জীবনকথা

খেয়ালি এক গণিতবিদ মারিয়াম মির্জাখানি

বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে ‘গণিতের নোবেল’খ্যাত ফিল্ডস পদক পেয়েছেন তিনি। জ্যামিতিশাস্ত্রের জটিল বিষয়ে অবদানের জন্য তিনি ২০১৪ সালে এই পুরস্কার পান। ইরানের অবিস্মরণীয় গণিতবিদ মারিয়াম মির্জাখানির জীবন কথা লিখেছেন আমান বাবু

  যুগান্তর ডেস্ক    ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জন্ম ও ছেলেবেলা

১৯৭৭ সালের ৩ মে ইরানের তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন মারিয়াম মির্জাখানি। ছোটবেলায় তার ঝোঁক ছিল যে কোনো বই পাওয়ামাত্রই পড়ে ফেলার দিকে। তখনও তার গণিত সম্পর্কে কোনো আগ্রহ জন্মায়নি। তিনি টেলিভিশনে মারি কুরি, হেলেন কেলার প্রমুখ বিখ্যাত নারীর জীবনী দেখতেও পছন্দ করতেন। চিত্রশিল্পী ভিন্সেন্ট ভ্যান গগকে নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘লাস্ট ফর লাইফ’ কিংবা বিখ্যাত নারীদের জীবনী- সবই তাকে প্রভাবিত করেছিল। উপলব্ধি করেছিলেন ‘জীবনে বড় কিছু করতে হবে’। হয়তো এ উপলব্ধি থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একজন লেখক হওয়ার। গণিতের চেয়ে গল্প পড়তে এবং লিখতেই আগ্রহ ছিল বেশি।

প্রাথমিক শিক্ষা ও গণিতে ঝোঁক

মারিয়াম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জীবন যখন শেষ করেন তখন ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষের পথে। সে সময় উদ্যমী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল। মারিয়াম ইরান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত তেহরানের ফারজানেগান মিডল স্কুল ফর গার্লসে ভর্তির সুযোগ পান। নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে রয়া বেহেশতির। তিনি বর্তমানে আমেরিকার মিসৌরি স্টেটে অবস্থিত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রফেসর। দুই বন্ধু মিলে মাঝে মাঝেই চলে যেতেন স্কুলের কাছে বইয়ের দোকানগুলোতে। স্কুলের প্রথম বছর মারিয়াম অঙ্কে বেশ খারাপ ফলাফল করেছিলেন। গণিত টিচারের ধারণা হয়েছিল, মারিয়াম খুব একটা বুদ্ধিমান নয়। টিচারের এ মনোভাব মারিয়ামের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরিয়ে দেয়। তিনি গণিতের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু পরের বছর পেলেন এমন একজন গণিত শিক্ষক, যিনি তাকে উৎসাহ দিলেন। মারিয়ামও খুব তাড়াতাড়ি গণিতে প্রচুর উন্নতি ঘটিয়ে ফেললেন। স্কুলের দ্বিতীয় বছর থেকে মারিয়াম হয়ে উঠেছিলেন একজন তারকা।

অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স

উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হতে হয়। সে সময় জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের যে প্রশ্নগুলো দেয়া হয়েছিল তার কপি মারিয়াম আর বেহেশতির হাতে আসে। কয়েকদিনের খাটাখাটুনি শেষে দু’জনে ছয়টা প্রশ্নের মধ্যে মাত্র তিনটার সমাধান করতে সক্ষম হন। এরপর দুই বন্ধু গেলেন প্রিন্সিপালের কাছে।

বললেন, ছেলেদের উচ্চ বিদ্যালয়ে যে ধরনের গণিতের সমস্যা সমাধানবিষয়ক ক্লাস হয় তাদেরও সেরকম ক্লাস করার সুযোগ দিতে হবে। প্রিন্সিপাল ছিলেন দৃঢ় মনের মহিলা।

মারিয়ামদের দাবি তাকে ভাবিয়ে তুলল। ইরানের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড দলে কখনও কোনো মেয়েকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই প্রিন্সিপালকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। অলিম্পিয়াডের টেস্টে মারিয়াম যে স্কোর তুললেন, তার জন্য তাকে পুরস্কৃত করা হল সোনার মেডেল দিয়ে। মারিয়ামই প্রথম ইরানের ছাত্রী যিনি গণিত অলিম্পিয়াডে সোনার মেডেল জিতেছেন। পরের বছর ১৯৯৫ সালে মারিয়াম গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে পারফেক্ট স্কোর অর্জন করেন এবং দু-দুটো সোনার মেডেল অর্জন করেন।

গবেষণা এবং শিক্ষাদান

১৯৯৯ সালে মারিয়াম তেহরানের শরীফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন।

এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান পিএইচডির জন্য।

সেখানে ফিল্ড মেডেলপ্রাপ্ত গণিতবিদ কার্টিস ম্যাকমুলেনের সেমিনারে যোগ দেয়া শুরু করেন। প্রথমে ম্যাকমুলেনের লেকচারের আগামাথা না বুঝলেও তিনি

ম্যাকমুলেনের অফিসে যান।

ভাঙা ভাঙা ইংরেজি ব্যবহার করে তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলতেন। প্রফেসরের কথা নোট করে রাখতেন ফার্সি ভাষায়। ম্যাকমুলেনের অধীনেই ২০০৪ সালে মারিয়াম পিএইচডি শেষ করেন। তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিভিন্ন ধরনের হাইপারবোলিক সারফেস। কিন্তু পিএইচডি শুরু করার সময়ও তার এই সারফেসগুলো নিয়ে অনেক সরল প্রশ্নের উত্তর ছিল অজানা।

বিয়ে এবং গবেষণা কাজ

মারিয়াম যখন হার্ভার্ডের শিক্ষার্থী তখন পরিচয় হয় ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির শিক্ষার্থী জ্যান ভনড্রাকের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের একটি কন্যা সন্তানও আছে।

যখনই মারিয়াম গণিত নিয়ে চিন্তা করতেন তখনই তিনি ডুডল আঁকতেন। এসব তার গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন চিত্র আর সারফেসের ছবি। মারিয়ামের ছিল বিশাল আকারের সব কাগজ। সেগুলো মেঝেতে বিছিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছবি আঁকতেন। জ্যানের মনে হতো, মারিয়াম যেন একই ছবি বারবার আঁকছেন। তাছাড়া বাসায় মারিয়ামের যে অফিস ছিল, সেটার অবস্থাও ছিল শোচনীয়। কাগজপত্র আর বই ছড়ানো ছিটানো ছিল যেখানে সেখানে। তিনি যে সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতেন সেগুলো এতটাই ধরাছোঁয়ার বাইরে আর জটিল ছিল, স্বাভাবিক গণিতের মতো ধারাবাহিক উপায়ে গুছিয়ে সেগুলোর সমাধান করা সম্ভব হতো না। মারিয়ামের মতে, আঁকাআঁকি তাকে গণিতের কঠিন সমস্যায় ফোকাস করতে সাহায্য করত। তিনি গণিতকে দেখেন ছবির মাধ্যমে।

২০০৪ সালে পিএইচডি করার পর একইসঙ্গে মারিয়াম প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর হিসেবে এবং ক্লাজ ম্যাথমেটিকস ইন্সটিটিউটে রিসার্চ ফেলো হিসেবে। দুই জায়গাতেই তিনি ২০০৮ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। প্রফেসর হিসেবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে যোগ দেন ২০০৮ সালে।

অতঃপর ফিল্ড মেডেল

২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে একটা ইমেল আসে ফিল্ড মেডেল কমিটির কাছ থেকে। মারিয়ামের কাছে ইমেইলটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তিনি ভেবেছিলেন কমিটির ইমেলে আইডি হ্যাক করা হয়েছে। নিজের কাছে মনে হয়, তার অবদান খুবই সামান্য। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শহরে আন্তর্জাতিক গণিত সমিতির আয়োজনে ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট পৃথিবীর বাঘা বাঘা গণিতবিদের উপস্থিতিতে মারিয়াম ফিল্ড মেডেল গ্রহণ করেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা অনেক বড় একটা সম্মান। কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হব যদি এই অর্জন নারী গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করে।’

ক্যান্সারে বসবাস এবং মৃত্যু

২০১৩ সালে মারিয়ামের স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে। চার বছর এই ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর ২০১৭ সালে এসে সেটা ছড়িয়ে পড়ে তার অস্থিমজ্জায়। ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই আমেরিকার এক হাসপাতালে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই নারী। তিনি অনেক কম বয়সে, অসময়ে চলে গেছেন। কিন্তু প্রভাব রেখে গেছেন হাজার হাজার নারীর ওপর, যারা তাকে দেখে বিজ্ঞান আর গণিত জগতে পা দিতে উৎসাহিত বোধ হবেন।

মারিয়াম মির্জাখানির তিনটি বাণী

* চেষ্টা করার মাধ্যমে আপনি গণিতের সৌন্দর্য বুঝতে পারবেন।

* আমি সহজে হতাশ হই না। কিছু ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।

* সবকিছু বিস্তারিতভাবে লিখে রাখা বেশ কঠিন একটা কাজ। সে জায়গায় একটা চিত্রের মাধ্যমেই বিস্তারিত অনেক কিছু ফুটিয়ে তোলা যায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter