বাঁচা-মরা

  শরীফ শহীদুল্লাহ ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সালেক স্যার হন্তদন্ত হয়ে ক্লাসরেুমে ঢুকে হাজিরা খাতা, চক, ডাস্টার আর তেলতেলে বেতখানা টেবিলের ওপর রেখে শার্টের দুই হাতা কনুইয়ের উপর পর্যন্ত গুটাতে গুটাতে বিশেষ আকুতির সুরে মুখ থেকে দুটি শব্দ নির্গত করলেন, ‘এদিকে আয়।’

সালেক স্যার কারো নাম ধরে ডাকেননি-এটা ঠিক, তবে জ্ঞানীর জন্য ইশারাই যথেষ্ট। ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছাত্রটি সেই ইশারায় সাড়া দিয়ে ধনুক থেকে সদ্য ছোড়া তীরের গতিতে মুহূর্তে হাজির হলো স্যারের সামনে।

পরস্পরের ডান হাতে কিছু একটা জিনিসের বিনিময় ঘটল; এক্ষেত্রে দাতা সালেক স্যার আর গ্রহীতা ফরিদ। বিনিময়কালে স্যার ফরিদকে বিড়বিড় করে একটি ফরমায়েশও দিয়েছেন। স্যারের ফরমায়েশখানা এতই অনুচ্চারিত ছিল যে, ফরিদ ছাড়া তা ক্লাসের অন্য কারও পক্ষে শোনা সম্ভব হয়নি।

ফরিদ যে বেগে স্যারের ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছিল তার দিগুণ বেগে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে গেল। ফরিদ স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, কিন্তু তার দৈহিক গড়ন দশম শ্রেণীর, আর পড়াশোনার মান হিসেব করলে বড় জোর চতুর্থ শ্রেণীর! এ প্রকার ছাত্র যে রকম হয়, ফরিদ তার চেয়ে এককাঠি সরেস!

ক্লাসের সময় তড়িঘড়ি করে ফরিদকে বাইরে যেতে দেখে স্কুলের বারান্দায় পায়চারি করতে থাকা হেডস্যার বললেন,‘কি-রে ফরিদ, সালেক স্যার ক্লাস নিচ্ছেন না?’

‘জ্বী স্যার।’

‘তাহলে বাইরে যাচ্ছিস ক্যান?’

‘একটা সমস্যা হয়েছে স্যার।’

সমস্যার কথা শুনে হেডস্যার যেন খানিকটা ধাক্কা খেলেন, ‘কী সমস্যা রে, ফরিদ?’

‘সালেক স্যার মারা যাচ্ছেন!’ এইটুকু বলে এক দৌড়ে ফরিদ হাওয়া।

‘সালেক স্যার মারা যাচ্ছেন? বলে কী?’

প্রতিদিন স্যালেক স্যার শুরুর ঘন্টাখানেক আগে স্কুলে প্রবেশ করেন। তারপর আয়েশ করে কয়েক খিলি পান চিবান। ঘন্টায় ঠনঠন আওয়াজ হলে তিনি পানের বাক্সটা খুলে আরেকটা পূর্ণ প্রস্তুত পান মুখে দিয়ে ক্লাস অভিমুখে রওনা হন। তার পানপ্রীতি এতই ভয়াবহ যে, প্রথম দেখাতেই তাকে দেখে যে কেউ স্থির সিদ্ধান্তে উপণীত হবেন- হি লিভস্ অন বিটল লিফ।

আজই ব্যতিক্রম। ঘন্টা ঠনঠনের মিনিট দশেক পর স্যালেক স্যার হন্তদন্ত হয়ে টিচার্সরুমে ঢুকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ক্লাসে গেছেন। হেডস্যার তখন টিচার্সরুমে।

জলজ্যন্ত মানুষটিই কিনা দশ মিনিটের মাথায় মারা যাচ্ছেন! চিন্তিত হেডস্যার টিচার্সরুমে ফিরে তৎক্ষণাৎ ঘটনাটি অন্য স্যারদের জানালেন। অত:পর সবাই মিলে গেলেন সেই কক্ষে, যেখানে স্কুলের প্রবীণতম শিক্ষক ‘মারা যাচ্ছেন’!

প্রাকৃতিক প্রস্থান না হলে সালেক স্যারকে যে স্কুল থেকে সরানো সম্ভব নয় এটা হেডস্যারের জানা। তাই ‘মারা যাচ্ছেন’ খবরে হেডস্যার তার বেকার ভাতিজাটার একটা ব্যবস্থা হবে ভেবে আশার আলো দেখতে শুরু করলেন। মতিন স্যার ভাবলেন, সালেক স্যারের বসার বড় টেবিলটা স্কুলের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে তারই প্রাপ্য। এবার সেটার একটা সুরাহা হচ্ছে। আলেয়া ম্যাডাম অনেকবার বলেছেন, তিন পান খান না। তবুও সালেক স্যার রোজ অন্তত তিনবার তার কাছে সুপারি চেয়ে বিরক্ত করেন। আলেয়া ম্যাডামও হাঁফ ছাড়লেন, এতদিনে উপরওয়ালা মুখ তুলে চেয়েছেন!

ক্লাসরুমের সামনে হেডস্যারসহ অন্যদের আগমনে পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। সালেক স্যার প্রায়ই ক্লাসে ঘুমান, সেই খবর কেউ কখনও রাখেনি, তাহলে আজ কেন সবাই ঘুমন্ত স্যারকে দেখেতে এসেছে- ছাত্ররা তা কিছু্তইে বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে স্যার ফরিদকে কী বললেন, আর সেই কথা শুনে ফরিদই বা কোথায় গেল, তা-ও মাথায় আসছে না ক্লাসের কারও।

‘মারা যাচ্ছে’-এই খবর হেডস্যার শ্রবণমাত্র সালেক স্যারের বাড়িতে জানানো হয়েছে। স্বজনরা ইতিমধ্যে স্কুলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত হাবিব স্যার ইতিমধ্যে একটা খাটিয়ার ব্যবস্থা করেছেন; বেঁচে থাকলে ডাক্তারের কাছে আর মরে গেলে সৎকারের উদ্দেশে ব্যবহারের জন্য।

অন্যান্য ক্লাস থেকে সব স্যার অকুস্থলে চলে আসায় স্কুলে ছুটি ছুটি ভাব। স্যারদের সঙ্গে নির্দিষ্ট দুরত্বে ছাত্ররাও এসে ভিড় জমিয়েছে। কানাঘুষাও চলছে, ‘জানিস, সালেক স্যার মারা যাচ্ছে!’

এর মধ্যে ফরিদ কোথা থেকে দৌড়ে এসে সহপাঠীদের ভিড় ঠেলে স্যারদের পাশ দিয়ে ফুস করে ক্লাসে ঢুকে টেবিলে মাথা রেখে আধো ঘুমে থাকা সালেক স্যারের কানে কানে বলল, ‘স্যার, দোকান বন্ধ।’

সবাই পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল, কিন্তু কেউ কিছু আন্দাজ করতে পারল না। এমন সময় টেবিল থেকে মাথা তুলতে তুলতে ভাবলেশহীন সালেক স্যার বললেন, ‘বাঁচছি বাঁচছি, চাবানো লাগবে না।’

মরতে থাকা সালেক স্যারের বাঁচার খবরে সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচল বটে, কিন্তু কারও বেঁচে থাকার খবর যে এত নিরানন্দের হতে পারে তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটল উপস্থিত জনতার অভিব্যক্তিতে।

মরতে থাকা সালেক স্যার পাশ ফিরে স্যার-শিক্ষার্থীর বিশাল জমায়েত দেখে পুনরায় মারা যাওয়ার যোগাড়, ‘কী, হচ্ছে কী? সবাই এখানে কেন?’

হেডস্যার বললেন, ‘তার আগে বলুন, আপনি মারা যাচ্ছিলেন কেন?’

‘কে বলেছে?’

‘ফরিদ যে বলল!’

সালেক স্যার কটমট দৃষ্টিতে ফরিদের দিকে তাকালেন। ফরিদ উভয় সংকটে। একদিকে সালেক স্যার, অন্যদিকে হেডস্যারসহ অন্যরা।

অবশেষে হেডস্যারের রক্তচক্ষুর কাছে হার মেনে মুখ খুলল ফরিদ,‘পঞ্চাশ পয়সার একটা কয়েন আমার হাতে দিয়ে সালেক স্যার বললেন, সকাল থেকে পান খাইনি। পান নিয়ে আয়, পান না খেয়ে মরে গেলাম রে বাবা!’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×