মৃত্তিকা মানুষ

  সাদিয়া সুলতানা ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুকের ঠিক মাঝখানে তীক্ষ্ম তীর হয়ে লতিফের শেষ কথাটি বিঁধে আছে। বিশেষ করে শহর ঘুমিয়ে গেলে যখন একাকী ঘরে নিঃসীম অন্ধকার প্রাচীন বটের মতো ঘাপটি মেরে বসে থাকে; তখন বিদ্যুৎরেখা সদৃশ স্মৃতিরেখা ঝলসে উঠে লতিফকে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। অদ্ভুতভাবে দৃশ্যমান সেই রেখা অন্ধকারে লীন হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মুচকি হেসে জানান দেয়, ‘তুমি পারোনি নিজামউদ্দিন, লতিফ পেরেছিল।’

প্রথম যেদিন আমি লতিফকে দেখি সেদিন আমার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়েছিল। আমি কখনও এমন গড়নের মানুষ দেখিনি। ওর গায়ের রং ছিল কুমারবাড়ির পোড়া মাটির মতো কালো আর ওর চোখজোড়া ছিল ভীষণ ম্লান ও নিষ্প্রাণ। ওর হাঁটাচলার মধ্যে ছিল অসাধারণ ক্ষিপ্রতা কিন্তু কণ্ঠস্বর ছিল রুক্ষ আর নিস্পৃহ। আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে খসখসে গলায় ও বলেছিল, ‘এই যে চাবি।’ আধ ময়লা লুঙ্গি আর মাড়হীন ফতুয়া পরা লতিফের চোখের দিকে তাকাতেই টের পেয়েছিলাম, মানুষটা চোখের পলক ফেলছে না। আমার মনে হচ্ছিল আমার সামনে রংহীন একটা মাটির পুতুল দাঁড়িয়ে আছে। আমি থতমত খেয়ে ওর কাছ থেকে রুমের চাবি বুঝে নিয়েছিলাম।

পাঠক হয়তো ভাবছেন গল্প জমানোর জন্য আমি লতিফের পরিচয় দিতে হেঁয়ালি করছি। আসলে তা নয়। গল্প না বলেই গালগপ্পো করে কালক্ষেপণ করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। খুব দেখেশুনে জীবনকে খরচ করে সত্তরে এসে ম্রিয়মান সন্ধ্যার মতো আয়ুকাল ধুঁকছে আমার। এ সময় কথার খেই হারিয়ে ফেলি ঠিকই কিন্তু প্রবঞ্চক হতে মন সায় দেয় না। তাই ভেবেছি, দেরি না করে লতিফের পরিচয় আপনাদের জানিয়ে দেব।

চল্লিশের কাছাকাছি বয়সের লতিফ ছিল আমাদের ওয়াপদা রেস্টহাউসের কেয়ারটেকার। ওর বাড়ি ছিল সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়ার আমতলার মোড়ে। সেখানে ওর মা, স্ত্রী আর দুই মেয়ে থাকত। পরিবারের কথা কখনও ও নিজমুখে বলত না। আমরা কেউ দশটা প্রশ্ন করলে অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ উত্তরগুলো সে এক বাক্যে সেরে ফেলত। লতিফ বেশিরভাগ রাতেই রেস্টহাউসে থাকত। সপ্তাহের দুই বা তিন রাতে নিজের পরিবারের কাছে যেত। মিলিটারিরা রেস্টহাউসে ক্যাম্প করার পর থেকে ও খুব কম দিনই বাড়ি ফিরত। আমি কখনও ওর পরিবারের কথা জানতে চাইলে লতিফ দুর্বোধ্য আর ঘোলা দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত তারপর ধীরে ধীরে বলত, ‘ওরা ভালো আছে।’

পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, লতিফকে নিয়ে করা প্রারম্ভিকতায় আমি অতীতকাল ব্যবহার করেছি এবং একবার বলেছি ‘লতিফ ছিল।’ অর্থাৎ লতিফ এখন নেই। যুদ্ধের কালে অনেক মানুষই হারিয়ে যাবে বা থাকবে না সেটাই তো স্বাভাবিক, তবু কেন আমার লতিফকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার প্রয়োজন হল? কী জানি হয়তো লতিফের চেহারা ও চরিত্রের মধ্যে ভিন্নরকম কিছু ছিল বলেই ওকে অনেক মানুষের মাঝেও আলাদা করে মনে রেখেছি। নতুবা যুদ্ধকালের কত স্মৃতিই তো উড়ুক্কু মেঘের মতো বিস্মৃতি হয়ে দূর আকাশে হারিয়ে গেছে। এই তো সেদিন যখন আমার নাতনি শব্দ প্রশ্ন করল, ‘দাদু, তুমি ২৫ মার্চ রাতে কোথায় ছিলে?’ সেই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না যে, আমি একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে কোথায় ছিলাম। সেদিন মন এমন ভারাক্রান্ত হয়েছিল যে তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি আরও বড় প্রতারক হয়ে ওঠার আগেই আপনাদের লতিফের কথা জানিয়ে যাব।

আসলে স্বল্পভাষী আর নীরস ধরনের মানুষ কেয়ারটেকার লতিফের সঙ্গে আমার কিছু দমবন্ধ করা স্মৃতি আছে। আমার আজও মনে আছে, সেদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে কারফিউ জারি হয়েছিল। পাকিস্তানি মিলিটারিদের নির্দেশে রাজাকাররা বিকাল থেকেই সারা শহরে মাইকিং করে কারফিউর ঘোষণা দিয়েছিল। কারফিউর সময়ে প্রতিটা ঘনায়মান সন্ধ্যা মৃত্যুরই ইশারা করত। আর সেই রাতগুলোও এত দীর্ঘ আর মিশমিশে আঁধারের হতো যে সহজে ফুরাতে চাইত না। অজগরের মতো হাঁ করে গিলে খাওয়ার ভয়াবহতা নিয়ে ঘরের দরজাতেই বিপদ ওঁৎ পেতে থাকত। তেল-নুন নিয়ে কোনোরকমে নিজের বাড়ির চৌকাঠে ঢোকার পর সাধারণত কেউ ঘর থেকে দু’পা সামনে বাড়ানোর দুঃসাহস দেখাত না।

আমার মনে পড়ে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি কোনো একদিন কারফিউ জারি হয়েছিল, সেই কারফিউ ছিল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টা অবধি। সকালে কারফিউ শেষ হওয়ার পর রেস্টহাউসের সামনের পুকুর থেকে আমাদের স্পিডবোট ড্রাইভার ফারুকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। আগের রাতে ভয়াবহ ধরনের গোলাগুলি হয়েছে। সেই গোলাগুলির ভেতরে পড়ে ফারুক মারা গিয়েছিল। রাতে টর্চ জ্বালিয়ে মিলিটারিরা পুকুরের কচুরিপানার আড়ালে লাশ খোঁজার চেষ্টা করেছিল। পরের দিন সকালে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এনে ওরাই পুকুর থেকে ফারুকের লাশ তোলার ব্যবস্থা করেছিল। সেই লাশ তোলার সময় আমার সহকর্মী সাত্তার ভাই কাঁদতে কাঁদতে আমার হাত ধরে বলছিল, ‘বেকুবটা গোলাগুলি থেইকা বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপ দিছিল, ওরা বৃষ্টির মতো গুলি করছে পানিতে, ভাবছে মুক্তিবাহিনীর লোক।’

ড্রাইভার ফারুক খুব সুদর্শন ছিল। যাত্রাপালার নায়কের মতো পরিপাটি বেশভূষার ফারুক প্রতি দশ মিনিট পর পর প্যান্টের পকেট থেকে একটা ছোট চিরুনি বের করে মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করত আর লাজুকমুখে হাসত। ওর প্রিয় নায়িকা ছিল শবনম। মাঝে মাঝে মাথাকে দুপাশে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ফারুক ‘হারানো দিন’ সিনেমার গান গাইত, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি।’ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফারুককে গান গাইতে শুনিনি। আমার সঙ্গে দেখা হলেই ও আতঙ্কিত গলায় বলত, ‘জানটা স্যার হাতের মইদ্দে পুইরা হাঁটি, যুদ্ধ কবে শেষ হইব স্যার! আমার খালি ডর করে স্যার! কহন জানি কল্লাটা কাটা পড়ে!’ সেই ফারুকের লাশ যখন জাল দিয়ে টেনে এনে পুকুরপাড়ে রাখা হয় তখন ওর মাথাটা জায়গামতো ছিল না।

আসলে ওর মাথাটাই দেখা যাচ্ছিল না, হয়তো গুলি লেগে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ফারুকের পরনের খয়েরি শার্টের কলারের কাছে মুণ্ডুহীন গলার কাছটা রক্তাক্ত আর এবড়োখেবড়ো দেখাচ্ছিল। কেয়ারটেকার লতিফ ফারুকের লাশের গায়ে চাদর জড়াবে বলে হাতে একটা বিছানার চাদর নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তখনও লতিফকে দেখাচ্ছিল ভাবলেশহীন। সেবারই প্রথম প্রচণ্ড বিতৃষ্ণায় আমি লতিফের নির্লিপ্ততা দেখছিলাম, কীভাবে পারে ও! ও কী মানুষ? নাকি প্রাণহীন, অসাড় কোনো মাটির মূর্তি!

লতিফের পাশে দাঁড়ানো একজন মিলিটারি হাতের লাঠি দিয়ে লাশের গলায় খোঁচা দিয়ে উর্দুতে কী যেন বলতেই আশপাশের ক’জন হো হো করে হেসে উঠেছিল। বড় বীভৎস সেই দৃশ্য! দৃশ্যটা আমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব ছিল না বলে আমি রুমে ফিরব ভেবে দৌড় দিয়েছিলাম। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারিনি। রাস্তাতে বসে পড়েই বমি করতে শুরু করেছিলাম।

আমি রক্ত ভয় পেতাম, যুদ্ধও। ঠিক ভয় না, হয়তো জীবনকে ভালোবাসতাম বলেই আমার যুদ্ধে যাওয়ার সাহস ছিল না। সেই সময়ে কোনোরকমে অফিস করে এসে আমি নিজের রুমে ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। বালিশের নিচে চাপা দিয়ে রাখা দুই ব্যাটারির ছোট রেডিওতে চরমপত্র শোনাই ছিল যুদ্ধকালীন আমার কৃত একমাত্র চরম সাহসী কাজ। বালিশের নিচে রেডিও রেখে মৃদু ভলিউমে শুনতাম, ‘কেইসডা কী? আমাগো বকশিবাজারের ছক্কু মিয়া কান্দে কীর লাইগ্যা? ছক্কু-উ, ও ছক্কু! কান্দিস না ছক্কু, কান্দিস না! কইছিলাম না, বঙ্গাল মুলুকের কোদো আর প্যাকের মাইদ্দে মছুয়াগো ‘মউত তেরা পুকুর তা হ্যায়’। নাঃ-তখন কী চোটপাট! হ্যান করেংগা, ত্যান করেংগা। আর অহন? অহন তো মওলবি সাবরা কপিকলের মাইদ্দে পড়ছে। সামনে বিচ্চু, পেছনে বিচ্চু, ডাইনে বিচ্চু, বাঁয়ে বিচ্চু।’ তখন এই একটাই বিনোদন ছিল আমার। আর একটাই দুঃসাহস।

আমার বয়স হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের মতো শরীরেও ভাঙচুর হয়েছে। তাই বিক্ষিপ্ত স্মৃতিগুলো এই অবেলায় একত্র করা মুশকিল। তবু মাথার ভেতরে এরা এতই কোলাহল শুরু করেছে যে, একটা বলতে গিয়ে আরেকটা বলছি। যা হোক এক রাতের কথা বলি। তার আগে বলে নিই তখন কেবল ছমাস হল আমি সাবডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সাতক্ষীরা ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডে যোগদান করেছি। আমার মনে আছে আমি যোগদান করেছিলাম জানুয়ারি মাসে আর জুন মাসের তিন তারিখে গোটা তিনেক জলপাই রঙের জিপ নিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারিরা আমাদের রেস্ট হাউসগুলোয় ওরা ক্যাম্প স্থাপন করে। ওদের নিজেদের থাকার রুম হিসেবে নিচতলাগুলোকেই বেছে নিয়েছিল। ওরা নিচতলায় থাকা আমাদের গোডাউনও দখল করে নিয়েছিল। সেখান থেকে সিমেন্টের বস্তাগুলো নিয়ে রেস্টহাউসের বাইরে বাঙ্কার তৈরি করেছিল।

আমি যে ভবনে থাকতাম সেটার নিচতলার একটা ঘর ছিল ডাইনিং রুম। যে রাতের কথা বলছি সেই রাতটা আমি আর কেয়ারটেকার লতিফ নিচতলায় ডাইনিং টেবিলের নিচে শুয়ে পার করেছি। লতিফ একবার ‘টয়লেটে যাই’ বলে উঠতে গিয়েছিল, ঠিক তখনই ডাইনিং রুমের দক্ষিণের জানালার কাচ ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছিল। বাইরে কাছাকাছি কোথাও বোম্বিং হচ্ছিল তখন; হঠাৎ থেমে থেমে গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল, সেই শব্দেই কাচ ভেঙেছে নাকি গুলি এসে লেগেছে জানালায় তা বিশ্লেষণ করার বোধশক্তি ছিল না আমার। আগেই বলেছি কারফিউর রাতগুলো হতো ভয়াবহ। কবরস্থানের নিস্তব্ধতা নেমে আসত শহরজুড়ে। রাতের বুক হিম করা নির্জীব নীরবতায় হঠাৎ হঠাৎ একটা-দুটো শেয়াল ডেকে উঠত। আবার কোনো কোনো রাতে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হতো। তেমনই এক রাত ছিল সেটা। গুলির শব্দ শুনতে শুনতে আমি বধির হয়ে যাচ্ছিলাম। টেবিলের নিচে শোওয়া অবস্থায় আমরা তো পুরো শহর দেখতে পাচ্ছিলাম না; কেবল টের পাচ্ছিলাম চোখের সামনে নিñিদ্র অন্ধকার জমে আছে। তখন ক্ষুধা বা তৃষ্ণার কোনো অনুভূতি যেমন আমার হচ্ছিল না তেমনি চোখে আলো বা আঁধারেরও কোনো পার্থক্য ছিল না। লতিফের হাত খামচে ধরে আমি গোলাগুলি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।

আসলে তখন সময়টাই ছিল এমন। জীবন আর মৃত্যুর মাঝে সূক্ষ্ম ফারাক ছিল কেবল। রোজই এর ওর মুখে খবর পেতাম শহরজুড়ে খণ্ড খণ্ড সশস্ত্র যুদ্ধ হচ্ছে; রাজাকারের দলে ভর্তি হচ্ছে অনেক বাঙালি, ওরা খবর পাচার করছে আর মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে অনেককেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে, নৃশংসভাবে শহরে সাধারণ মানুষ মারা হচ্ছে, দোকানপাট-ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, পাটকেলঘাটা বাজারে শরণার্থীসহ বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, শহরের বহু জায়গায় নিরীহ মানুষের গণকবর হয়েছে, হিজলদির যুদ্ধে কিছু পাকসেনাও মারা গেছে। এসব খবর শুনেও আমরা ঘুমাতে যেতাম। প্রকৃত অর্থে ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি বিচিত্র এক অনুভূতির ভেতরে আমাদের এক একটি রাত কাটত। রোজ সকালে নিজের শরীরে চিমটি কেটে দেখতে হতো, বেঁচে আছি কিনা। নিজের অস্তিত্ব টের পাওয়ার পর কখন মৃত্যু হবে শুরু হতো তার অপেক্ষা। কারফিউকালীন রাত পেরিয়ে যে সকালগুলো আসত সেই সকালের প্রথম আলো দেখে আমি শিশুর মতো খুশি হতাম, বেঁচে আছি তবে।

এর পরের দিন সকালের কথা বলি। সেদিন আমি অফিসে যাব বলে সিঁড়ি দিয়ে নামছি। ডাইনিং রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ডাক দিলাম, ‘লতিফ, অ্যাই লতিফ।’ আমি ওকে একটু জোরেই ডাক দিয়েছিলাম। একটা কথা বলা হয়নি, লতিফ ছিল কানে খাটো। ও কথা যেমন কম বলত, শুনতও তেমন কম। ওর পাশে দাঁড়িয়ে ওকে হেড়ে গলায় ডাকলেও ও শুনতে পেত না। আমি তখন দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছি, লতিফ টেবিলের ওপর গ্লাস প্লেট রাখছে। কিন্তু ও আমাকে তখনও দেখতে পায়নি। আমি ‘লতিফ কী হলো, নাস্তা রেডি?’ বলে ঘরের দিকে ঘুরতেই একজন পাকিস্তানি সৈনিক আমাকে পিছু ডাকল, ‘হল্ট।’ মুহূর্তের মধ্যে মনে হল মৃত্যুদূত আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। আমার গলা শুকিয়ে এলো। আমি কিছু না বলে মৃতবৎ দাঁড়িয়ে রইলাম।

রাস্তায় তখনও মাইকিং চলছে, কথা বোঝা যাচ্ছে না। একটু আগে আমি নিচে নামার সময় দোতলার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি একটা চিমসে শরীরের রাজাকার রিকশায় বসে গলা ফুলিয়ে মাইকিং করছে, ‘...আজ রাতে কম্বিং অপারেশন। রাস্তায় দেখামাত্রই গুলি করা হবে।’ ঘোষক মাইক্রোফোন ঠোঁটের একেবারে কাছে ধরে কথা বলছিল। তাই তার কোনো কথাই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না। সৈনিকটি যখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে তখনও মাইকিং চলছে। আমি সেই ঘোষণা আর শোনার চেষ্টা না করে শ্রবণশক্তিরহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকি। তখন সৈনিকটির ভারী কণ্ঠস্বরে চারপাশ গমগম করে ওঠে। সে আমার দিকে রাইফেলের নল তাক করে বলে,

-ইধার আও। ও আদমি ক্যায়া বোলতা হ্যায়? ও বাঙ্গালিমে বাতচিৎ কররাহা হ্যায়। হাম সমঝনেহি পায়া। মুঝে সমঝাও।

আমি কোনোরকমে দুঠোঁট ফাঁক করি,

-মেরে সমঝমে নেহি আতা হ্যায়।

সৈনিক গর্জে ওঠে,

-ঝুট। ও বাঙ্গাল আদমি হ্যায়, তুম ভি বাঙালি। তুম বোলা সমঝমে নেহি আতা হ্যায়। ঠ্যারো...তুমকো গুলি কারেগা।

সৈনিকের কথাগুলো তখন আমার কানের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। রাইফেলের নলের খোঁচা বুকে লাগছিল। লম্বা-চওড়া বিশালদেহী সৈনিকটি আমার বুকে আরও জোরে খোঁচা দিয়ে বলল,

-তুম জো বাঙালি আদমি হ্যায়, ও বিলকুল হারামি আদমি হ্যায়, তুম মালাওনকো সাথ রাহেগা।

কখন যেন লতিফ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ও আমার হাত চেপে সৈনিকের দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিল,

-স্যার সরকারকা আদমি হ্যায়। হামভি সরকারকা আদমি হ্যায়।

-বিলকুল ঝুট হ্যায়।

সৈনিকের কথা ফুরাতে না ফুরাতেই চারপাশ গুলির ঝাঁ ঝাঁ শব্দে কেঁপে উঠেছিল। বুটে ধুপধাপ আওয়াজ তুলে সে এক ছুটে রেস্টহাউস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। রেস্টহাউসের সামনের রাস্তাতেই দুদিক থেকে গোলাগুলি আরম্ভ হয়েছিল। মনে হচ্ছিল আমার কানের একেবারে পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গুলি চলে যাচ্ছে। আমি টের পাচ্ছিলাম আমি মারা যাচ্ছি। আমি ছুটে পালাতেও পারছিলাম না। লতিফ আমাকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ডাইনিং রুমের মেঝেতে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। ওর শক্ত হাতের টান খেয়ে ততক্ষণে আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে বুঝেছিলাম, তখনও বেঁচে আছি। সেদিনের পর থেকে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা আর উদ্বিগ্নতার মধ্যে আমার দিন কাটতে লাগল।

শুধু আমার কেন, আমার মতো আরও যেসব কর্মকর্তা রেস্টহাউসে দুই পৃথক ভবনের দোতলার বিভিন্ন রুমে থাকত তাদেরও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটত। ডাইনিং রুমে পরস্পরের সঙ্গে আমাদের চোখাচোখি হলে আমরা তীব্র আতঙ্কে মেপে মেপে ফিসফিস করে একটা-দুটো কথা বলতাম। আর লতিফ ভাবলেশহীন চোখে-মুখে আমাদের জন্য খাবার পরিবেশন করত। সেসময় লতিফ ছিল আমাদের কেয়ারটেকার কাম বাবুর্চি। আগে রেস্টহাউসে হারুন নামে একজন খণ্ডকালীন বাবুর্চি ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এক রাতে হারুন পালিয়ে গেলে লতিফ নিজে থেকেই রান্নার দায়িত্ব নিয়েছিল। পরে শুনেছি হারুন যুদ্ধে গিয়েছে। সাত্তার ভাই সাইটে যাওয়ার পর তাকে কে যেন খবরটা দিয়েছিল। শহরে কী হচ্ছে সেসব খবরের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। আমাদের কেউ সাইটে গেলে অনেক খবর পেতাম। লতিফ বাজার করতে বের হতো কিন্তু ওর মুখ দিয়ে কোনো বাড়তি কথা বের হতো না।

সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে কোনো এক রাতের কথা বলি। আমরা চার কর্মকর্তা তখন সবে খেতে বসেছি, একটা ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকল। লতিফের কাছে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, ‘ভাবি যাইতে কইছে।’ সেদিন লতিফ বাড়ি যেতে পারেনি। আমাদের রেস্টহাউসের বাইরের দিকের বড় লোহার গেটটা গুলির শব্দে ঝনঝন করে কাঁপছিল বারবার। মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা আশপাশেই রাইফেল-স্টেনগান নিয়ে ঘাপটি মেরেছিল। রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা হামলার আশঙ্কায় মিলিটারিরা বাঙ্কারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। পরের দিন সকালে লতিফ বাড়ি গিয়ে দুপুর নাগাদ ফিরে এসেছিল। সঙ্গে ছিল সেই ছেলেটি। ছেলেটি হেঁচকি তুলতে তুলতে জানিয়েছিল, লতিফের মা আর স্ত্রীকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে। ওর বাড়িঘরও লুট হয়েছে; কেবল বাচ্চা মেয়ে দুটির দ্বিখণ্ডিত লাশ পড়েছিল বাড়ির উঠানে।

লতিফের চোখ সেদিনও ছিল পলকহীন, মৃত মাছের মতো ঘোলাটে। ওর হাতের মুঠোতে উঁকি দিচ্ছিল লাল-কমলা রঙা চুলের ক্লিপ, ফিতে। ডান হাতের মুঠো থেকে বাম হাতের মুঠোতে নিয়ে ও যখন মালিকানাবিহীন ফিতে-ক্লিপগুলোয় হাত বুলাচ্ছিল তখন আমি চমকে উঠে দেখেছি, ওগুলোয় রক্তের ছাপ। আমার পা টলে উঠেছিল। লতিফের হাতের দিকে আমি আর তাকাতে পারছিলাম না, ডুকরে কেঁদে উঠেছি। মনের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা অগ্নিকুণ্ডের দহনে দগ্ধ হচ্ছিলাম, লতিফের চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না। এ সময় কত বড় প্রবঞ্চনা করছি দেশের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে! কত মানুষ যুদ্ধে গেছে সব পিছুটান উপড়ে ফেলে। আমি পারিনি।

অন্তর মহলের দহন জুড়াতে অবনত মস্তকে সেদিন বিরামহীন কেঁদেছিলাম। আমাকে কাঁদতে দেখে ভাবান্তরহীন গলায় লতিফ বলেছিল, ‘আমি বিদায় নিতে আসছি স্যার।’ তারপর আমাদের পিছু ফেলে সেই অঙ্গাররঙা ঝাঁঝালো দুপুরে হনহন করে হেঁটে লতিফ রেস্টহাউসের প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেদিনই লতিফের সঙ্গে আমার শেষ দেখা, শেষ কথা। তারপর কত বছর পেরিয়ে গেল। তবু আমার বুকের ঠিক মাঝখানে তীক্ষ্ম তীর হয়ে লতিফের শেষ কথাটি বিঁধে আছে, ‘স্যার, মইরা লাভ কী? যাই মাইরা আসি।’

লতিফ আর আসেনি। শুধু এমনই কোনো নির্জন রাত্রিতে আমি যখন ঘর অন্ধকার করে বসে থাকি তখন গুটিগুটি পায়ে ওর স্মৃতিরা আসে আর ওর শেষ কথাটি ওরই মতো ভাবলেশহীনভাবে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×