ধারাবাহিক রম্য টল TALK

ব্যাটারির ভোল্টে পুরনো রোমান্স- ২

  শায়ের খান ২৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাটারির রিকশার হর্ন বাচ্চাদের খেলনা সাইকেলের মতো। পিউ পিউ ডাক দেয়। চিকির পাশে টল বলল, ‘ছোটকালে ক্লাসে ফার্স্ট হলে আব্বা এমন হর্নের সাইকেল কিনে দিতেন।’ চিকি আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ‘চোরের মতো ওইপাশে চিপা মেরে আছেন ক্যান? ইজি হয়ে বসেন।’ কথা শেষ না হতেই চিকির মেসেঞ্জারে সামনের রিকশা থেকে ছানামুখির মেসেজ- দেখছিস, শুধু ছাত্র জীবন না, রিকশার হর্ন ছোটকালের স্মৃতিতে নিয়ে গেল! সঙ্গে সঙ্গে চিকির রিপলাই- হুম, আমরাও সেটাই আলাপ করছিলাম।

ট্রাফিক সিগন্যালে পুলিশ ম্যাশদের রিকশা থামায়। ম্যাশকে সালাম দিয়ে রিকশাওয়ালাকে অর্থোপেডিক্স ডাক্তারের মতো ‘দেখি, পা দেখি’ বলে ওর গুটানো পা টেনেটুনে দেখল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে যাও।’ ম্যাশ জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেখলে?’ পুলিশ বলল, ‘দেখলাম স্যার রিয়েল না ফলস। আজকাল চিট-বাটপাররা লুলা সাইজা এগুলা চালায়। ও রিয়েল।’ ছানামুখি ম্যাশকে চিমটি কাটে। মাথা নিচু করে ম্যাশ বললেন, ‘স্যাড, রিয়েলি স্যাড!’ চোঁ-ও-ও-ও...করে আবার ছুটে চলল ব্যাটারি রিকশার বহর। টুং টুং করে চিকির মেসেঞ্জারে মেসেজ আসতে লাগল। নবাব লিখেছে- আফা, সাবধান। রেক্সাওয়ালা গুলেন কেনতু হারামি। জেবা লিখেছে- এ জার্নি বাই চিপা রিকশা! পুপলি লিখেছে- আপু তাং ফাং চলতেসে কেমন? ফ্লোরিডা থেকে মারিয়াম লিখেছে- জানটুশ, দুইজন আটসোস তো? না আঁটলে মুড়ির টিনের মতো একটু ঝাঁকাইয়া নিস। এক ঢিলে দুই বার্ড! ...ফিলিং জেলাস!

কলাভবনে ঢোকার গেটে নামল ওরা। ভার্সিটিতে চিকি আসেনি বহু বছর। ছানামুখি-ম্যাশ সাহেবের তো বোধহয় ৪০ বছর হয়েছে। এত যে চেঞ্জ, ভাবতে পারেনি ওরা। ছুটির দিনে কিছুটা নির্জন থাকবে আশা করেছিল, কিন্তু ছেলেমেয়ে অনেক। জোড়ায় জোড়ায়। চিকি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ভাষা বোঝে টল। কার পার্কিংয়ের সঙ্গে ‘ক্যাম্পাস শ্যাডো’ আর সো-জা সবুজ মলকে মিস করছে চিকি। এই মলে কত জ্বালিয়েছে ওকে টল। চটপট কিছু প্লেটে নিয়ে মলে সবাই গোল হয়ে বসে খাওয়া আর আড্ডা ছিল সবার প্রিয়। চিকি বলল, ‘ডাসটা এখনও আছে না?’

‘আছে, তবে আগের চরিত্র হারিয়েছে।’

‘লাইব্রেরি?’

‘থাকবে না কেন? তবে গিজগিজ।’

‘হাকিম চত্বর?’

‘আছে, তবে ওই যে, গিজগিজ।

ছানামুখি খেঁকিয়ে ওঠেন, ‘তোরা ডাস-ফাস কী বলছিস? আমার তো আমতলা ছাড়া কিছুই মনে নাই। কই ম্যাশু, চল আমতলায় বসেই মিটিংটা সারি। আহারে আমার আমতলা।’ ম্যাশ সাহেব হেসে বললেন, ‘আমতলা না বলে ধাওয়া তলা বলো। ওখানেই তো আমাকে তুমি বেশি বেশি ধাওয়া...!’ ছানামুখির কটকটি চাহনিতে থেমে বললেন, ‘চলো, সবাই আমতলায়।’

আমতলায় ঝালমুড়ি দিয়ে স্মৃতিচারণ শুরু করল ওরা। ম্যাশ বললেন, ‘আসলে আজ আমরা স্টুডেন্ট লাইফে চিকিকে টলের ইভ টিজিঙের কিছু বাস্তব দৃশ্য দেখবো।’ চমকে টল বলল,‘ইয়ে স্যার...।’ ম্যাশ বললেন, ‘স্যার-ট্যারের কিছু নাই। চিকি, তোকে যেন ও কোথায় কোথায় বেশি জ্বালিয়েছে?’ ঝালমুড়ির ঠোঙা হাতে পা নাচিয়ে নাচিয়ে চিকি বলল, ‘জ্বালাতো বলবো না, ফলো করতো। আর্টস বিল্ডিংয়ের সামনে-পিছে, ক্যাম্পাস শ্যাডো থেকে মল চত্বর, মধুর ক্যান্টিনের সামনে, হাকিম চত্বর, পাবলিক-সেন্ট্রাল দুই লাইব্রেরি, ডাস, টিএসসি!’ ছানামুখি থামিয়ে বললেন, ‘এ-মা, এ তো দেখছি লোকাল ট্রেন। সব স্টেশন ধরেছিলো!’ ঠোঙা হাতে মাথা নিচু করে রিম্যান্ডের আসামির মতো বসে রইল টল। ম্যাশ বললেন, ‘চলো, আমরা সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি চিকিকে এই ছোটখাটো টল কীভাবে ফলো করতো। টল, তুমি ঠিক যেভাবে চিকিকে ফলো করে প্রপোজ করতে, ঠিক সেভাবে এগিয়ে গিয়ে করবে। আমরা ভিডিও করবো। এখানে আপত্তি টাপত্তি চলবে না। এটা তোমার জবেরই অংশ।’ ভয়ে মুখ হা হয়ে গেল টলের। ঢোক গিলে বলল, ‘আবার ভাইরাল হবে না তো স্যার?’ হেসে বলেন ম্যাশ, ‘শোনো, ঘুষ যারা খায়, তারা কি নিজেরটা ভাইরাল করে বোকা? করে অন্যেরটা। ডোন্ট ওরি।’

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির বারান্দার দৃশ্যটা এখন এমন। চিকি বই হাতে হেঁটে যাচ্ছে, পেছন পেছন টল চোরের মতো এগোচ্ছে। ছানামুখি মোবাইলে ভিডিও করছে। পাশে ম্যাশ দাঁড়িয়ে স্ক্রিনে চোখ রেখে পাকা ডিরেক্টরের মতো ফ্রেম দেখিয়ে দিচ্ছে। ‘কাট ইট, ওকে শট’ বলে চিৎকার করে ওঠেন ম্যাশ। ‘এই দৃশ্য বাসায় গিয়ে আমরা রিল্যাক্স করে দেখবো। টলের প্রস্তাব করার ভঙ্গিটা খুব চমৎকার ছিলো। চলো টিএসসিতে সেই মোগল আমলের সস্তা লাঞ্চটা সেরে নিই।’ চিকি বাধা দিয়ে বলল, ‘তোমাদেরটা?’

ছানামুখি : আমাদের আবার কী?

ম্যাশ : ও বলতে চাচ্ছে, তুমি যে আমাকে ফলো করতে, সেই শুটিংটার কথা।

ছানামুখি : খ-ব-র-দা-র ম্যাশু। তুমি চিকনা পটকা ছিলে, তর তর করে আমার আগে হেঁটে চলে যেতে। তার মানে আমি তোমাকে ফলো করতাম না!

টল : থাক না ম্যাডাম। আপনি ফলো করতেন বলেই তো চিকিকে পেয়েছেন।

কিছু না বলে বেলুনের মতো চুপসে গেল ছানামুখি।

টিএসসির বারান্দার দৃশ্য এখন এরকম। ম্যাশ সাহেব বই হাতে হেঁটে যাচ্ছেন, পেছন পেছন কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে যাচ্ছেন ছানামুখি। ম্যাশকে বইয়ে মানাচ্ছে না একেবারেই। চিকি ভিডিও করছে, টল স্ক্রিনে চোখ রেখে ডিরেকশন দিচ্ছে। কিছু ছেলেমেয়ে এগিয়ে এলো। একজন বলল, ‘এক্সকিউজ মী, কি হচ্ছে এখানে?’ থতমত খেয়ে থেমে গেলেন ম্যাশ-ছানামুখি। একে অন্যের দিকে বোকার মতো তাকালেন। চিকি তাকাল টলের দিকে। গলা খাঁকারি দিয়ে স্মার্টলি এগিয়ে গেল টল। পকেট থেকে লেখক-পরিচালকের কার্ড বের

করে বলল, ‘একটা টেলিফিল্ম বানাবো। তারই রিহার্সেল হচ্ছে!’

(চলবে)

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×