স্বদেশে এসে প্রবাসীর মুখটা মলিন

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  জমির হোসেন

দেশান্তরিত হয়েছেন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি। উন্নত জীবন পরিবারের সুখ আর মুখ ভরা হাসি কিনতে নিজের সুখকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন তারা। কেউ সুখী, কেউ আবার জেলজীবনের সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ করে ভাগ্য উন্নয়নে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন স্বদেশে। দিন-রাত পরিশ্রম করে মাস শেষে যে বেতন তার সবই দেশে পাঠিয়েছেন। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে উপার্জন করেন। টাকা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখেন। কারও কারও দুঃখ, জীবন-যৌবন ক্ষয় করা টাকা দেশে পাঠিয়ে নিজেরা থাকেন শূন্য হাতে। এমন অসংখ্য প্রবাসী আজ দুঃখ-দুর্দশায় জীবন পার করছেন। ইচ্ছা করলেই এখন আর আগের জীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

পরিবারের চাহিদা মেটাতে হরহামেশা মানসিক বিপর্যয়বরণ করছেন। মানসিক চিন্তার ফলে অকাল মৃত্যুর ঘটনাও আছে। রোম বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) এরফানুল হকের তথ্য অনুসারে ২০১৭ অর্থবছরের ২০১৮ মার্চ পর্যন্ত ৮৩ জন ইতালি প্রবাসী মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই মারা যান ৭২ এবং চলতি বছরের মার্চের হিসাব মোতাবেক ১২ জনের বেশি। প্রবাসে মরেও শান্তি নেই। লাশ নিয়ে চলে টানাহেঁচড়া।

সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে হিমাগারে লাশ পড়ে থাকে অনেক দিন। আর যদি আত্মীয়স্বজন না থাকে তবে তো মরার পরও দুর্ভোগের শেষ নেই। লাশের তদারককারী কেউ থাকলে বাংলদেশ দূতাবাস অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে। দুই বছরে ৮৩ লাশের মধ্যে দেশে পাঠাতে দূতাবাস ১৭ জনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ১২ জনকে ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে ৫ জনকে। দেশে লাশ পাঠাতেও দুর্ভোগের শেষ নেই। কারণ বাংলাদেশের বিমান নেই ইতালিতে। ভিন দেশের বিমানে মৃতদেহ ট্রানজিট ঝামেলায় পড়ে। আট ঘণ্টার বদলে প্রায় পনেরো ঘণ্টা লেগে যায় দেশে পৌঁছতে।

পরিবারের লোকজন মনে করে প্রবাসীরা কত সুখে না জানি আছে বিদেশ গিয়ে। কতটা যে সুখে আছেন তারাই জানেন যারা বিদেশে থাকেন। দেশে পরিবার-পরিজন তাকিয়ে থাকেন বিদেশ থেকে কবে টাকা আসবে। আর একের পর এক আবেদন আসতেই থাকে। আজ এটা লাগবে, কাল ওটা লাগবে। এটা নেই, ওটা নেই। নেই নেই বুলি শুনতে শুনতে প্রবাসীদের মন ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ না ফেরার দেশে চলে যান। আয়ের চেয়ে চাহিদা বেশি হওয়ায় অকালে ঝরে পড়ে অনেক জীবন।

যেসব পরিবার প্রবাসীর আয়ে চলে তাদের তখন দুঃখের সীমা থাকে না। কোনো প্রবাসীর মৃত্যু মানে মাসে মাসে ডিম পাড়া একটি মুরগি কমে যাওয়া। তাতে দেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব পড়ে বছরের হিসাব টানতে গেলে তা বোঝা যায়। এখানে প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিটের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় কষতে হয়। তা না হলে মাস শেষে হিসাব মিলানো কষ্ট হয়ে যায়। সময়ের রাশ ধরে ছুটে যেতে হয়। টগবগে যুবক পাড়ি জমায় বিদেশে। বার্ধক্যে শেষ ঠিকানা হয় সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। প্রবাস জীবন সাহসের সঙ্গে পার করতে হয় একেকজন রেমিটেন্স যোদ্ধাকে। ভাগ্যের চাকা সচল রাখতে দিনরাত খাটতে হয় প্রবাসীকে।

প্রবাস এমন একটা জায়গা একদিন অসুস্থ হলে দেখার কেউ থাকে না। সময়ের অভাবে কেউ কারও জন্য কিছু করতে পারে না। ‘রানার চলছে রানার’-এর মতো চলতে থাকে বিরতিহীন জীবন। কর্মে পিষ্ট হয় ক্ষুধার্ত জীবন। বিনোদন যেন তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। সুখে না থেকেও সারা বছর সুখের অভিনয় করেন তারা।

মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ কোম্পানিতে ভোর চারটা-পাঁচটায় কাজে রওনা দিতে হয়। সেই তুলনায় ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা ভালোই আছেন। নিজের দেশের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন। ইচ্ছা করলেই ব্যবসা করতে পারছেন। যখন ইচ্ছা দেশে যেতে পারেন। যা মধ্যপ্রাচ্যে স্বপ্ন। সেখানে নিজের পাসপোর্টটি পর্যন্ত কোম্পানির কাছে জমা রাখতে হয়। এত কষ্ট মেনে নিয়ে দেশের রেমিটেন্সের চাকা সচল রাখতে কাজ করছেন দিন-রাত।

যখন দেশে ফেরার সময় হয় বাংলাদেশে পৌঁছামাত্রই হয়রানি শুরু হয়ে যায়। সারা বছর পরিশ্রম করে দেশে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে এসে বিমানবন্দরে অযৌক্তিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অহরহ। অথচ অন্য দেশের ইমিগ্রেশন স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ায়। দেশের বিমানবন্দরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর নাম জপতে শুরু করেন পরবাসীরা। মাছের মতো এদের জালে আটকানোর চেষ্টায় থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পোষ্যদের মাঝে কয়দিন আনন্দে কাটাতে এসে স্বদেশেই বহিরাগতের তিক্ত স্বাদ পান তারা। হায় আমার স্বদেশ কবে তুমি প্রবাসীর দুঃখ বুঝবে।

এই ঋণ বাড়ছে প্রতিদিন

স্বদেশে এসে প্রবাসীর মুখটা মলিন।

অথচ সরকারের উচিত বিমানবন্দরে এক একজন প্রবাসীকে ভিআইপির মর্যাদা দেয়া। কারণ প্রবাসীদের কাছে দেশ যুগ যুগ ধরে ঋণী হয়ে আছে।

লেখক : ইতালি প্রবাসী সংবাদকর্মী