প্যারিস শহরটা ছবির মতো সাজানো

  মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুন্দর দেশ দেখতে চাইলে তাকে যেতে হবে মিসর। একটি শহর দেখতে চাইলে যেতে হবে ইউরোপের প্যারিস। এটা আমার কথা নয়, জ্ঞানী ও গুণীজনের অভিজ্ঞতার কথা। বিশ্বের সৌন্দর্য ও আধুনিক নগরীর অন্যতম ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস। বর্তমানে সভ্যতার মাপকাঠিতে ফরাসিদের তুলনা করা যায় না। কেমন সেই প্যারিস? জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ইউনেস্কো অন্যতম। আর ইউনেস্কো’র সদর দফতর প্যারিসে অবস্থিত আর সেই ইউনেস্কো’র আমন্ত্রণে এবারও আমাকে একটি এনজিও বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৭ম বারের সব প্যারিসে যেতে হয়েছিল। অন্যবারের মতো হোটেলে না উঠে এবার আমি প্যারিসের সেন্ট-দেনিসে প্রবাসী বাংলাদেশি এক ভাই মানবিক গুণাবলিতে ভরপুর রুহুল আমিন আবদুল্লাহ-র বাসায় উঠেছিলাম। কেননা প্যারিসের হোটেল ও জীবনযাত্রার মান ব্যয়বহুল। প্যারিস থেকে দ্রুততম ট্রেন টিজিবি ডুপ্লেক্স-এ (যা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩১৯ কিলোমিটার বেগে ছুটে থাকে) করে সুইজারল্যাল্ডের জেনেভা শহর ও বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস সফর করে অনেক কিছু জানা ও শেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। টিজিবি ট্রেনে আমার এই প্রথম সফর। দ্রুতগামী এ ট্রেন সংযুক্ত করেছে ফ্রান্সের প্রধান শহর ইউরোপের অনেক দেশের রাজধানী। এ ট্রেন তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে উচ্চমানের অ্যালুমিনিয়াম। ফলে ওজন কমেছে। প্রতিটি বগি এতটাই শহনশীল, সর্বোচ্চ গতিতে চলাচলের সময় একটি টিজিভি ট্রেন দুর্ঘটনা কবলিত হয়- তাহলে এর বগিগুলো একেবারে দুমরে মুচড়ে যাবে না। ফ্রান্সের এসএনসিএফ কোম্পানির তত্ত্বাবধানে এ ট্রেন ২০১১ সাল থেকে ইউরোপের বিভিন্ন রুটে চলাচল শুরু করে।

প্যারিস নগরী সত্যিই অপূর্ব। কোনো দেশের নগরীর সঙ্গে তুলনা করা বোকামি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শিল্পীর অঙ্কনে উদ্ভাসিত এবং পর্যাপ্ত আলোয় আলোকিত। ব্যস্ত নগরী প্যারিসে স্বল্প সময়ের জন্য আসা ঠিক নয়। শুধু প্যারিসে কেন গোটা ফ্রান্স দেখা এবং জানার কোনো শেষ নেই এ শহরকে। প্যারিস নগরীতে ঘুরে বেড়ানোর বহু স্থান রয়েছে, যা লিখে শেষ করা যাবে না। প্যারিসে কেউ এলে আইফেল টাওয়ার, প্যারিস গেট, বাস্তিল দুর্গ, প্যারিসের সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর গ্যালারি লাফায়েত, মোলা রুজ নাইট ক্লাব, ডায়না সাট (সেন নদীর ট্যানেলে যেখানটায় লেডি ডায়না গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান), আর্চ অফ ট্রয়াঞ্চ গ্যালারি লাফাযেত, প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিজি প্যালেস, এনভারস এ মোমার্থ, পার্লামেন্ট হাউস, লুভ জাদুঘর, নটরডেম গির্জা, কনকর্ড টাওয়ার, গিমে জাদুঘর, নেপোলিয়নস টুম ইত্যাদি না দেখলে জীবনটাই অপূর্ণ থেকে যাবে। আইফেল টাওয়ারে না উঠে সম্পূর্ণ প্যারিস শহরটাকে অতি সহজে দেখা সম্ভব নয়। তাই আইফেল টাওয়ারে ওঠা চাই। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ইউরোপের দর্শনীয় শহরগুলোর মধ্যে প্যারিস অন্যতম। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার মধ্যযুগে সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে ছিল একটি। এখনও প্যারিসের প্রধান শোভা আইফেল টাওয়ার। ১৮৮৯ সালে মি. গুসটাভ আইফেল টাওয়ার নির্মাণ করেন। পুরো টাওয়ারটা তৈরি করতে লোহা বা স্টিলের মোট মেটাল পার্টস বা যন্ত্রাংশ ছিল ১৮ হাজার ৩৮টি। আইফেল টাওয়ারটি চারটি বিশাল লোহার পিলারের ওপর দাঁড়ানো। প্রায় ২৫০ জন নির্মাণ কর্মী বা শ্রমিক ২ বছর ৫ মাস ধরে বিরামহীনভাবে নির্মাণ কাজ শেষ করেছিলেন। রাতে আইফেল টাওয়ারে কয়েক লাখ রঙিন বাতি বারবার তার রং বদলাচ্ছে। পুরো টাওয়ারের গায় লাখ লাখ বাতি জ্বলছে। এ দৃশ্য রাতের বেলায় দেখতে কি যে অপূর্ব লাগে তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝানো যাবে না। দূর থেকে আইফেল টাওয়ার দেখতে খুব সরু মনে হলেও আসলে কিন্তু তা অনেক প্রশস্ত ও বিশাল। একই সঙ্গে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার দর্শণার্থী আইফেল টাওয়ারে উঠতে পারে। আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা ১০৮১ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং এর ওজন ১০ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। ভ্রমণ বা দেখার জন্য সিঁড়ি বা লিফটের সাহায্যে টাওয়ারটির শীর্ষস্থানে ওঠা যায়। সেখান থেকে প্যারিস নগরীর সৌন্দর্য চমৎকারভাবে উপভোগ করা এবং প্রায় ৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত শহরটি দেখা যায়। গোটা দুনিয়ার মানুষের কাছেই ওটার একটা আলাদা মর্যাদা আছে। বিশ্বের বিভিন্ন ব্যস্ততম নগরীর মধ্যে প্যারিস অন্যতম হলেও মাটির নিচে মেট্রো থাকার কারণে রাস্তায় তেমন যানজট নেই, গাড়ি পার্কিংয়ে সংকটের কারণে মালিকদের পুলিশের ভয়ে তটস্থ থাকতে দেখা যায়। তবে প্যারিস শহরের পুলিশের ব্যবহার ও ভদ্রতা দেশি-বিদেশি সবার কাছে প্রশংসিত।

রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বার, নাইট ক্লাব ইত্যাদিতে ভরপুর। নগরীর লোকজন রাস্তার জন্য ঘর থেকে বাইরে বা রেস্টুরেন্টে খেতে বেশি পছন্দ করে। বন্ধের দিন শনি ও রোববার বাসায় বেশ ধুমধাম পার্টির আয়োজন করে। প্যারিসে সকালের জনপ্রিয় নাশতা হচ্ছে বাগেট এবং চিজ। বাগেট হচ্ছে এক ধরনের লম্বা শক্ত রুটি। এখানকার মানুষ প্রচুর চিজ খায়। প্যারিসে রয়েছে প্রায় দুই থেকে ৩ শত প্রকারের চিজ। প্যারিস শহরকে বলতে হবে কফি শপ, ফুড শপ আর সেফস শপের শহর। শহর জুড়ে অসংখ্য খাবারের দোকান। তবে ফরাসিরা কাঁচা খাবার খুব পছন্দ করে। মাছ বা মাংস থেকে রক্ত ঝরছে এমন খাবার তাদের পছন্দ।

চেনা-জানা না থাকলে প্যারিস নগরীতে ম্যাপ নিয়ে চলাফেরা করা অতি সহজ। তবে নতুন হলে কোনো বাংলাদেশি পরিচিত কাউকে নিয়ে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানো আনন্দময় এবং সহজ হবে। ফ্রান্সে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি-ছিনতাইয়ের তেমন কোনো ভয় নেই। ঐতিহাসিক সিন নদীর ওপর দিয়ে প্যারিস নগরীর চতুর্দিকে ট্যুরিস্ট বোর্ড দিয়ে ভ্রমণ করা যে কত মনমুগ্ধকর তা সত্যিই অকল্পনীয়। প্রায় সাত কোটির জনসংখ্যা অধ্যুষিত ফ্রান্সের রাজধানীতে প্রায় ১৫ লাখ লোকের বসবাস। প্যারিস শহর স্বল্প অর্থে ঘুরে বেড়ানোর জন্য আরিয়ার (ট্রেন) মেট্রো’র সুব্যবস্থা রয়েছে। প্যারিস শহরটা চমৎকার এবং মনে হয় ছবির মতো সাজানো। শৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্যারিসে সহজে কেউ আইন ভঙ্গ করে না। দেশটিতে মরক্কো, আলজেরিয়ান, আফ্রিকান, নিগরো ইত্যাদি দেশের লোকে ভরপুর। এখন ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি লোকের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। প্যারিসের গারদু নর্ড এলাকাটি বাংলাদেশিদের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভরপুর। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এখানে জমে উঠে বাঙালিদের মিলনমেলা। ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের এক বিরাট অংশ বসবাস করছে। সংখ্যা মোটামুটি কম নয়, প্রায় ২০/৩০ হাজার। বলে রাখা ভালো তরুণ ফরাসিদের মধ্যে বিয়ে করার হার কম। এরা লিভ টুগেদার পছন্দ করে থাকে। তবে কিছু কিছু বাঙালি তরুণদের ফরাসি মেয়েরা বিয়ে করে ভালোভাবে সংসার জীবন যাপন করছে। তারা মোটামুটি ভালোই আছে।

প্যারিস কেন ইউরোপে বা পশ্চিমা দেশগুলোতে সবচেযে কষ্টে থাকে বুড়া-বুড়িরা। ওদের কোনো সঙ্গী-সাথী থাকে না। এখানে বুড়ো-বুড়িরা বড় নিঃসঙ্গ ও অসহায়। কুকুর-বিড়ালই তাদের প্রধান বন্ধু। ফরাসিরা জাতি হিসেবে খুবই ভদ্র এবং অমায়িক। তারা ফুলকে ভালোবাসে বলে আপনজনের বিয়ে, জন্ম ও মৃত্যুতে ফুল উপহার দিয়ে সম্মান জ্ঞাপন করে। প্যারিসে প্রতিদিন প্রচুর ফুল বেচাকেনা হয়। যদিও প্যারিসে যে কোনো জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। তার পরও ফ্রান্সের পারফিউম বিশ্ববিখ্যাত। কোনো সময় প্যারিস সফরে এসে আইফেল টাওয়ার দেখতে এবং সেখানকার খ্যাতনামা পারফিউম ক্রয় করতে ভুল করবেন না যেন।

লেখক : ইউনেস্কো ক্লাবের মহাসচিব

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter