জীবনকথা

কমেডি কিং ঢাকার ভানু

  সেলিম কামাল ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভানু
বাঙালি কমেডি কিং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতায় বসে তার শিল্পের সব উত্তরণ ঘটালেও বাংলাদেশের দর্শক-শ্রোতার কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘ঢাকার ভানু’। তিনি উপমহাদেশের বাঙালি কমেডি কিং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।

জন্ম ও পরিবার : ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে সবসময়ই এক্কেবারে বাংলাদেশের পোলা বলে পরিচয় দিতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুরের পাঁচগাঁওয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ডাকনাম ছিল ভানু।

পরবর্তীকালে সাম্যময় থেকে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় নামেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। অডিও ক্যাসেটে রেকর্ডকৃত কৌতুক প্রবল জনপ্রিয় হওয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকার ভানু। বাবা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। মা সুনীতি দেবী। জিতেন্দ্রনাথের ছাত্র ছিলেন পরবর্তীকালের দুই বিখ্যাত অভিনেতা শিশির কুমার ভাদুড়ি ও অহীন্দ্র চৌধুরী।

পড়াশোনা ও ঢাকা ত্যাগ : মুন্সিগঞ্জের কাজি পাগলা এ.টি. ইনস্টিটিউট থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকার পোগোজ স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। কিন্তু তার উচ্চশিক্ষা গ্রহণ আর সম্ভব হয়নি।

কারণ ঢাকা শহরে সেই সময় বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের অনুরক্ত হয়ে ওঠেন ভানু। ফলে ১৯৪১ সালে রাজরোষে পড়েন তিনি। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য ঢাকা শহর ত্যাগের পরোয়ানা জারি হয়। তারপরই সাম্যময় ঢাকা ছেড়ে চলে যান কলকাতায়। কলকাতায় চারু এভিনিউতে থাকতেন তিনি।

টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানিতে একটা চাকরিও জুটে যায়। সেই সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন অফিস ও ক্লাবের অনুষ্ঠানে কৌতুক নকশা পরিবেশন করতে থাকেন এবং রীতিমতো জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠেন। সেই জনপ্রিয়তা একসময় এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছে যে, তিনি ১৯৪৩ সালে ‘ঢাকার গাড়োয়ান’ নামে একটি কৌতুক নকশার রেকর্ড বের করেন।

বিয়ে এবং চলচ্চিত্রে অভিনয় : ভানু কোনোদিনই ভাবেননি যে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনেতা হবেন। বরং মঞ্চে অভিনয়ের দিকেই তার ঝোঁক ছিল সবচেয়ে বেশি। এরই মধ্যে ১৯৪৬ সালে ভানু বিয়ে করেন বেতার শিল্পী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিয়ের তিন দিন পরই প্রথম ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান ভানু। ছবির নাম ছিল ‘জাগরণ’। তবে সিনেমার জগতে ভানুর প্রথম বাণিজ্যিক সফল ছবি নির্মল বসুর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’।

এই ছবিটি বাংলা কমেডি সিনেমার ইতিহাসে একটি অন্যতম মাইলস্টোন। এক ছবিতেই বাজিমাত করেন ভানু। বাংলার দর্শক-শ্রোতা তাকে বলতে থাকেন কমেডি কিং।

অভিনয়ের ধরন : ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করেছেন অন্তত ৩০০ ছবিতে। আর প্রায় ছবিতেই তাকে তৈরি করতে হয়েছে কৌতুক। সংলাপ থেকে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে নিজেই গড়ে নিয়েছিলেন কমেডির নিজস্ব ভুবন।

সমসাময়িকদের পেছনে ফেলে ভানুর নাম শিরোনামেই তৈরি হয় ‘ভানু পেলো লটারি’ কিংবা ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’-এর মতো ছবি। ভানু মনে করতেন বাঙালি কান্নাপ্রিয় জাতি। তাই বাঙালির কান্নাপ্রীতি ভোলানোর প্রয়াসেই হাসির হুল্লোড় তৈরি করতেন, যা অরুণ মুখোপাধ্যায়কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভানু নিজের মুখেই বলেছেন।

যাত্রাপালায় ভানু : ক্যারিয়ারের শেষ দিকে যুক্ত হয়েছিলেন যাত্রাপালায়। ভানুর উল্লেখযোগ্য যাত্রাপালার মধ্যে ছিল ‘গোপাল ভাঁড়’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘ভৈরবমন্ত্র’, ‘শ্রীযুক্ত আলিবাবা’ ইত্যাদি।

ভানুর রসসম্পদ : ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পদ ছিল তার মুখের ভাষা। ভানু তার কৌতুকে নানা সময়ে সমাজের নানা বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। বাঙালি দাম্পত্য নিয়েও রয়েছে ভানুর নানা অকাট্য মন্তব্য। যেমন, বাঙালি কর্তাদের গিন্নির কাছে ৪০ মিনিট ধরে চা চাইলেও নাকি শুনতে হয় পাঁচ মিনিটের মধ্যে দিচ্ছি।

এছাড়া ভানুর দাবি, কর্তার চোখে ধুলো পড়লে ডাক্তার খরচ হয় ২৫ টাকা, আর গিন্নির চোখে শাড়ি পড়লে গ্যাঁট থেকে বেরিয়ে যায় পাক্কা ২৫০ টাকা। এ ধরনের অসংখ্য রসিকতা ভানুর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

যেদিন চলে গেলেন : ১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ তিনি মাত্র ৬২ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×