জীবনকথা

কিংবদন্তি এক গানের পাখি লতা

জন্মের পর তার পারিবারিক নাম ছিল হেমা হার্দিকার। পরে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছলেন লতা মুঙ্গেশকর হয়ে। বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করা এ প্রতিভাময়ী সঙ্গীতশিল্পী কয়েক দশকজুড়ে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করেছেন সঙ্গীত জগতে।

  সেলিম কামাল ০৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লতা মুঙ্গেশকর

জন্ম ও শৈশবে লতা

১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মারাঠি দ্বীননাথ মুঙ্গেশকর আর সেবন্তী মুঙ্গেশকরের ঘরে এলো তাদের প্রথম সন্তান, নাম রাখলেন হেমা। পুরো নাম ছিল হেমা হার্দিকার মুঙ্গেশকর। দ্বীননাথের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন সেবন্তী। পণ্ডিত দ্বীননাথ নিজেও সঙ্গীত আচার্য ছিলেন। সঙ্গীত ও নাটক দু’ক্ষেত্রেই ছিল তার সাবলীল বিচরণ। মঞ্চনাটক লিখতেন, সঙ্গে অভিনয়ও করতেন। নাটকের প্রয়োজনে গানও গাইতেন। ‘ভাউবন্ধন’ নামের এক নাটক পরিচালনার পর নাটকের প্রধান চরিত্র লতিকাকে খুব মনে ধরেছিল দ্বীননাথ-সেবন্তী দম্পতির। তাই সন্তানের নাম হেমা থেকে বদলে রাখা হল লতা। নাম বদলের ইতিহাস তাদের পরিবারে অবশ্য নতুন নয়। বর্তমান মধ্যপ্রদেশের অধিবাসী লতা মুঙ্গেশকরের পরিবারের পদবি ছিল হার্দিকার। দ্বীননাথ এটিকে বদলে মুঙ্গেশকর করেন, যাতে নিজেদের এলাকা গোয়ার মুঙ্গেশি শহরের মানুষ বলে তাদের চিহ্নিত করা যায়।

সঙ্গীত পরিবার

লতা মুঙ্গেশকরের পুরো পরিবারই বলতে গেলে সঙ্গীতের রথী-মহারথী ছিলেন। লতার পর একে একে সেবন্তীর কোলে আসেন আশা ভোঁসলে, উষা মুঙ্গেশকর, মীনা মুঙ্গেশকর ও সর্বকনিষ্ঠ হৃদয়নাথ মুঙ্গেশকর। ভাইবোন বলতে পাগল ছিলেন লতা। কথিত আছে প্রতিদিন ছোট বোন আশা ভোঁসলেকে নিজের সঙ্গে স্কুলে নিয়ে যেতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ নিষেধ করলে রাগ করে সেই স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দেন তিনি। এ নিয়ে আবার ভিন্ন একটি মতও আছে। স্কুলের প্রথম দিনেই নাকি শিশু লতা অন্য শিশুদের গান শেখাচ্ছিলেন, শিক্ষক নিষেধ করতেই ছেড়ে চলে আসেন স্কুল।

তালিম শুরু

গল্প প্রচলিত আছে, লতাকে ছোটবেলায় গান শেখানো হলেও কোনো অগ্রগতি ছিল না তার শেখায়। ওদিকে দ্বীননাথ নিজের বাড়িতেই অনেক ছাত্রকে গান শেখাতেন। একদিনের ঘটনা- অল্প কিছু সময়ের জন্য বাইরে গেছেন দ্বীননাথ। এক ছাত্রকে বলে গেছেন গানের অনুশীলন করতে। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন ছোট্ট লতা তার ছাত্রের গানের রাগ শুধরে দিচ্ছেন। তারপর থেকেই বাবার কাছে লতার তালিমের শুরু।

শৈশবেই চমক

পাঁচ বছর বয়স থেকে বাবার লেখা মারাঠি গীতি নাটকে ছোট ছোট চরিত্রে অংশগ্রহণ করতেন লতা। একদিন দ্বীননাথের নাটকে নারদ মুনির চরিত্রের অভিনেতা কোনো কারণে এসে পৌঁছাননি। তার আবার গানও গাওয়ার কথা। লতা বাবাকে এসে বললেন, তিনি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করতে চান। প্রথমেই দ্বীননাথ তার প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন। ওই অতটুকু নারদ মুনিকে দেখতে যদি জোকার লাগে? লতার পীড়াপীড়িতে শেষটায় রাজি হলেন। লতার অভিনয় আর গান শেষে দর্শকরা ‘আবার চাই, আবার চাই’ বলে চিৎকার করেছিলেন সেদিন।

বাবার মৃত্যুর পর

পিতার ছায়া খুব বেশিদিন থাকেনি মুঙ্গেশকর পরিবারের ওপর। লতার বয়স যখন ১৩ বছর, তখন (১৯৪২ সাল) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দ্বীননাথ মুঙ্গেশকর মারা যান। ফলে সম্পূর্ণ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী লতার ওপর। পরিবারের বন্ধু ‘নবযুগ চিত্রপট চলচ্চিত্র কোম্পানি’র মালিক মাস্টার বিনায়ক তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মুঙ্গেশকর পরিবারের। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন লতা। কিন্তু বিনায়ক তাকে গান আর অভিনয়কে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে শেখালেন। মারাঠি চলচ্চিত্রে গাওয়া তার গান ‘খেলু সারি মানি হাউস ভারি’ চলচ্চিত্রের ফাইনাল কাট থেকে বাদ পড়ে গেল। তবু দমে যাননি লতা মুঙ্গেশকর।

প্রথম হিন্দি গান

মাস্টার বিনায়ক তার চলচ্চিত্র ‘পাহিলি মঙ্গলা-গৌর’-এ লতা মুঙ্গেশকরের জন্য ছোট একটি চরিত্র বরাদ্দ করেন। এ চলচ্চিত্রে দাদা চান্দেকারের রচনা করা গান ‘নাটালি চৈত্রাচি নাভালাল’-এ কণ্ঠ দেন তিনি। তখনও চলছে তার জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ। চলচ্চিত্রের জীবনকে কখনও আপন করে নিতে পারেননি তিনি। একদিন কাজ শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলেন। মায়ের প্রশ্নের উত্তরে জানান, এ কৃত্রিম অভিনয়ের জগৎ তার আর ভালো লাগে না। কিন্তু কিছু করার নেই, পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। বসন্ত যুগলকরের ‘আপ কি সেবা ম্যায়’ চলচ্চিত্রে ‘পা লাগো কার জোরি’ গানটি তার প্রথম হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রে গাওয়া গান।

গুরু গুলাম হায়দার

সঙ্গীত পরিচালক গুলাম হায়দার হলেন লতার গুরু। লতা তার ৮৪তম জন্মদিনে বলেছিলেন, গুলাম হায়দার তার জীবনে ‘গডফাদার’ ছিলেন। গুলাম হায়দারের হাত ধরে তার জীবনে সুযোগ এলো ‘মজবুর’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রে ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝে কাহি কা না ছোড়া’ গানটি গাওয়ার। এই এক গানেই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি নতুন এ গায়িকাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। জীবনের প্রথম বড় ধরনের সাফল্য আসে ‘মহল’ (১৯৪৯) চলচ্চিত্রের ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটির মাধ্যমে। এ গানে ঠোঁট মেলালেন মধুবালা।

পেছনে তাকানোর সময় নেই

সেই তো সবে শুরু। তারপর শত শত গানে লতা আপ্লুত করেছেন লাখো মানুষকে। ভালোবাসার সঙ্গে এসেছে অসংখ্য পুরস্কার ও উপাধি। পঞ্চাশের দশকেই গান করে ফেললেন নামিদামি সব সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে। ষাটের দশকে উপহার দিলেন ‘পিয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া’ বা ‘আজিব দাসতা হ্যায় ইয়ে’র মতো এখনও পর্যন্ত তুমুলভাবে বিখ্যাত সব গান। আর পেছনে তাকানোর সময় নেই। লতাই তো ইন্ডাস্ট্রির ব্যস্ততম কণ্ঠশিল্পী।

গিনেস বুকে নাম

তার এত সৃষ্টির ফলে অনায়াসে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যার গান রেকর্ডকারী হিসেবে তার নাম আসে। পরে অবশ্য তার এ রেকর্ড ভেঙেছিলেন নিজেরই ছোট বোন আশা ভোঁসলে। মোট ৩৬টি ভাষায় রচিত লতার এ গানগুলোর অনেক ভাষা তিনি আসলে জানতেনই না। তার মধ্যে বাংলা গানও আছে।

পুরস্কার

তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ রয়েছে তিনটি জাতীয় পুরস্কার, বারোটি বাঙালি ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার এবং চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। শেষে অবশ্য তিনি আর ফিল্ম ফেয়ার নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, নতুনদের জায়গা করে দেয়া দরকার। শুধু পুরস্কার নয়, ১৯৬৯ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৮৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে পদ্মবিভূষণ আর ২০০১ সালে দ্বিতীয় ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে লতা অর্জন করেন ভারতরত্ন খেতাব।

লতা মুঙ্গেশকরের দশটি জনপ্রিয় বাংলা গান

* আমারও তো সাধ ছিল

* আমি যে কে তোমার

* বোঝো না কেন যে তুমি

* বুঝবে না কেউ বুঝবে না

* আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন

* চঞ্চল ময়ূরী এ রাতে

* চঞ্চল মন আনমনা হয়

* ধরণির পথে পথে

* হায়রে পোড়া বাঁশি

* বাঁশি কেন গায় আমারে কাঁদায়

 
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

gpstar

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter