পোড়া মবিলে পোড়ে মন

  মো. রায়হান কবির ০৪ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কেউ কেউ আছেন পোড়া জিনিস খেতে পছন্দ করেন। মিষ্টি আলু যেমন অনেকে সেদ্ধ করে খান, তেমনি অনেকে মিষ্টি আলু পুড়েও খান। বেগুন ভর্তা কেউ কেউ বেগুন সেদ্ধ করে বানিয়ে থাকেন আবার কেউ আছেন তা পুড়ে বানিয়ে থাকেন। সেটা যার যার পছন্দের ব্যাপার। কিন্তু দেশে এমন লোকও আছেন যারা অন্যের বাড়িতে আগুন লাগলে হাতে পানি কিংবা বালির বালতি নিয়ে বের হন না। বের হন কিছু মিষ্টি আলু হাতে নিয়ে। যাতে আগুনে পুড়ে খেতে পারেন! সমাজে এই শ্রেণীর লোকের এখন অভাব নেই।

ফেসবুক এখন বিচিত্র মানুষের এক মিলনমেলা। এক শ্রেণী নিজে যেমন অ্যাকটিভ থাকে, অন্যদেরও অ্যাকটিভ থাকতে সাহায্য করে। এরা ঘনঘন স্ট্যাটাস বা ছবি আপডেট দেয়। অন্যের ছবি, পোস্টে লাইক কিংবা কমেন্ট করে। আরেক শ্রেণী সবার সবকিছু দেখে কিন্তু আওয়াজ ছাড়া। মানে লাইক বা কমেন্ট করে না কিন্তু সব বিষয়ে ওয়াকিবহল। এদের সংখ্যা শুধু ফেসবুকে না, সব জায়গায়তেই বেশি। বাসে চড়ে অফিসে যাচ্ছেন, বাস সিটিং হওয়া সত্ত্বেও ড্রাইভার হেলপারের ইশারায় জায়গায় জায়গায় ব্রেক করছে। এদিক সেদিক অহেতুক যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে। এতে এক শ্রেণীর যাত্রী তীব্র প্রতিবাদ করে, আরেক শ্রেণী তাদের কিছুটা সাপোর্ট করে। আর সবচেয়ে বড় শ্রেণীরা ফেসবুকিং করে, গান শুনে কিংবা ঘুমের মাঝে নিজেদের ব্যস্ত রাখে। তার মানে এই নয় যে, তাদের অফিসে দেরি হচ্ছে না। তারা ধরেই নেন অন্যরা প্রতিবাদ করবে। কিংবা যাত্রাপথের এ বিড়ম্বনা তারা মেনে নিয়েই বের হয়েছে। তাই দেশ ও সমাজে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে না ভেবে একটু ঘুমানোকে প্রাধান্য দেয় কেউ। কেউ প্রিয় শিল্পীর গানে ডুবে থাকতে পছন্দ করে। অথচ বাসে থাকা সবাই যদি একসঙ্গে প্রতিবাদ করত তাহলে কার সাধ্য অনিয়ম করে? এভাবেই আমরা দায় এড়িয়ে গোঁফের ফাঁকে হাসি লুকিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের সাক্ষী হই। আমরা বসে থাকি অন্যদের আশায়।

সভ্যতার শুরুতে মানুষ খাবার পুড়েই খেত। এরপর সময়ের বিবর্তনে সেদ্ধ খাবার থেকে রান্না করা খাবারে উন্নীত হয়েছে। সেই আদি শেকড়ের টানে মানুষ আবার পোড়া খাবারের দিকে ঝুঁকছে। এখন রান্না করা বা সেদ্ধ করা মুরগির চেয়ে তান্দুরি বা গ্রিল মুরগির চাহিদা বেশি। গরুর ভুনার চেয়ে দেখতে পোড়া পোড়া কালো ভুনা বা শিক কাবাবের চাহিদা বেশি। অর্থাৎ পোড়া জিনিসের ঐতিহ্য আবার ফিরে আসছে। আর সেটা এমনভাবে ফিরে আসছে যে সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে পোড়া জিনিসের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আজকাল মেকাপেও দেখা যায় পোড়া জিনিসের ছোঁয়া। একে বলা হয় স্মোকি আই। মানে ধোঁয়া ধোঁয়া চোখ। কোনো কিছু না পুড়লে তো আর ধোঁয়া হয় না! কারও মন পোড়াতে হলে পোড়া চোখ মনে হয় জরুরি। সে সূত্র ধরেই কিনা কে জানে আইন সংস্কারের জন্য আন্দোলনেও শ্রমিকরা নিয়ে এলো পোড়া মবিল বা ইঞ্জিনের পোড়া তেল। সড়ক নিয়ে আন্দোলন ছাত্ররাও করেছে। তারাও রাস্তায় থেকেছে। বরং তারা দাবি আদায়ে ‘জাতিকে তেল’ দিয়েছে। ছাত্রদের রাস্তায় অবস্থান যাতে কোনোভাবেই উপদ্রপের কারণ না হয় সেজন্য তারা ট্রাফিককে সাহায্য করেছে। রাস্তায় ঝাঁট দিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে তাকে দ্রুত যাওয়ার পথ করে দিয়েছে। যাত্রীকে সুরক্ষার জন্য হেলমেট পরার অভ্যাস গড়ে দিয়েছে। এগুলো জাতির তেল মালিশ হিসেবেই গণ্য করা যায়। আর আন্দোলনরত শ্রমিকরা পোড়া তেল ছুড়ে দিয়েছে জাতির গায়ে। এক সময় সমাজে অসামাজিক কিছু করলে মুখে চুনকালি মাখিয়ে গ্রাম ঘোরানোর রেওয়াজ ছিল। অথচ সমাজ বদলে সেই রেওয়াজও বদলে গেছে। যাত্রীদের চলার পথে শুধু বাধা সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, দৈনন্দিন প্রয়োজনে বের হওয়ার মতো অপরাধে মানুষের মুখে কালি মাখিয়ে দিয়েছে। এত বড় অপরাধ করার পরও শ্রমিকদের অভিভাবকরা নিশ্চুপ। তাদের মুখ থেকে কোনো শব্দ আসে না। কিন্তু কেন? তারা কি ওই দ্বিতীয় শ্রেণীর ফেসবুকার? নাকি অন্য কিছু? সেটা জানার আগে আমরা আরেকটা বিষয় জেনে নিই।

জনৈক তরুণের মুখ ছোট বেলা থেকেই কাঁদো কাঁদো। যখন যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, তার মুখের অভিব্যক্তি কান্নার। একদিন সেই তরুণ তার এক সহপাঠীর বিয়েতে গেছে অন্য সহপাঠীদের সঙ্গেই। যথারীতি তার মুখ কাঁদো কাঁদো। যখন সব বন্ধুরা মিলে গ্রুপ ছবি তুলতে গেল, তখনও সেই একই দৃশ্য। এটা দেখে হবু জামাইয়ের মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। তাহলে কি আমার হবু বউয়ের সঙ্গে এই ছেলের কোনো চক্কর ছিল? বর্তমান যুগে কেউই রিস্ক নিতে চায় না। হবু জামাইও রিস্ক নিল না। সে সরাসরি তার বউকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা তোমার সব বন্ধু বেশ হাসিখুশি কিন্তু ওর কাঁদো কাঁদো ভাব কেন? স্পেশাল কিছু?’ এইবার বউ বলল, ‘তোমার স্মার্ট ফোনটা দাও।’

হবুজামাই দিল তার স্মার্টফোন। এবার বউ, হবু জামাইয়ের স্মার্ট ফোন দিয়ে ফেসবুকে সেই বন্ধুর আইডি বের করে দেখাতে লাগল যাকে নিয়ে সন্দেহ তার ছবি। বউ বলল, ‘দেখ আজকে থেকে আট বছর আগের প্রোফাইল পিকচারেও ওর মুখে কান্নার অভিব্যক্তি। তখন তো আমরা একসঙ্গে পড়তামই না। তখন কাঁদছিল কেন? আসলে ওর মুখটাই এমন। তাই সবাই ভাবে ও কাঁদছে!’

বলিউডে রাজত্ব করেন খানেরা। কিন্তু আমাদের কিছু খানসাহেব রাজত্ব করেন জলে, স্থলে সর্বত্র। পোড়া মবিলে মানুষের মন পুড়লেও তাদের কিছু আসে যায় না। কারণ তারা হয়তো মনে মনে ভাবেন, পোড়া মবিল তাদের ক্ষমতার উৎস, পোড়া মবিলে যদি দারুণ কিছু হয় তবে পোড়া মবিলই ভালো!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×