বিমানবন্দরে প্রবাসী যন্ত্রণা আর সহেনা

  লুৎফুর রহমান ০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রবাসীদের জন্য সরকার কি আদৌ আন্তরিক। সরকার কি সত্যি প্রবাসীবান্ধব। উত্তর নিশ্চয় হ্যাঁ। তার অনেক প্রমাণ আছে। প্রবাসীদের পরিবার পুনর্বাসনসহ লাশ পাঠাতে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। যা এর আগে ছিল না। কিন্তু সরকারের এত পদক্ষেপে গুড়ে বালি দিচ্ছে কিছু অসাধু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা। প্রতিবার দেশে এসে প্রবাসীরা এ ক্ষোভে সরকারকে ঘৃণা করতে বাধ্য হন, তা কি সরকারের নজরে আসে না? আবার অনেককে এও বলতে শুনি--- সরকারের রাজনৈতিক দলের কর্মী এরা তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। আমার মনে হয় এই অভিযোগ সত্য নয়। তবে সরকারের গাফিলতি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই এখানে। কারণ এয়ারপোর্টে সিসিটিভি থাকলেও তা সবসময় মনিটরিং হচ্ছে না। হলে এসব ঘটনা রোধ সম্ভব। এ ছাড়া এয়াপোর্টে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক থাকলেও সেখানে কোনো কর্মকর্তা নেই আমরা আমাদের অভিযোগ কোথায় জানাব? কারে দেখাব মনের দুঃখ গো গানের মতো কী শুধু গান গেয়েই যাব জীবন ভর?

আমরা যারা প্রবাসে থাকি তারা যে দেশে থাকি সে দেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশও ভ্রমণ করি। সে দেশগুলোয় আপনার সব ঠিক থাকলে আপনাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করে হাসিমুখে বিদায় করা হয়। আর আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশের এয়ারপোর্টগুলোয় ডাকাতের চেয়ে বড় দস্যুর ভূমিকা পালন করে কিছু অসাধু অফিসার। সব কিছু ঠিক ঠাক থাকার পরও ‘আপনাকে সন্দেহ আছে’ বলে আটকিয়ে দেয়া হয়। তারপর পাশ থেকে অন্য সহকারী এসে বলে ‘এত টাকা দিয়ে দেন’ আমি ম্যানেজ করব। এ দৃশ্য রক্তে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশ ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোনো দেশে আছে বলে আমার জানা নেই। আইনের পোশাক পরা এসব অফিসারের লজ্জা না লাগলেও বাঙালি হিসেবে আমরা লজ্জিত!

আমার এ লেখা পড়ে বেশি লিখছি ভাবার কোনো কারণও নেই। বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারি দেশের জন্য কাজ করি। সরকারের উচিত এ জন্য আরও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যে ছেলেটি তার মা বাবা বউ বাচ্চা রেখে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে অনেক যাতনায়। দেশে ফিরে ইমিগ্রেশনে আসার পর তাকে হয়রানিতে পড়তে হয়। ফোনের অপর পাশে এয়াপোর্টের বাইরে থাকা তার বৃদ্ধ মা হয়তো এটা শুনে হার্ট অ্যাটাক করেছেন। এ দায়টা কে নেবে? শপথ নেয়া অফিসাররা? নাকি সরকার? এ ছেলেটি একদিন দেশের রেমিটেন্সের চাকা ঘুরাতে ঘাম ঝরাবে। রাজনৈতিক দল আর সরকারের কোনো মন্ত্রী এলে প্রবাসে নানা কথার ফুলঝুরি দিয়ে প্রবাসীরা দেশের সোনার সন্তান বলে বেড়াবেন। হয়তো আপনার এসব বক্তব্য ওই ছেলেটিকে ছুঁয়ে যাবে না। কেন যাবে? সে তো সোনার বদলে অপরাধীর মতো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পকেটে যা টাকা ছিল সেটা এয়াপোর্টে দিয়ে এসেছে। তার বাবার দেয়া শেষ চিহ্ন ‘টাকা’টাও দিতে হয়েছে কেঁদে কেঁদে আইনের পোশাক পরা এসব চরিত্রহীন মানুষরূপী দস্যুদের। এমন কিছু দৃশ্যের সাক্ষী আমি নিজেও। একজন প্রবাসী সংবাদকর্মী হিসেবে যতবার দেশে যাই আশপাশের কাউকে না কাউকে ছাড়িয়ে নিতে হয়। কিন্তু একবার ভাবুন যে মানুষটি শেষ সম্বল ভিটেবাড়ি বিক্রি করে বিদেশ নামক জেলে পাড়ি দিচ্ছে তাকে তার পরিবার না এই দেশ এগিয়ে নিতে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ শ্রমিকই অর্ধশিক্ষিত নিজের অধিকার না জানা মানুষগুলোকে ঠকানো হয় দেশে ফেরত যাওয়ার সময়ও। এয়ারপোর্টে বিদেশি দেরহাম না দিলে এক্সিট সিল মারে না কিছু অফিসার। তাই নিরুপায় মানুষগুলোর সেখানে কাঁড়িকাঁড়ি টাকা দিতে হয়।

আমি পরিষ্কার করতে দুটি দৃশ্যপট তুলে ধরব। একটি দেশ থেকে আসার সময়, আরেকটি দেশে ফেরার সময়-

কেস স্টাডি-১: ১৪ জানুয়ারি ২০১৯। সন্ধে ৬.৩০ মিনিট বাংলাদেশ সময়। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে আমার আপন ভাই দুবাই আসছে। সঙ্গে আমার খালাতো ভাইও। যে ১০ বছর ধরে দুবাই থাকে। ইমিগ্রেশনে গিয়ে সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অফিসার আমার ভাই যে নতুন আসবে তাকে বললেন, আপনার প্রোফাইল নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। আপনাকে যেতে দেব না। পাশে থাকা সহকারী এসে বলল আপনার সঙ্গে ৩০০ ডলার আছে তা দিয়ে দেন। স্যারকে বলব আপনাকে ছেড়ে দেবেন। সঙ্গে থাকা আমার খালাতো ভাই ১০ বছর ধরে দুবাই থাকেন। তিনি দিতে নারাজ। সেই সঙ্গে ডিগ্রি ফাইনাল ইয়ারে পড়ুয়া আমার ভাইও দিতে নারাজ। অফিসার তার বোর্ডিং কার্ড ফিরিয়ে নিলেন। তাকে সন্দেহ আছে বলে আটকিয়ে দিলেন। আর খালাতো ভাইকে চোখ রাঙিয়ে বললেন আপনি যান, না হয় আপনাকেও আটকিয়ে দেব। বিমানের ফ্লাইট তখন ৮টায় ছাড়বে। বাজে ৭.৪৫ ওই লোকটি এসে আবার ২০০ ডলার চাইল। নিরুপায় হয়ে আমার ভাই ২০০ ডলার দিয়ে ছুটে এলেন। এর আগে বিমানের স্থানীয় ম্যানেজারের সঙ্গেও আমি কথা বললে তিনি ইমিগ্রেশন আলাদা বলে নিজের দায় এড়িয়ে গেলেন। ওই ইমিগ্রেশন অফিসারকে আমার পরিচয় দেয়ার পরই তিনি ফোনে কথা বলা মানা বলে লাইন কেটে দিলেন। আর আমার ভাইকে ফোনের সুইচ অফ করতে বললেন। এ ঘটনা শুধু একজনের তা নয় এটা যে শুধু সিলেটের তাও নয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সব জায়গায় প্রতিদিন এমন ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে শতাধিক প্রমাণ আমার কাছে আছে।

কেস স্টাডি: ২: ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট। ঢাকা এয়ারপোর্ট। দুবাই থেকে ঢাকায় বিমান নামল। সবার চোখে মুখে আনন্দ। ভিনদেশ থেকে নিজ দেশের আলোমাখা পরিবেশ যেন হাতছানিতে ডাকছে। একে একে সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। এক্সিট সিল পড়বে বলে। এখানেও ইমিগ্রেশন অফিসার ৫ দেরহাম দেন বলে বলে সবার থেকে ৫ দেরহাম নিচ্ছেন আর সিল দিচ্ছেন। কেউ দিতে অপারগ থাকলে তার পাসপোর্টে সিল দিচ্ছেন না। যখন আমার পালা এলো। আমি বললাম কেন ৫ দেরহাম দেব? তিনি বললেন ওই ফরমটা আপনাদের কারও কাছে নাই তাই দিতে হবে। আমি বললাম ঠিক আছে ফরম দিন আমি ফিলাপ করি। ফরম এনে দেখি এটা ‘ডুয়েল সিটিসেনশিপ’ যারা তাদের জন্য। আমি বললাম এটা আমাদের জন্য নয়। আমরা প্রবাসী। নাগরিকত্ব শুধু বাংলাদেশেরই। এটা যারা ইউরোপ আমেরিকা থাকে তাদের জন্য। তারা ডুয়েল সিটিজেনশিপ। তিনি ক্ষেপে গেলেন, বেশি কথা বলেন বলে আমার পাসপোর্ট ছুড়ে মারলেন। আমার কাছে পাসপোর্ট মানে পতাকা। আর পতাকা মানে আমার দেশ, আমার মা। আমার দেশ, মাকে অপমান করা দেখে আমি তার কলার চেপে ধরলাম। হইহুল্লোড় শুরু হল। এলেন ওসি। তিনি অফিসারকে বকে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, তিনি এসব জানেন না। সে যা করছে অন্যায় আর তাকে তিনি দায়িত্বে রাখবেন না। কিছু সময় বন্ধ থাকা সেবা আবার তিনি চালু করলেন অন্য অফিসার দিয়ে। আমাকে বসে চা পান করাতে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি আমার আব্বা আইসিইউতে আছেন আমি ইমার্জেন্সি এ জন্য দেশে আসছি বলে তাড়াতাড়ি চলে এলাম। সোজা চলে গেলাম হাসপাতালে যেখানে গিয়ে আব্বার মরদেহ দেখতে পেয়েছি। আমরা কে কোনো অবস্থায় দেশে যাই আমরাই জানি। আমাদের হয়রানি আর কত যুগ গেলে বন্ধ হবে কেউ বলতে পারেন?

বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত। অনেকটা সফলও। এয়ারপোর্ট আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব রোধ করা সম্ভব। এর আগে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কে সবসময় লোক বসিয়ে রাখা বা এসব দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারদের শাস্তি দেয়ার জন্য অন্তত একজন আর্মি অফিসার এয়ারপোর্টে বসান। বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেড় কোটি প্রবাসীর পক্ষ থেকে আমার অনুরোধ- প্লিজ, অন্তত বিমানবন্দরে আমাদের এসব হয়রানি বন্ধের গ্যারান্টি দিন।

লেখক : আরব আমিরাত থেকে প্রবাসী সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×