সবাই পাঠক নন কেউ কেউ পাঠক, তবুও-

  ইমন চৌধুরী ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ মুজতবা আলী বহুকাল আগেই বলে গেছেন- বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না। তবুও বাঙালির বইভীতি যেন কিছুতেই দূর হতে চায় না। নানা কাজে তারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করেন; কিন্তু একশ’ টাকা দিয়ে একটি বই কিনতে তাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায় দেউলিয়া হওয়ার ভয়ে! অবশ্য বইপ্রীতিও আমাদের নেহাত কম নয়। যদি সেটা চেক বই হয়। প্রিয় মানুষটির চেয়েও তখন বেশি খাতির-যত্নে সেটা আগলে রাখি আমরা।

এর মধ্যে ভিড়ে ভিড়ে জমে উঠেছে একুশের বইমেলা। স্রোতের মতো মেলায় দলে দলে রোজ আসছেন অনেকে। তাদের অনেকে বাহারি পোশাক পরে মেলায় এসে ঠোঁট বাঁকিয়ে সেলফি তোলেন।মেলার ক্যান্টিনে বসে ফুচকা খান। পুকুরপাড়ে বসে গল্পে মেতে ওঠেন। মাঝে মাঝে বইয়ের পাতা উল্টেও দেখেন। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে শূন্য হাতে বেরিয়ে পড়েন মেলা প্রাঙ্গণ ছেড়ে।

বইমেলার সঙ্গে বাঙালি পহেলা ফাল্গুন এবং ভ্যালেন্টাইন ডে’র আনন্দও যোগ করে নিয়েছে। এ দিবস দুটিকে কেন্দ্র করে বইমেলায় মানুষের যে স্রোত তাদের অর্ধেকও যদি একটি করে বই কিনতেন তবে এ দুটি দিন মেলার স্টলগুলো ফাঁকা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা তো আর হয় না। আমরা বেশিরভাগই বইমেলায় আসি খুশিতে, মেলায় ঘুরতে!

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষের কাছে বইয়ের মূল্য প্লাস্টিকের বালতির চেয়েও কম! তাই তারা রাস্তায় রাজ্যের ভোগান্তি সয়ে, মোটা টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যমেলায় গিয়ে বালতি কিনতে রাজি। কিন্তু বইমেলায় গিয়ে বই কিনতে তাদের যথেষ্ট কার্পণ্য আছে। অথচ বালতি যেমন আমাদের প্রয়োজন, তেমনি বইয়ের প্রয়োজনও কম কিন্তু নয়!

বইমেলা এলেই আমরা বুঝতে পারি, সবাই পাঠক নন- কেউ কেউ পাঠক। যারা হুজুগে ঘোরাঘুরি করতে আসেন তাদের ভিড়ে অনেক সময় নাকাল হতে হয় প্রকৃত পাঠককে। রঙ্গ ভরা বঙ্গদেশের রূপও খানিকটা দেখা যায় বইমেলায় এলে। গোটা দিন কাটিয়ে শত শত বই ঘেঁটেও অনেককে দিব্যি খালি হাতে মেলা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। কেউ কেউ আবার শত শত বই ঘাঁটতে ঘাঁটতেই বিক্রেতার চোখ এড়িয়ে দু-একটা বগলদাবা করে সটকে পড়েন দ্রুত। কেউ কেউ নাক-মুখ কুঁচকে বলেন, ‘বই পড়ার সময় কই?’ যাদের বই পড়ার সময় নেই তাদের মেলায় আসার কীভাবে সময় হয় সেও এক বিরাট রহস্য!

এখন যুগটাই হচ্ছে সেলফির যুগ। বইমেলাই বা বাদ যাবে কেন! বিশেষ করে পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবসে তরুণ-তরুণীরা যে পরিমাণ সেলফি তুলেন তার সিকি ভাগও যদি বই কিনতেন তবে বইমেলার চিত্রটাই বদলে যেত।

অনেকে আবার স্টল থেকে বই হাতে নিয়ে সেলফি তুলে বইটা যথাস্থানে রেখে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটা ধরেন। সেই সেলফি মুহূর্তেই চলে যায় ফেসবুকে। লোকজন সেলফিদাতাকে বইয়ের সমঝদার পাঠক মনে করে লাইক-কমেন্ট দেন। সেলফিদাতা মনের সুখে লাইক গুনতে থাকেন।

এতসব ঝক্কি-ঝামেলা সয়ে যারা বই কেনেন তাদের কতভাগ সে বই বাসায় গিয়ে পড়েন এ নিয়েও আছে বিতর্ক। কেউ কেউ মনে করেন বই কিনে বাসার ড্রইংরুমে সাজিয়ে রাখলে সমাজে মর্যাদা বাড়ে। তাই বই কিনে অনেকে সাজিয়ে রাখেন বইয়ের তাকে। বাড়িতে অতিথি এলে জানতে পারেন গৃহকর্তার বইপ্রীতি আর জ্ঞান অর্জনের কথা। গৃহকর্তা বইয়ের তাকে তাকিয়ে তাকিয়ে গোঁফে তা দেন।

আশার কথা হল, এতকিছুর পরও কিছু মানুষ বই পড়েন। তারাই শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখেন সভ্যতা। কারণ সভ্যতার জন্য বইয়ের বিকল্প কিছু নেই।

তারপরও এটাই সত্য, বইমেলা আমাদের মনোনের মেলা। বইমেলা আমাদের গৌরবের, আমাদের অহংকারের। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বইমেলাও তো তারই ধারাবাহিকতায়। আমরা করবো জয়, নিশ্চয়।

সুতরাং বইমেলার জয় হোক! জয় হোক সত্যিকারের পাঠকদের!

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×