পতিবন্দি

  বাসার তাসাউফ ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনিকেত আমার হাজব্যান্ড। আমাকে সে ভীষণ ভালোবাসে। কখনও আমার নাম ধরে ডাকে না। আমাকে সে আহ্লাদ করে ডাকে ‘জান।’

জানের চেয়ে আপন যে জন তাকে তো ‘জান’ বলেই ডাকা উচিত, তাই না?

তার আহ্লাদ যখন উপচেপড়ার উপক্রম হয় তখন এ শব্দটাকে আরও গোল করে ফেলে। বলে, ‘জানু।’

আমি কিন্তু তখন আহ্লাদে গদো গদো হয়ে তার কোলের ওপর ঢলে পড়ি না। বরং ছদ্ম রাগ দেখিয়ে, বিরক্ত হওয়ার মিছে অভিনয় করে মুখ ভেংচে বলি, ‘ঢঙ।’

অনিকেত তখন রাগ না করে, ‘লক্ষ্মীসোনা’ ‘চাঁদের কণা’ ‘ময়নাপাখি’ ‘টুনটুনি’ ‘ঝুনঝুনি’ ইত্যাদি নানা শব্দ ও উপমা ব্যবহার করে আমাকে আরও খুশি করার চেষ্টা করে। আমি তখন কিঞ্চিত আহ্লাদিত হই। কিন্তু সে যেন তা বুঝতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখি।

আমাকে বিয়ে করার পর অথবা আমি বউ হয়ে ঘরে আসার পর থেকেই অনিকেত নাকি ভীষণ বদলে গেছে, বাড়ির লোকজন তা-ই বলছে। বিয়ের আগে সে কেমন ছিল তা তো আর আমি জানি না। তবে বিয়ের পর যেরকম দেখছি তাতে মনে হয়, সত্যিই সে আর আগের মতো নেই। শুনেছি আগে সে অহরাত্রি বাইরে বাইরে কাটাত। বাসায় ফিরত দুই চার দিন পরপর। আর এখন অফিস এবং জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বেরই হয় না। সারাক্ষণই বাসায় থাকে। আমার পাশে পাশে। যাকে বলে বউয়ের আঁচলতলে থাকা। সেদিন তো আমার শাশুড়ি বলেই বসল, ‘ছেলেটার কী হল! সারাক্ষণই প্রতিবন্দীর মতো ঘরের কোণে পড়ে থাকে কেন?’

আমি তখন অনুচ্চ শব্দে হেসেছি আর শাশুড়ি মায়ের উদ্দেশ্যে মনে মনে বলেছি, ‘মা, আপনের পোলা প্রতিবন্ধী না, পতিবন্দি করে রেখেছি আমি।’

সত্যি বলছি, মিথ্যে না, একটুও মিথ্যে না- অনিকেত যখন আমাকে ‘জান’ অথবা ‘জানু’ বলে ডাকে- তখন কী যে ভালো লাগে আমার! শহরের ব্যস্ততম এলাকায় গলিগুপচির দু কামরার বাসাটাকে তখন আমার কাছে মনে হয় স্বর্গের চেয়েও বেশি সুন্দর ও আনন্দময়।

আমাদের ঘরের সবকিছুই পরিপাটি করে সাজনো-গোছানো থাকে। টেলিভিশন আর কম্পিউটারের ওপরে ধূলো জমে না কয়েক ইঞ্চি। ঘরের ছাদের কোণে কোণে মিহিন সুন্দর জাল বুনে না মাকড়সারা। চোখে পড়ে না টিকটিকিদের অবাধ বিচরণ। বিছানা, কাপড়-চোপড় যেখানে যেটা থাকার সেটা সেখানেই থাকে। নিপুন হাতে এসব কিছু সুচারু রূপে গুছিয়ে রাখে অনিকেত নিজে। সংসারের আর সব চাওয়া-পাওয়া পূরণ না হোক অন্তত এ রকম একজন স্বামী পেয়ে আমার ভালোই লাগে।

তারপর একদিন, কয়েক সপ্তাহ শেষে হঠাৎ একদিন সকালে অনিকেত আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি যেভাবে তোমাকে ভালোবেসেছি, তা নিশ্চয়ই তোমার ভালো লেগেছে?’

আমি আহ্লাদি গলায় বলি, ‘হুম, লেগেছে অনেক ভালো লেগেছে?’

‘আমি যেভাবে ঘর গুছিয়েছি তা কি দেখেছ?’

‘হুম, দেখেছি।’

‘এ ক’দিনে নিশ্চয়ই তা শিখে নিয়েছ, এখন তো আর শেখার দরকার নেই। কাল থেকে তুমি এভাবে আমাকে ভালোবাসবে আর ঘর গোছাবে। একটুও ভুল যেন না হয়!’

আমি তখন বিস্ময়ে শুধু ‘থ’ না, একেবারে ‘ত’ ‘থ’ ‘দ’ হয়ে রইলাম।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×