বৈশাখী মেলার স্মৃতি কিছু কথা

এখন তো যাত্রার প্যান্ডেল চোখেই পড়ে না। যাও দু-একটা দেখা যায়, নদীর পাড়ে কিংবা জনপদের এক প্রান্তে- এতটাই অস্পৃশ্য হয়ে গেছে! আজ বৈশাখী মেলা গ্রাম থেকে উঠে এসেছে শহরের উদ্যানে ও রাজপথে। ফলে সে তার আদি-আসল চেহারা হারিয়ে ফেলেছে। কাক ধারণ করেছে ময়ূর পুচ্ছ!

  সরকার মাসুদ ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্লাস সিক্সে বা সেভেনে পড়ার সময় আমি প্রথম বৈশাখী মেলায় যাই। ছোট দাদা মনিরউদ্দিন সরকারের হাত ধরে মেলায় যেতাম। ছোট দাদা ভোগী টাইপের মানুষ ছিলেন। গান-বাজনা ভালোবাসতেন, যাত্রা-জারি এসব দেখতেন; আবার নামাজ-কালামও পড়তেন। আমি বেড়ে উঠেছি রংপুর শহরে, পিতার চাকরিসূত্রে। কিন্তু মেলার সময়টায় আমি দাদাবাড়ি চলে যেতাম- নতুন অনন্তপুরে। এটা কুড়িগ্রাম জেলার একটা গ্রাম। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ওখানে রিকশা চলত না। ধূলিভরা মাটির রাস্তা ছিল। আর ছিল গরুর বা মোষের গাড়ি। সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ, মহিলা এবং মালপত্র আনা-নেওয়া করা হতো ওইসব গাড়িতে। যা বলছিলাম, বৈশাখ মাসে মেলায় যাওয়ার মৌসুমে ছোট দাদার নিয়মিত সঙ্গী ছিলাম আমি। পরে অবশ্য আলতাফ চাচা (ছোট দাদার একমাত্র ছেলে) এবং গ্রামে আরও কারও কারও সঙ্গে মেলায় গেছি।

সে সময় আমার দাদাবাড়ি থেকে ৪-৫ মাইলের ভেতর অনেক মেলা ছিল। মেলা বসত চৈত্রসংক্রান্তিতে। কোনো কোনোটি বৈশাখের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে। আবার মাসব্যাপী মেলাও ছিল। এ সবের মধ্যে তিনটা মেলার কথা খুব মনে পড়ে। হাতিয়ার মেলা, সিদ্ধেশ্বরীর মেলা আর জানজাগিরের মেলা। আমাদের বাড়ির সবচেয়ে কাছে জানজাগির- বড়জোর দুই কিলোমিটার হবে। ছোট মেলা; কিন্তু এর প্রধান আকর্ষণ ছিল লাঠিখেলা। মেলা বসত দুপুরের পর। আলতাফ চাচার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি। মোয়া চিবাচ্ছি আর খেলা দেখছি। গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। যারা বেশ লম্বা তারা অন্য মানুষের মাথার ওপর দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। মাঝখানে দু’জন লাঠিয়াল। একজন বেশ হালকাপাতলা এবং খাটো। অন্যজন প্রায় দৈত্যের মতো। হালকা-পাতলার ভাব-ভঙ্গি কিন্তু দেখার মতো। লাঠি ঘোরাতেও পারে ভালো। দৈত্যের তেমন ভঙ্গি নেই, তবে কৌশল আছে, যদিও লাঠি তার বেশি ঘোরে না। লম্বা লাঠি অন্যপ্রান্তটি অনেকক্ষণ মাটিতে ছেঁছড়ে এনে ‘হু-ই-ই-ই’ শব্দ করে, ঘুরে গেল পাতলা লোকটি। দৈত্যের পিঠে সেই লাঠি পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাতলা লাঠিয়ালের পাছায় আঘাত করল দৈত্যের বাঁশ। হৈ হৈ করে উঠল সমবেত লোকজন। একটু পরে পাতলা লাঠিয়ালের মুখে আবার সেই ‘হু-ই-ই-ই’ এবং তার লাঠি ঘুরে আসার আগেই তারই পিঠে দৈত্যের লাঠির আঘাত! সশব্দে হেসে উঠেছে জনতা। লাঠি খেলা পরিণত হয়েছে জমজমাট কৌতুকে।

জানজাগির গ্রামের মেলার কথা মনে পড়লেই সবার আগে আমার চোখে ভাসে ওই দৃশ্যটি। হাতিয়ার মেলা এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মেলা। এক সপ্তাহ ধরে চলে। উলিপুর থানার হাতিয়া ইউনিয়ন ব্রহ্মপুত্রের কাছাকাছি। ইউনিয়নের নামেই মেলার নামকরণ হয়েছে। থানা সদর থেকে সাত মাইল দূরে হাতিয়া। ছোটবেলায় ২-৩ বার গিয়েছিলাম। ঘোড়ার দৌড় হতো, সকাল এগারোটা নাগাদ। শুধু এই ঘোড়দৌড় দেখার জন্যই সমবেত হতো পাঁচ-সাতশ’ মানুষ। আমোদপ্রিয় জনতা সঙ্গে আনত বেলুন, ব্যানার, লম্বা লেজযুক্ত পতাকা। রীতিমতো উৎসব আর কী! এই মেলার বৈশিষ্ট্য ছিল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দর্শনার্থী বাড়তে থাকা। আড়াইটা-তিনটা নাগাদ পরিণত হতো জনসমুদ্রে। আবার বিকাল পাঁচটার পর কমতে থাকত মানুষ। দোকানপাট খোলা থাকত মধ্য রাত পর্যন্ত। রাত ন’টার পর ওখানে থাকত প্রধানত জুয়াড়িরা। আমার সবচেয়ে ভালো লাগত ঘোড়দৌড়। আর বাঁশ+কাগজ দিয়ে তৈরি ঘোড়া, উট, মিনার এসব নিয়ে আসত গ্রামের মানুষ। এসব মিলে শোভাযাত্রাও হতো। তখন ওই কাগজের ঘোড়া উট, মিনার বহনকারী লোকজনের পেছনে পেছনে মেলায় আসা লোকজনও দলবেঁধে ঘুরে আসত মেলার বিশাল প্রাঙ্গণ। এ ছবিটা আমার মাথায় সেঁটে আছে আজও। ষাট বা তারও বেশি বয়সের মানুষেরা চাইত ভিড় খুব বেশি হওয়ার আগেই মেলা ঘুরে আসতে। সে জন্য তারা রওনা দিত সকাল-সকাল। যাথাসম্ভব দ্রুত হাঁটত তারা। তারপরও কেউ কেউ পিছিয়ে পড়লে এগিয়ে থাকা লোকরা বলত, হাঁটো বাহে; বেলা হবার নাগছে! রাস্তা শর্টকাট করার জন্য মানুষ সড়ক ধরে না গিয়ে যেত জমির মাঝখান দিয়ে পায়ে-হাঁটা পথ ধরে। তথাপি রাস্তা ফুরাতে চায় না। সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়ত বৃদ্ধা ও শিশুরা। তারা হাঁটতে হাঁটতে একসময় দাঁড়িয়ে পড়ত। কেউ কেউ বসে পড়ত আলের ওপর। ছোটরা যাত্রার শুরুর দিকে হেঁটে-দৌড়ে এগোতে থাকলেও ঘণ্টাখানেক পর ঝিমিয়ে যেত। তখন বড়দের মধ্য থেকে কেউ হয়তো মুখ ঝামটা দিয়ে বলে বসত, এহ্ হাটপার পায় না; মেলা যাওয়ার শক! ফির আসপু? ক! বাচ্চাদের সে সময় প্রায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা।

সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সিদ্ধেশ্বরীর মেলার কথা। সাধারণ মানুষের কাছে এটা পরিচিত ‘ঠাকুরবাড়ি মেলা’ নামে। এই মেলায় অনেকবার যাওয়া হয়েছে আমার। মামাবাড়ির খুব কাছে মেলার প্রাঙ্গণ। সেটি একটা কারণ। অন্য কারণ হচ্ছে, মেলাটি একমাস ধরে চলে। প্রতিদিন না। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার। হাটের মতো। উলিপুর-বাগুয়া অনন্তপুর সড়কের মাঝামাঝি একটা জায়গায় আরেকটা রাস্তা ঢুকে গেছে ধামশ্রেণি গ্রামের দিকে। ওই পথ ধরে আধা ঘণ্টা হাঁটলেই আপনি পাবেন ঠাকুরবাড়ি। ওই রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য সোনালু গাছ- বিরাট আকৃতির লম্বা লম্বা দুলের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ হলুদ ফুল ঝুলে আছে। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবলই ওই গুচ্ছ ফুলের অনিঃশেষ সারি যেন গাছের শাখায় নয় ঝুলে আছে চিরপল্লীবালাদের লজ্জাশিহরিত কানের লতিতে লতিতে! চড়কগাছ আমি প্রথম দেখি সিদ্ধেশ্বরীর মেলায়। পিঠের চামড়ায় বিশাল বড়শি বাঁধা ঝুলন্ত একজন মানুষ চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে- এ দৃশ্য কোনোদিন ভুলবার নয়। অসংখ্য মানুষের মাঝখানে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা আমার কিশোর মন সেদিন বারবার বলে উঠেছিল, কী করে সম্ভব! কী করে সম্ভব! মেলা প্রাঙ্গণে ঢোকার একটু আগে গোঁসাইবাগানটা চোখে পড়তই। হাজারীদের নানা গাছভরা অন্ধকার-অন্ধকার বিরাট সেই বাগান। আমার ভয়-ভয় করত। আর গাঙুলিদের পুকুরপাড়ে ফুটে থাকত থোকা-থোকা সাদা ভাঁটফুল; আ! জীবনানন্দের ভাঁটফুল!

সিদ্ধেশ্বরীর মেলার আরেকটা আকর্ষণ ছিল জুয়াখেলা। হাতিয়ার মেলায় জুয়া হতো রাতে। কিন্তু এখানে চলত সারা দিন। ছেলেবেলায় হাবিবুর মামার সঙ্গে যেতাম। মেলায় ঢুকেই মামা প্রথমে আমাকে নিয়ে যেতেন মিষ্টির দোকানে। জিলেপি এবং নানারকম মিষ্টি আর খাজা-গজা সাজিয়ে বসে থাকত দোকানিরা। আমার পছন্দ ছিল পাতলা শিরার শাদা মিষ্টি, এখন যেটাকে স্পঞ্জ-রসগোল্লা বলে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে মামা আমাকে নিয়ে হাজির হতেন সেই জায়গায় যেখানে জুয়াড়িদের আড্ডা। ছক্কা-জুয়াটা বেশ মজার। লুডোর ছক্কার মতোই দেখতে বিরাট এক ছক্কার দান দেয়া হতো পাতলা টায়ার দিয়ে তৈরি মগে করে। ছক্কা ওই মগের ভেতর রেখে যখন চাদরের ওপর ঢালা হতো সেই মুহূর্তে ‘গাবাউ’ করে শব্দ হতো একটা! অদ্ভুত শব্দটা এখনও শুনতে পাই আমি। আরেক ধরনের জুয়ার কথা মনে পড়ে। পানির ওপর মাঝারি সাইজের কয়েকটা টিনের থালা ভাসছে। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ওই প্লেটগুলোর ওপর কয়েন ফেলতে হবে। এক টাকার কয়েন। মনে হবে কাজটা খুব সোজা। কিন্তু পয়সা থালায় পড়ামাত্র লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে যায়। পানিতে পড়ে গেলে লোকসান। আর প্লেটের ওপর থাকলে দ্বিগুণ টাকা পাবে নিক্ষেপকারী। দেখা গেল, প্রতি ৫-৭ জনের মধ্যে ১-২ জন সফল হচ্ছে।

হাবিবুর মামা এই খেলাটা খুব পছন্দ করতেন। আমাকে সঙ্গে নিয়ে ৪-৫ বার খেলেছেনও। লাভ করতে পারেননি। কেবল একবার মূল টাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিশ টাকা। তাতেই তিনি মহাখুশি! আমার বাঁ হাত ধরে দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন আসর থেকে।

সিদ্ধেশ্বরীর মেলা প্রধানত হিন্দুদের মেলা। কিন্তু শত শত মুসলমানও এতে যোগ দিতেন। উৎসবটা তাদেরও ছিল। ছেলেদের পাশাপাশি দলবেঁধে মেয়েরাও আসত। তারা শুধু মিঠাই-মণ্ডা নয়, নানা ধরনের নানা আকৃতির মাটির পুতুলও কিনে নিয়ে যেত। মনে আছে, আমি একবার ওই মেলায় কিনেছিলাম একটা মাটির, রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের গলাটা কায়দা করে স্প্রিং দিয়ে যুক্ত করা ছিল। আঙুল দিয়ে একটু নাড়া দিলেই অনেকক্ষণ ধরে মাথা ঝাঁকাত। রংপুর শহরের কালেকটরেট ময়দানে, স্কুলে পড়ি তখন, মহররমের মেলা বসত। সেখানেও দেখেছি, মুসলমানদের পাশাপাশি অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ভিড় কম ছিল না। তা সত্ত্বেও মেলায় আগত যুবকরা ভিড়ের সুযোগ নিয়ে তরুণীদের গায়ে হাত দিত না। এখন অনেকেই এই কুকর্মটি অবলীলায় করে ফেলে। সে যুগে এটা করার কথা ভাবতেই পারত না ছেলেরা। তারা বড়জোর ‘কী দিদিঈ আল্তা কিনবা না!’ অথবা ‘একলা না কি?’-র মতো দু-একটা সরল মন্তব্য করত।

গ্রাম-বাংলায় বিনোদন বলতে আজ আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। পনেরো-বিশ বছর আগেও কিছু কিছু ছিল। নানা উপলক্ষে জারি, যাত্রা, মেলা পুতুল নাচ এসব হতো। এখন তো যাত্রার প্যান্ডেল চোখেই পড়ে না। যাও দু-একটা দেখা যায়, নদীর পাড়ে কিংবা জনপদের এক প্রান্তে- এতটাই অস্পৃশ্য হয়ে গেছে! আজ বৈশাখী মেলা গ্রাম থেকে উঠে এসেছে শহরের উদ্যানে ও রাজপথে। ফলে সে তার আদি-আসল চেহারা হারিয়ে ফেলেছে। কাক ধারণ করেছে ময়ূর পুচ্ছ!

তেইশ বছর পর, গত ২০১৬ সালে, শেষবার গিয়েছিলাম সিদ্ধেশ্বরীর মেলায়। বেদনায় হু-হু করে উঠল মন। এত কম এত কম মানুষ! শ’তিনেকও হবে না। অথচ ওই সময়ের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। পরে ভাবলাম, লোকজন মেলায় আসবে কি; মান হারানোর ভয়ে আর প্রাণ হারানোর আতঙ্কে তারা সিঁটিয়ে আছে! ধর্ম ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত হুমকি দিয়ে চলেছে। একাধিক সমাবেশে তাদের ‘সৈনিক’রা বোমা ফাটিয়েছেও। আগেও আমরা বাঙালি ছিলাম, মুসলমানও ছিলাম। এখনও তা-ই আছি। আগে ছিল সৌহার্দ্য-ভ্রাতৃত্ব-শান্তি। এখন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানরা আর আমার ভাই নয়। কেননা আমরা আজ বড় বেশি মুসলমান হয়ে গেছি। আজ মেলা নেই মিলমিশ নেই ভালোবাসা নেই। হত্যার রাজনীতি ও সব ধরনের বাড়াবাড়ি যে-কোনো ধর্মেই নিষিদ্ধ, এ কথা ভুলে গেছে প্রায় সবাই!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×