবেটিস ধরা পড়ল। পরে হার্টের সমস্যাও দেখা দিল।

ওষুধ খেত না নিয়মিত?

তা খেত, পীযুষ বলে, খেলে কী হবে, এসব কেসে রেগুলার ইন্টারভ্যাল দিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয়।

মুন্না বলে, ও সেটা করেনি, তাই তো?

একদম ঠিক ধরেছিস। তুই তো ওকে জানিস মুন্না, অভিমান ছিল তো। ফলে শেষের দিকে

একগুঁয়ে হয়ে উঠেছিল। কথা বেশি সময় হয়নি। পীযুষের তাড়া ছিল। ‘স্যরি’ বলে বিদায় নিতে হয়েছিল ওকে। মুন্না কিন্তু অল্প সময়েই যা বোঝার বুঝে গেছে ।

ওরা যখন লেখাপড়া শেষ করে বেরোয় তখন ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্সধারীদের অনেক ডিমান্ড। পাশ করে বেরোতে না বেরোতেই চাকরি হলো অনুপের। পোস্টিং লালমনিরহাটে, কৃষি ব্যাংকের প্রধান অফিসে। কয়েক মাসের মধ্যেই সে বুঝেছিল, ওই কাজ তার নয়। ফলে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই রাজশাহী ফিরে আসে। প্রথমে এক-দেড় বছর পড়ায় আড়ানি কলেজে। ট্রেনে করে যেত আসত। তারপর যোগ দেয় বানেশ্বর ডিগ্রি কলেজে। আমৃত্যু ওখানেই ছিল। বানেশ্বরে থাকাকালীন ওর একটা প্রমোশনও হয়েছিল। নাটোর-রাজশাহী বাস রুটের মাঝামাঝি জায়গা বানেশ্বর ঠিক শহর না, আবার আড়ানির মতো গন্ডগ্রামও না। বাসা থেকে বেরিয়ে পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে কলেজে পৌঁছে যেতে পারত। অনুপ মোটামুটি মানিয়ে নিতে পেরেছিল। কেননা লোকাল ট্রেনে যাতায়াতের হ্যাপা ছিল না। অনেকটা সময় বাঁচত। সেই সময়টাতে নিজের ইচ্ছামতো কাজে লাগাত।

সেবার রাজশাহী থেকে ফিরে আসার পর আর পাঁচটা মেয়ের মতোই সুষমা জিজ্ঞেস করেছিল, অনুপ দা বিয়ে করল না কেন?

মুন্না বলেছে, সেটা বলা মুশকিল। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু বটে, কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে খুব কমই কথা হতো। ওর চরিত্রে একটা অন্যরকম স্বাতন্ত্র্র্য ছিল। গড়পড়তা বাঙালি মেয়ে ওকে বুঝবে না। ওরকম কাউকে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি হওয়ার খুবই সম্ভাবনা। আবার একই সঙ্গে সুশিক্ষিতা, ব্যক্তিত্বময়ী ও ব্যতিক্রমী টাইপের পাত্রী পাওয়াও খুব কঠিন। পাওয়া গেলেও সেই মেয়ে অনুপকে বিয়ে করতে রাজি হবে তার নিশ্চয়তা কী? তা ছাড়া ওকে অনেক

কিছু দেখতে হয়। একটা ভাগ্নে ওর সঙ্গে থাকে। তার পড়ার খরচ জোগায় সে। আরও অনেক কিছু আছে। এসব সাত-পাঁচ ভেবেই হয়তো বিয়ে করতে রাজি হলো না।

সুষমা অবাক কণ্ঠে বলে, বিয়ের কথাবার্তাও ওঠেনি কখনো? মানে সম্বন্ধের আলাপটালাপ?

যদ্দূর জানি, ও লালমনিরহাটে থাকতে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। ওর বাবা দু-তিনবার চেষ্টা করেছিলেন। রাজশাহীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

অনুপকে নিয়ে যখন ভেবেছে, একটা কথা মুন্নার প্রায়ই মনে হয়েছে, বিয়ে-শাদি সময়মতো না করলে বা আদৌ না করলে মানুষের শরীর ও মনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সবকিছুরই তো একটা নিয়ম আছে। পয়তাল্লিশের কাছাকাছি এসে অনুপের শরীরটা কেমন ভেঙে গেল। নানারকম অস্বস্তিও দেখা দিল শরীরে। তা ছাড়া নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়ার ব্যাপার তো ছিলই। একটা ছবি মুন্নার মাথায় সেঁটে আছে। ডিসেম্বর মাস। রাজশাহীতে খুব শীত পড়েছে। অলকা সিনেমার পাশের গলিতে একটা বাড়ির দোতলায় থাকত অনুপ। ভার্সিটি বন্ধ। সবুজ বাড়ি গেছে। বাসায় অনুপ একা। ফুলহাতা সোয়েটারের ওপর শাল জড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বিছানার মাঝখানে বসে আছে। কান-মাথা মাফলারে টাইট করে বাঁধা। অনুপ একটু পর পর জোরে শ্বাস নিচ্ছে। যতটা সম্ভব বাতাস ভেতরে নিতে চাইছে। কিন্তু শ্বাসনালি সহযোগিতা করছে অল্পই। এক অসুস্থ, মধ্যবয়সী মানুষের বিপন্ন দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে আছে সামনের দেওয়াল পর্যন্ত ।

মুন্না প্রশ্ন করে, কী অবস্থা? খুব বেড়ে গেছে?

অনুপ বলে, আর বলিস না! গত পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় তিনবার ইনহেলার নিলাম। তারপরও তেমন

কাজ হচ্ছে না।

ডাক্তারের কাছে যাবি? চল আমার সঙ্গে।

তিন-চার দিন আগেই গিয়েছিলাম। সেলিমকে বলেছি ট্যাবলেট আনতে। ট্যাবলেটটা খেলে রিলিফ পাবো। তুই চিন্তা করিস না।

সারা দেশে ঘুরে বেড়ায় মুন্না। ভ্রমণ তার রক্তের মধ্যে। মুন্নার প্রবল আগ্রহের কথা শুনে অনুপ বলেছিল, বাড়ি যাওয়ার আগে তোকে জানাব। তুই সময়মতো রাজশাহী চলে আসিস। একসঙ্গে যাওয়া যাবে। গত পাঁচ বছরে মুন্না দেশে-বিদেশে কত জায়গায় ঘুরল, কত কিছু করল। অনুপের সঙ্গে যাওয়া আর হলো না। ওহ্! অনুপ আজ চিতায় ওঠার জন্য চলে গেছে নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানার সেই নিভৃত গ্রামে। ওদের বাড়ির পুকুরের পাকা ঘাটলার সিড়িতে অনুপ আর বসে থাকবে না ভাববিহ্বল। ওর ঘন অন্যমনস্কতার চারপাশে ঘুরে ঘুরে ফড়িং আর উড়বে না কখনই। আর কোনোদিন ব্যাগ কাঁধে ভ্রমণক্লান্ত অনুপ কুমার সরকার ফিরে আসবে না পৃথিবীতে।

প্ল্যান ছিল লাঞ্চের পর রেস্ট নিয়ে মুন্না ডিগ্রি ইনকোর্স পরীক্ষার দুটো প্রশ্নপত্র তৈরি করবে। কিন্তু যে মানুষ সকালবেলায়ই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃতুসংবাদ পায়, এমনকি দূরত্বের দৈর্ঘ্যবশত মৃত বন্ধুর মুখটা শেষবারের মতো দেখারও সুযোগ পায় না, তার কাজে মন বসে কী করে? সুতরাং সাদা কাগজ টেবিলের ওপরেই পড়ে থাকল। সারা দিন ওই এক মনোবেদনা। ভাবগম্ভীর মুন্না বারান্দায় পায়চারি করলো দীর্ঘ সময়। এমন যদি হতো ওর ছেলেমেয়ে আছে। তাদের একজন বিদেশে থাকে। সে দেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে নওগা পৌঁছে আবার বদলগাছির সেই গ্রাম পর্যন্ত যাওয়া- অনেকটা সময়ের ব্যাপার। তাহলে আমি রওনা যেতাম, সোজা নওগাঁ হয়ে বদলগাছি। হ্যাঁ, যেতামই। কেননা সে রকম হলে তো পারদিন দুপুরের আগে অনুপের সৎকার সম্পন্ন হতো না। মুন্না জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে। সে আসলে এখন কোনো কিছু দেখছে না। তার দৃষ্টি এখন নিজের ভেতরে।

কামাল এমনিতেই ধীরে কথা বলে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেগ। কুয়াশা মেশানো গলায় কামাল বলছে, ক্লাস থেকে বেরিয়ে মুন্না যখন ফোন করল, দুপুর নাগাদ আমরা ডেড বডি নিয়ে রওনা হয়ে যাব।

কে কে যাচ্ছে?

অনুপের ভাগ্নে, পীযুষ, কচি, আমি আর অনুপের ২-৩ জন কলিগ।

অসীম? অসীম যাবে না?

না না, ও তো দেখতেই আসেনি অনুপকে!

বলো কি! দেখতেই আসেনি? কিছু একটা গোলমাল আছে মনে হচ্ছে!

ধীর-স্থির, শীতল গলায় কামাল বলে, সে মেলা কথা। আজ থাক। তোমাকে পরে বলব।

সন্ধ্যার দিকে মুন্না বাইরে যায় এক-দেড় ঘণ্টার জন্য। আজ কোথাও গেল না। আজ অনুপের মুখটা ঘুরেফিরে মনে পড়ছে তার। আহা, এ রকম বন্ধু হয় না! ইউনিভার্সিটি লাইফে এবং তার পরও তো কতজনকে কাছে থেকে দেখলাম, এ রকম শিক্ষিত, সজ্জন, উদার মানুষ ক’জন আছেন? আরেকটা অনুপকে এ জীবনে আমরা আর পাবো না! ভালো-মন্দ সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু যার সঙ্গ এত ভালো লাগে, যার কথা ভাবতে ভালো লাগে, যার ভদ্রতা ও সুরুচির তারিফ না করে পারা যায় না এমন মানুষকে হারানোর কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে সারা জীবন?

ছ’টার দিকে মুন্না ফোন করেছিল। তিনবার চেষ্টা করার পর চতুর্থবার ফোন ধরে পীযুষ। মুন্না বলে, কী খবর বল তো! পীযুষের গলা, আ-র খবর! অন্যান্য কাজ শেষ। এখন শুধু দাহ করা বাকি। আধা ঘণ্টার ভেতর চিতায় ওঠানো হবে হতভাগাটাকে! আরও কি কি যেন জানতে চাইছিল মুন্না। পীযুষ বলে, আমি তোকে পরে ফোন দিচ্ছি। বলেই লাইন কেটে দেয়। বোঝা গেল অনুপকে চিতায় ওঠানোর প্রাককালের প্রস্তুতি চলছে। এখন বেশি আলাপের সময় নেই। মুন্না কিছু সময় বসে থাকল হতভম্বের মতো। তারপর টিভি অন করল। ২-৩ মিনিট পর টিভি অফ করল। তারপর ভেতরের বারান্দায় গিয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে দাঁড়িয়ে থাকল অনেকটা সময়। এ সবের কোনো কিছুই চোখ এড়াল না সুষমার। মুন্না তার বিছানায় এসে বালিশে পিঠ দিয়ে আধশোয়া ভঙিতে নিজেকে স্থাপন করল যখন, পাশে এসে বসলো সুষমা। আলত করে স্বামীর কাঁধে হাত রাখে, মনটাকে শক্ত কর প্লিজ। এমন করো না। আমার খারাপ লাগে!

এদিকে এখন মুন্নার গলা নিস্তেজ। পীযুষ বলল, আধ ঘণ্টার মধ্যে চিতায় আগুন দেবে। এখন ক’টা বাজে?

ক’টা আর? সাতটার মতো।

মুন্না ধরা গলায় বলে, এতক্ষণে পুড়তে আরম্ভ করেছে বডিটা ।

সুষমা বলে, আর মন খারাপ করো না। কী লাভ বলো তো? সবাই তো মরব একদিন, তাই না? অনুপ দা চিতায় পুড়তেছে। আমরা যাব মাটির নিচে।

কিন্তু মন কি প্রবোধ মানে? মুন্নার চোখে পানি নেই, চোখের ভেতরটা ধু-ধু! শীতকাতর মানুষের শরীরের ভেতরে একেবারে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া শীতের কনকনে শিরশির অনুভূতির মতো কিছু একটা লেগে থাকে তার মনে। আরও একবার মুন্না ফোন করেছিল পীযুষকে। ততক্ষণে চিতার আগুন লকলক করে উঠেছে আর অনেকখানি দগ্ধ হয়ে গেছে অনুপের মরদেহ। সেই কখন থেকে মুন্নার কানে বেজে চলেছে পীযুষের হাহাকার- সব শেষ হয়ে গেল রে! আমার চোখের সামনে অনুপটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে...!

শেষ বিকেলে মেঘ করেছিল আকাশে। মেঘ সন্ধ্যায় ঘন হয়ে উঠেছিল এবং সবার আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করার জন্য সেই মেঘ এক পশলা বৃষ্টি হয়ে নেমেওছিল। পীযুষের ভাষ্যমতে, বৃষ্টি ছিল ক্ষণস্থায়ী। হলে হবে কী? জ্বলে ওঠা কাঠ ভিজে গেলে তাকে জ্বালানো-যে কত কঠিন তা শুধু তারাই জানে যারা ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অনেক চেষ্টার পর স্যাঁতসেঁতে কাঠে আগুন জ্বালানো সম্ভব হয়েছে, মুন্না দেখতে পাচ্ছে, শ্মশানবন্ধুরা ওই আগুনকে ঘন, চওড়া শিখায় পরিণত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। আগুন জ্বলেছে বটে, ভালো করে কাঠে ধরছে না। শ্মশানবন্ধুরা লম্বা কাঠি দিয়ে চিতার কাঠগুলো নাড়াচাড়া করছে। কেরোসিন ঢালছে। মুন্না ভাবছে, অনুপটা সারা জীবন কত বাধা-বিঘ্ন মোকাবিলা করল, এখন ওর দাহটাও নির্বিঘ্ন হচ্ছে না! ভাবতে ভাবতেই সে দেখতে পায়, আগুন আবার ভল্ভল করে জ্বলে উঠল। এই তো! বাহ! দাউদাউ করে উঠেছে চিতা! আর চিন্তা নাই। এবার চিতা আর নিভবে না। আর একটুও কষ্ট করতে হবে না অনুপকে। হ্যাঁ, অনুপ এখন লেলিহান শিখার ভেতর দিয়ে চলেছে নদীর ওপারে। দাউদাউ আগুনের লেলিহান শিখায় ওই নশ্বর মানবশরীরের সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে অনুপের চিরনিঃসঙ্গতা, মনোবেদনা, ঔদাস্য, অপ্রেম!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন