অসাধারণ কবি ও শিল্পী উইলিয়াম ব্লেক
jugantor
জীবনকথা
অসাধারণ কবি ও শিল্পী উইলিয়াম ব্লেক

  সেলিম কামাল  

০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিক যুগের অন্যতম সেরা একজন কবি উইলিয়াম ব্লেক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কবি, চিত্রকর ও খোদাইশিল্পী।

জীবদ্দশায় অখ্যাত থাকা এ কবি বর্তমানে ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের একজন। তার চিত্রকলাগুলোও রোমান্টিক যুগের সেরা চিত্রকলার প্রতিনিধিত্ব করে। কিছু মানুষের সৃষ্টি তার সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকে, ফলে সমসাময়িকরা বুঝে উঠতে পারেন না তার মর্ম। উইলিয়াম ব্লেকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তা-ই ছিল।

লন্ডনের সোহোতে গোল্ডেন স্কয়ারের ২৮ নম্বর ব্রড স্ট্রিটে (বর্তমান ব্রডউইক স্ট্রিট) ১৭৫৭ সালের ২৮ নভেম্বর উইলিয়াম ব্লেক জন্ম নেন। তার বাবা জেমস ব্লেক ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী। আর তার মা ক্যাথেরিন রাইট আর্মিটেজ ব্লেক তাদের সাত ভাইবোনের দেখাশোনা করতেন।

ব্লেক দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে দুজন শৈশবেই মারা যায়। উইলিয়াম ব্লেক শুধু লেখা আর পড়াটা শিখতে যতদিন লাগে, ততদিনই স্কুলে গিয়েছিলেন। দশ বছর বয়সে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন। বাকি শিক্ষালাভ করেছেন বাড়িতে মায়ের পায়ের কাছে বসেই।

সুযোগ পেলেই তিনি লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। গভীর আগ্রহে চারপাশ অবলোকন করতেন। বাবার কিনে দেয়া বইগুলো থেকে প্রাচীন গ্রিক চিত্রকর্মগুলো খোদাই করার চেষ্টা করতেন। এসব চিত্রকর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়েই রাফায়েল, মাইকেলেঞ্জেলো, হিমস্কার্ক, ডিউরার প্রমুখের কাজে তিনি প্রভাবিত হন।

এ সময় কবিতার প্রতিও ধীরে ধীরে তার আকর্ষণ জেগে ওঠে। চিত্রকর্মের প্রতি ব্লেকের অনুরাগের কারণে বাবা-মা তাকে দশ বছর বয়সে একটি ড্রয়িং একাডেমিতে এবং পরবর্তী সময়ে তরুণ শিল্পীদের একটি প্রিপারেটরি স্কুলে ভর্তি করে দেন।

ব্লেকের শৈশব শান্ত ও সুখদায়ক ছিল, কিন্তু আট বছর বয়স থেকে তিনি বিভিন্ন কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে শুরু করেন। যেমন, গাছের ডালে দেবদূত দেখা বা ডানা গজানো তারকা।

এসবই আসলে তার অতি কল্পনাপ্রবণ মনের চাঞ্চল্য ছিল। এ দৃশ্যপট কল্পনাক্ষম মন তার কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে তাকে দিয়েছিল আলাদা সুবিধা। ব্লেকের কবিতাগুলো পড়তে গেলে পাঠকের মনে হবে, তারা কোনো খোদাই করা দৃশ্য দেখছেন। কাব্যে চিত্রাঙ্কনের এ অসাধারণ ক্ষমতা ব্লেককে তার সমসাময়িকদের মধ্যে করেছে অনন্য।

১৭৮২ সালে ব্লেক স্থানীয় এক মুদি দোকানির মেয়ে ক্যাথেরিন বাউচারের সঙ্গে পরিচিত হন। এ পরিচয় পরবর্তী সময়ে প্রণয় ও পরিণয়ে গড়ায়। ১৭৮৩ সালে ব্লেক তার প্রথম কবিতার সংকলন ‘পোয়েটিক্যাল স্কেচেস’ প্রকাশ করেন। কাব্যে খুব একটা কাটতি না হলেও খোদাইকারী হিসেবে ব্লেকের খ্যাতির কারণে তাদের সংসার চলে যাচ্ছিল।

১৭৯৫ সালে ব্লেক ‘লার্জ কালার প্রিন্টস’ নামে একটি সিরিজ শুরু করেন। বাইবেল, মিল্টন ও শেকসপিয়ার থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি এ সিরিজ চালিয়ে যান। ব্লেক সে বছরই টমাস বাটস নামে একজন পৃষ্ঠপোষক পেয়ে যান।

অর্থাৎ বাটসের অর্থায়নে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্লেক বেশ কয়েক বছর ধরে তার জন্য ছবি আঁকেন। এখানে ব্লেক আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি শিল্পে অবারিত স্বাধীনতাও ভোগ করেন। তিনি তার কল্পনায় রং লাগিয়ে তুলিতে যা-ই ফুটিয়ে তুলতেন, বাটস তা-ই কিনতেন। ব্লেকের ভাষ্যমতে, তিনি যে কোনো সময়ের চেয়ে এখানে কাজ করার সময় আরও অনেক ভালো কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে পেতেন।

ব্লেকের অলীক দর্শন বা হ্যালুসিনেশন তাকে সাধারণের কাছে পাগল পরিগণিত করতে থাকে। পরিণত সময়েও তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, তার কাজগুলো দেবদূতদের দ্বারা প্রভাবিত। অনেক সময় কুমারী মেরির মতো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় বলেও তিনি দাবি করতেন।

১৮২৭ সালে ব্লেক জন লিনেল নামে এক তরুণ শিল্পীর পৃষ্ঠপোষকতায় দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ সিরিজের খোদাইয়ের কাজ করছিলেন। এ কাজ অসমাপ্ত রেখেই সে বছর ১২ আগস্ট ব্লেক পরলোকগমন করেন।

মৃত্যুবরণের দিনও নিরন্তর কাজ করে গেছেন। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে ভোলেননি ব্লেক। স্ত্রীর ছবিটি এঁকে তিনি তার যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখেন। তারপরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জীবনকথা

অসাধারণ কবি ও শিল্পী উইলিয়াম ব্লেক

 সেলিম কামাল 
০৯ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিক যুগের অন্যতম সেরা একজন কবি উইলিয়াম ব্লেক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কবি, চিত্রকর ও খোদাইশিল্পী।

জীবদ্দশায় অখ্যাত থাকা এ কবি বর্তমানে ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের একজন। তার চিত্রকলাগুলোও রোমান্টিক যুগের সেরা চিত্রকলার প্রতিনিধিত্ব করে। কিছু মানুষের সৃষ্টি তার সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকে, ফলে সমসাময়িকরা বুঝে উঠতে পারেন না তার মর্ম। উইলিয়াম ব্লেকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তা-ই ছিল।

লন্ডনের সোহোতে গোল্ডেন স্কয়ারের ২৮ নম্বর ব্রড স্ট্রিটে (বর্তমান ব্রডউইক স্ট্রিট) ১৭৫৭ সালের ২৮ নভেম্বর উইলিয়াম ব্লেক জন্ম নেন। তার বাবা জেমস ব্লেক ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী। আর তার মা ক্যাথেরিন রাইট আর্মিটেজ ব্লেক তাদের সাত ভাইবোনের দেখাশোনা করতেন।

ব্লেক দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে দুজন শৈশবেই মারা যায়। উইলিয়াম ব্লেক শুধু লেখা আর পড়াটা শিখতে যতদিন লাগে, ততদিনই স্কুলে গিয়েছিলেন। দশ বছর বয়সে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন। বাকি শিক্ষালাভ করেছেন বাড়িতে মায়ের পায়ের কাছে বসেই।

সুযোগ পেলেই তিনি লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। গভীর আগ্রহে চারপাশ অবলোকন করতেন। বাবার কিনে দেয়া বইগুলো থেকে প্রাচীন গ্রিক চিত্রকর্মগুলো খোদাই করার চেষ্টা করতেন। এসব চিত্রকর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়েই রাফায়েল, মাইকেলেঞ্জেলো, হিমস্কার্ক, ডিউরার প্রমুখের কাজে তিনি প্রভাবিত হন।

এ সময় কবিতার প্রতিও ধীরে ধীরে তার আকর্ষণ জেগে ওঠে। চিত্রকর্মের প্রতি ব্লেকের অনুরাগের কারণে বাবা-মা তাকে দশ বছর বয়সে একটি ড্রয়িং একাডেমিতে এবং পরবর্তী সময়ে তরুণ শিল্পীদের একটি প্রিপারেটরি স্কুলে ভর্তি করে দেন।

ব্লেকের শৈশব শান্ত ও সুখদায়ক ছিল, কিন্তু আট বছর বয়স থেকে তিনি বিভিন্ন কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে শুরু করেন। যেমন, গাছের ডালে দেবদূত দেখা বা ডানা গজানো তারকা।

এসবই আসলে তার অতি কল্পনাপ্রবণ মনের চাঞ্চল্য ছিল। এ দৃশ্যপট কল্পনাক্ষম মন তার কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে তাকে দিয়েছিল আলাদা সুবিধা। ব্লেকের কবিতাগুলো পড়তে গেলে পাঠকের মনে হবে, তারা কোনো খোদাই করা দৃশ্য দেখছেন। কাব্যে চিত্রাঙ্কনের এ অসাধারণ ক্ষমতা ব্লেককে তার সমসাময়িকদের মধ্যে করেছে অনন্য।

১৭৮২ সালে ব্লেক স্থানীয় এক মুদি দোকানির মেয়ে ক্যাথেরিন বাউচারের সঙ্গে পরিচিত হন। এ পরিচয় পরবর্তী সময়ে প্রণয় ও পরিণয়ে গড়ায়। ১৭৮৩ সালে ব্লেক তার প্রথম কবিতার সংকলন ‘পোয়েটিক্যাল স্কেচেস’ প্রকাশ করেন। কাব্যে খুব একটা কাটতি না হলেও খোদাইকারী হিসেবে ব্লেকের খ্যাতির কারণে তাদের সংসার চলে যাচ্ছিল।

১৭৯৫ সালে ব্লেক ‘লার্জ কালার প্রিন্টস’ নামে একটি সিরিজ শুরু করেন। বাইবেল, মিল্টন ও শেকসপিয়ার থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি এ সিরিজ চালিয়ে যান। ব্লেক সে বছরই টমাস বাটস নামে একজন পৃষ্ঠপোষক পেয়ে যান।

অর্থাৎ বাটসের অর্থায়নে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্লেক বেশ কয়েক বছর ধরে তার জন্য ছবি আঁকেন। এখানে ব্লেক আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি শিল্পে অবারিত স্বাধীনতাও ভোগ করেন। তিনি তার কল্পনায় রং লাগিয়ে তুলিতে যা-ই ফুটিয়ে তুলতেন, বাটস তা-ই কিনতেন। ব্লেকের ভাষ্যমতে, তিনি যে কোনো সময়ের চেয়ে এখানে কাজ করার সময় আরও অনেক ভালো কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে পেতেন।

ব্লেকের অলীক দর্শন বা হ্যালুসিনেশন তাকে সাধারণের কাছে পাগল পরিগণিত করতে থাকে। পরিণত সময়েও তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, তার কাজগুলো দেবদূতদের দ্বারা প্রভাবিত। অনেক সময় কুমারী মেরির মতো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় বলেও তিনি দাবি করতেন।

১৮২৭ সালে ব্লেক জন লিনেল নামে এক তরুণ শিল্পীর পৃষ্ঠপোষকতায় দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ সিরিজের খোদাইয়ের কাজ করছিলেন। এ কাজ অসমাপ্ত রেখেই সে বছর ১২ আগস্ট ব্লেক পরলোকগমন করেন।

মৃত্যুবরণের দিনও নিরন্তর কাজ করে গেছেন। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে ভোলেননি ব্লেক। স্ত্রীর ছবিটি এঁকে তিনি তার যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখেন। তারপরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন