আমাদের মোতালেব ভাই

  রুবেল কান্তি নাথ ১০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা তাকে আদর করে ‘ভাদাইম্যা’ বলে ডাকেন। আদরের এত নাম থাকতে ভাদাইম্যা কেন? প্রশ্নটা মনে জাগাটাই স্বাভাবিক। আসলে তিনি আজতক বাপ-মায়ের খেয়ে বনের মোষই তাড়িয়েছেন বেশি। যার ফলে তার কপালে ‘ভাদাইম্যা’ ট্যাগটা সুপার গ্লু ছাড়াই সেঁটে গেছে। যা অনেক কসরত করেও মুছতে বা কপাল থেকে টেনেহিঁচড়ে নামাতে পারেননি।

যে ‘ভাদাইম্যা’ নামটার আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে, তার আসল ‘মোতালেব’ নামটা। ইতিমধ্যে অনেকে মোতালেবের বদলে তাকে ‘ভাদাইম্যা’ বলে ডাকতেও শুরু করে দিয়েছেন। যে দলে স্বয়ং মোতালেব ভাইয়ের স্ত্রী মানে ভাবি সাহেবাও রয়েছেন।

মোতালেব ভাই অনেক চেষ্টা করেও এহেন যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষমেশ একজন কামেল বাবার দ্বারস্থ হলেন। কামেল বাবা তার সমস্যাগুলো শোনার পর কিছু হাদিয়ার সঙ্গে এক বোতল পড়া পানি দান করলেন।

সঙ্গে এও জানালেন, ‘প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সবার অলক্ষে যারা যারা তাকে ‘ভাদাইম্যা’ বলে ডাকে, তাদের শরীরে একটুখানি পানি ছিটিয়ে দিলে- তার সমস্যা দূর হতে বাধ্য। বাধ্য ছেলের মতো পানি পড়া সমেত বোতলটা বগলদাবা করে প্রসন্ন চিত্তে বাড়িতে ফিরলেন মোতালেব ভাই।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, ভাবি সাহেবা ততক্ষণে রান্নাঘরে নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। তিনি চুপিচুপি পেছনে গিয়ে কিছু পানি তার শরীরে ছিটিয়ে দিলেন। ভাবি হাঁপানি রোগীর মতো এমনভাবে আঁতকে উঠলেন, যেন তার গায়ে গরম তেলের ছিটা পড়েছে!

ভাবি তখন রুটি তৈরি করছিলেন। আচমকা গায়ে পানি পড়াতে তিনি যারপরনাই শিউরে উঠলেন এবং দেখতে পেলেন, মোতালেব ভাই তার পেছনে ভয়ে বরফের মতো জমে গেছেন। সটান দাঁড়িয়ে আছেন ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’র মতো। আর যায় কই, রুটি তৈরি করার বেলুনটা নিয়েই তাড়া করলেন মোতালেব ভাইকে।

তিনিও ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা’ তত্ত্বে যেহেতু বিশ্বাসী, সেহেতু দেরি না করে পড়িমরি করে ঝেড়ে দৌড় দিলেন। পেছন থেকে ভাবি গজগজ করতে করতে বলতে লাগলেন,‘ভাদাইম্যা ব্যাটা, সকালে আসছে মশকরা করতে। মশকরা করার আর টাইম পায় নাই!’

দুই.

যাই হোক, ওইদিন মহারানীকে দামি একটা শাড়ি কিনে দেয়ার শপথ করে, পরে তার ধোলাইয়ের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছিলেন মোতালেব ভাই। নইলে যে তার কপালে টি-টুয়েন্টির চার-ছক্কার মতো বেদম প্রহার ছিল, সেটা বলাই বাহুল্য। বেচারা অবলা প্রাণী থুড়ি, গৃহপালিত স্বামী!

পরদিন ঘুম থেকে উঠে মোতালেব ভাইয়ের দ্বিতীয় মিশন হয়ে দাঁড়াল, তার মায়ের শরীরে পানি পড়া ছিটানো। সেই উদ্দেশে ঘুম থেকে উঠেই মায়ের রুমে উঁকি দিলেন মোতালেব ভাই। দেখলেন, তার মা আয়েশ করে সোফায় বসে পান চিবুচ্ছেন।

এহেন অবস্থায় এক ছুটে রুমে ঢুকলেন মোতালেব ভাই। মায়ের পেছনে গিয়ে কিছু পানি ছিটিয়ে দিলেন তার শরীরে। হয়তো মোতালেব ভাইয়ের মা একটু আনমনাই ছিলেন, তাই বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ভেবে ভাবির উদ্দেশে চেঁচালেন, ‘বউমা, জানালাগুলা বন্ধ কইরা দাও তো। বাইরে বোধহয় বৃষ্টি হইতাছে!’

যাক বাবা, বাঁচা গেল! মা কিছু বুঝতে পারেননি। ফাঁড়াটা বোধহয় বৃষ্টির ওপর দিয়েই গেল। মুখে একটা মিচকা শয়তানের মতো মিচকা হাসি ফুটিয়ে মোতালেব ভাই রুম থেকে বের হতে যাবেন, অমনি শুনতে পেলেন মায়ের কণ্ঠ,‘ওই ভাদাইম্যার ঘরের ভাদাইম্যা, বৃষ্টি আইতাছে দেখতাছস না? জলদি জানালাগুলা বন্ধ কর।’

যে কারণে পানি পড়াটা মা আর বউয়ের শরীরে ছিটানো হচ্ছিল, তার কোনো ফলই তো পাওয়া যাচ্ছে না। কামেল বাবাকে ধরতে হবে। হাদিয়াবিহীন একটা ধোলাই দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভাবলেন মোতালেব ভাই।

তিন.

দান, দান, শেষ দান। এই ভেবে তিন নাম্বার মিশনে নামলেন তিনি। বাপের গায়ে পানি ছিটানোর পরিকল্পনা হাতে নিলেন এবার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বলাই বাহুল্য, মোতালেব ভাইয়ের বাবা মানে খালুজান বেশ বদমেজাজি স্বভাবের মানুষ। পান থেকে চুন খসলেই তিনি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলেন।

বাপের রুমে ঢুকে আড়াল থেকে মোতালেব ভাই দেখলেন, পিতৃদেব আরাম কেদারায় ব্যাঁকা হয়ে আধশোয়া অবস্থায় একটা বই পড়ছেন।

এই তো মোক্ষম সুযোগ। ভাবলেন ভাই। বই পড়ার সময় তিনি এতই মশগুল থাকেন যে, কেউ হুল ফুটিয়ে গেলেও খবর থাকে না। এই মহা সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে চাইলেন মোতালেব ভাই। বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পা টিপে-টিপে খালুর কাছে গেলেন। তার গায়ে একটুখানি পানি ঢালতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পুরো পানিটাই ঢেলে দিলেন। সেই পানির স্রোত ভিজিয়ে দিল খালুর শরীরের নিম্নাংশ।

চোখের পলক পড়তে না পড়তেই মোতালেব ভাই জান বাঁচাতে খাটের নিচে গিয়ে ঢুকলেন। দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ যেমন লাফিয়ে ওঠে ঘুম থেকে, ঠিক সেভাবে তড়াক করে বসা থেকে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। অবাক হয়ে নিজের ভেজা লুঙ্গির দিকে চেয়ে রইলেন। ততক্ষণে অভ্যাসবশত তার মুখ থেকে বোমা ফাটানোর জোরালো আওয়াজের মতো হুংকার বেরিয়ে এলো,‘কোন শালা রে!’

তার চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে খালাম্মা ছুটে এলেন। এসেই খালুর আলুর কর্ম ভেবে বিলাপ ধরলেন,‘হায় হায় রে; আমার এখন কী হইব রে! এই বুইড়া দেখি ঘর ভাসাই দিছে রে! ওরে ভাদাইম্যা, তোরা কোথায় গেলি রে, আইসা দেইখা যা রে, তোর বাপের কাণ্ড...!’

‘ওই চোপ! এসবে আবার ভাদাইম্যারে ডাকতাছো ক্যান? তোমারে হাট থেইকা আইজ অনেক ট্যাকার পান আইনা দিমু। জলদি মুখ বন করো। আর বিশ্বাস করো ভাদাইম্যার মা, আমি এই কাম করি নাই।’ কোনোমতে রাগ সামলে বললেন খালু।

বিশ্বাস-অবিশ্বাস পরের কথা। ওদিকে খাটের তলে লুকিয়ে থাকা মোতালেব ভাই ওরফে ভাদাইম্যা হাসতে হাসতে শেষ। যদিও তিনি মনে মনে হাসছিলেন। শব্দ করে হাসলে যে, খালুর দু’নলা বন্দুকের একটা গুলিও মিস হতো না, সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×