যেখানে হৃদয়ের গহিনে চিরদিনের বঙ্গবন্ধু

  শান্তনু চৌধুরী ০১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যেখানে হৃদয়ের গহিনে চিরদিনের বঙ্গবন্ধু

তিলোত্তমা কলকাতা, আনন্দের শহর। চার্নকের কলকাতা। ইংরেজ সাহেবের বোঝার ভুলে ‘কাল ঘাস কাটা’-এর কলকাতা। চারশ’ বছর পেরিয়েও পূর্ণ যৌবনা। প্রাণ প্রাচুর্যে টলমল।

সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানে সেরা। সেই কারণেই হয়তো কলকাতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই মনটা ভালো হয়ে গেল। এত সাজানো-গোছানো আর পরিষ্কার।

এর আগেও এসেছি কিন্তু এবারের সফর সংক্ষিপ্ত তাই প্রাসঙ্গিক কাজ সেরে বিকালের দিকে রওনা দিলাম কলকাতার নিউ টাউনের ইকোপার্কের দুই নম্বর গেটের মাদার ওয়াক্স মিউজিয়ামে। সংক্ষিপ্ত সময়ে এটাই দেখতে চাই। কলকাতার অন্য দর্শনীয় স্থানগুলো আগেই দেখা।

২০১৪ সালের পর থেকে এই মিউজিয়ামের নাম শুনে আসছিলাম। লন্ডনের মাদাম তুসোর জাদুঘরের কথা আমরা কে না জানি। সেটা নিয়ে দুনিয়াজুড়ে হৈচৈ। এখন অবশ্য নানা দেশে এমন মিউজিয়াম তৈরি হচ্ছে। আমাদের দেশেও ঢাকার বনানীতে এমন একটি মিউজিয়াম তৈরির চেষ্টা চলছে। মাদারস ওয়াক্স মিউজিয়াম মোম শিল্পকর্মের জাদুঘর। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটিই ভারতের প্রথম মোমশিল্পের জাদুঘর।

এটি মাদাম তুসো জাদুঘরের আদলে নির্মিত। জাদুঘরটি মাদার তেরেসার নামে। আমার সঙ্গে কলকাতার ছেলে ছোট ভাই নিলয়। দু’শ রুপির টিকিট কেটে প্রবেশ করি দোতলা এই জাদুঘরে। দেখা পেয়ে যাই স্বামী বিবেকানন্দের। ‘জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না’। প্রাণ উৎসারী বাণী।

রবীন্দ্র নাথ পড়ছেন চেয়ারে বসে। নির্ভিক নজরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে আছেন গায়ে চাদর জড়িয়ে। তিনিও বলছেন জেগে ওঠার কথা। সবচেয়ে ভালো লাগলো বঙ্গবন্ধুকে দেখে। জীবিত দেখা হল না তার সঙ্গে। কিন্তু তিনি আঙুল উঁচিয়ে এখনও যেন বাঙালিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। পেছনে লেখা জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’। এই মোমের মূর্তি স্থাপনের সময় ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে আমরা হৃদয়ের গহিনে চিরদিনের জন্য রেখে দিলাম। আমরা (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনাকে জানাতে চাই, বঙ্গবন্ধুকে আমরা ভুলিনি।

তাকে কোনো দিন ভুলবও না। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্রষ্টা, তাকে ভোলা যায় না।’ ভারতের বিখ্যাত তথা জগৎজুড়ে খ্যাতি রয়েছে এমন মহান ব্যক্তিদের মূর্তি রয়েছে এখানে। বর্ষীয়ান ভাস্কর সুশান্ত রায়ের তৈরি ১৯টি মূর্তি প্রথমে এই জাদুঘরে ঠাঁই পেলেও এখন এর সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, এ পি জে আবদুল কালামের দাঁড়ানোর ভঙ্গিই বলে দেয় তারা কতটা সভ্য।

আইনস্টাইন এখনও অংক কষছেন। ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে কপিল, শচীন আর সৌরভ। এই বুঝি চার-ছক্কা হাঁকাবেন। ঘুমের ছায়া নামে দু’চোখে যাদের গানে সেই কিশোর কুমার, লতাজি। গানের বসন্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আর বিহরের কথা এলে যার কথা মনে পড়ে তিনিই মান্না দে। করছেন গানের সঙ্গত।

জেনিফার লোপেজকে দেখেতো হার্টবিট থেমে যাওয়ার অবস্থা। জরিপ অনুযায়ী দুনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঠোঁটটা যে তার। কিছুদিন আগে ঘুরে গেছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বিখ্যাত ‘রোমান হলিডে’ ছবির ‘প্রিন্সেস অ্যান’-এর কথা মনে আছে তো? তিনিই অড্রে হেপবার্ন। গালে হাত দিয়ে তার সামনে যে বসেই আছি উঠতেই ইচ্ছে করছে না। সৌন্দর্য, সৌষ্ঠব, লাবণ্যের প্রতিমূর্তি তিনি। জাদুকরী মুখশ্রী দিয়ে ঘায়েল করেছেন আমার মতো কোটি তরুণের হৃদয়। তিনি যখন বাংলাদেশে আসেন (১৯৮৯ সালে) তখন আমি শিশু। নিকোল কিডক্যান হাঁটছেন র‌্যাম্পে।

অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী, সালমান খানসহ রয়েছেন ভারতীয় অভিনেতারা। দস্তানাহীন মাইকেল জ্যাকসন গানের তালে তালে নেচে ওঠার অপেক্ষায়। ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ ছবির কিংবদন্তি জাহাজের ক্যাপ্টেন ‘জ্যাক স্প্যারো’ খ্যাত জনি ডেপকে দেখে সত্যি রোমাঞ্চিত। এই বুঝি চোখের পলকে তিনি হারিয়ে যাবেন সাগরে।

এত এত গল্প বইতে পড়েছি বা ছবিতে দেখেছি মোমের জাদুঘরে সেই রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ বিদ্যাসাগর, পণ্ডিত রবিশঙ্করকে দেখে উচ্ছ্বাস যেন বেড়ে যায়। খালি গায়ে ধূতি জড়ানো মহাত্মা গান্ধী এখনও যেন পৃথিবীতে শান্তির বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন। ‘অ্যাভাটার’ ছবির অ্যাভাটার, মি. বিন, স্পাইডারম্যান, আয়রন ম্যান, হ্যারি পটার, ‘কোই মিল গায়া’ ছবির এলিয়েন জাদুও রয়েছে মোমের জাদুঘরে।

কিছুদূর যেতেই কেউ একজন ঠেলে দিল অন্ধকার কক্ষের দিকে। কিসের যেন ফিসফিসানি আওয়াজে গা ছমছম করে ওঠল। বুঝলাম ভূতের ডেরায় এসে পড়েছি। জনপ্রিয় ভূত চরিত্রগুলো স্থান পেয়েছে এই মিউজিয়ামে। কাটা হাত, কাটা মাথা আর পাতো ঝুলছেই। ‘এলিভ ডেড’-এর যে চরিত্রকে দেখে রাতে ঘুমাতেই পারিনি তার পাশে বসেই দোলনায় চড়ে ছবি তুললাম। ছবি আরও অনেক তোলা হয়েছে। একটা কক্ষে চলছে আলো আঁধারির খেলা।

সেখানে ঢুকলেই মনে হবে পৃথিবী ছেড়ে বুঝি অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি। প্রায় দু’ঘণ্টা পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখে ওপরের ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে বসলাম কফি খেতে। সেখানে যেন বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। কফিতে চুমুক দিতে দিতেই টুপ করে সন্ধ্যা নেমে এল। রাস্তার বিপরীত দিকে ইকো পার্কে জ্বলে উঠল হাজার হাজার বাতি। সে বাতিতে এক নজর ইকো পার্ক দেখে মন ভরে গেল। সেই ভালো লাগার ঘোর নিয়েই ফিরতি পথ ধরি।

কীভাবে যাবেন : কলকাতার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস ছাড়ে নিউ টাউনের দিকে। তেমন একটি বাসে ওঠে ইকো পার্কের সামনে নামলেই মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম। সবচেয়ে ভালো উবার বা সে দেশের ট্যাক্সি বাহন ওলা’তে গেলে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×