আবু তালেবের নির্বাচনী পরাজয়

  শরীফ শহীদুল্লাহ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজারের চায়ের দোকানটা ক’দিন ধরে নির্বাচনী আলাপে সরগরম। এ সরগরম আড্ডায় আজ আবু তালেবও উপস্থিত। তালেব সাদাসিধা মানুষ। মজমা-আড্ডায় তালেব তালের মতো কথা বলতে পারে না, আবার ঠিকঠাক তালও মেলাতে পারে না। সেই তালেবকে উদ্দেশ করেই কিনা মোতাহের মেম্বার বললেন, ‘শোন তালেব, এবার আমাদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হল তুমি।’

মোতাহের মেম্বারের এক কথায় ‘তালেব ভাই’ ‘তালেব ভাই’ বলে স্লোগানের ঝড় উঠল। স্লোগান পর্ব শেষ হলে মোতাহের মেম্বার উপদেশের সুরে বলেন, ‘তালেব মিয়া, মন দিয়ে শোন, আজ এখানে যারা আছে সবাই তোমার কর্মী। এখন চা-বিড়ির যা বিল হইছে, সেইটা তুমি দিবা। আর নির্বাচনের বাকি দেড়মাস- এ কয়টা দিন তুমি ওদের চালাবা। মনে রাখবা, নেতা হতে গেলে এসব করতে হয়!’

‘আমার ভাই তোমার ভাই-তালেব ভাই-তালেব ভাই...!’ মেম্বারের কথা শেষ হতে না হতেই আরেক দফা স্লোগান ওঠে।

দৈহিক গঠনে আবু তালেব একখানা ছোটখাটো তালগাছ। তালগাছ এক পায় দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে...। ভিড়ের মধ্যে কিংবা বাজারে সবাইকে ছাড়িয়ে আবু তালেবের মাথাখানা চোখে পড়ে। তবে, হাঁটার সময় তালেব কিঞ্চিৎ সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটে। তার মাথাখানা থাকে হাঁটুমুখী।

তালেবের কাছের মানুষরা বলে, তালেব হল ফলবান বৃক্ষ। ফলের ভারে ফলবান বৃক্ষের ডাল যেমন ঝুলে পড়ে, তেমনি তালেবের মাথা নুয়ে থাকে জ্ঞানের ভারে। তবে তালেবের বিরোধীদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলে, লম্বা মানুষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে! আর বুদ্ধিকে সব সময় চোখে চোখে রাখার জন্যই হাঁটুমুখী হয়ে হাঁটে তালেব।

২.

নিজেকে কিছুতেই বিশ্বাস হয় না তালেবের। আবার এটাও ভাবে, স্বয়ং মেম্বার যে তাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন এবং তাতে অন্তত জনা বিশেক লোক সমর্থন দিয়েছে, তা তো আর মিথ্যা না।

কাউকে হেনস্থা করতে চাইলে তাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দাও, না হয় আরেকটা বিয়ে- এ কথা জীবনে বহুবার শুনেছে তালেব, কিন্তু হাঁটুমুখী-তালেবের মাথা পর্যন্ত তা পৌঁছেনি! তার মাথায় শুধুই নির্বাচন।

নির্বাচন করতে অনেক টাকা দরকার, কিন্তু হাত খালি। কোন জমি কার কাছে কত টাকায় বিক্রি করা যায়, সেই চিন্তায় ঘুম নেই তালেবের। যে লোকজন কোনোদিন তালেবের ধারে কাছে ঘেঁষত না, তারাও আশপাশে ঘোরাঘুরি করে, নিশ্চিত জয়ের বিষয়ে আশ্বাস দেয়। হারু বয়াতি বলে, ‘ওরে তালেব, তোমার এবার সুযোগ!’ কালু গাজি বলে, ‘কাশেম চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনেকের অনেক অভিযোগ, কাজেই এবার সব ভোট তোমার। তুমিই আমগো চেয়ারম্যান।’

জনগণের ব্যাপক সমর্থনে তালগোল লেগে গেছে তালেবের। মানুষ যে তাকে এত ভালোবাসে, পছন্দ করে, গুরুত্ব দেয়, এটা সে আগে কেন বুঝল না, তা ভেবে নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকে তার। উত্তর পাড়া থেকে একজন এসে বলে, ‘তালেব ভাই, পুরো গ্রামবাসী আপনার কথা বলছে।’ দক্ষিণের পাড়া থেকে খবর আসে, ‘পাড়ার তিনশ’ ভোট আপনার, লোকজনকে শুধু হাত খরচা দিলেই চলবে।’

তালেব পৈতৃকসূত্রে যে পাঁচবিঘা জমি পেয়েছে, প্রথম ধাক্কায় তার দেড় বিঘা শেষ। মোতাহের মেম্বার, যিনি তালেবকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছেন, তিনিই দয়া করে ওই দেড় বিঘার টাকা তালেবকে নগদে শোধ করেন।

স্ত্রী তালেবকে সাবধান করলে সে স্ত্রীকে আশার বাণী শোনায়, ‘একবার গমের চালান মারতে পারলে দশ বিঘা কিনুন যাইব।’ তালেবের মুখে এমন কথা শুনে স্ত্রীর ভালো লাগে আবার চিন্তাও হয়।

৩.

চারপাশ থেকে ভক্তদের চাহিদা আসে। ‘তোমার কোনো জায়গায় যাওয়া লাগবে না, আমাদের হাত খরচ দাও, আমরা দেখব।’ ‘বুঝলা তালেব, স্কুলের ধারে ডিজিটাল ব্যানার লাগাতে হবে, টাকা দ্যাও।’ ‘প্রতিদিন সন্ধ্যায় তোমার পক্ষে ছেলেপুলে মিছিল করছে, ওদের চা-মুড়ি খাওয়ার জন্য টাকা লাগবে, কিছু দাও।’ ‘উপরের দিকে ম্যানেজ করার জন্য বড় অ্যাকাউন্ট লাগবে, আপাতত অল্পকিছু দাও আর বাকিটা রেডি রাখবা, যখন বলব তখন দিবা।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাকি জমিটুকুর বন্দোবস্ত করার জন্য তালেব এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে। অবশ্য নির্বাচনে যিনি তালেবকে দাঁড় করেছেন, তিনি তালেবের কষ্ট বোঝেন, ‘ধুর মিয়া, খালি মুলামুলি করো, ভেবে দেখেছ, একবার চেয়ারম্যান হতে পারলে খালি টাকা আর টাকা। সুযোগ বুঝে ট্যাকা দিয়া দিবা আর তোমার জমি তুমি ফিরায়া নিবা। কি, ঠিক আছে না?’

তালেব আনমনে মাথা চুলকায়, ‘আচ্ছা।’

৪.

নির্বাচন ঘনিয়ে আসে। তালেবের জমি শেষ হয়, হাতের টাকাও। মোতাহের মেম্বার বলে, ‘জনগণ তো আর রাখতে পারছি না, তারা তো একে একে কাশেম চেয়ারম্যানের পক্ষে চলে যাচ্ছে।’

‘এ কী কন মেম্বার সাব?’ তালেবের মাথায় যেন বাজ পড়ে।

‘ট্যাকা ধার নাও।’

‘কিন্তু কে টাকা দেবে?’

‘কে আর দিবে, আমি তোমাকে দাঁড় করিয়েছি, আমিই দিব।’ মোতাহের মেম্বার বলে।

মোতাহেরর ধারের টাকা তালেবের হাত ঘুরে আবার মোতাহেরের কাছেই যায়। কর্মীদের ক্লান্তি নেই, উৎসাহের শেষ নেই। সবাই টাকা চায়।

তালেবের হাঁটুর বুদ্ধি এখন মাথায়। সে আর ঝুঁকে হাটে না। তালেব এখন প্রচণ্ড ঝড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ।

চারপাশ থেকে নানা পরামর্শ আসে, ‘দ্যাখেন, দুইদিন পরই নির্বাচন, টাকা ঢালার এখনই সময়।’ ‘পোলাপানকে না খাওয়াতে পারলে শেষ মুহূর্তে কিন্তু বড় বিপদ হয়ে যাবে। আজকালকার ছেলেপুলের মন বোঝা দায়, তারা অন্যদলেও ভিড়তে পারে।’ ‘নির্বাচনের আগের রাতটা হল গুরুত্বপূর্ণ। ওই রাতে ভোটারদের হ্যান্ডক্যাশ দিতে হয়। টাকার বিনিময়ে মানুষ ভোট দেয়।’ ‘শুনেছি কাশেম চেয়ারম্যান এ দেড়মাসে একটাকাও খরচ করেনি। সেই জমানো টাকার ব্যাগ নিয়ে তোমার এলাকায় লোক ঢুকিয়েছে। তোমার সব ভোট কিন্তু কিনে ফেলবে।’

এত চাহিদা আর এত পরামর্শে তালেবের মাথায় তালগোল বাঁধে। তা হলে কি চেয়ারম্যানের পদটা হাতছাড়া হয়ে গেল?

নির্বাচনের আগের রাতে সেরের ওপর সোয়া সের নিয়ে হাজির হন মোতাহের মেম্বার, ‘উপরের লোকজন ম্যানেজ করার জন্য যে টাকা রেডি রাখতে বলছিলাম, সেটা দাও। মিছিল-টিছিল, ভোট চাওয়া-চাওয়ি কিছু লাগবে না। উপরেই সব ম্যানেজ হবে।’

তালেব ভেবে পায় না কী বলবে? নির্বাচনের আগেই সে বচনশূন্য!

৫.

সাড়ে ছয় হাজার ভোটের মধ্যে তালেব পেয়েছে মাত্র ছয় ভোট।

তালেবের মনে পড়ে সেই চায়ের দোকানের কথা, যেখানে মোতাহের মেম্বার তাকে চেয়ারম্যান প্রার্থী বলে ঘোষণা করেছিল। মনে পড়ে মুহুর্মুহু স্লোগানের কথা। কোনোভাবেই হিসেব মেলে না তালেবের।

প্রথমদিনই তো চায়ের দোকানে ‘তালেব ভাই’ ‘তালেব ভাই’ বলে স্লোগান তুলেছিল জনা বিশেক। সেই বিশজনের বিশ ভোট গেল কোথায়?

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×