করোনার তীব্রতায় কুরবানির আগমন
jugantor
করোনার তীব্রতায় কুরবানির আগমন

  মোহীত উল আলম  

১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছর, ২০২০-এ কুরবানি যখন হতে যাচ্ছিল, আমরা ভেবেছিলাম এই করোনার আক্রমণ বুঝি এবারই শেষ এবং সামনের বছর থেকে ইনশাআল্লাহ্ স্বাভাবিকভাবে কুরবানি করতে পারব। কিন্তু ২০২১ এলো, আর করোনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে জাঁকিয়ে বসেছে। ভয় হয়, ২০২২ সালেও বুঝিবা এই অবস্থা থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাকর্তা বলেছেন, বিশ্ব এখন করোনার তৃতীয় প্রবাহের মুখে।

এ ধরনের সর্বনাশা পরিস্থিতির মধ্যে সরকার থেকে শুরু করে সারা জাতি একটি বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছে। সরকারের অবস্থানটি বোঝা যায়। তাকে সব দিকে দেখতে হয়। তার কাছে করোনার তীব্রতা যেমন সত্য, ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পবিত্র ঈদুল আজহা পালনের সব ব্যবস্থা যাতে ঠিক থাকে সেদিকেও তার লক্ষ রাখতে হয় এবং আরও দেখতে হয় কুরবানি উপলক্ষ্যে পশুর বাজার যাতে দম পায়, এবং সেটিকে কেন্দ্র করে চামড়ার ব্যবসাও যেন ঠিক থাকে। তাই কঠোর বিধিনিষেধের বেশ কিছুটা শিথিল করে দেওয়া হয়েছে আট দিনের জন্য এবং বলা হচ্ছে কুরবানির পরপরই আবার কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হবে।

বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার অর্থ হলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন পুরোপুরি নিজের ওপর এসে পড়ল। আপনি গরুর হাটে যাবেন, গরুর পাছায় থাপড় মেরে গরুর মাংসের পুরুত্ব আঁচ করবেন, গরুর গোঁজটাও একটু হাতিয়ে পরখ করবেন, গরুটাকে একটু হাঁটিয়ে দেখতে চাইবেন, আর কেবল একটা গরু দেখলে তো আপনি সন্তুষ্ট হবেন না, আরও কয়েকটি দেখবেন; লোক হালকা থাকবে মনে করে দুপুরের আহার করেই গরুর হাটে এসে গেছেন, যখন ফিরছেন তখন সন্ধ্যা লাগ-লাগ, গরু আর মানুষের ভিড়ে আপনি হাঁটতেই পারছেন না, এবং ফিরছেন শূন্য হাতে, কারণ মনমতো গরু পাননি, পরের দিন আবার যাবেন, এই নিয়তে। আপনি যখন এসব পরম আনন্দের কাজ সম্পন্ন করতে ব্যস্ত তখন অলক্ষে হাসছে কোভিড-১৯-এর সেই রক্তজবার মতো লাল শুলওয়ালা অনুজীবটি। এসব কাজ করতে গিয়ে আপনি গরুর বিক্রেতার শিকার হওয়ার আগে বা সঙ্গে সঙ্গে কোনো ডেল্টা ভেরিয়েন্টের সহজ শিকারে পরিণত হয়ে গেলেন কীনা, এটা বোঝার দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার। করোনার ভীতির সঙ্গে কুরবানি করার নিয়ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে এক নিদারুণ সংকট তৈরি করেছে। কোন কাজটি করবে সে বুঝতে পারছে না। সে কি রোগের ভয়ে ঘরের বাহির হবে না, হাটে গিয়ে গরু কিনবে না? না কি সে অনলাইনে গরু কিনবে। অনলাইনে গরু কিনলেও তাকে তো গরুর কুরবানির ব্যবস্থা করতে হবে, গরুর জবাইয়ের জায়গায় যেতে হবে, কসাই ঠিক করতে হবে, অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে সে সংক্রমিত হওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। কী করবে তা হলে সে?

কুরবানির নিয়ত হচ্ছে আল্লাহ্র নামে পশু (গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও উট) জবাই করা। কিন্তু করোনার কারণে যে মৃত্যুভীতি আমাদের আঁকড়ে ধরেছে তার থেকে বেরিয়ে আসার একটি মন্ত্রণা পাচ্ছি স্বয়ং যে ঘটনাটি থেকে কুরবানির সৃষ্টি সে ঘটনাটির উৎসে। মক্কায় নাজিল হওয়া পবিত্র আল কুরানের ৩৭ নম্বর সূরা ‘ছোয়াফ্ফাত’-র ১০০ থেকে ১০৬ নম্বর আয়াতে ঘটনাটির বর্ণনা এরকম-

হজরত ইবরাহিম (আ.) নিজের পিতাসহ পৌত্তলিক লোকদের নাস্তিক আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা নগরীতে এলেন। আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘রব্বি হাবলি মিনাছ ছোয়ালিহিন’, অর্থাৎ ‘হে আমার রব! আমাকে নেককার সন্তান দাও।’ আল্লাহ্ বলছেন, ‘আমি তাকে সহিষ্ণু পুত্রের সংবাদ প্রদান করলাম।’ পবিত্র বাইবেলে (জেনেসিস ১৬) বলা হচ্ছে, এ ঘটনার সময় ইবরাহিম (আ.)-এর বয়স ছিল ৮৬। তার প্রথম পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর জন্ম হলো। ইসমাইল বালক বয়সে পৌঁছালে যখন তিনি পিতার নয়নের মণি, তখন পরপর দু’দিন ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন যে তার প্রিয় পুত্রকে আল্লাহ্র নামে কুরবানি করতে হবে। পুত্রকে পিতা বললেন, ‘হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে জবাই করব, এখন তোমার মত কী?’ ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘হে পিতা, নির্দেশ পালন করুন। আল্লাহ্ চাহে তো আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ ‘অতঃপর উভয়েই অনুগত হলো, পিতা পুত্রকে শোয়াল। পিতা নিজের চোখ বেঁধে ফেললেন, যাতে পুত্রের গলার ওপর খঞ্জর ধরার সময় তাকে কিছু দেখতে না হয়। জবাইয়ের কাজটি হয়ে যাওয়ার পর চোখ থেকে কাপড় খসিয়ে দেখলেন পুত্রের জায়গায় একটি দুম্বা মৃত পড়ে আছে, আর তার পুত্র তার পাশে দাঁড়িয়ে-সম্পূর্ণ অক্ষত। তখন আল্লাহ্ বললেন, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করলে! এভাবেই আমি পুণ্যবানদের পুরস্কৃত করি।’ অর্থাৎ, ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ্র প্রতি সম্পূর্ণ বাধ্যতা দেখিয়েছিলেন বলে আল্লাহ্ তাকে একটি বিকল্প ব্যবস্থা বা সাবস্টিটিউট পশু দিয়ে পিতা এবং পুত্রের যুগপৎ তাকওয়া বা ভক্তি গ্রহণ করলেন।

পবিত্র কুরআনের ইংরেজির মান্যবর অনুবাদক আব্দুল্লাহ্ ইউসুফ আলী বলেছেন, লক্ষ্যণীয় যে এখানে জীবন ত্যাগের ক্ষেত্রে পিতাপুত্র দু’জনেই রাজি ছিলেন, যার অর্থ আল্লাহ্র আজ্ঞা তারা অক্ষরে অক্ষরে পালনে ব্রতী ছিলেন। আলী আরও বলছেন, পুরো ব্যাপারটাই প্রতীকী, কারণ ২২ নম্বর সূরা ‘হজ’-এর ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ্র কাছে পৌঁছায় না তার [জবাইকৃত পশুর, মানুষের তো নয়ই] গোশত ও রক্ত, পৌঁছে শুধু তাকওয়া।’

ত্যাগ বা স্যাক্রিফাইস করার এই তাকওয়াটিই হচ্ছে কুরবানির মূল তাৎপর্য। তা হলে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি হলো হজরত ইসমাইলের (আ.) নিঃশঙ্কচিত্তে আল্লাহ্র আজ্ঞাকে মেনে নিয়ে মৃত্যুবরণ করার সাহস। প্যানডেমিকের ভয়ার্ত সময়ে এর মুখোমুখি হওয়ার জন্য ইসমাইল (আ.) ধরনের সাহস ধারণ করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।

ভীতি এবং সাহস ব্যক্তিগত পর্যায়ে এক ধরনের, সামাজিক পর্যায়ে আরেক ধরনের। ঘরেন্টাইনের (কোয়ারেন্টিনের বাংলাদেশি প্রতিশব্দ) সময় ঘরের ভেতর বসে থাকতে থাকতে মনে হয় দরজার বাইরে বের হলেই বুঝি কোভিড-১৯ জেঁকে ধরবে। ফোবিয়াটা এমন বিশ্রী রকমের বাঁক নেয় যে কুরিয়ারের পার্সেল এলে সেটি পর্যন্ত খোলা হয় দু’দিন পরে। কঠোর বিধিনিষেধের সময় ঘরের কাজের বুয়ার আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে, ফলে ঘরে ঘরে গিন্নিরা নানা অতিরিক্ত চাপে থেকে হয়ে যান ত্যক্ত-বিরক্ত। কিন্তু একবার ঘরের বাইরে এলে মনে হয়-আরে দূর, কিচ্ছু হবে না। তখন দেখা যায় নিজের অজান্তেই একজনের খুব কাছে আরেকজন ঘেঁষে কেনাকাটা করছি, মাস্ক ঝুলছে থুতনির নিচে। ভীতি কেটে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সাহস বেড়ে যাওয়া।

ঠিক এরকম একটি দোদুল্যমানতায় পুরো জাতি দুলছে। গতবারে একটি গরু অনলাইনে কিনে শান্তি পাইনি। ভিডিওতে যে সাইজের গরু খামারি দেখিয়েছিল, গরু বাসায় এলে দেখলাম গরুটা ছোট মনে হচ্ছে। যদিও ক্রেতার সিরিয়াল নম্বর ঠিক আছে। এবার তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি গরু হাট থেকে কিনব। এবারের হাটের বেলায় মধ্যস্বত্বভোগী একটি বিরাট বাহিনীর জন্ম হয়েছে। আমার অফিসের পিয়ন, সেও আর কয়েকজন বন্ধু মিলে গরুর হাট বসিয়েছে। আমাকে নাদুসনুদুস বেশ কয়েকটি গরুর ভিডিও দেখাল সে। দাম জিজ্ঞেস করলাম আকাশচুম্বী দাম বলল। যে গরুর গত বছর দাম হতে পারত ৬০-৭০ হাজার, সে সাইজের গরুর দাম বলছে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ। আমি বললাম, বলিস কীরে এত দাম! সে আমাকে আরও স্পষ্ট ধারণা দিল যে অন্য জায়গায় আরও চড়া হবে, তার কাছে বরঞ্চ কিছুটা সস্তায় পাওয়া যাবে। এক সাবেক ছাত্রনেতাকে টেলিফোন করলাম, কেন না সে এবার বিরাট একটা হাটের ‘ডাক’ পেয়েছে শুনেছি। জিজ্ঞেস করলে বলল, আমি যদি বুঝতে চাই, তা হলে এভাবে বুঝব যে এক মণ ওজনের গরুর মাংসের দাম পড়বে ৩৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ একটি তিন মণি গরুর দাম পড়বে ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা। এ লেখাটি যখন পাঠক পড়বেন, তখন নিশ্চয় গরুর দাম কমে আসবে, কারণ গরুর চালানও বাড়বে, ক্রেতার ভিড়ও বাড়বে। করোনার ভীতির কথা বাদ দিয়ে শুধু যদি গরুর কথায় আসি তা হলে আমি বিরাট একটা ফুলে ফেঁপে ওঠা অর্থনীতির কথা বলতে চাই। টিভিতে, মেসেন্জারে, ফেসবুকে এবং ছাপানো খবরের কাগজে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ব্যক্তিগত মালিকানায় গড়ে ওঠা বিশাল বিশাল খামারে প্রজননকৃত বিশাল বিশাল গরুর ছবি দেখে আমি রোমহর্ষিত হচ্ছি। আগে যে ধরনের গরু অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডসে দেখতাম, তারচেয়েও সরেস গরু এখন বাংলাদেশের খামারগুলোতে দেদার প্রজনন হচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম একটি হাতির সাইজের গরু ‘মহারাজ’, যার দাম হাঁকানো হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। এটি সাধারণ বোধগম্যের বাইরে যে একটি গরু কীভাবে এত উচ্চমূল্যে উঠতে পারে, তার চেয়েও অবাক করা ব্যাপার এই যে দামের সামান্য হেরফের করে এই গরু কেনারও লোক থাকবে। কুরবানির গরুর সাইজ বাংলাদেশের নিশ্চিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচক।

কুরবানির বিশাল চক্রযজ্ঞে আসলে গরুর গলায় আল্লাহ্র নামে ছুরি দেওয়াটাই হচ্ছে একমাত্র আধ্যাত্মিক দিক, এর আগেপরে বাদবাকি সব প্রক্রিয়াই হচ্ছে জাগতিক। সে জন্য কুরবানি সেই বাৎসরিক উপলক্ষ্য যখন গরুসহ সব গবাদি পশুর প্রজনন, বিপণন এবং চামড়ার সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ এবং সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে অগ্রগমণ সব কিছুই নিশ্চিত হয়।

কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতিচিহ্নিত অনুবাদ : মাওলানা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

করোনার তীব্রতায় কুরবানির আগমন

 মোহীত উল আলম 
১৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছর, ২০২০-এ কুরবানি যখন হতে যাচ্ছিল, আমরা ভেবেছিলাম এই করোনার আক্রমণ বুঝি এবারই শেষ এবং সামনের বছর থেকে ইনশাআল্লাহ্ স্বাভাবিকভাবে কুরবানি করতে পারব। কিন্তু ২০২১ এলো, আর করোনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে জাঁকিয়ে বসেছে। ভয় হয়, ২০২২ সালেও বুঝিবা এই অবস্থা থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাকর্তা বলেছেন, বিশ্ব এখন করোনার তৃতীয় প্রবাহের মুখে।

এ ধরনের সর্বনাশা পরিস্থিতির মধ্যে সরকার থেকে শুরু করে সারা জাতি একটি বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছে। সরকারের অবস্থানটি বোঝা যায়। তাকে সব দিকে দেখতে হয়। তার কাছে করোনার তীব্রতা যেমন সত্য, ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পবিত্র ঈদুল আজহা পালনের সব ব্যবস্থা যাতে ঠিক থাকে সেদিকেও তার লক্ষ রাখতে হয় এবং আরও দেখতে হয় কুরবানি উপলক্ষ্যে পশুর বাজার যাতে দম পায়, এবং সেটিকে কেন্দ্র করে চামড়ার ব্যবসাও যেন ঠিক থাকে। তাই কঠোর বিধিনিষেধের বেশ কিছুটা শিথিল করে দেওয়া হয়েছে আট দিনের জন্য এবং বলা হচ্ছে কুরবানির পরপরই আবার কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হবে।

বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার অর্থ হলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন পুরোপুরি নিজের ওপর এসে পড়ল। আপনি গরুর হাটে যাবেন, গরুর পাছায় থাপড় মেরে গরুর মাংসের পুরুত্ব আঁচ করবেন, গরুর গোঁজটাও একটু হাতিয়ে পরখ করবেন, গরুটাকে একটু হাঁটিয়ে দেখতে চাইবেন, আর কেবল একটা গরু দেখলে তো আপনি সন্তুষ্ট হবেন না, আরও কয়েকটি দেখবেন; লোক হালকা থাকবে মনে করে দুপুরের আহার করেই গরুর হাটে এসে গেছেন, যখন ফিরছেন তখন সন্ধ্যা লাগ-লাগ, গরু আর মানুষের ভিড়ে আপনি হাঁটতেই পারছেন না, এবং ফিরছেন শূন্য হাতে, কারণ মনমতো গরু পাননি, পরের দিন আবার যাবেন, এই নিয়তে। আপনি যখন এসব পরম আনন্দের কাজ সম্পন্ন করতে ব্যস্ত তখন অলক্ষে হাসছে কোভিড-১৯-এর সেই রক্তজবার মতো লাল শুলওয়ালা অনুজীবটি। এসব কাজ করতে গিয়ে আপনি গরুর বিক্রেতার শিকার হওয়ার আগে বা সঙ্গে সঙ্গে কোনো ডেল্টা ভেরিয়েন্টের সহজ শিকারে পরিণত হয়ে গেলেন কীনা, এটা বোঝার দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার। করোনার ভীতির সঙ্গে কুরবানি করার নিয়ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে এক নিদারুণ সংকট তৈরি করেছে। কোন কাজটি করবে সে বুঝতে পারছে না। সে কি রোগের ভয়ে ঘরের বাহির হবে না, হাটে গিয়ে গরু কিনবে না? না কি সে অনলাইনে গরু কিনবে। অনলাইনে গরু কিনলেও তাকে তো গরুর কুরবানির ব্যবস্থা করতে হবে, গরুর জবাইয়ের জায়গায় যেতে হবে, কসাই ঠিক করতে হবে, অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে সে সংক্রমিত হওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। কী করবে তা হলে সে?

কুরবানির নিয়ত হচ্ছে আল্লাহ্র নামে পশু (গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও উট) জবাই করা। কিন্তু করোনার কারণে যে মৃত্যুভীতি আমাদের আঁকড়ে ধরেছে তার থেকে বেরিয়ে আসার একটি মন্ত্রণা পাচ্ছি স্বয়ং যে ঘটনাটি থেকে কুরবানির সৃষ্টি সে ঘটনাটির উৎসে। মক্কায় নাজিল হওয়া পবিত্র আল কুরানের ৩৭ নম্বর সূরা ‘ছোয়াফ্ফাত’-র ১০০ থেকে ১০৬ নম্বর আয়াতে ঘটনাটির বর্ণনা এরকম-

হজরত ইবরাহিম (আ.) নিজের পিতাসহ পৌত্তলিক লোকদের নাস্তিক আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা নগরীতে এলেন। আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘রব্বি হাবলি মিনাছ ছোয়ালিহিন’, অর্থাৎ ‘হে আমার রব! আমাকে নেককার সন্তান দাও।’ আল্লাহ্ বলছেন, ‘আমি তাকে সহিষ্ণু পুত্রের সংবাদ প্রদান করলাম।’ পবিত্র বাইবেলে (জেনেসিস ১৬) বলা হচ্ছে, এ ঘটনার সময় ইবরাহিম (আ.)-এর বয়স ছিল ৮৬। তার প্রথম পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর জন্ম হলো। ইসমাইল বালক বয়সে পৌঁছালে যখন তিনি পিতার নয়নের মণি, তখন পরপর দু’দিন ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন যে তার প্রিয় পুত্রকে আল্লাহ্র নামে কুরবানি করতে হবে। পুত্রকে পিতা বললেন, ‘হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে জবাই করব, এখন তোমার মত কী?’ ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘হে পিতা, নির্দেশ পালন করুন। আল্লাহ্ চাহে তো আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ ‘অতঃপর উভয়েই অনুগত হলো, পিতা পুত্রকে শোয়াল। পিতা নিজের চোখ বেঁধে ফেললেন, যাতে পুত্রের গলার ওপর খঞ্জর ধরার সময় তাকে কিছু দেখতে না হয়। জবাইয়ের কাজটি হয়ে যাওয়ার পর চোখ থেকে কাপড় খসিয়ে দেখলেন পুত্রের জায়গায় একটি দুম্বা মৃত পড়ে আছে, আর তার পুত্র তার পাশে দাঁড়িয়ে-সম্পূর্ণ অক্ষত। তখন আল্লাহ্ বললেন, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করলে! এভাবেই আমি পুণ্যবানদের পুরস্কৃত করি।’ অর্থাৎ, ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ্র প্রতি সম্পূর্ণ বাধ্যতা দেখিয়েছিলেন বলে আল্লাহ্ তাকে একটি বিকল্প ব্যবস্থা বা সাবস্টিটিউট পশু দিয়ে পিতা এবং পুত্রের যুগপৎ তাকওয়া বা ভক্তি গ্রহণ করলেন।

পবিত্র কুরআনের ইংরেজির মান্যবর অনুবাদক আব্দুল্লাহ্ ইউসুফ আলী বলেছেন, লক্ষ্যণীয় যে এখানে জীবন ত্যাগের ক্ষেত্রে পিতাপুত্র দু’জনেই রাজি ছিলেন, যার অর্থ আল্লাহ্র আজ্ঞা তারা অক্ষরে অক্ষরে পালনে ব্রতী ছিলেন। আলী আরও বলছেন, পুরো ব্যাপারটাই প্রতীকী, কারণ ২২ নম্বর সূরা ‘হজ’-এর ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ্র কাছে পৌঁছায় না তার [জবাইকৃত পশুর, মানুষের তো নয়ই] গোশত ও রক্ত, পৌঁছে শুধু তাকওয়া।’

ত্যাগ বা স্যাক্রিফাইস করার এই তাকওয়াটিই হচ্ছে কুরবানির মূল তাৎপর্য। তা হলে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি হলো হজরত ইসমাইলের (আ.) নিঃশঙ্কচিত্তে আল্লাহ্র আজ্ঞাকে মেনে নিয়ে মৃত্যুবরণ করার সাহস। প্যানডেমিকের ভয়ার্ত সময়ে এর মুখোমুখি হওয়ার জন্য ইসমাইল (আ.) ধরনের সাহস ধারণ করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।

ভীতি এবং সাহস ব্যক্তিগত পর্যায়ে এক ধরনের, সামাজিক পর্যায়ে আরেক ধরনের। ঘরেন্টাইনের (কোয়ারেন্টিনের বাংলাদেশি প্রতিশব্দ) সময় ঘরের ভেতর বসে থাকতে থাকতে মনে হয় দরজার বাইরে বের হলেই বুঝি কোভিড-১৯ জেঁকে ধরবে। ফোবিয়াটা এমন বিশ্রী রকমের বাঁক নেয় যে কুরিয়ারের পার্সেল এলে সেটি পর্যন্ত খোলা হয় দু’দিন পরে। কঠোর বিধিনিষেধের সময় ঘরের কাজের বুয়ার আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে, ফলে ঘরে ঘরে গিন্নিরা নানা অতিরিক্ত চাপে থেকে হয়ে যান ত্যক্ত-বিরক্ত। কিন্তু একবার ঘরের বাইরে এলে মনে হয়-আরে দূর, কিচ্ছু হবে না। তখন দেখা যায় নিজের অজান্তেই একজনের খুব কাছে আরেকজন ঘেঁষে কেনাকাটা করছি, মাস্ক ঝুলছে থুতনির নিচে। ভীতি কেটে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সাহস বেড়ে যাওয়া।

ঠিক এরকম একটি দোদুল্যমানতায় পুরো জাতি দুলছে। গতবারে একটি গরু অনলাইনে কিনে শান্তি পাইনি। ভিডিওতে যে সাইজের গরু খামারি দেখিয়েছিল, গরু বাসায় এলে দেখলাম গরুটা ছোট মনে হচ্ছে। যদিও ক্রেতার সিরিয়াল নম্বর ঠিক আছে। এবার তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি গরু হাট থেকে কিনব। এবারের হাটের বেলায় মধ্যস্বত্বভোগী একটি বিরাট বাহিনীর জন্ম হয়েছে। আমার অফিসের পিয়ন, সেও আর কয়েকজন বন্ধু মিলে গরুর হাট বসিয়েছে। আমাকে নাদুসনুদুস বেশ কয়েকটি গরুর ভিডিও দেখাল সে। দাম জিজ্ঞেস করলাম আকাশচুম্বী দাম বলল। যে গরুর গত বছর দাম হতে পারত ৬০-৭০ হাজার, সে সাইজের গরুর দাম বলছে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ। আমি বললাম, বলিস কীরে এত দাম! সে আমাকে আরও স্পষ্ট ধারণা দিল যে অন্য জায়গায় আরও চড়া হবে, তার কাছে বরঞ্চ কিছুটা সস্তায় পাওয়া যাবে। এক সাবেক ছাত্রনেতাকে টেলিফোন করলাম, কেন না সে এবার বিরাট একটা হাটের ‘ডাক’ পেয়েছে শুনেছি। জিজ্ঞেস করলে বলল, আমি যদি বুঝতে চাই, তা হলে এভাবে বুঝব যে এক মণ ওজনের গরুর মাংসের দাম পড়বে ৩৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ একটি তিন মণি গরুর দাম পড়বে ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা। এ লেখাটি যখন পাঠক পড়বেন, তখন নিশ্চয় গরুর দাম কমে আসবে, কারণ গরুর চালানও বাড়বে, ক্রেতার ভিড়ও বাড়বে। করোনার ভীতির কথা বাদ দিয়ে শুধু যদি গরুর কথায় আসি তা হলে আমি বিরাট একটা ফুলে ফেঁপে ওঠা অর্থনীতির কথা বলতে চাই। টিভিতে, মেসেন্জারে, ফেসবুকে এবং ছাপানো খবরের কাগজে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ব্যক্তিগত মালিকানায় গড়ে ওঠা বিশাল বিশাল খামারে প্রজননকৃত বিশাল বিশাল গরুর ছবি দেখে আমি রোমহর্ষিত হচ্ছি। আগে যে ধরনের গরু অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডসে দেখতাম, তারচেয়েও সরেস গরু এখন বাংলাদেশের খামারগুলোতে দেদার প্রজনন হচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম একটি হাতির সাইজের গরু ‘মহারাজ’, যার দাম হাঁকানো হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। এটি সাধারণ বোধগম্যের বাইরে যে একটি গরু কীভাবে এত উচ্চমূল্যে উঠতে পারে, তার চেয়েও অবাক করা ব্যাপার এই যে দামের সামান্য হেরফের করে এই গরু কেনারও লোক থাকবে। কুরবানির গরুর সাইজ বাংলাদেশের নিশ্চিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচক।

কুরবানির বিশাল চক্রযজ্ঞে আসলে গরুর গলায় আল্লাহ্র নামে ছুরি দেওয়াটাই হচ্ছে একমাত্র আধ্যাত্মিক দিক, এর আগেপরে বাদবাকি সব প্রক্রিয়াই হচ্ছে জাগতিক। সে জন্য কুরবানি সেই বাৎসরিক উপলক্ষ্য যখন গরুসহ সব গবাদি পশুর প্রজনন, বিপণন এবং চামড়ার সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ এবং সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে অগ্রগমণ সব কিছুই নিশ্চিত হয়।

কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতিচিহ্নিত অনুবাদ : মাওলানা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন