পর্তুগালে বাংলাদেশি কারি শিল্পের বিপ্লব

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

বাংলাদেশি কারি শিল্পের জন্য ইউরোপের বিখ্যাত জায়গা ইংল্যান্ড। সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বড় অবদান আছে এই শিল্পের প্রসারের পেছনে। যুগের পর যুগ ধরে সেখান এই শিল্পের প্রসার ঘটিয়েছে বাংলাদেশি অভিবাসীরা। ইদানীং নানা সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে ইংল্যান্ডের কারি শিল্প নিয়ে। ব্রিটিশ সরকারের কঠোর ইমিগ্রেশন নীতির কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে রেস্টুরেন্ট কর্মচারীর সংখ্যা। রেস্টুরেন্টের ফ্রন্ট স্টাফ, কিচেন স্টাফ বা শেফ সংকট চলছে। যার ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক বড় বড় ও নামিদামি রেস্টুরেন্ট।

ঠিক একই সময়ে তার বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইউরোপের আরেক কর্মজীবী দেশ পর্তুগাল তথা লিসবনে। অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজতর হওয়ার ফলে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আনাগোনা বাড়ছে হাজারো বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসন প্রত্যাশীদের। তাই জমে উঠেছে এখানে বাংলাদেশি কারি শিল্প তথা বাংলা খাবারের অসংখ্য রেস্টুরেন্ট।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রস্থল ও ঐতিহ্যবাহী মার্তিম মনিজের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা, রুয়া দো বেনফরমসোয় ঢুকলে মনে হবে, এ যেন ছোট্ট এক টুকরা ‘বাংলাদেশ’। এখানে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং চাইনিজ প্রবাসীরাও বসবাস করছেন। পর্তুগিজ সরকারের ঘোষিত সহজ ইমিগ্রেশন আইনে বৈধতা লাভের আশায় ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্তুগালে আসছে অসংখ্য অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশি। এর ফলে নতুন করে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে পর্তুগালের মার্তিম মনিজ এলাকার ‘রুয়া দো বেনফরমসো’ নামক রাস্তাটি। বর্তমানে এখানে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জমজমাট অবস্থা দেখা যাচ্ছে।

১৯৯৫ সাল থেকে এ শিল্পে বাংলাদেশিদের পদচারণা শুরু হয়ে এর বিকাশ লাভ করে ২০১৪ সালের শুরুর দিকে। একের পর এক গড়ে উঠে বাংলাদেশি মালিকানায় প্রায় ২০টির মতো রেস্টুরেন্ট। এ এলাকায় ঢুকলে যে কেউ বুঝে নেবে এখানে বাংলাদেশিদের বেশ ভালো আধিপত্য রয়েছে। রেস্টুরেন্টের নামগুলোর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নানা ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং নিদর্শনের নাম।

যেমন স্পাইসি রেস্টুরেন্ট গ্রিল, স্পাইসি তান্ডুরী, সিতার, বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট, রাধুনী রেস্টুরেন্ট, ঘরোয়া বাংলা রেস্টুরেন্ট, বেঙ্গল ক্যাফে, বিসমিল্লা রেস্টুরেন্ট-১, বিসমিল্লা রেস্টুরেন্ট-২, ঢাকা রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড সুইটস, বাংলা রেস্টুরেন্ট, ফুড গার্ডেন, রূপসী বাংলা, এ এফ সি ক্যাফে অ্যান্ড ফাস্ট ফুড, তাজমহল রেস্টুরেন্ট, নিউ তাজমহল রেস্টুরেন্ট এবং মাতৃ ভাণ্ডারসহ আরও অনেক বাহারি নামের রেস্টুরেন্ট। এ প্রসঙ্গে কথা হয় স্পাইসি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড গ্রিল ও স্পাইসি তান্ডুরীর কর্ণধার যৌথভাবে সুমন আহমেদ এবং মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। জানালেন এই শিল্পের নানা সম্ভাবনার কথা। বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষসহ সাউথ এশিয়ান মানুষ প্রধানত খেতে আসে এখানে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পর্যটক, স্থানীয় পর্তুগিজ মানুষজনও আসছে। বাংলাদেশিদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ সব রেস্টুরেন্টে যুক্ত হয়েছেন উবার ইট, গ্লোব ও টেইক ওয়ের মতো জনপ্রিয় অনলাইন ডেলিভারি সার্ভিসের সঙ্গে। যা এই ব্যবসার প্রসারে আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।

এমন অবস্থা দেখে পর্তুগাল ট্যুরিজম বোড, লিসবন মিউনিসিপালিটি ও স্থানীয় প্রশাসন পর্তুগালে ঘুরতে আসা টুরিস্টদের জন্য মার্তিম মনিজের ‘রুয়া দো বেনফরমসোকে’ বিশেষায়িত ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট জোন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বাঙালির সাদামাটা খাবার এবং ভারতীয় নানা মাসালাদার খাবারসহ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজে খাবারের ব্যবস্থা। চাহিদা অনুযায়ী পর্তুগিজ ও অ্যারাবিক খাবারও পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই বাংলাদেশ, ভারত তথা এই উপমহাদেশের মানুষ পর্তুগালের লিসবনে বেড়াতে এলে ঘরের খাবারের স্বাদ পেতে একবার হলেও ডু-মেরে যাচ্ছেন রুয়া দো বেনফরমসোয়। সন্ধ্যা নামলে প্রচুর অভিবাসী, স্থানীয় মানুষজন এবং বেড়াতে আসা পর্যটকের দেখা মিলবে এসব রেস্টুরেন্টে। শুধু লিসবনে নয়, এমনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে সমগ্র পর্তুগালের বড় বড় সব শহরে। বিশেষ করে যে সব শহরে পর্যটকের আনাগোনা বেশি রয়েছে। পর্তুগিজরা আমাদের উপমহাদেশের খাবারের সঙ্গে পরিচয় সেই পাঁচশ’ বছর আগ থেকে। তাই যেখানেই এমন রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছেন উদ্যোক্তারা।

মো. রাসেল আহম্মেদ, লিসবন পর্তুগাল থেকে