জীবনকথা

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন ওস্তাদ রবিশঙ্কর

  সেলিম কামাল ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন ওস্তাদ রবিশঙ্কর

কিংবদন্তি সেতারবাদক ওস্তাদ রবিশঙ্কর। সঙ্গীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন অথচ তার নাম শোনেননি এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

১৯২০ সালে ভারতের বেনারসে একটি বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম ওস্তাদ রবিশঙ্করের। বাবা ছিলেন লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়া আইনজীবী।

জন্মের আগেই বাবা লন্ডনে চলে যাওয়ায় আট বছর বয়সে বাবার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় তার। শৈশব থেকেই ছোট্ট রবির নাচ-গানের প্রতি আলাদা ঝোঁক ছিল।

সেতারের সঙ্গে রবিশঙ্করের পরিচয় হয় ১৮ বছর বয়সে, কলকাতার এক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কনসার্টে। তরুণ রবি সেদিন মুগ্ধ হন অমিয়া কান্তি ভট্টাচার্যের সেতার বাজানো শুনে। তখনই তিনি ঠিক করেন, যে করেই হোক অমিয়া কান্তির গুরুর কাছেই সেতার শিখতে হবে।

অমিয়া কান্তির গুরু ওস্তাদ এনায়েত খানের কাছে সেতারের হাতেখড়ি হয় রবিশঙ্করের। সেই যে শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রটি নিজের করে নিলেন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই সেতারকে আর হাতছাড়া করেননি।

১৯৪৪ সালে ওস্তাদের কাছ থেকে সেতার শেখার পর মুম্বাইতে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটারে কাজ শুরু করেন। সেখানে তার কাজ ছিল নাচের জন্য বিশেষ সঙ্গীত রচনা করা। ২ বছর সেখানে কাজ করার পর তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও স্টেশনে সঙ্গীত পরিচালকের পদে যোগ দেন।

এই রেডিও স্টেশনে কাজ করার সময় রবিশঙ্কর অর্কেস্ট্রার জন্য সঙ্গীত রচনা করতে শুরু করেন। ১৯৫৪ থেকে রবিশঙ্কর বিশ্বব্যাপী কনসার্ট করতে থাকেন, যার মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও ছিল।

কিছু সিনেমার আবহ সঙ্গীত তৈরি করেন, যার মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজিও (পথের পাঁচালি, অপরাজিত, অপুর সংসার) ছিল। ট্রিলজির এই সিনেমা তিনটির মধ্যে পথের পাঁচালি ১৯৫৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি’অর পায়। একই সময়ে রবি ‘ইহুদি মেনোউইন’ নামক এক আমেরিকান বেহালা বাদকের সঙ্গে সঙ্গীত রচনা করা এবং বিভিন্ন কনসার্টে বাজানো শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে এই দুজনের গ্র্যামি জয়ী অ্যালবাম ওয়েস্ট মিটস ইস্টসহ (১৯৬৭) ওয়েস্ট মিটস ইস্ট : ভলিউম টু (১৯৬৮) এবং ইম্প্রোভাইজেশন ওয়েস্ট মিটস ইস্ট (১৯৭৬) নামে আরও দুটি অ্যালবাম বের হয়। অ্যালবামগুলো পশ্চিমের সঙ্গীত জগতে রবিশঙ্করের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।

ষাটের দশকে পশ্চিমে ভারতীয় সঙ্গীতের বাহক হিসেবেই রবিশঙ্কর নিজেকে তৈরি করে নেন। ১৯৬৬-এর দিকে বিখ্যাত ব্যান্ড ‘দ্য বিটলস’-এর সদস্য জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে পরিচয় হয় রবিশঙ্করের। দুজনেই খুব তাড়াতাড়ি বন্ধু বনে যান। জর্জ হ্যারিসনের ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল, যে কারণে জর্জ রবিশঙ্করের কাছ থেকে সেতারের তালিম নেয়া শুরু করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদেশের মানুষের কষ্ট, নিপীড়ন ওস্তাদ রবিশঙ্করের মনে দাগ কাটে। তিনি তখনই বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের কাছে এসব মানুষের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তারপর দুজন মিলে ঠিক করেন এসব মানুষের জন্য কিছু করা উচিত। এ ধারণা থেকেই পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং জর্জ হ্যারিসন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করেন।

ইতিহাসে প্রথম কোনো যুদ্ধরত দেশের জন্য বড় পরিসরে দাতব্য কনসার্ট ছিল এটি। বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আগস্টের ১ তারিখে এই কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। জর্জ হ্যারিসন তার বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটি গেয়েছেন এখানেই।

এই কনসার্টটির অডিও রেকর্ড করে পরে অ্যালবাম আকারে ছাড়া হয়। অ্যালবামটি ১৯৭৩ সালে গ্র্যামি আওয়ার্ড জিতে নেয়। এই কনসার্টটি তৎকালীন বাংলাদেশের জন্য বিরাট এক গুরুত্ব বহন করে।

রবিশঙ্কর জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে তিনবার গ্র্যামি, ১৪টি সম্মানসূচক ডিগ্রিসহ অনেক কিছুই রয়েছে। নিজের শেষ অ্যালবাম বের করেছেন কন্যা আনুশকা শঙ্করের সঙ্গে- যাকে তিনি নিজেই সেতারের তালিম দিয়েছেন। সেতারের রাজকুমার রবিশঙ্কর ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×