মিউজিয়ামের শহর ওয়াশিংটন ডিসি

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  প্রণবকান্তি দেব

ওয়াশিংটন ডিসি এমন এক শহর, যেখানে সময়ের চোখ আটকে যেতে পারে রূপ, সৌন্দর্যের জাদুময়তা দেখে। পৃথিবীর এক প্রাচীন শহর আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি। নানা কারণে তাবৎ দুনিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুও এই নগরী। ব্রিটিশদের আক্রমণে এ নগরী ১৮১২ সালে আক্রান্ত হলে পরবর্তীতে আবারও ঢেলে সাজানো হয় নতুন করে। সেই থেকে এর নাম এলো ‘হোয়াইট হাউস’।

আমেরিকান সরকারের আমন্ত্রণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাগত দক্ষতা বিনিময় প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ থেকে মনোনীত হই। বিশ্বের আরও তেরোটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অংশ নেয়া এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ভাষা আর শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেয়া। কর্মসূচির উদ্বোধন হয় ওয়াশিংটন ডিসিতে। এ প্রোগ্রামের অন্যতম সহযোগী সংস্থা ‘কালচারাল ভিসতা’ এর সেমিনার হলে আনুষ্ঠানিকতার পর আমেরিকার রাষ্ট্র ব্যবস্থা, প্রশাসনিক অবকাঠামো এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন প্রফেসর রডস। তিনি জানালেন, ‘আপনারা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে যা কিছু নিয়েই ভাবেন না কেন দেখবেন আমেরিকায় তার ওপর পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে’, এ থেকে জানতে পারবেন আমেরিকার পড়াশোনার ব্যাপকতা। এর পরই শুরু হয় মিউজিয়াম পরিদর্শন। প্রথমেই ‘হোয়াইট হাউস’। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এই ভবনের দিকে আমাদের কালো রঙা বাসটি এগুতেই হৃদয়ে ভর করে উত্তেজনা। রাস্তার পাশ ধরে সারি সারি চেরি ফুল যেন স্বাগত জানাচ্ছে আমাদের। তারকা চিহ্নিত আমেরিকার পতাকা পতপত করে উড়ছে, তার সঙ্গে যেন আমাদের আবেগ মেলেছে ডানা। সারা পথ জুড়ে হোয়াইট হাউসের ইতিহাস শুনালেন গাইড।

হোয়াইট হাউস চত্বরজুড়ে সারি সারি গাছ, ফাঁকেফাঁকে চোখ ধাঁধানো স্মৃতিস্তম্ভ। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের আনাগোনা, সময়কে ধরে রাখতে ব্যস্ত ক্যামেরা-আকাক্সক্ষা প্রিয় হোয়াইট হাউস যেন থাকে ফ্রেমের ভেতর। আমাদের দেশের সরকারি ভবনগুলো যেভাবে ঘিরে রাখে পুলিশ বাহিনী, সেখানে হোয়াইট হাউসের মতো ভবনের আশপাশে মাত্র ২/৪ জন পুলিশের দেখা পেলাম। কারও সঙ্গে তাদের কথা নেই। নিজ নিজ কাজেই মনোযোগ তাদের। হোয়াইট হাউসের সাদা দেয়াল থেকে উৎসারিত উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের ওপর। ওয়াশিংটনে তখন বসন্ত আসি আসি করছে। আশপাশে বাউরি বাতাসে উড়ছে বাদামি চুল। নিপুণ শিল্প সুষমায়, মনোহর কারুকার্যময় স্থাপনা, নানা রঙের ফুল, বৃক্ষে গোছানো পুরো এলাকা। যতবার চোখ পড়েছে ওই ভবনে, একটা অবাক শিহরণ ছুঁয়ে গেছে হৃদয়জুড়ে। এই সেই স্থান, যেখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় পুরো আমেরিকা, কখনও কখনও পুরো দুনিয়া।

‘হোয়াইট হাউস’ ছাড়াও ওয়াশিংটনে রয়েছে দেখার মতো অসংখ্য স্থাপনা। ওয়াশিংটন মনুমেন্ট যেন মাথা উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস হয়ে। দুপুরের কড়া রোদে মনুমেন্টের সামনে নীল জলের ওপর আছড়ে পড়ছে মায়াবী ছায়া। কী অপরূপ এ দৃশ্য! তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, সারি সারি মিউজিয়াম.... এক জীবনে আমাদের দেখার কিংবা স্বপ্ন-কল্পনার যা কিছু থাকতে পারে তার সবই থরে থরে সাজানো এসব মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামগুলো একটা আরেকটার গা ঘেঁষে রয়েছে। যেমন আছে আমেরিকান হিস্ট্রি মিউজিয়াম, তেমনি আছে আফ্রিকান, ভারতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের মিউজিয়ামও। মোট কথা, পুরো বিশ্বকে তুলে এনে বসানো হয়েছে যেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। ইতিহাসের গৌরব গাথাকে তারা যে মমতা দিয়ে সংরক্ষণ করেছে সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে আমাদের। হাইকোর্ট ভবন, ক্যাপিটল ভবন, জেফারসন মেমোরিয়াল, লিংকন মেমোরিয়াল পরিদর্শনের সময় কেবলই মনে হয়েছে ইতিহাসের প্রতি বাঙালিদের কী অবহেলা! লিংকন মেমোরিয়ালের প্রবেশপথেই কী সুন্দর করে লেখা, ও যধাব ধ ফৎবধস! ছুঁয়ে দেখতেই অগণিত স্বপ্নের স্ফুলিঙ্গ যেন ছড়িয়ে পড়ল মন-মগজে। একেকটা মিউজিয়াম ভালো করে ঘুরে দেখতে যে সময় প্রয়োজন ছিল তা আমাদের হাতে ছিল না। মুগ্ধ হয়েছি ওদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। মিউজিয়ামগুলোতে ঢুকতেই দেয়া হয় ম্যাপ। প্রায় প্রতেকটি মিউজিয়ামেই রয়েছে গাইডের ব্যবস্থা। তাছাড়া প্রতিটি বিষয়েরই সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে স্থানে স্থানে। পর্যটকদের আগ্রহ মেটাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিরও ব্যবহার রয়েছে এসব মিউজিয়ামে। অন্যদিকে, আধুনিক বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির মিশেলে সাজানো প্রত্যেকটি স্তর। ন্যাচারাল হিস্ট্রি কিংবা এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম পরিদর্শনের সময় বারবার রোমাঞ্চিত হয়েছি। আমাদের জীবন ও প্রকৃতির বিবর্তন প্রক্রিয়া, ডারউইনবাদ কি চমৎকারভাবে বিস্তৃত আছে সেখানে। এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামে এক টুকরো চাঁদ ছুঁয়ে দেখার উত্তেজনা বহুদিন মনে থাকবে। তাছাড়া, আমেরিকানদের যুদ্ধ বিমান, যুদ্ধ জাহাজসহ নানা সমরাস্ত্রের নমুনা দেখার সুযোগ পাওয়া গেল মিউজিয়ামে।

মিউজিয়ামের বেশিরভাগেরই প্রবেশ ফি নেই। প্রতি বছর ১৮ থেকে ১৯ মিলিয়ন মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এই শহরে আসেন নিজেদের জ্ঞান পিপাসা মিটাতে। জানা যায়, এই শহরের আয়েরও একটি বড় ক্ষেত্র হল পর্যটন। তবে, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি অনুসন্ধিৎসু মানুষের জন্য এ এক পরম পাওয়া। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জীবন ও ইতিহাস সংরক্ষণে আমেরিকা সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রশংসা না করে পারা যায় না। এসবের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ডিসিতে রয়েছে ‘নিউজিয়াম’ নামে একটি মিডিয়া জাদুঘর। আপনি স্বপ্ন কিংবা বাস্তবে যা কিছুই দেখতে চাইবেন ওয়াশিংটন ডিসিতে তার জন্যও জাদুঘর রয়েছে। তাই মনে হয়, এটা যেন মিউজিয়ামেরই শহর।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অ্যালামনাই, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট