সতীত্ব বনাম পুরুষত্ব
jugantor
সতীত্ব বনাম পুরুষত্ব

  স্বপনা রেজা  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল সাতটায় ফ্লাইট। যশোহর থেকে ঢাকায় ফিরবে মুনা। ফ্লাইট ইউ এস বাংলা। নির্ধারিত সময়ে ছাড়বে। হাতঘড়িতে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে বিশ মিনিট বাকি। সকালের ফার্স্ট ফ্লাইটে যাত্রী সাধারণত কম হয় না।

বিমান বন্দরে বড় ভাই রাসেল পৌঁছে দিয়েছে। অল্প বয়সে বাবা ও মাকে হারিয়ে এই ভাইয়ের আশ্রয়ে সে কৈশর থেকে তারুণ্যে এসেছে। বয়সের পার্থক্য মুনার সাথে বড় ভাইয়ের বেশ। রাসেলের একমাত্র মেয়ে রূপা মুনার চাইতে এক বছরের বড়। রাসেল ও মুনার মাঝে আর এক বোন লুনা। পৈতৃক বাড়িতে বিবাহিত রাসেল ও লুনা বসবাস করে। নিজের বাড়ি বলতে মুনার যাশোরের এই বাড়িটাই। ছুটি পেলেই আসে।

বিশ মিনিটের অপেক্ষায় খন্ড খন্ড মেঘ জড়ো হলো আকাশে। নিমিষেই আকাশের চেহারা বদলে গেলো। বলেকয়ে না আসা এই মেঘ দেখে মুনার ভয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে। শৈশবে মেঘ ডাকলে মায়ের বুকে মুখ লুকাতো। আর মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরলে ঝুমসে বৃষ্টিতে ভিজতো।

রাসেল ফোন করে খোঁজ নিলো প্লেন সঠিক সময়ে ছাড়বে কিনা। আকাশ কালো হয়ে ওঠা তারও দুশ্চিন্তার কারণ। মনিটর দেখাচ্ছে একঘন্টা পর প্লেন ছাড়বে। আবহাওয়া ভালো না। ঢাকায় তুমুল ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের ভেতর আলাপচারিতা যেন বেড়ে গেলো। কফি খাওয়ার ধুম পড়ে গেছে। সাইড ব্যাগ থেকে সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন বের করে মুনা। এক ঘন্টা অনেক সময়। অনেকবার পড়া এই বইটা মুনা বারবার পড়ে।

হঠাৎ কড়া পারফিউম নাকে এসে লাগে। কালো স্যূট পরা একজন তরুণ মুনার পাশে এসে বসেছে। নিজেকে ছোট করে একটু সরে বসে মুনা। বইয়ে চোখ থাকলেও মুনা বুঝতে পারে পাশে বসা তরুণ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বিষয়টি যাচাই করতে যেয়ে দু, একবার চোখাছোখি হলো। মৃদু বাকা হাসি তরুণের ঠোঁট জুড়ে। ভাব এমন মুনা তার পরিচিত। মুনা কখনো তাকে দেখেছে বলে মনে হয় না। আজকাল কতকিছু ঘটে পথেঘাটে ভেবে মুনা নিজের কাজে মন দেয়। কিন্তু অপলক তরুণের দৃষ্টি। বিজলীর আলোয় তার কণ্ঠ থেকে বের হয়,

হ্যালো ! বেশ মিষ্টি শোনালো কণ্ঠস্বর। দৃষ্টি না ফিরিয়ে পারে না মুনা। সৌজন্যতার মৃদু হাসি তারও ঠোঁটে।

আমি শান। আপনি ?

মুনা।

বাহ্ ! কফি চলবে?

চলতে পারে।

গুড। লাফ দিয়ে শান উঠে গেলো কফি আনতে। বেশ স্মার্ট । অভিজাত অভিব্যক্তি চলনেবলনে। মুনার ভেতর কৌতুহল ততক্ষণে জেগে উঠেছে। বাড়তি আগ্রহ কখনো কারোর প্রতি আচমকা জাগেনি। ব্যতিক্রম বোধহয় এই মানুষটি। কত কিলোমিটার বেগে কফি নিয়ে হাজির তা অনুমানক করা যায়। একটা কাপ এগিয়ে দেয় শান।

ওয়ান টাইম ইউজের কাপে কফি পান নিরাপদ। সেকেন্ড টাইম ইউজের সুযোগ থাকে না। স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। কথাগুলো হেসে হেসে বললো শান। মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে কার্পণ্য করা গেলো না।

মিস মুনা, বই পড়বেন, নাকি গল্প করবেন ?

প্রশ্নের ভেতর গল্প করবার আব্দার ছিলো। মন্দ নয়। বই বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে মুনা। জয়ী হবার আলো জ্বলে উঠলো শানের চেহারায়। সেই আলোয় এবং গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ঘনিষ্ট হবার চেষ্টা। দ্রবণের মতন দ্রবীভুত হলো মুনা। কী ছিলো শানের মধ্যে সেসব বুঝে উঠবার আগেই টান অনুভুত হলো। মুনার পেছনে শানের একটা হাত জায়গা নিয়েছে ততক্ষণে। সেই হাত কাঁধ থেকে কোমড়ে। নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ মুনা। শরীরের ভেতর অন্যরকম এক শিহরণ। মেঘের গর্জন। ভয় পেয়ে কেঁপে ওঠে না মুনা। হাতেধরা কফির কাপে ঠোঁট স্পর্শ পায় না। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিষফিস করে জানতে চায় শান,

কী হলো?

সম্বিৎ ফিরে আসে মুনার। লজ্জিত হয়। মাথা নিঁচু করে উত্তর দেয়, কই কিছু না তো !

বাঁকা ঠোঁটে হাসে শান। শব্দ হাসি। হাসিতে মুনার ধরা খাবার তথ্য ছিলো।

বোর্র্ডিং পাস কোথায়, দেখি। দাবীর সুর। অনুগতের মতন ব্যাগ থেকে বের করে দেয় মুনা। হাতে নিয়ে কোর্টের পকেটে ঢুকায় শান। জানতে চাওয়া সম্ভব হলো না এর কারণটা। ধীরে ধীরে আকাশ পরিস্কার হয়। উড়বার সময় হয়ে আসে। শান মুনার পেছন পেছন হাঁটে। পকেট থেকে দুটো বোর্ডিং পাশ বের করে মুনাকে নিয়ে সোজা বিজনেস ক্লাসে পাশাপাশি বসে পড়ে।

আমার সীট তো এটা নয় ! বলতে বাধ্য হলো মুনা। ভ্রুক্ষেপ নেই শানের। মুচকি হেসে বলে, এটাই সীট। বসো। মুনা সাক্ষাত যাদুকরের মন্ত্রে বসে পড়ে। তুমিতে সম্বোধন জায়গা নিয়েছে। আপন হবার, আপন করবার কৌশল এ যেন। রাসেল ফোন দিয়েছে বেশ কবার। রিসিভ করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ফোন রিসিভ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

কে ফোন দিচ্ছে ?

বড় ভাই।

রিসিভ করো। এক সম্পর্কের ভেতর বসবাস হলে এমন আদেশ থাকে। কে এই ব্যক্তি যে ক্রমশঃ আধিপত্য বিস্তারে তৎপর হয়ে উঠছে। মুনা নিজে অবাক হয় নিজেকে ভেবে, এতটা বিসর্জিত হবার কী মানে।

রাসেল ফোনের অপেক্ষায় ছিলো। দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই কথাটুকু বলেই কথা শেষ করে।

আকাশে ডানা মেলে উড়োজাহাজ। উড়োজাহাজ নয়, এ যেন নতুন এক স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলা। কথা বলতে বলতে বিভোরতার গভীরে ডুবে যায় মুনা। বিশ বছর বয়সী জীবনে আগে এভাবে কেউ তাকে স্পর্শ করেনি। কাছে আসেনি। সুখের অফুরন্ত জানালা খুলে দেয়নি।জীবনে এতো কিছু পাওয়া যায়, পাবার সাধনা করতে হয় এইসব কথা নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের কোথাও লেখা ছিলো না। দেখেনি সে। মেঘের উপর আজ এই ভেসে বেড়ানোর পয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে এক রাজপুত্র এসে তাকে অনেক কিছু জানান দিয়ে গেলো। জীবনের অপরিচিত জানালাগুলো টপাটপ খুলে দিয়ে গেলো।

মাটিতে পা পেলে বিভোরতা কাটে না। আরও কিছুক্ষণ উড়বার সুপ্ত ইচ্ছেটা বুকের ভেতর বাজতে থাকে গোপনে। শুনতে দিতে চায়না সেই শব্দ শানকে। বিদায় নেবার সময় হাত বাড়িয়ে দেয় শান। মুনা সেই হাতে নিজের হাতকে সমর্পিত করে। স্পর্শে অনেক কিছু বলে দেয় শান। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলে,

খুব শীগ্রই আমরা আবার মিলিত হব। রাজী ?

হুম।

গুড।

শান তার গন্তব্যে পা বাড়ায়। মুনার চোখে পড়ে শান এর পেছন পেছন দুজন মানুষ হেঁটে গেলো। অনেকটা দেহরক্ষীর মতন তাদের চলা। একই রকম পোশাক পরা তাদের। প্লেনে পেছনের সীটে সম্ভবত তারা বসেছিলো। শুধু নাম ছাড়া আর কিছুই বলেনি শান। মুনার নাম ছাড়াও সে আর কিছু শুনতে চায়নি। তাহলে কী করে আবার দেখা হবে ? অস্পষ্ট স্বরে মুনার কণ্ঠ থেকে বের হয় প্রশ্নটা।

এয়ারপোর্ট থেকে সোজা রোকেয়া হলে মুনা। নিজের রুমটাকে অপরিচিত লাগে আজ। আলো কম আর স্যাতস্যাতে এই রুমটাতে আরও কিছুর প্রয়োজন অনুভব করে। বিছানায় শরীর বিছিয়ে চোখ বন্ধ করে। চোখের ভেতর আঁধারজুড়ে শান। অথচ কত স্পষ্ট সে ও তার বাঁকা ঠোঁটের হাসি। অনেক রাত করে রুমমেট শায়লা ফেরে। এই দেরী করে ফেরা নিয়ে অনেক কিছু হয়ে যায় শায়লার সাথে হল কর্তৃপক্ষের। শায়লা ওসব গায়ে মাখে না। রুমে ঢুকে প্রথম প্রশ্ন শায়লার,

কী করে কখন ফিরলি ?

সকালেই। এতো রাতে তুই কোথ থেকে ফিরলি ?

প্রায়ই তো ফিরি। আজ প্রশ্ন করছিস যে !

ঠিক বলেছে শায়লা। এটা তার প্রায় প্রতিদিনকার ফেরা।

রাজনীতি করলে সময়জ্ঞান কাজ করে না। করলে বুঝতি। ম্যানেজ এন্ড অ্যারেঞ্জ করে চলতে হয়। বাদ দে। খাইছিস ?

উঁহু। ভালো লাগছে না। শায়লা অবাক হয়। মুনার কপালে হাত রাখে। শান্ত হয়ে পড়ে থাকা মানায় না মুনাকে।

কোন সমস্যা ?

না তো। পাশের রুম থেকে রবীন্দ্র সংগীত ভেসে আসছে- আমার হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়। কেউ খালি গলায় গাইছে। হলে অনেক সময় বহিরাগতরা এসে থাকে। কণ্ঠ কার বুঝা কঠিন। বাইরের নির্জন, নিস্তব্ধতার মাঝে গানটা মুনাকে অন্যমনস্ক করে দিলো। শান অনুভবে এসে দাঁড়ায়। শানের কথা আর লুকানো গেলো না শায়লার কাছে। আকাশের বুকে অসংখ্য নক্ষত্র আর এক ফালি চাঁদ নয়ন সম্মুখে রেখে হলের খোলা জায়গায় বসে ওরা রাত পাড় করে দিলো। গল্প শেষে শায়লা বলে, মুনা সাবধানে থাকিস।

গেস্টরুমে একজন সাক্ষাতপ্রার্থী বসে আছে। হল ক্লিনার খবরটা পৌঁছে দিলো। এতো সকালে কে আসবে মুনার কাছে বুঝতে পারে না। রাত জাগায় শায়লা বেভোরে ঘুমুচ্ছে। সাতপাঁচ মাথায় আসে, আবার যায়। বাড়ির থেকে কেউ নয়তো। গতকালইতো ফেরা হলো। কে তার জন্যঅপেক্ষা করছে খুঁজতে হলো না। একজনই সাক্ষাতপ্রার্থী।

মুনাকে দেখা মাত্র মাঝবয়সী লোকটা উঠে দাঁড়ালো। হাতে ধরা বড় একটা প্যাকেট মুনার দিকে বাড়িয়ে দিলো।

ম্যাম, আপনার একটা পার্সেল ছিলো। প্লিজ !

শত বিস্ময়তার মাঝে পার্সেল হাতে নিতেই প্রেরকের নামটা চোখে পড়লো -শান। বিস্ময়তা কেটে তখন আনন্দ উতলে ওঠে। সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট- খুব শীগ্রই আমাদের দেখা হবে। বাহকা দ্বিতীয় কোন কথার সুযোগ দিলো না। হন হন করে বের হয়ে গেলো।

সাক্ষাতের দিন একবারও বলা হয়নি মুনা কোথায় থাকে, কী করে। অথচ জেনে গেলো মুনার ঠিকানা! সাথেই থাকছে তাহলে। অন্যরকম এক ভালোলাগা জরিয়ে ধরে মুনাকে। রুমে গিয়ে প্যাকেট খুলে চোখ ছানাবাড়া। গোলাপী রং এর থ্রী পিস। ব্রান্ডের। তার ভেতর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের রিং। বুকটা কেঁপে ওঠে মুনার। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির বেপরোয়া সুখে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতির প্রথম বর্ষের ছাত্রী মুনা। ক্লাস করবার টান হারিয়েছে। বারবার মনে হয় পেছনের ছায়াটা শানের। একদিন সেই ছায়াটা সত্য হয়ে ওঠে। বেশ রাত করে এসে হাজির হলে। হলের গেট বন্ধ হলেও শানের জন্য দরজা খুলে যায়। অবিশ্বাস্য এক মুহুর্ত।

আপনি !

বিশ্বাস করে নাও। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এসো। না ঠিক আছে এভাবেই চলো। মুনার হাত ধরে বেরিয়ে যায় হল থেকে। হলের কেউ কোন উচ্চবাচ্য, প্রশ্ন করলো না। সাদা গাড়ির বেশ ঠান্ডা পরিবেশে ঘেমে ওঠে মুনা। পাশের সীটে মুনাকে বসিয়ে নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে শান। শাহবাগ, মহাখালী পেছন ফেলে গাড়ি এসে দাঁড়ায় বনানীর একটি ফ্ল্যাটের সামনে। বেশ নির্জন এলাকা। লাইটপোস্টের আলো ছাড়া রাস্তায় আর কিছুই চোখে পড়ে না। শান পুরোটা রাস্তায় চুপ ছিলো। ফিরেও তাকায়নি মুনার দিকে।

তিনতলার একটি এপার্টমেন্টের দরজায় চাবি ঢুকিয়ে দরজা খুলে শান। অভিজাত আসবাবপত্রে সুসজ্জিত এপার্টমেন্ট। বেডরুমে খাটের উপর বেশ কটি শাড়ি ও সালোয়ার কামিজের প্যাকেট।

পছন্দমতন একটা ড্রেস পরে আসো। এতোক্ষণ পর কথা বলে শান। মুনার চোখমুখে প্রশ্ন।

বুঝতেই পারছো তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। তুমিও আমাকে। রাইট, মুন ? অস্বীকার করবার উপায় নেই মুনার। সম্ভবত আলোর গতির সাথে তাল মিলিয়ে শানের প্রতি একটা টান মুনার ভেতর জেগে উঠেছে। কত পরিবর্তন না ঘটে জীবনে না বলেকয়ে। না শুনে, না জেনে, না বুঝে এমন এক টানে বিলীন মুনা। আশেপাশে কাউকে এখন আর দেখতে পায় না সে।

রাত পাড় করে যাবার সময়ে শান বলে, এখন থেকে হলে নয়, এখানেই থাকবে। টেবিলের উপর একটা ব্লাংক চেক আছে। টাকার পরিমাণ বসিয়ে নিও। নিচে গাড়ি আছে। ড্রাইভার তোমাকে চিনে নেবে। ঘরে কিছু লাগলে কিনে নেবে। খাবার ইচ্ছে হলে খাবে। রাতে ফিরবো আমি।

আপনার ফোন নম্বর আমি জানি না। নম্বরটা দেবেন ?

ওও ! তাইতো। মুনার মোবাইলে নম্বর সেভ করে রিং দেয় শান। বলে, যখন তখন ফোন দেবে না। আমিই দেবো।

মুনা ভেবে নেয় সে জীবনের অনেক কিছুই পেয়ে গেছে। যে সব পাবার জন্য জীবনে কত চেষ্টাই না থাকে, কষ্ট থাকে। তার কিছুই করতে হলো না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সত্য অনুভব করে, সে অনেক সুন্দরী এবং এটাকেই তার ধরে রাখতে হবে।

রাসেল ও লুনাকে প্রতিদিনকার গল্প শোনায় মুনা। এই গল্পে তারাও স্বপ্ন দেখে প্রাচূর্যের। মুনার সক্ষমতার পানে চেয়ে রাসেল রূপার বিয়ে দেবার জন্য পাত্র খোঁজে।

একটা বছর কেটে যায় ঘোরের সুখে। তারপর ঘোরের যাবার সময় হয়ে আসে। বাস্তবতার বন্ধ দরজা প্রকৃতি খুলে দেয়। শানের নিয়মিত আসা বন্ধ হয়। মাঝেসাঝে এসে সময় কাটায়। মুনা জেনে গেছে শান বিবাহিত। দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের মালিক। অগাদ প্রাচূর্য, ধন সম্পদ তার। যাকে চোখে ধরে তাকেই সে শরীরে ধরে থাকে যতক্ষণ না নিজের শরীরের ক্ষুধা মেটে।

নতুন শিকারে অধীর শানের সাথে বেঁধে যায় মুনার। মুনা একজন রক্ষিতা এমন পরিচয় শান উচ্চারণ করে। অপবাদ, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য আর অবহেলায ক্লান্ত মুনা। শানের বিশ্বাসঘাতকতায় নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। ঠাঁই নেয় মাদকে। ক্ষতবিক্ষত হয় তার রূপ, সৌন্দর্য।

তারপর মুনার দেহ ঝুলে পড়ে। শীতল হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় মুনার সতীত্ব। আর অর্থবিত্তে চাঙা থাকে শানের পুরুষত্ব।

সতীত্ব বনাম পুরুষত্ব

 স্বপনা রেজা 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল সাতটায় ফ্লাইট। যশোহর থেকে ঢাকায় ফিরবে মুনা। ফ্লাইট ইউ এস বাংলা। নির্ধারিত সময়ে ছাড়বে। হাতঘড়িতে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে বিশ মিনিট বাকি। সকালের ফার্স্ট ফ্লাইটে যাত্রী সাধারণত কম হয় না।

বিমান বন্দরে বড় ভাই রাসেল পৌঁছে দিয়েছে। অল্প বয়সে বাবা ও মাকে হারিয়ে এই ভাইয়ের আশ্রয়ে সে কৈশর থেকে তারুণ্যে এসেছে। বয়সের পার্থক্য মুনার সাথে বড় ভাইয়ের বেশ। রাসেলের একমাত্র মেয়ে রূপা মুনার চাইতে এক বছরের বড়। রাসেল ও মুনার মাঝে আর এক বোন লুনা। পৈতৃক বাড়িতে বিবাহিত রাসেল ও লুনা বসবাস করে। নিজের বাড়ি বলতে মুনার যাশোরের এই বাড়িটাই। ছুটি পেলেই আসে।

বিশ মিনিটের অপেক্ষায় খন্ড খন্ড মেঘ জড়ো হলো আকাশে। নিমিষেই আকাশের চেহারা বদলে গেলো। বলেকয়ে না আসা এই মেঘ দেখে মুনার ভয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে। শৈশবে মেঘ ডাকলে মায়ের বুকে মুখ লুকাতো। আর মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরলে ঝুমসে বৃষ্টিতে ভিজতো।

রাসেল ফোন করে খোঁজ নিলো প্লেন সঠিক সময়ে ছাড়বে কিনা। আকাশ কালো হয়ে ওঠা তারও দুশ্চিন্তার কারণ। মনিটর দেখাচ্ছে একঘন্টা পর প্লেন ছাড়বে। আবহাওয়া ভালো না। ঢাকায় তুমুল ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের ভেতর আলাপচারিতা যেন বেড়ে গেলো। কফি খাওয়ার ধুম পড়ে গেছে। সাইড ব্যাগ থেকে সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন বের করে মুনা। এক ঘন্টা অনেক সময়। অনেকবার পড়া এই বইটা মুনা বারবার পড়ে।

হঠাৎ কড়া পারফিউম নাকে এসে লাগে। কালো স্যূট পরা একজন তরুণ মুনার পাশে এসে বসেছে। নিজেকে ছোট করে একটু সরে বসে মুনা। বইয়ে চোখ থাকলেও মুনা বুঝতে পারে পাশে বসা তরুণ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বিষয়টি যাচাই করতে যেয়ে দু, একবার চোখাছোখি হলো। মৃদু বাকা হাসি তরুণের ঠোঁট জুড়ে। ভাব এমন মুনা তার পরিচিত। মুনা কখনো তাকে দেখেছে বলে মনে হয় না। আজকাল কতকিছু ঘটে পথেঘাটে ভেবে মুনা নিজের কাজে মন দেয়। কিন্তু অপলক তরুণের দৃষ্টি। বিজলীর আলোয় তার কণ্ঠ থেকে বের হয়,

হ্যালো ! বেশ মিষ্টি শোনালো কণ্ঠস্বর। দৃষ্টি না ফিরিয়ে পারে না মুনা। সৌজন্যতার মৃদু হাসি তারও ঠোঁটে।

আমি শান। আপনি ?

মুনা।

বাহ্ ! কফি চলবে?

চলতে পারে।

গুড। লাফ দিয়ে শান উঠে গেলো কফি আনতে। বেশ স্মার্ট । অভিজাত অভিব্যক্তি চলনেবলনে। মুনার ভেতর কৌতুহল ততক্ষণে জেগে উঠেছে। বাড়তি আগ্রহ কখনো কারোর প্রতি আচমকা জাগেনি। ব্যতিক্রম বোধহয় এই মানুষটি। কত কিলোমিটার বেগে কফি নিয়ে হাজির তা অনুমানক করা যায়। একটা কাপ এগিয়ে দেয় শান।

ওয়ান টাইম ইউজের কাপে কফি পান নিরাপদ। সেকেন্ড টাইম ইউজের সুযোগ থাকে না। স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। কথাগুলো হেসে হেসে বললো শান। মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে কার্পণ্য করা গেলো না।

মিস মুনা, বই পড়বেন, নাকি গল্প করবেন ?

প্রশ্নের ভেতর গল্প করবার আব্দার ছিলো। মন্দ নয়। বই বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে মুনা। জয়ী হবার আলো জ্বলে উঠলো শানের চেহারায়। সেই আলোয় এবং গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ঘনিষ্ট হবার চেষ্টা। দ্রবণের মতন দ্রবীভুত হলো মুনা। কী ছিলো শানের মধ্যে সেসব বুঝে উঠবার আগেই টান অনুভুত হলো। মুনার পেছনে শানের একটা হাত জায়গা নিয়েছে ততক্ষণে। সেই হাত কাঁধ থেকে কোমড়ে। নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ মুনা। শরীরের ভেতর অন্যরকম এক শিহরণ। মেঘের গর্জন। ভয় পেয়ে কেঁপে ওঠে না মুনা। হাতেধরা কফির কাপে ঠোঁট স্পর্শ পায় না। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিষফিস করে জানতে চায় শান,

কী হলো?

সম্বিৎ ফিরে আসে মুনার। লজ্জিত হয়। মাথা নিঁচু করে উত্তর দেয়, কই কিছু না তো !

বাঁকা ঠোঁটে হাসে শান। শব্দ হাসি। হাসিতে মুনার ধরা খাবার তথ্য ছিলো।

বোর্র্ডিং পাস কোথায়, দেখি। দাবীর সুর। অনুগতের মতন ব্যাগ থেকে বের করে দেয় মুনা। হাতে নিয়ে কোর্টের পকেটে ঢুকায় শান। জানতে চাওয়া সম্ভব হলো না এর কারণটা। ধীরে ধীরে আকাশ পরিস্কার হয়। উড়বার সময় হয়ে আসে। শান মুনার পেছন পেছন হাঁটে। পকেট থেকে দুটো বোর্ডিং পাশ বের করে মুনাকে নিয়ে সোজা বিজনেস ক্লাসে পাশাপাশি বসে পড়ে।

আমার সীট তো এটা নয় ! বলতে বাধ্য হলো মুনা। ভ্রুক্ষেপ নেই শানের। মুচকি হেসে বলে, এটাই সীট। বসো। মুনা সাক্ষাত যাদুকরের মন্ত্রে বসে পড়ে। তুমিতে সম্বোধন জায়গা নিয়েছে। আপন হবার, আপন করবার কৌশল এ যেন। রাসেল ফোন দিয়েছে বেশ কবার। রিসিভ করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ফোন রিসিভ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

কে ফোন দিচ্ছে ?

বড় ভাই।

রিসিভ করো। এক সম্পর্কের ভেতর বসবাস হলে এমন আদেশ থাকে। কে এই ব্যক্তি যে ক্রমশঃ আধিপত্য বিস্তারে তৎপর হয়ে উঠছে। মুনা নিজে অবাক হয় নিজেকে ভেবে, এতটা বিসর্জিত হবার কী মানে।

রাসেল ফোনের অপেক্ষায় ছিলো। দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই কথাটুকু বলেই কথা শেষ করে।

আকাশে ডানা মেলে উড়োজাহাজ। উড়োজাহাজ নয়, এ যেন নতুন এক স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলা। কথা বলতে বলতে বিভোরতার গভীরে ডুবে যায় মুনা। বিশ বছর বয়সী জীবনে আগে এভাবে কেউ তাকে স্পর্শ করেনি। কাছে আসেনি। সুখের অফুরন্ত জানালা খুলে দেয়নি।জীবনে এতো কিছু পাওয়া যায়, পাবার সাধনা করতে হয় এইসব কথা নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের কোথাও লেখা ছিলো না। দেখেনি সে। মেঘের উপর আজ এই ভেসে বেড়ানোর পয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে এক রাজপুত্র এসে তাকে অনেক কিছু জানান দিয়ে গেলো। জীবনের অপরিচিত জানালাগুলো টপাটপ খুলে দিয়ে গেলো।

মাটিতে পা পেলে বিভোরতা কাটে না। আরও কিছুক্ষণ উড়বার সুপ্ত ইচ্ছেটা বুকের ভেতর বাজতে থাকে গোপনে। শুনতে দিতে চায়না সেই শব্দ শানকে। বিদায় নেবার সময় হাত বাড়িয়ে দেয় শান। মুনা সেই হাতে নিজের হাতকে সমর্পিত করে। স্পর্শে অনেক কিছু বলে দেয় শান। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলে,

খুব শীগ্রই আমরা আবার মিলিত হব। রাজী ?

হুম।

গুড।

শান তার গন্তব্যে পা বাড়ায়। মুনার চোখে পড়ে শান এর পেছন পেছন দুজন মানুষ হেঁটে গেলো। অনেকটা দেহরক্ষীর মতন তাদের চলা। একই রকম পোশাক পরা তাদের। প্লেনে পেছনের সীটে সম্ভবত তারা বসেছিলো। শুধু নাম ছাড়া আর কিছুই বলেনি শান। মুনার নাম ছাড়াও সে আর কিছু শুনতে চায়নি। তাহলে কী করে আবার দেখা হবে ? অস্পষ্ট স্বরে মুনার কণ্ঠ থেকে বের হয় প্রশ্নটা।

এয়ারপোর্ট থেকে সোজা রোকেয়া হলে মুনা। নিজের রুমটাকে অপরিচিত লাগে আজ। আলো কম আর স্যাতস্যাতে এই রুমটাতে আরও কিছুর প্রয়োজন অনুভব করে। বিছানায় শরীর বিছিয়ে চোখ বন্ধ করে। চোখের ভেতর আঁধারজুড়ে শান। অথচ কত স্পষ্ট সে ও তার বাঁকা ঠোঁটের হাসি। অনেক রাত করে রুমমেট শায়লা ফেরে। এই দেরী করে ফেরা নিয়ে অনেক কিছু হয়ে যায় শায়লার সাথে হল কর্তৃপক্ষের। শায়লা ওসব গায়ে মাখে না। রুমে ঢুকে প্রথম প্রশ্ন শায়লার,

কী করে কখন ফিরলি ?

সকালেই। এতো রাতে তুই কোথ থেকে ফিরলি ?

প্রায়ই তো ফিরি। আজ প্রশ্ন করছিস যে !

ঠিক বলেছে শায়লা। এটা তার প্রায় প্রতিদিনকার ফেরা।

রাজনীতি করলে সময়জ্ঞান কাজ করে না। করলে বুঝতি। ম্যানেজ এন্ড অ্যারেঞ্জ করে চলতে হয়। বাদ দে। খাইছিস ?

উঁহু। ভালো লাগছে না। শায়লা অবাক হয়। মুনার কপালে হাত রাখে। শান্ত হয়ে পড়ে থাকা মানায় না মুনাকে।

কোন সমস্যা ?

না তো। পাশের রুম থেকে রবীন্দ্র সংগীত ভেসে আসছে- আমার হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়। কেউ খালি গলায় গাইছে। হলে অনেক সময় বহিরাগতরা এসে থাকে। কণ্ঠ কার বুঝা কঠিন। বাইরের নির্জন, নিস্তব্ধতার মাঝে গানটা মুনাকে অন্যমনস্ক করে দিলো। শান অনুভবে এসে দাঁড়ায়। শানের কথা আর লুকানো গেলো না শায়লার কাছে। আকাশের বুকে অসংখ্য নক্ষত্র আর এক ফালি চাঁদ নয়ন সম্মুখে রেখে হলের খোলা জায়গায় বসে ওরা রাত পাড় করে দিলো। গল্প শেষে শায়লা বলে, মুনা সাবধানে থাকিস।

গেস্টরুমে একজন সাক্ষাতপ্রার্থী বসে আছে। হল ক্লিনার খবরটা পৌঁছে দিলো। এতো সকালে কে আসবে মুনার কাছে বুঝতে পারে না। রাত জাগায় শায়লা বেভোরে ঘুমুচ্ছে। সাতপাঁচ মাথায় আসে, আবার যায়। বাড়ির থেকে কেউ নয়তো। গতকালইতো ফেরা হলো। কে তার জন্যঅপেক্ষা করছে খুঁজতে হলো না। একজনই সাক্ষাতপ্রার্থী।

মুনাকে দেখা মাত্র মাঝবয়সী লোকটা উঠে দাঁড়ালো। হাতে ধরা বড় একটা প্যাকেট মুনার দিকে বাড়িয়ে দিলো।

ম্যাম, আপনার একটা পার্সেল ছিলো। প্লিজ !

শত বিস্ময়তার মাঝে পার্সেল হাতে নিতেই প্রেরকের নামটা চোখে পড়লো -শান। বিস্ময়তা কেটে তখন আনন্দ উতলে ওঠে। সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট- খুব শীগ্রই আমাদের দেখা হবে। বাহকা দ্বিতীয় কোন কথার সুযোগ দিলো না। হন হন করে বের হয়ে গেলো।

সাক্ষাতের দিন একবারও বলা হয়নি মুনা কোথায় থাকে, কী করে। অথচ জেনে গেলো মুনার ঠিকানা! সাথেই থাকছে তাহলে। অন্যরকম এক ভালোলাগা জরিয়ে ধরে মুনাকে। রুমে গিয়ে প্যাকেট খুলে চোখ ছানাবাড়া। গোলাপী রং এর থ্রী পিস। ব্রান্ডের। তার ভেতর ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের রিং। বুকটা কেঁপে ওঠে মুনার। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির বেপরোয়া সুখে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতির প্রথম বর্ষের ছাত্রী মুনা। ক্লাস করবার টান হারিয়েছে। বারবার মনে হয় পেছনের ছায়াটা শানের। একদিন সেই ছায়াটা সত্য হয়ে ওঠে। বেশ রাত করে এসে হাজির হলে। হলের গেট বন্ধ হলেও শানের জন্য দরজা খুলে যায়। অবিশ্বাস্য এক মুহুর্ত।

আপনি !

বিশ্বাস করে নাও। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এসো। না ঠিক আছে এভাবেই চলো। মুনার হাত ধরে বেরিয়ে যায় হল থেকে। হলের কেউ কোন উচ্চবাচ্য, প্রশ্ন করলো না। সাদা গাড়ির বেশ ঠান্ডা পরিবেশে ঘেমে ওঠে মুনা। পাশের সীটে মুনাকে বসিয়ে নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে শান। শাহবাগ, মহাখালী পেছন ফেলে গাড়ি এসে দাঁড়ায় বনানীর একটি ফ্ল্যাটের সামনে। বেশ নির্জন এলাকা। লাইটপোস্টের আলো ছাড়া রাস্তায় আর কিছুই চোখে পড়ে না। শান পুরোটা রাস্তায় চুপ ছিলো। ফিরেও তাকায়নি মুনার দিকে।

তিনতলার একটি এপার্টমেন্টের দরজায় চাবি ঢুকিয়ে দরজা খুলে শান। অভিজাত আসবাবপত্রে সুসজ্জিত এপার্টমেন্ট। বেডরুমে খাটের উপর বেশ কটি শাড়ি ও সালোয়ার কামিজের প্যাকেট।

পছন্দমতন একটা ড্রেস পরে আসো। এতোক্ষণ পর কথা বলে শান। মুনার চোখমুখে প্রশ্ন।

বুঝতেই পারছো তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। তুমিও আমাকে। রাইট, মুন ? অস্বীকার করবার উপায় নেই মুনার। সম্ভবত আলোর গতির সাথে তাল মিলিয়ে শানের প্রতি একটা টান মুনার ভেতর জেগে উঠেছে। কত পরিবর্তন না ঘটে জীবনে না বলেকয়ে। না শুনে, না জেনে, না বুঝে এমন এক টানে বিলীন মুনা। আশেপাশে কাউকে এখন আর দেখতে পায় না সে।

রাত পাড় করে যাবার সময়ে শান বলে, এখন থেকে হলে নয়, এখানেই থাকবে। টেবিলের উপর একটা ব্লাংক চেক আছে। টাকার পরিমাণ বসিয়ে নিও। নিচে গাড়ি আছে। ড্রাইভার তোমাকে চিনে নেবে। ঘরে কিছু লাগলে কিনে নেবে। খাবার ইচ্ছে হলে খাবে। রাতে ফিরবো আমি।

আপনার ফোন নম্বর আমি জানি না। নম্বরটা দেবেন ?

ওও ! তাইতো। মুনার মোবাইলে নম্বর সেভ করে রিং দেয় শান। বলে, যখন তখন ফোন দেবে না। আমিই দেবো।

মুনা ভেবে নেয় সে জীবনের অনেক কিছুই পেয়ে গেছে। যে সব পাবার জন্য জীবনে কত চেষ্টাই না থাকে, কষ্ট থাকে। তার কিছুই করতে হলো না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সত্য অনুভব করে, সে অনেক সুন্দরী এবং এটাকেই তার ধরে রাখতে হবে।

রাসেল ও লুনাকে প্রতিদিনকার গল্প শোনায় মুনা। এই গল্পে তারাও স্বপ্ন দেখে প্রাচূর্যের। মুনার সক্ষমতার পানে চেয়ে রাসেল রূপার বিয়ে দেবার জন্য পাত্র খোঁজে।

একটা বছর কেটে যায় ঘোরের সুখে। তারপর ঘোরের যাবার সময় হয়ে আসে। বাস্তবতার বন্ধ দরজা প্রকৃতি খুলে দেয়। শানের নিয়মিত আসা বন্ধ হয়। মাঝেসাঝে এসে সময় কাটায়। মুনা জেনে গেছে শান বিবাহিত। দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের মালিক। অগাদ প্রাচূর্য, ধন সম্পদ তার। যাকে চোখে ধরে তাকেই সে শরীরে ধরে থাকে যতক্ষণ না নিজের শরীরের ক্ষুধা মেটে।

নতুন শিকারে অধীর শানের সাথে বেঁধে যায় মুনার। মুনা একজন রক্ষিতা এমন পরিচয় শান উচ্চারণ করে। অপবাদ, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য আর অবহেলায ক্লান্ত মুনা। শানের বিশ্বাসঘাতকতায় নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। ঠাঁই নেয় মাদকে। ক্ষতবিক্ষত হয় তার রূপ, সৌন্দর্য।

তারপর মুনার দেহ ঝুলে পড়ে। শীতল হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় মুনার সতীত্ব। আর অর্থবিত্তে চাঙা থাকে শানের পুরুষত্ব।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন