আমাদের হোখলেস

সংরক্ষিত পাঠক আসন

  মোঃ আনোয়ার হোসেন ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেদিন বিকালে কোনো কাজ ছিল না তাই মাঠে বসে বাদাম খেয়ে সময় কাটাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই আকাশে বাজ পড়ার মতো দৌড়ে হাজির আমাদের হোখলেস।

‘কি রে হোখলেস, দৌড়াইতাছিস কেন? কোনো সিরিয়াস কিছু?’ হোখলেস লম্বা দম নিয়ে আমার দিকে তাকায়। বুক টান করে বলে, ‘আমি রাজনীতি করব রে!’

হোখলেসের মুখে অপ্রত্যাশিত শব্দটি শুনে আমার হার্টব্রেক হওয়ার মতো অবস্থা। আমি থমকে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। হোখলেস বলে কী! হোখলেসের মতো লোক যদি রাজনীতি করার কথা বলে তা শুনে শুধু হার্টব্রেক করা না- হার্টের ব্রেক ছিঁড়ে যাওয়ারই কথা! আমার ভাগ্য ভালো, বেঁচে গেলাম। এমন সময় হোখলেস আমার কাঁধে ঝাকি দিয়ে বলল, ‘আমি প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। জনগণের সেবায় নিজেকে উজাড় করতে চাই। আমাকে কিছু আইডিয়া দে।’

‘তোর চাওয়াটা খুবই ভালো, তবে খুব ভাবনার বিষয়।’ বলে ভাবুকের ভাব নিয়ে আরও যোগ করি, ‘তোকে প্রথমে জনবল বাড়াতে হবে। বর্তমান যুগ ইয়াং জেনারেশনের যুগ বুঝতেই পারছিস। পোলাপানগুলারে হাত করতে হবে।’

‘ঠিক আছে, আজ থেকেই মাঠে নামব।’ এই বলেই হোখলেস বেরিয়ে গেল।

যে কিনা তেল বললে আনে তিল সে কিনা করবে রাজনীতি! হোখলেসের কিছু কাণ্ড দেখলে পেটে খিল লাগা অবস্থা হয়ে যায়। হোখলেসের একটা ঘটনা বলি। হোখলেস একদিন আমাকে জানাল তার জন্য পাত্রী দেখতে যাবে। সঙ্গে আমাকেও নিয়ে যাবে। কী আর করা, যেতেই হবে। অটো দিয়ে যাচ্ছি। হোখলেসের শরীর থেকে পারফিউমের গন্ধে নাক উড়ে যাওয়ার উপক্রম। লাল রঙের পাঞ্জাবি পরা হোখলেসের সামনে যেন বাংলা সিনেমার নায়কও ফেল। মিনিট বিশেক পর অটো থামল। আমি আগে নামলাম। তারপর আমাদের হোখলেস। কিন্তু হোখলেসকে অটো থেকে নামতে দেখে আমার চোখ ছানাবড়া অবস্থা। আমাকে দেখে জামাই জামাই ভাব নিয়ে হোখলেস বলল, ‘কী দেখছিস অমন করে! জামাই জামাই লাগছে তো! লাগবেই। এই শোন, এখানে পাত্রী দেখতে এসেছি, জার্সি গায়ে হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলতে আসিনি বুঝলি।’

এ পর্যন্ত বলে ঠোঁট দুটো ফাঁকা হয়ে গেল তার। হোখলেস আসলে পাত্রী দেখার পরিবর্তে ফুটবল খেলতেই এসেছে। কারণ পাঞ্জাবির দুই পাশের ফাঁক দিয়ে হাফপ্যান্ট ঠিকই দেখা যাচ্ছে। মানে ভুলে প্যান্ট না পরে হাফপ্যান্ট পরেই চলে এসেছে হোখলেস!’ সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।

সে যাক, দু’দিন পর আবার এসে হাজির আমাদের হোখলেস। আমার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এই নে সিগারেট আর গ্যাসলাইট!’ আমি তো অবাক, ‘হোখলেস, তুই তো জানিস আমি সিগারেট খাই না!’

‘ধুর, তোর জন্য না!’ বলেই হোখলেস একটা ছোটখাটো বক্তৃতা শুরু করল, ‘দেখ, আমি ইয়াং জেনারেশন নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি। আমার বিরোধী দল বিড়ি কিনে খাওয়াচ্ছে তাই আমি জনবল বৃদ্ধির জন্য সিগারেট আর গ্যাসলাইট মুরব্বিসহ ইয়ং জেনারেশনের হাতে হাতে পৌঁছে দিয়েছি। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা। এলাকায় ছোট ছোট করে ক্লাব বানিয়ে দিয়েছি। সেখানে প্রত্যেক ক্লাবে ব্রডব্যান্ড লাইন সংযোগ দিয়ে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড ফ্রি করে দিয়েছি। সঙ্গে চা-পাতি আর প্রজেক্টর কিনে দিয়েছি। ক্যাবল সংযোগও আছে সঙ্গে। ইয়ং জেনারেশন সারারাত সিরিয়াল দেখবে আর চা খাবে, আর ডাউনলোডে বিজি থাকবে। সেখানে প্রায় লাখখানেক খরচ হয়েছে। দুই দিনে তাদের কত আপন হয়ে গেছি, তুই যদি স্বচক্ষে দেখতি। ছেলেরা আমায় দেখলেই স্লোগান দেয়- হোখলেস ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের...!’ স্লোগানটা আর শেষ করতে পারল না। হোখলেসের ফোন বেজে উঠল।

‘ক্লাবে মিটিং আছে রে...।’ বলেই ছুটে বেরিয়ে গেল। আমি হোখলেসের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনে থ খেয়ে পড়ে রইলাম।

তিনদিন পর, খুব ভোরে আমার রুমের দরজায় ধুমধাম আওয়াজ। ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দেখি হোখলেস।

‘কী হয়েছে হোখলেস, এত সকালে?’

‘এলাকার যত লোক সবাই আমার বাড়িতে।’

‘ভালোই তো, সবাই তোর নামে স্লোগান দিচ্ছে মনে হয়।’

‘না না, ঘটনা উল্টো। লোকজন সব ক্ষ্যাপা। বলছে তাদের ছেলেগুলো সব ধূমপায়ী হয়ে গেছে। এ জন্য ঘর থেকে টাকা মারছে। আর সারা রাত উল্টাপাল্টা সিরিয়াল দেখে, চা খেয়ে ঘুম থেকে উঠছে বিকালে। ইয়ং জেনারেশনের আনইয়ং বাপ-মায়েরা আমারে ধাওয়া করছে। আমি এখন কোথায় যাই?’ এটুকু বলেই হোখলেস লম্বা একটা দম নিয়ে আবার শুরু করল, ‘না রে, জনগণ এই হোখলেসরে চিনল না! আফসোস!’

পাকুড়িয়া তিলকান্দি, শেরপুর-২১০০

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×