পর্তুগালের বাঙালি আবদুল আলীম

  নাঈম হাসান পাভেল ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পর্তুগাল

দেশে দেশে এখন শীর্ষ ধনীদের কাতারে বাংলাদেশিদের নাম দেখা যায়। পিছিয়ে নেই দক্ষিণ পশ্চিম ইউরোপের দেশ পর্তুগালের বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও। তেমনই একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আবদুল আলীম। যিনি ইতিমধ্যেই পর্তুগালের অন্যতম বড় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর মর্যাদা পেয়েছেন।

নিরলস পরিশ্রম, একাগ্রতা, একনিষ্ঠতায় বড় হয়েছেন তিনি। রিয়েল বাংলা টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আলীম। পর্তুগালের বাণিজ্যিক রাজধানী পোর্তো শহরে টেলিকমিউনিকেশন ও ট্যুরিজম ব্যবসা করছে তিনি। একান্ত আলাপে উঠে আসে ব্যবসায়ী আবদুল আলীমের দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রবাস জীবনের রঙিন গল্প।

আবদুল আলীম তরুণ বয়সে ইরানে পাড়ি জমান। পরিবর্তন ঘটাতে পারছিলেন না। একদিন সকালে ভাবলেন ভিন্ন কিছু করতে হবে। ইরান ছেড়ে যাত্রা শুরু করলেন তুরস্কের পথে। তুরস্ক পৌঁছে সেখান থেকে রাশিয়া চলে যান। অবৈধ প্রবেশের জন্য ছয় মাসের কারাভোগ করেন রাশিয়ায়। রাশিয়ার জেলে তাকে কাঁচা মাছ খেতে দেয়া হতো, ছয় মাস ভাতের দানাও চোখে দেখেননি। রাতে যখন ঘুমাতে যেতেন গরম পানি বিছানায় ছিটিয়ে দিতো জেলরক্ষীরা। ভালো কোনো কাপড় ছিল না, দুটো ছেঁড়া জরাজীর্ণ প্যান্ট পরে ছয় মাস কারাগারে কেটেছে। ছয় মাস পর মুক্তি পেলেন। কষ্টের অভিজ্ঞতায় জীবনে নতুন করে সংগ্রাম করার প্রত্যয় পেলেন।

গন্তব্য এবার ইউক্রেন। কিন্তু অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়। চলতিপথে ছিনতাইকারী সব নিয়ে গেল। এরপর এক দালাল চক্রের সঙ্গে ৯৬ ঘণ্টা লরিতে করে জার্মানিতে পৌঁছান। রাজনৈতিক আশ্রয়ে জার্মানিতে অবস্থান করেন। জার্মানিতে ফুল বিক্রি করে জীবন কাটান। জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় শেষ হলে পর্তুগালে এলেন।

দিন যায় যত সংগ্রাম তত কঠিন হতে থাকে। ভাবলেন কিছু একটা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে তাই ঘরে বসেই খেলনা সামগ্রী বানাতে শুরু করলেন। এক্সপো-৯৮ তে কন্সট্রাকশনের কাজ করলেন। লিসবন ছেড়ে এলেন পোর্তো শহরে কন্সট্রাকশনের কাজে ১৯৯৯ সালে পেলেন পর্তুগিজ রেসিডেন্স। মাথায় চাপল ব্যবসা করবেন। রোজ সকালে বেরিয়ে পড়তেন রাস্তায়। দূর-দূরান্ত হেঁটে দোকান খুঁজে বেড়ান।

পর্তুগালের প্রথম রাজধানী গিমারাইসে একটি দোকান খুঁজে পেলেন। ফুল বিক্রি আর কন্সট্রাকশনে কাজ করে জমানো মূলধন ১৩ হাজার ইউরো। ব্যবসা শুরু করলেন একটি মোবাইল শপ দিয়ে। চাইনিজ ব্যবসায়ীরা সেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। সময়ের সঙ্গে তার ব্যবসায়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। ব্যবসার ছয় মাস না যেতেই গিমারেইসে আরও চারটি দোকান হল। গিমারাইসে প্রথম বাংলাদেশী তিনিই। এরপর পোর্তো শহরে নিলেন পর্যটন ও খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রি করার একটি পাইকারি শপ। এক বছর না যেতেই সেখান থেকে আয় করলেন মিলিয়ন ইউরো। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আবদুল আলীমকে।

পোর্তোর শিল্প জোনে নিলেন রিয়েল বাংলা টেলিকমিউনিকেশন নামের একটি কোম্পানি। চীন থেকে মোবাইল সামগ্রী কোম্পানির ট্যাগ ও সীলসহ পর্তুগালে আনলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোর্তো শহরের টেলিকমিউকেশন ইন্ডাস্ট্রিতে স্থানীয় পাইকারদের কাছে রিয়েল বাংলা টেলিকমিউনিকেশন হয়ে উঠল একমাত্র ভরসা। আর ধীরে ধীরে বদলে গেল ব্যবসায়ী আবদুল আলীমের গল্প। পোর্তোর টেলিকমিউনিকেশন ইন্ডাস্ট্রিতে আবদুল আলীম এখন প্রতিষ্ঠিত এক নাম। ক্রেতাদের প্রায় ৯০ ভাগই স্থানীয় পর্তুগিজ।

আবদুল আলীম বলেন, মানুষের কারও ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত না। জীবনে বহু প্রতিবন্ধকতা আসবে, কিন্তু সেসবকে আমলে না নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্রত থাকতে হবে। কোনো কিছু শুরু করলে মাঝপথে থেমে না গিয়ে তার শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। স্বপ্ন থাকা চাই, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেগে থাকার মানসিকতাও জরুরি। আর একটা কথা ব্যবসা করতে গেলে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ নীতিতে থাকতে হবে। আর রিস্ক নেয়ার মানসিকতা রাখতে হবে।

ব্যবসা স্বাধীন একটি ক্ষেত্র। অন্যের হয়ে কাজ করার চেয়ে নিজের ব্যবসা গড়ে তুললে কারও অধীনে না থেকে স্বাধীন জীবন উপভোগ করা যায়। জীবনে চলতে গেলে অনেকেই বাজে কথা বলবে, সমালোচনা করবে, হাসিঠাট্টা অবজ্ঞা করবে, তাদের প্রতি আমার উপদেশ মানুষের কথায় কান দেবেন না বরং নিজের বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। যারা সমালোচনা করে তারা পেছনে থাকে তাই নিজেকে ছাড়িয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। তবেই উন্নতি আসবে।

আবদুল আলীম বলেন, ব্যবসা আমার কাছে বিদ্যার মতো। বিদ্যা মাধ্যমে আমরা অজানাকে জানি তেমনি ব্যবসায়ে প্রয়োজন নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকা। ব্যবসা শুরুর আগে প্রয়োজনে সে বিষয়ে কিছুদিন কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা জরুরি। তিনি ইসলামিক মূল্যবোধে শতভাগ হালাল পন্থায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। তিনি মনে করেন, তার সফলতার পেছনে হালাল ব্যবসার অবদান আছে। আবদুল আলীম সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তার জেলা কুষ্টিয়ায় মানবসেবায় বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ করছেন। আবদুল আলীম মনে করেন, মানুষ টাকা উপার্জন করে নিজের পরিবারের এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। মানুষের উচিত উপার্জনের অংশ থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুনিয়াতে মানুষ সারা জীবন বেঁচে থাকবে না কিন্তু ভালো কাজগুলো বেঁচে থাকবে।

নাঈম হাসান পাভেল, পোর্তো, পর্তুগাল থেকে

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×