পুরীর সৌন্দর্য জগন্নাথ মন্দির

  রফিক হাসান ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জগন্নাথ মন্দির দর্শন না করে পুরী ছাড়তে মন সায় দিচ্ছিল না। ভাবলাম ভেতরে ঢুকতে না পারলে অন্তত বাইরে থেকে হলেও একবার ঘুরে আসি। তা না হলে মনে আফসোস থেকে যেতে পারে। পুরী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা থেকে ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। এটি পড়েছে উড়িষ্যা রাজ্যের মধ্যে। আগে এই রাজ্য বাংলার সঙ্গে ছিল এখন আলাদা হয়ে গেছে। যেমন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বলা হতো বাংলা, বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব।

পুরী আসার অনেক পথ রয়েছে। ট্রেন, বাস, বিমান। বিমানে এলে উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরে নামতে হয়। তারপর সেখান থেকে গাড়িতে করে আসতে হয়। দূরত্ব ৬৫ কিলোমিটার। অন্য দিকে বাস ও ট্রেনের পুরী পর্যন্ত সরাসরি সার্ভিস রয়েছে। ট্রেনের রিজার্ভেশন না পাওয়ায় আমাকে বাসে করে আসতে হয়েছে। বাসের সার্ভিস চমৎকার। আমাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম সার্ভিসের মতো। জাতীয় সড়ক দিয়ে আসতে এক রাত লেগেছে। রাস্তাও খুবই ভালো। পুরোটাই চার লেনের মহা সড়ক। ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে কোথাও জ্যামে পড়তে হয়নি।

স্বর্গদ্বার রোড বলা যায় পুরীর প্রধান সড়ক। সমুদ্র সৈকতের পাশ দিয়ে দীর্ঘ টানা রাস্তা। রাস্তার উত্তর পূর্বদিকে সমুদ্র। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতে সারাদিন একের পর এক উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ে। আর দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে পুরী শহর। আমাদের দেশের যে কোনো জেলা শহরের মতো। বেশ ঘিঞ্জি ও নোংরা। শহরের রাস্তাঘাটও সরু এবং ভাঙাচোরা। তবে প্রধান সড়ক স্বর্গদ্বার রোড বেশ চওড়া এবং পরিষ্কার পরিছন্ন। তবে পাশের সমুদ্র সৈকত থেকে প্রচুর বালু উড়ে আসে। বিকেলের দিকে বালিতে অনেকটা ঢেকে যায়। সকালে ঝাড়ু দেয়ার পর আবার ঠিক হয়ে যায়।

এ রাস্তারই এক মাথায় বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির। দুই দিন পুরী শহর ও এর আশপাশ ঘোরাঘুরি করে মোটামুটি একটা ধারণা হয়েছে। আজকেই আমার কলকাতার পথ ধরতে হবে। কিন্তু জগন্নাথ মন্দির না দেখে যাই কী করে? জীবনে আর আসা হয় না হয়!

দুরুদুরু বক্ষে সকাল সকাল উঠেই রওনা হলাম মন্দির দর্শনে। আমি এত ভোরে রওনা দিয়েছি যে তখনও মন্দিরে যাওয়ার বাস চালু হয়নি। কাজেই সমুদ্র সৈকতে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম।

সমুদ্র সৈকতে বেশ কয়েকটি উট রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের চড়ার জন্য। গলায় ফুল জড়িয়ে গায়ে রঙিন কাপড় দিয়ে উটগুলোকে সুন্দর করে সাজানো। উটের পিঠে ওঠার জন্য মই রয়েছে। উটের পিঠে চড়ে সৈকতে হাঁটতে বেশ মজাই লাগে। বাস না আসায় উটের পিঠে চড়ে একটি রাউন্ড দিলাম। বাংলাদেশে তো উট নেই। কাজেই এর আগে উটের পিঠে চড়া হয়নি। জীবনে কোনো শখ অপূরণীয় রাখতে নেই।

বাংলাদেশের কোনো সমুদ্র সৈকতে এখনও এই জিনিসটা চালু হয়নি। খুব শিগগিরই হয়তো চালু হয়ে যাবে। আমাদের দেশের কোনো সমুদ্র সৈকতে চালু হলে এই রাইড অত্যন্ত জনপ্রিয় হবে আশা করা যায়। কারণ বাংলাদেশের মানুষের উটের প্রতি প্রচুর আগ্রহ রয়েছে। এখানে উটের পিঠে চড়ে ২০০ মিটার ঘোরার জন্য জনপ্রতি ভাড়া ৬০ রুপি। বাচ্চাদের জন্য ৪০ রুপি। এক সঙ্গে ৪-৫ জন বসার জন্য সুন্দর করে হাওদা বসানো রয়েছে। এখানে একটি উট ৭০-৮০ হাজার রুপিতে পাওয়া যায়। প্রতিদিন খাবার বাবদ খরচ হয় ৩০০-৪০০ রুপি। কাজেই একটি উট চড়িয়ে দিনে ২০০০-৩০০০ রুপি আয় করা খুব একটা কঠিন না। পর্যটকরা দেখলাম বেশ ভালোই উপভোগ করেন উট সওয়ারি।

কিছুক্ষণ পরই বাস চলা শুরু হল। আমি একটি বাসে উঠলে ঘণ্টাখানেক পর মন্দিরের কাছে নামিয়ে দিল। বিশাল মন্দির। দূর থেকেই মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। মন্দিরের সর্বোচ্চ মিনারটিতে একটি ধ্বজা বা রঙিন পতাকা লাগানো। পতাকাটি ভোরের বাতাসে পতপত করে উড়ছে।

মন্দিরের সামনের রাস্তা বেশ চওড়া। অনেক সাধু-সন্ত রাস্তায় বসে ভিক্ষা করছে। লোকজন কেবল আসতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো এলাকা জমজমাট হয়ে উঠবে। আমি চিন্তা করছিলাম মন্দিরের ভেতরে ঢুকব না এখান থেকেই ফিরে যাব। গেটের কাছে গিয়ে দেখলাম কোথাও কোনো নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কিনা। তেমন কিছু নজরে পড়ল না। গেটে পোশাকধারী সশস্ত্র প্রহরাও রয়েছে। একটা বোর্ডে লেখা দেখলাম জুতা, মোবাইল, ক্যামেরা নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোকা যাবে না। মানুষের ব্যাপারে কোনো কিছু লেখা নেই। বুকে একটু সাহস এল। যাক জুতা ক্যামেরা রাখার নির্ধারিত জায়গায় রেখে এলাম। এ জন্য ১০ রুপি দিতে হবে। জুতা ক্যামেরা রেখে টোকেন নিয়ে নিলাম।

চওড়া পাথরের সিঁড়ি দিয়ে একেবারে মন্দিরের ভেতরে চলে গেলাম। ভেতরটা আধো-অন্ধকার। বাইরের চেয়ে বেশ ঠাণ্ডা। ভারী পাথরের দেয়াল থাকায় সূর্যের তাপ তেমন একটা ঢুকতে পারে না। দেয়ালে ফ্যান ফুল স্পিডে চলছে।

লোকজন ফুল চন্দন, মালা নিয়ে এসেছে পূজা দেয়ার জন্য। বেশ ভিড়। বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের ভিড় বেশি। অনেক পাণ্ডা পুরোহিতও রয়েছে। তারা পূজার অর্ঘ্য নিয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় দেখলাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে, প্রতি অর্ঘ্য প্রধান মূর্তি পর্যন্ত পৌঁছাতে একশ’ রুপি। পূজার আগুন জ্বলছে কোনায় কোনায়। সেখানে লোকজন গিয়ে আগুনের ওপর হাত রেখে আবার মাথায় গায় বোলাচ্ছে। পুরোহিতদের কাছে গিয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছে।

ভেতরের দেয়ালে নানা পৌরাণিক কাহিনীর ছবি আঁকা। এক জায়গায় দেখলাম, বোরাকের মত একটি ছবি। অর্থাৎ একটা সাদা ঘোড়ার পিঠে সাদা পাখা লাগানো। সামনে কয়েকজন দাড়িওয়ালা লোক দাঁড়ানো। মাঝে কোনো এক দেবীর ছবি। মনে হল মুসলিম শাসনামলের কোনো ঘটনার বর্ণনা হবে।

ভেতরে বেশিক্ষণ না থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারপর চারদিকটা একবার চক্কর দিলাম। প্রধান মন্দিরটা অনেক উঁচু। বিশ-ত্রিশতলা ভবনের মতো উঁচু। পাথরের ওপর পাথর বসিয়ে তৈরি। চারপাশে আরও অনেক ছোট ছোট মন্দির। মনে হল একেক দেবতার একেক মন্দির। সেখানে সেই দেবতার ভক্তরা পূজা দিচ্ছে। কয়েকজন পাণ্ডা আমাকেও জিজ্ঞেস করল আমি পূজা দেব কিনা? না সূচক উত্তর শুনে চলে গেল।

মন্দিরের সর্বত্র অসংখ্য বানর দৌড়াদৌড়ি করছে। ভক্তরা বানরকে খাবার দিচ্ছে। কোথাও কোথাও লেখা আছে বানর থেকে সাবধান! আমি আর কী করব। মন্দিরের ছায়ায় এক জায়গায় কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করলাম। এখানকার পরিবেশটি মনের ভেতর গেঁথে নেয়ার চেষ্টা করলাম। যেটা আমি যে কোনো প্রাচীন বা ঐতিহাসিক স্থানে গেলে করি। এই বিশাল স্থাপত্য নির্মাণে কত শত মানুষের কত শত চিন্তা পরিকল্পনা, শ্রম আর ঘাম ব্যয় হয়েছে, তাদের কথা স্মরণ করার চেষ্টা করলাম।

শত শত বছর ধরে এখানে মানুষ তাদের মনের আকুতি প্রকাশ করছে। ভক্তি জানাচ্ছে। তাদের মতের সঙ্গে আমার মিল না থাকতে পারে কিন্তু এই ভক্তিভাব প্রকাশের মধ্যে তো কোনো ভেজাল নেই। যার মনের যে আকুতি এখানে এসে অবলীলায় তা প্রকাশ করছে। এই প্রকাশের প্রতি তাদের নিষ্কলুস মনের শ্রদ্ধা জানাতে কোনো সংকোচ থাকতে পারে না। এরপর আস্তে আস্তে সামনে বের হওয়ার যে গেট পেলাম সে গেট দিয়েই বেরিয়ে এলাম। মজার ব্যাপর হল গেট থেকে বের হওয়ার সময় দেখি একটা সাইনবোর্ডে বেশ বড় করে ইংরেজিতে লেখা- Only Hindus are allowed.

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×