বিদ্রোহী কবির গ্রাম চুরুলিয়ায় একদিন

অজয় নদী দিয়ে ঘেরা নিভৃত প্রত্যন্ত গ্রাম চুরুলিয়া শান্তির পরশ বুলিয়ে দেবে। তবে ‘কবিতীর্থ’ এখন অবহেলায় পড়ে আছে। কয়েক বছর সরকার একটু নজর দিলেও তা অপ্রতুল! কবিতীর্থ বা নজরুলের বাড়ি এখন ‘নজরুল একাডেমি’। কবির জীবনের বাঁক নেয়া বিভিন্ন ঘটনার ইতিহাস সংবলিত বই, ম্যাগাজিন ও পেপার কাটিং এখানের লাইব্রেরিতে রয়েছে। কবির জন্মদিন উপলক্ষে কবিতীর্থে সাত দিনব্যাপী মেলার আয়োজন হয়। নজরুলের ছেলে সব্যসাচী কবির মৃত্যুর পর কবরের মাটি (বাংলাদেশে কবির কবর থেকে) নিয়ে কবির প্রতীকী কবরস্থান ও পাশে কবিপত্নী প্রমীলা দেবীর কবর দারুণ অনুভূতি দেবে দর্শককে!

  আবু আফজাল মোহাম্মদ সালেহ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্রোহী কবি

বাংলা সাহিত্যের প্রধান দুই দিকপাল হচ্ছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের তীর্থস্থান বীরভূমের শান্তিনিকেতন আর পাশের জেলা বর্ধমানের আসানসোলের চুরুলিয়ায় নজরুলের জন্মভিটা ‘কবিতীর্থ’ নামে পরিচিত।

অনেকেই শান্তিনিকেতন বা কলকাতার জোড়াসাঁকোয় যান। কিন্তু একটু দুর্গম ও কলকাতা থেকে দূরের চুরুলিয়ায় যাওয়া লোকের সংখ্যা সে তুলনায় অনেক কম! বর্ধমান পার হয়ে রানীগঞ্জের ভেতর দিয়ে আসানসোল হয়ে চুরুলিয়ায় যাওয়া কম রোমাঞ্চকর নয়। সারি সারি কয়লা-পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ট্রেন ভ্রমণ কম মজার নয়! উঁচু উঁচু কয়লার পাহাড় বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় বলে শোনা যায় না। আবার বাসেও কলকাতা থেকে বর্ধমান হয়ে বাসযোগে আসানসোল যাওয়া যায়। আসানসোল রেলস্টেশন অত্যন্ত মনোরম ও ব্যস্ত স্টেশন।

ট্রেনে বর্ধমান পার হলে ক্রমেই ধূসর হবে শান্তিনিকেতনের পথ। লালমাটি পেরিয়ে বোলপুরের শান্তিনিকেতন। আর রানীগঞ্জের আগেই কালোপাহাড়ের পথ মাড়িয়ে আসানসোল। হাওড়া থেকে ট্রেনে বর্ধমান। তারপর কবিগুরু ট্রেনে শান্তিনিকেতন। শান্তিনিকেতন দেখে পরের দিন বর্ধমানে এলাম। উদ্দেশ্য ট্রেনে আসানসোল যাওয়া। শান্তিনিকেতন থেকে পানাগড়-রানীগঞ্জ হয়ে আসানসোলও যাওয়া যায়। কিন্তু সময়সাপেক্ষ। আর ট্রেনজার্নি আরামদায়ক। তাই বেছে নিলাম ট্রেনের পথ।

অনেক ট্রেন যায় বর্ধমান থেকে আসানসোলের পথে। ১০৩ কিমি’র ট্রেনভ্রমণ ভালোই লাগবে! সকালের দিকে ট্রেন ছুটে চলল আসানসোলের উদ্দেশ্যে। কিছুদূর যেতেই কালো কালো উঁচু-নিচু পাহাড়। এ কালো পাহাড়ের ভেতর দিয়ে আমাদের ট্রেন ছুটে চলল। কালো পথ। কালো খোয়া দিয়ে তৈরি ট্রেনের দু’ধার। কয়লার উঁচু পাহাড়! পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম কয়লা খনি আর কয়লা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ছুটে চলছি আমরা। শ্রমিকদের কাজ আর ব্যস্তশহর অন্ডাল, রানীগঞ্জ পেরিয়ে সোয়া দু’ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম আভিজাত্যের আসানসোলে। কয়লা খনির জন্য ব্রিটিশরা আসানসোলে রেলের বড় অফিস খুলেছিল।

দিল্লি-মুম্বাই-জয়পুর বা হিমালয়ের পাদদেশের শহরমুখে ট্রেনগুলো আসানসোল হয়েই যায় এবং প্রতিটি ট্রেনের স্টপেজ আছে এখানে। মধ্য বা উত্তরের প্রদেশ থেকে আসতে আন্তঃপ্রদেশের ট্রেনের প্রথম স্টপেজ এটি। পরে অবশ্য বেশ কয়েকবার গেছি আজমির-আগ্রা-বিহার-দিল্লি আসানসোল হয়েই। আর ওড়িশা-কেরালার প্রবেশপথ হচ্ছে খড়গপুর। দুটি স্টেশনই নান্দনিক। ভারতের সবচেয়ে লম্বা প্লাটফরম খড়গপুর।

আসানসোল হয়ে চুরুলিয়ায় যেতে আরও রোমাঞ্চ লাগবে! আসল মজা এ পথেই! আসানসোল থেকে চুরুলিয়া যাওয়ার পথে বাসগুলো অজয় ঘাট পর্যন্ত যায়। চুরুলিয়া গ্রামে ঢুকতেই কবির ম্যুরাল দেখা যাবে। অজয় ঘাটের একটু আগেই চুরুলিয়ার ছোট্ট একটি বাজার। চৌরাস্তার ডানদিকের সরু ও ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। রোমাঞ্চিত হয়ে হাঁটছি দু’পাশেই মাটির ঘর। বেশিরভাগই শন বা বিচালির চাল বা ছাদ। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তায় খেলা করে। যানবাহনের কোনো ব্যস্ততা নেই। ‘কবিতীর্থে’ পৌঁছে যাচ্ছি অজান্তেই। এসব গ্রামীণ আর প্রাচীন জিনিসের সাক্ষী হতে হতে ১৫ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম কবিতীর্থে। প্রশ্ন জাগবে আর উত্তর পাবেন একইসঙ্গে! কবি কোথায় থাকতেন, কোথায় পড়তেন এবং স্কুলের আঙিনা কোথায়! মসজিদের সামনেই পুকুর যেন কালের সাক্ষী! এখানেই কবি সাঁতার শিখেছেন, গোসল করেছেন।

অজয় নদী দিয়ে ঘেরা নিভৃত প্রত্যন্ত গ্রাম চুরুলিয়া শান্তির পরশ বুলিয়ে দেবে। তবে ‘কবিতীর্থ’ এখন অবহেলায় পড়ে আছে। কয়েক বছর সরকার একটু নজর দিলেও তা অপ্রতুল! কবিতীর্থ বা নজরুলের বাড়ি এখন ‘নজরুল একাডেমি’। কবির জীবনের বাঁক নেয়া বিভিন্ন ঘটনার ইতিহাস সংবলিত বই, ম্যাগাজিন ও পেপার কাটিং এখানের লাইব্রেরিতে রয়েছে। কবির জন্মদিন উপলক্ষে কবিতীর্থে সাত দিনব্যাপী মেলার আয়োজন হয়।

নজরুলের ছেলে সব্যসাচী কবির মৃত্যুর পর কবরের মাটি (বাংলাদেশে কবির কবর থেকে) নিয়ে কবির প্রতীকী কবরস্থান ও পাশে কবিপত্নী প্রমীলা দেবীর কবর দারুণ অনুভূতি দেবে দর্শককে! ১৯৭৮ সাল থেকে জাঁকজমক করে অনুষ্ঠান পালন করে থাকে কবির ছোট ভাইয়ের পরিবার। তবে সরকারি অনুদান খুব কমই পায়। কোনো কোনো বছর তাও থাকে না! ছোট্ট বাড়ি বা একাডেমিতে নিচতলায় নজরুল সংগ্রহশালা। পাঁচ রুপি অনুদান ফি দিয়ে নজরুল ও তার সন্তানদের ব্যবহৃত সংরক্ষিত পোশাক, সঙ্গীত যন্ত্র, পুরনো ম্যাগাজিন, পেপার কাটিং, কবির ব্যবহৃত আসবাবপত্র, প্রমীলা দেবীর ব্যবহৃত খাট ও বিভিন্ন ছবি পর্যটকদের বাড়তি কৌতূহল মেটাবে!

নজরুল একাডেমিতে গবেষণা করার জন্য লাইব্রেরিতে কবির বিভিন্ন বই, তার সম্পাদিত বিভিন্ন ম্যাগাজিন রয়েছে। কবির মক্তব এখন ‘নজরুল বিদ্যাপীঠ’ নামে পরিচিত। যেখানে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে। আরও আছে নজরুল কলেজ। ছোট গ্রাম চুরুলিয়া একবার দেখলে মনে গেঁথে থাকে।

দিগন্তঘেঁষা কালো পাহাড়ের পাদদেশে ঐতিহাসিক চুরুলিয়া আর পাহাড়ের নিচেই কয়লাখনি। কয়লা-পাথর উত্তোলন করেই কালক্রমে এ কৃত্রিম পাহাড়শ্রেণী তৈরি হয়েছে। কলকাতা থেকে আসানসোল রেলপথে ২৩০ কিলোমিটার। হাওড়া-শিয়ালদহ থেকে বর্ধমান-রানীগঞ্জ হয়ে কালো পাহাড়ের এ পথ। এশিয়ার বৃহত্তম কয়লা অঞ্চল রানীগঞ্জ বিট দিয়ে জিগজাগ পথে রোমাঞ্চ জাগবে মনে! আসানসোল স্টেশন পৌঁছালেই অটোতে যেতে হবে আসানসোল আন্তর্জাতিক বাস টার্মিনাল। এখান থেকেই অজয় নদীর ঘাট পর্যন্ত লোকাল বাস পাবেন। ঘাটে যাওয়ার আগেই চুরুলিয়া বাজারে নেমে পড়তে হবে। আসানসোল থেকে ১৩ কিলোমিটার চুরুলিয়ার পথ অনায়াসেই পর্যটকের মনে দোলা দেবে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও ভ্রমণপিয়াসী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×