জীবনকথা

জাপানের দীর্ঘতম সময়ের শাসক হিরোহিতো

  সেলিম কামাল ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাপানের দীর্ঘতম সময়ের শাসক হিরোহিতো

জাপানের ইতিহাসের দীর্ঘতম রাজকীয় শাসনামল যিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন, তিনি হচ্ছেন সম্রাট হিরোহিতো। প্রায় ৬৩ বছর তিনি সম্রাটের আসনে ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিরোহিতো নিয়ে আজকের আলোচনা।

মিচিনোমিয়া হিরোহিতোর জন্ম ১৯০১ সালের ২৯ এপ্রিল টোকিওর আওয়ামা রাজপ্রাসাদে। সম্রাট মেইজি তখন জাপানের সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন, যিনি ছিলেন হিরোহিতোর দাদা। হিরোহিতোর বাবা ছিলেন তখনকার যুবরাজ ইওশিহিতো, যিনি ১৯১২ সালে সম্রাট মেইজি মারা যাওয়ার পর সম্রাট তাইশো হিসেবে রাজসিংহাসন গ্রহণ করেন।

১৯১৬ সালে হিরোহিতোকে জাপান সাম্রাজ্যের যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরই মধ্যে তিনি জাপানের সামরিক বাহিনী ও নৌবাহিনীতে সহকারী লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং গ্র্যান্ড কর্ডন অফ দ্য অর্ডার অফ ক্রাইস্যান্থেমাম হিসেবে সম্মানিত হন।

১৯১৪ সালের দিকে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সামরিক বাহিনীতে লেফটেন্যান্ট ও নৌবাহিনীতে উপ-লেফটেন্যান্ট পদ পান এবং এরপর ১৯১৬ সালে তিনি সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন ও নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন।

১৯২১ সালে, হিরোহিতো এবং ৩৪ জন সৈনিক ছয় মাস পশ্চিম ইউরোপে ভ্রমণ করেন; যেটি ছিল প্রথমবারের মতো জাপানি যুবরাজের বিদেশ ভ্রমণ।

জাপানে ফিরে আসার পর তিনি দেখতে পেলেন, তার বাবা, সম্রাট তাইশো মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই হিরোহিতো জাপানের রাজতন্ত্রে রিজেন্ট পদ গ্রহণ করে সম্রাটের দায়িত্বগুলো পালন করা শুরু করলেন।

১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বরে টোকিওতে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়, যেটি দ্য গ্রেট কান্তো আর্থকোয়েক নামে পরিচিত। এর ফলে প্রায় ১ লাখ মানুষ মারা যায় এবং ৬৩ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। তখন বিভিন্ন জায়গায় লুটতরাজ ও আগুন লাগানোর ঘটনায় জাপানি লোকজনের মধ্যে ক্রোধ তৈরি হয়। তারা কোরীয় ও বামপন্থীদের দায়ী করে হাজার হাজার কোরীয় ও বামপন্থীদের মেরে ফেলে।

এর রেষ ধরে ডিসেম্বরে হিরোহিতোর ওপর গুপ্তহত্যার চেষ্টা করা হয়, যেটি তোরানোমন ঘটনা হিসেবে পরিচিত। দাইসুকে নানবা নামক একজন জাপানি কমিউনিস্ট এই ব্যর্থ আক্রমণটি করেন।

এই হত্যাচেষ্টার অল্প দিনের মাথায় ১৯২৪ সালে যুবরাজ ও রিজেন্ট হিরোহিতো বিয়ে করেন রাজকুমারী নাগাকো কুনিকে।

সম্রাট তাইশোর মৃত্যুর পর ১৯২৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর হিরোহিতো জাপানের ১২৪তম সম্রাট হন। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন জাপান পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দেশগুলোর একটি ছিল। অর্থনীতির দিক থেকে ৯ম, নৌবাহিনীর শক্তির দিক থেকে ৩য়।

পাশাপাশি তখনকার লিগ অব ন্যাশনসের কাউন্সিলের চিরস্থায়ী চারটি রাষ্ট্রের মধ্যে জাপান একটি ছিল। সে সময় কেবল পুরুষ ভোটাধিকার আইন পাস হয়েছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো বেশ ক্ষমতাধর ছিল। কিন্তু দুর্বল অর্থনীতি, সামরিকতন্ত্রের উত্থান এবং পরপর বেশ কয়েকটি গুপ্তহত্যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জাতির উচ্চপর্যায়ের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ছিলেন হিরোহিতো।

১৯৩৫ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামুরাই তলোয়ার দিয়ে একজন জেনারেলকে মেরে ফেলেন। ১৯৩৬ সালে টোকিওতে ১ হাজর ৪০০-এরও বেশি সৈন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, সেনাবাহিনী মন্ত্রণালয়কে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেছিল এবং বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ রাজনীতিবিদকে হত্যা করেছিল।

এ ঘটনার পরপরই সম্রাট সশস্ত্র সেনা অভ্যুত্থানটিকে অতিদ্রুত দমন করার আদেশ দিলেন এবং এর সঙ্গে জড়িত অফিসারদের বিদ্রোহী আখ্যা দিলেন। এ ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দায়ে ১৯ সেনা সদস্যের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন হিরোহিতো।

নিজের প্রণীত সংবিধান অনুসারে একজন স্বর্গীয় ও অতিশক্তিশালী ব্যক্তি থেকে খুব কম ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতীকী ব্যক্তিতে পরিণত হন সম্রাট হিরোহিতো। ১৯৭১ সালে তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করেন, যা জাপানের সম্রাটদের ইতিহাসে প্রথম।

হিরোহিতো ৭ সন্তানের জনক ছিলেন। তার ছেলে আকিহিতো পরবর্তীতে সম্রাট হিসেবে আবির্ভূত হন। হিরোহিতো ১৯৮৯ সালের ৭ জানুয়ারি জাপানের রাজপ্রাসাদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×