জীবনকথা

হেলিকপ্টার ও ইগর সিকোরস্কি

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  একদিন প্রতিদিন ডেস্ক

ইগর সিকোরস্কি

আজ থেকে বহুদিন আগে হেলিকপ্টারের যে প্রথম নকশাটি আমরা দেখতে পাই সেটি এঁকেছিলেন ইতালির লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। লিওনার্দো নিজে সেই স্বপ্নের যানটি তৈরি করতে সক্ষম না হলেও, তিনি অনেককেই যুগ যুগ ধরে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই কাজে।

তার সেই আকাশযানটির কথা মায়ের কাছ থেকে ছোটবেলায় শুনে রাশিয়ার যে শিশুটি আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখত, সেই ইগর সিকোরস্কি বড় হয়ে ১৯৪২ সালে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সেই কল্পিত হেলিকপ্টারকে বাস্তবরূপ দেন।

১৮৮৯ সালের ২৫ মে ইগর সিকোরস্কি রাশিয়ার কিয়েভ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন মনতত্ত্বের অধ্যাপক। মা ডাক্তার। ১৯০৩ সালে ইগরের যখন মাত্র চৌদ্দ বছর বয়স তখন আমেরিকার রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এরোপ্লেন বানিয়ে প্রথম আকাশে উড়লেন

। এরপর থেকেই শুরু হল বহুলোকের আকাশে ওড়ার প্রচেষ্টা। ইগরেরও প্রবল ইচ্ছা জাগল তিনিও আকাশে উড়বেন। ১৯০৮ সালে প্যারিসে গেলেন যদি এরোপ্লেন বানানো সম্পর্কে কিছু শিখতে পারেন। সেখান থেকে তিনি ২৫ অশ্বশক্তির একটি ইঞ্জিন কিনে রাশিয়াতে ফিরে এসেছিলেন। ইঞ্জিনটির সঙ্গে নানা কলকব্জাজুড়ে ১৯০৯ সালে যে বস্তুটি তিনি তৈরি করেন- সেটিই হল ইগর সিকোরস্কির হেলিকপ্টার বানানোর প্রথম প্রচেষ্টা। এটিতে ছিল দুটো প্রপেলার বা পাখা- একটি ওপরে একটি নিচে। দুর্ভাগ্যক্রমে প্রপেলার দুটি পুরোদমে চালান সত্ত্বেও হেলিকপ্টার আকাশে উঠল না।

সিকোরস্কি অবশ্য নিরাশ হলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন হেলিকপ্টারটা আকাশে ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু একটু বেশি ভারী হয়ে যাওয়ার ফলে ঠিক উঠতে পারছে না। এরপর কয়েক বছর ইগর সিকোরস্কি এরোপ্লেন তৈরির দিকে মন দিলেন।

একের পর এক বেশ কয়েকটি প্লেনের মডেল তৈরি করলেন। প্রথম কয়েকটিতে কৃতকার্য না হলেও পরের অনেকগুলোই আকাশে উড়ল। তার তৈরি এস-৬ মডেলের প্লেন শুধু আকাশে উড়ল তাই নয়- দুজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৭০ মাইল গতিতে দেশ-দেশান্তর উড়ে সেই সময়কার বিশ্বরেকর্ড স্থাপন করল। এতে উৎসাহিত হয়ে সিকোরস্কি এবার আরও বড় কিছু তৈরি করবেন স্থির করলেন।

সিকোরস্কির নতুন স্বপ্ন হল একটি বিশাল প্লেন তৈরি করা, যেটি চারদিক থেকে বন্ধ থাকবে। তাহলে আকাশে ওড়ার সময় হু হু করে বাতাস গায়ে এসে লাগবে না। চারটি ১০০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন এটিকে চালাবে। ভেতরে আরাম করে বসার জায়গা, খাবার জায়গা, বাথরুম ইত্যাদি থাকবে।

১৯১৩ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে সিকোরস্কি তার এই বিখ্যাত প্লেন দ্য গ্র্যান্ড নিয়ে আকাশে উড়লেন এবং নিজেকে আকাশযানের ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন। রাশিয়ার জার নিকোলাস ২ সিকোরস্কিকে সম্মানিত করলেন।

প্রথম মহাযুদ্ধ তখন আরম্ভ হয়েছে। শত্রুদের ওপর বোমা ফেলার জন্য রাশিয়া তখন বড় বিমানের খোঁজ করছিল। রাশিয়ার মিলিটারির কাছে সিকোরস্কি ৭৫টি এরকম বিশাল বিমান বানান অর্ডার পেলেন। রাশিয়া-বিদ্রোহের সময় সিকোরস্কি তার বহু টাকার সম্পত্তি ফেলে আমেরিকাতে পালিয়ে যান এবং আবার নতুন করে স্বল্প পুঁজি নিয়ে একটি প্লেন তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এই ব্যবসায়ে আবার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কিন্তু সিকোরস্কি কোনো দিনই ভোলেননি, তার প্রথম প্রয়াস- হেলিকপ্টার- কোনোদিনই আকাশে ওড়েনি। ইতিমধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি দেশে অনেকেই হেলিকপ্টার তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো কোনো মতে কাঁপতে কাঁপতে আকাশে কিছুক্ষণের জন্য উড়েছে। সিকোরস্কিও আবার শুরু করলেন হেলিকপ্টার নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা। তিনি দেখলেন যে, সবাই হেলিকপ্টারে দুটি রোটর ব্যবহার করছে।

তার ফলে ও দুটিকে একযোগে নিয়ন্ত্রণ করার অসুবিধা হচ্ছে। তিনি ঠিক করলেন, হেলিকপ্টারের শুধু একটা রোটর ব্যবহার করবেন কিন্তু ওঠার সময়ে বা চলার সময়ে যানটি যাতে হেলে বা ঘুরে না যায়, এজন্য পেছনের দিকে তিনটি ছোট রোটর ব্যবহার করবেন। পরে তিনটির বদলে পেছনে শুধু একটি রোটর ব্যবহৃত হয়েছিল। কাজটা যত সহজ ভেবেছিলেন, তত সহজ হল না। সা

ধারণ ব্যবহারের উপযোগী করতে কয়েক বছর লেগে গেল। অবশেষে ১৯৪২ সালে ইগর সিকোরস্কির তৈরি হেলিকপ্টার আমেরিকার কানেকটিকাট স্টেট থেকে কয়েকশ’ মাইল দূরে ওহায়ও স্টেটে উড়ে গিয়ে নির্বিঘ্নে অবতরণ করল। শুরু হল বিমান-জগতের আরেকটি অধ্যায়।

৮৩ বছর বয়সে আকাশযান ইতিহাসের কিংবদন্তি ইগর সিকোরস্কির মৃত্যু হয়।