হারানো হালখাতার খোঁজে

  মুহম্মদ সবুর ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভ্যাপসা গরম, চৈত্রের কাঠফাটা রোদ, ধুলোর ওড়াউড়ি, ঘাম দরদর ঝরঝর হাল সব কিছু ছাপিয়ে যেত, হালখাতার টানে। সেই যে দোকান ঘুরে ঘুরে মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি, সবচেয়ে বড় কথা হালখাতায় নাম লেখানো- সে বড় সুখের সময়, সে বড় আনন্দের সময়। বৈশাখী মেলার চেয়েও নববর্ষের প্রথম দিনে হালখাতা টেনে নিত গঞ্জের দোকানে কিংবা শহরের বিপণি বিতানগুলোয়। মেলার রেশ অনেক দিনই থাকত। জুটত নানা বিনোদনের রকমারি জগৎ। হালখাতার খবর আগেভাগেই মিলে যেত। তা নিয়ে প্রস্তুতি চলত বেশ আগেই। নতুন জামাকাপড় কী করে যে মিলে যেত; পৈতৃক সূত্রে না হলেও।

চৈত্রসংক্রান্তির পঞ্চব্যঞ্জন শেষে হালখাতার জন্য প্রস্তুতিটা মন্দ ছিল না। ফিনফিনে পাঞ্জাবি-পায়জামা, চপ্পল, হাতে রুমালও থাকত। এই গরমেও সুগন্ধী মাখার চল ছিল। তা যে পরবর্তীতে কটুগন্ধতে পরিণত হতো, বলাই বাহুল্য। ‘চৈত্রে বৈশাখে খুব আমাদের আয়োজন হতো/ আনন্দ-আহ্লাদ হতো, মেলামেশা, প্রীতি সম্ভাষণ,/ গরিবের বাড়িঘরে সাজসজ্জা, গানের আসর/এইমতো চৈত্রনিশি সকলেই যাপন করেছি।/ করেছি ঢোলের বাদ্য, নৃত্যগীত, অষ্টমীর স্নান/ চৈত্রে বৈশাখে বেশ সকলের সমাদর হতো,/ এ গাঁওয়ে ও গাঁওয়ে সখ্য, দেখা, গলাগলিভাব/ বাংলার আদিশিল্প যেন এই বৈশাখের মেলা।/ দেখেছি গ্রামের পথে হেঁটে যায় বৈষ্ণব বৈষ্ণবী/ কী গান গেয়েছে তারা নেচে ওঠে বৈশাখের নদী;/ চৈত্রের আকাশ ডিঙ্গিয়ে বৃষ্টি নামে; মাতে শালবন/ চৈত্র-বৈশাখ যেন উদাসীন গাঁয়ের বাউল।/চৈত্রে-বৈশাখে খুব আমাদের মাখামাখি হয়/ মেলা, গান, আপ্যায়ন, খোলা গীতবিতান,/ কেউকি রেখেছে তোলে পুরাতন হালখাতার চিঠি/ সাধ হয় ফিরে যাই সেই প্রিয় চৈত্রে বৈশাখে।’/ এই চিত্র ষাট দশকের। যখন আমরা স্কুলছাত্র। আর কবি মহাদেব সাহা তখন তারুণ্য পেরিয়েছেন। আজকের বাংলায় হয়তো তার অনেকটাই মিলবে না আর। যেমন মেলে না আমার হালখাতার দিন। বণিক সভ্যতার বিকাশে প্রযুক্তির ব্যবহার হালখাতার নাম লেখার গৌরববঞ্চিত করেছে বৈকি। নববর্ষের শুভেচ্ছাসমেত হালখাতার চিঠিপত্র বাড়িতে আসা শুরু হয়ে যেত চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে। চৌষট্টি সালে কলকাতার ওয়াসেক মোলার দোকান থেকে আসা নববর্ষের শুভেচ্ছাসহ হালখাতার আমন্ত্রণ সংবলিত চিঠি বাড়িতে দেখেছি। চট্টগ্রাম শহরের জুয়েলারি দোকানগুলোর প্রায় নেমন্তন্নপত্র চৈত্রেই এসে যেত। কোনো আমন্ত্রণপত্রে থাকত ‘এলাহি ভরসা।’

কোনোটায় ‘নমোঃ গণেশায় নমোঃ, আবার কোনটায় ‘বুদ্ধনং শরণং গচ্ছামি, ধম্মং শরণং গচ্ছামি, সংযম শরণং গচ্ছামি’ কিংবা ‘ক্রুশ’ আঁকা। সব চিঠি জমিয়ে কিশোর তরুণরা ভাগ করে নিত কে কোন দোকানে যাবে। শ’খানেক আমন্ত্রণপত্র থেকে বাছাই করা হতো, দোকানের মান ও আপ্যায়নের পূর্ববর্তী গুণাগুণ থেকে। তবে পরিবারের পরিচিত বা ঘনিষ্ঠজনদের দোকনগুলো এড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল না। বাড়তি লাভও ছিল। হালখাতায় নাম তোলার জন্য ১ পয়সা বা পাঁচ পয়সা জমা দিতে আর হতো না। উল্টো পাঁচ-দশ টাকা পকেটে গুঁজে দেয়া হতো। বুঝতাম নববর্ষের উপহার; মেলা থেকে কেনাকাটার সুযোগ করে দেয়া যেন। এ ভাবে রোজগারটা সে সময় কম হতো না। আর সালাম ঠুকলে তো উপহারের পরিমাণটা বেড়ে এক থেকে দুইশ টাকায় দাঁড়িয়ে যেত। সে এক আনন্দের দিন, রোমাঞ্চকর সুখের দিন, পরম ভালোলাগা, চরম উত্তেজনার দিন। সেসব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত, ‘ মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাইনা’ যারা। আবেগ উথলে উঠত বৈকি। এমনিতেই হরেক কিসিমের আকারের রসগোল্লা, সন্দেশ, মণ্ডা-মিঠাই, নিমকি, দই, ফিরনি, মোরগপোলাও সাঁটার প্রতিযোগিতাও চলছে। রাত একটা-দুইটা গড়িয়ে যেত। দৈবাৎ নববর্ষের প্রথম দিনে কালবৈশাখী ঝড় হানা দিত। তবে তা বিকালের দিকে কিংবা রাত ১০টার পর। সে কারণে হালখাতা শুরু হতো সকাল থেকেই।

চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে পয়লা বৈশাখ মানেই ভিন্নতর আবাহন। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান, হরিজন, আদিবাসী সম্প্র্রদায়ের সহাবস্থান। তাই নববর্ষ এখানে আসে নানা বৈচিত্র্য নিয়ে। সবার বাড়িতে সবার আমন্ত্রণ- স্বতঃসিদ্ধ। খাবার আদান-প্রদানও চলে। পয়লা বৈশাখ মানেই হালখাতা। এমনটাই ছিল ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ শিক্ষিত সমাজে। বৈশাখী মেলার আবেদনও ছিল ভিন্নতর। চলত সপ্তাহব্যাপী। কিন্তু হালখাতা শুরু হতো পহেলা বৈশাখের সকাল থেকে। রাত গড়িয়ে যেত। হালখাতায় সপরিবারেও আসা হতো। মহিলাদের জন্য পৃথক আয়োজনও থাকত।

দোকানগুলো সাজানো হতো হরেক সাজে। কদিন ধরেই করা হতো সাফসুতরো। দোকানের সামনে কলাগাছ দিয়ে তোরণ। সুতোয় বাঁধা লাল নীল হলুদ সবুজ বেগুনি কাগজে সাজানো। দোকানের সামনে লেখা থাকত ‘শুভ নববর্ষ, শুভ হালখাতা।’ কলাগাছের তোরণের পাশে কলস-পানি; তুলসী পাতা, ঘটি ফুল গাঁদা ফুল।

রঙিন বাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়। দোকান ঘরের ভেতর গদিতে লালসালু, সাদা কাপড় দিয়ে তাক-তাকিয়া সাজিয়ে মহাজন-মালিক- বেশ ধবধবে পোশক পরে সুগন্ধী মাখিয়ে আসন পেতে বসতেন। দু’পাশে দাঁড়ানো পাঙ্খাওয়ালা এবং হিসাবরক্ষক বসা। লাল কাপড়ের মোড়কে নতুন মোটা হালখাতা, পাশে সুতোয় বাঁধা কালির দোয়াত কলম। সকাল ৭টায় আগর বাতি, ধূপধুনো জ্বালিয়ে শুরু হতো হালখাতার উদ্বোধন। ছিটানো হতো গোলাপজল। মহাজন খাতায় কলমের আঁচড় কেটে নতুন দিনটির শুভ সূচনা করতেন। ক্যাশ বাক্সের পাশে থাকত পঞ্জিকা। কোথাও দোয়া দরুদ, কোথাও মন্ত্র পাঠ দিয়ে শুরু হতো। হালখাতার আমন্ত্রণপত্র ক্রেতা; বন্ধু, প্রতিবেশী, বিদগ্ধজন, শুভার্থীদের আগেই পাঠানো হতো। বকেয়া হালনাগাদ করার জন্য সকালের দিকে ক্রেতারা টাকা নিয়ে আসতেন। বস্তাভর্তি করে টাকা নিয়ে আসার দৃশ্যও দেখেছি বক্সিরহাটে। বিকাল বা সন্ধ্যায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসতেন আমন্ত্রিতরা। পরণে সবার ধোপ দুরস্ত জামাকাপড়। আলিঙ্গন, করমর্দন (হ্যান্ডশেক), কুশলাদি জানা সবই চলত। সবার জন্যই অবারিত ছিল। দোকানের সামনে খোলা জায়গায় শামিয়ানা টানিয়ে অথবা দোকানের ভেতর সাজানো হতো পরিপাটি করে খাবারের ব্যবস্থা। নিমকি, রাবড়ি, দই, পানতোয়া, রসগোল্লা, সন্দেশ, কদমা, জিলিপি, রেশমি মিঠাই ইত্যাদি কোথাও একসঙ্গে মিলত। কোথাও তিনটির বেশি আইটেম থাকত না। বিভিন্ন দোকানিরা হাঁড়িভর্তি মিষ্টি পাঠাতেন তাদের ক্রেতাদের। অমন হাঁড়ি আসত কুমিল্লা থেকে। বাড়িতে দেখেছি রসে ভেজা ওই মিষ্টির স্বাদ ভোলার নয়।

ষাটের দশকের পহেলা বৈশাখের সকাল অন্য দিনের মতো হতো না। স্কুল ছুটি থাকত বলে পড়াশোর চাপ কম। তাই নববর্ষের জন্য প্রস্তুতিটা ভালোই নেয়া হতো। হালখাতা ছিল সার্বজনীন উৎসব। মূলত ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠান। তাই ব্যবসায়ী পরিবারগুলোয় এক ধরনের উৎসবের আমেজ শুরু হতো ক’দিন ধরেই। হালখাতার বিষয়টা অবশ্য অতি প্রাচীন। জমিদারের ‘পুণ্যাহ’ আদায়ের মতোই। তবে এর ভিন্নতা আছে। কৃষিপ্রধান বাংলায় নগদ পয়সা কৃষিজীবীদের হাতে আসত ফসলের মৌসুমে ফসল বিক্রি করে। নগদ পয়সার ব্যবহার তেমন ছিল না। পণ্যের বিনিময়ে পণ্য কেনা অথবা বাকিতে। কৃষিজীবীদের নগদ পয়সার সংস্থান থাকত না বলে বাকিতে সারা বছর পণ্য নিত দোকানি থেকে। বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ছোট ব্যবসায়ীরা বাকিতে দ্রব্য নিত।

পহেলা বৈশাখ নববর্ষের প্রথম দিনে সেই বাকির টাকা পুরো বা আংশিক শোধ করত ভোক্তারা। স্বাধীনতা পরবর্তী বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবর্তন, প্রযুক্তির ব্যবহার; বাকিতে পণ্য বিক্রির প্রথা হ্রাস ইত্যাকার কারণে হালখাতার আবেদন নেই আর। হালখাতা ছিল নববর্ষের উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। জীবনের জীর্ণ খাতাকে বদলে একটি নতুন খাতা খোলাই এর আদর্শিক লক্ষ্য- এভাবেও দেখা হতো। অর্থাৎ নতুনভাবে জীবন শুরু করাই যেন এর শর্তাবলী। এমনিতে বৈশাখের সঙ্গে সামন্ত সমাজের বৈষয়িক সম্পর্ক তীব্র। এ সম্পর্ক আবার পরস্পরবিরোধী শ্রেণী-পেশার মানুষের ব্যবসায়িক লেনদেনের। রাজার সঙ্গে প্রজার। সামন্ত প্রভুর সঙ্গে ভূমিদাসের। জমিদারের সঙ্গে রায়তের। ব্যবসায়ীর সঙ্গে ক্রেতার। সুদখোর মহাজনের সঙ্গে ঋণগ্রস্ত মজুরের। রাজার কর, জমিদারের খাজনা, ব্যবসায়ীর বকেয়া, মহাজনের দেনা পরিশোধের সময় নতুন বছরের শুরুর দিন পহেলা বৈশাখ। ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কথা লাভ এবং লোভ। ‘বাকির খাতায় শূন্য থাক’- এই হল উদ্দেশ্য। ‘ক্ষেতের কোনা বাণিজ্যের দুনা’- এই লৌকিক প্রবাদ হয়েছে বাসি। ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’ হল এ যুগের বাস্তবতা। আর এই ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে মূলত সম্পর্কটা বৈশাখের বেশ গভীর, গম্ভীর, বাণিজ্যিক। তবে এ কেবলই লাভালাভের বিষয় নয়। এ ভবিষ্যতের বাণিজ্যের ক্ষেত্রকে করে আরও প্রসারিত। ক্রেতা- বিক্রেতার সম্পর্কে আনে আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য, প্রীতিময়তা। এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে নানা লোকাচার বা লৌকিক সংস্কৃতির নানা দিগন্ত, উৎসবের আমেজ। হালখাতা তারই অঙ্গ। হালখাতা মানেই বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ হালনাগাদ। ব্যবসায়িক সালতামামি তো প্রতিটি মানুষেরই জীবনের অংশ। জীবনের খেরোখাতার নবায়ন হালখাতা। সামাজিক লেনদেনের সঙ্গে এই সংস্কৃতির সম্মিলন খুব গভীর। হালখাতায় থাকে ব্যবসায়ীর কায়কারবারের লেনদেন, বাকি-বকেয়া, উসুল আদায়-ইত্যাদির লিপিবদ্ধ রূপ। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় হালখাতা তো স্বাভাবিক রূপ। কাগুজে বা ধাতব মুদ্রার প্রচলন ঘটেনি যে যুগে, পণ্যের বিনিময়ে চলত পণ্য কেনাবেচা। এর হিসাব রাখা হতো রশিতে গেরো দিয়ে, মাচানের বাঁশের খুঁটিতে দাগ কেটে রেখে কিংবা অন্য কোনো দেহাতি পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতি আরও পরে তালের পাতায় লেখা বা তুলট কাগজের ‘চিরকুট’ বা হাত টোকার রূপ লাভ করে। এ ধারারই বিবর্তিত রূপ হালখাতা। নগদ পয়সার ব্যবহার না থাকায় বাকিতে পণ্য বিক্রি ছিল ব্যবসায়ের স্বাভাবিক অঙ্গ।

আর এ সবের হিসাব-নিকাশ চুকানোর জন্য গ্রামবাংলায় আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন ছিল। হালখাতার মূল বিষয়টি অর্থনীতি ও বাণিজ্য হলেও এর সামাজিক পরিধি ছিল ব্যাপক। বকেয়া শোধের মধ্য দিয়ে ভোক্তা আত্মমর্যাদা বা আত্মতৃপ্তি যে পেতেন, অবয়বে তা ফুটে উঠত। ব্যবসায়ী বছরের শুরুতে অর্থ পেয়ে সারা বছরের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা করে নিতেন। যিনি বকেয়া দিতে পারতেন না, ম্রিয়মান হলেও তাকে কেউ অসম্মান করত না। বরং অন্যদের সহানুভূতিই পেতেন। হালখাতা নিয়ে সে যুগে ব্যঙ্গ মন্তব্যও করা হয়েছে। প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী তো নববর্ষের দিন বাঙালি ব্যবসায়ীদের হালখাতা খোলার প্রসঙ্গে এ প্রথার অসারতা তুলে ধরেছেন। বলেছেন, ‘নতুন বছরের প্রথম দিনে হিসাবের নতুন খাতা খোলার পর তা শুরু হয় ধার বা পাওনা দিয়ে, সারা বছরেই এই নতুন খাতায় হিসাব নতুন করে লেখা হলেও তা এক রকমের পুরনো অনুবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। এর মধ্য দিয়ে নতুনের আদর্শ প্রকাশিত হয় না।’

আসলে হিসাবের খাতা নতুন খোলা হলেও তাতে আবার পুরনো প্রথাই অনুসৃত হতো। তারপরও হালখাতা নতুন বর্ষে ব্যবসায়ীদের কাছে নতুনভাবে ব্যবসা করার আদর্শ। চট্টগ্রাম শহরে ষাটের দশকে ব্যবসাকেন্দ্রিক অঞ্চল শুধু নয়, মহল্লার দোকানগুলোয়ও জাঁকজমকের সঙ্গে হালখাতার উৎসব হতো, মাইকে বাজত গ্রামফোন রেকর্ডের গান। কানন দেবী, কমলা ঝরিয়া, কেএল সায়গল, কে মলিক, বেচু দত্ত, শৈল দেবী, কেদারনাথ ভট্টাচার্য, সুধীরলাল চক্রবর্তী, আব^াসউদ্দিন আহমদের গ্রামোফোন রেকর্ডের গানের পাশাপাশি শামসাদ বেগম, সুরাইয়া, মোহাম্মদ রফি, লতার গানও বাজত। কীর্তনও বাজত। ব্যবসায়ীদের পছন্দের চেয়েও গান বাছাইয়ের ব্যাপারটা নির্ভর করত মাইকওয়ালার ওপর। তখনকার দিনে যারা মাইক ব্যবসা করতেন, তারা বক্তৃতা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গ্রামোফোন রেকর্ড বাজাতেন। চট্টগ্রামে এ রকম গ্রামোফোন রেকর্ডের দোকান ছিল দুটি। সারা বছর রেকর্ড বিক্রি হলেও বৈশাখের পুজোতে বিক্রির হিড়িক পড়ত। বহদ্দারহাট, চকবাজার, বক্সিরহাট, চাকতাই, আন্দরকিলা, দেওয়ানবাজার, ফিরিঙ্গীবাজারের প্রায় দোকানে বৈশাখে ফুলের মালা দেখা যেত। এত ফুল সে সময় কোথা থেকে জোগান হতো জানা নেই। বাকি না থাকলেও হালখাতায় যোগ দিলে কিছু টাকা দেয়া হতো। এটা কি জমা হিসেবে থাকত, নাকি উপহার- জানা ছিল না। আমরাও দিয়েছি, দিতে হয় প্রথা জেনেই।

কোনো দোকানে কোনো বাকি না থাকলেও অতিথি হিসেবে সম্মানের কমতি ছিল না। বেশ আপ্যায়ন করে হাঁড়ি বা বালতি থেকে রসে ভেজা রসগোল্লা, জিলাপি, আমিত্তি পেটে এসে যেত। একজন বেতের টুকরিতে করে নিমকি; লাড্ডু দিয়ে যেত। কাঁচের গ্লাসে পানি ঢালার জন্য লোক সার্বক্ষণিক থাকত। খাবার শেষে বেরিয়ে আসার সময় পরিবেশনকারীদের দু-চার পয়সা বকশিশ দেয়ার রেওয়াজ ছিল। জুয়েলারি দোকানগুলোয় সমাদর বেশি মিলত। খাবার দাবারও উন্নত মানের। অনেক ক্রেতাকে উপহার হিসেবে তারা কলম; কলমদানি, নোট বুক দিতেন। মুসলিম দোকানগুলোয় দুপুরে মুরগিপোলাও খাওয়ানো হতো। সম্ভবত সেদিন গো-মাংস ব্যবহার হতো না। সঙ্গে বোরহানি, জর্দাও থাকত। অলঙ্কার কেনার রেওয়াজ ও ছিল নববর্ষের দিনে। দামে রেয়াত মিলত, তদুপরি ভেজাল না থাকার এক ধরনের নিশ্চয়তা। শহরের বইয়ের দোকানগুলোয়ও হালখাতা হতো। সেদিন নতুন গল্পের বইও কেনা হতো। সব সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে হালখাতার অনুষ্ঠানে সম্মিলিত হওয়ার দিন; একাত্তরের যুদ্ধকালে আর মেলেনি। সেদিন যুদ্ধজয়ের হালখাতা খুলতে হয়েছিল স্ট্রেঞ্জে বসে, শক্রর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে।

হালখাতা অনুষ্ঠানে হিন্দুদের দোকানে গণেশ বন্দনা হতো। মুসলমানদের দোকানে মিলাদ। ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের অভিব্যক্তি ছিল অবশ্য তা।

সারা বছরের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে, আবার নতুন করে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাই শুধু যোগাত না হালখাতা। মানুষে মানুষে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে, নারী-পুরুষে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, বন্ধন, সামাজিকতা, আন্তরিকতা সর্বোপরি মহামিলনের পথ তৈরি করে দিত। হালখাতা টিকে আছে এখনও এ দেশে স্বল্প পরিসরে। প্রীতি-সম্ভাষণ আজো বিনিময় হয়। বিশ্বায়ন আর মুক্তবাজারের যুগে হালখাতা সব সময়ই হাল করে রাখা হয় এখন। বর্ষ শেষের হিসাব-নিকাশ চুকাতে আর ধৈর্য ধরে না। তবু হালখাতার হালচাল থেকে যাবে বণিক সভ্যতায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×