দন্ত বিষয়ক জটিলতা

  মাসুদ রানা আশিক ১০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দাঁত একটি শক্ত বস্ত। এটা আমাদের অনেক উপকার করে। আমরা দাঁত দিয়ে ভাত, মাছ, মাংস চিবিয়ে খাই। দাঁত দিয়ে হাড় পর্যন্ত চিবোতে পারি আমরা। কিন্তু দাঁত না থাকলে আমাদের সবার অবস্থা হতো আমার দাদির মতো। আমার দাদির দাঁত হাতেগোনা কয়েকটি। উপরের মাড়িতে দুইটা, নিচে একটা। এই দাঁত নিয়েই দাদি খাওয়া নামক যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তিনি তো আমাকে প্রায়ই বলেন,‘ নাতিরে, তোদের তো দাঁত আছে। আমারও এককালে দাঁত ছিল। তখন আমিও তোদের মতোই সব খেতাম। আহারে, কোথায় যে গেল সেই দিন!’

আমি দাদিকে থামিয়ে দিই, ‘সেই দিন আর নাই দাদি। এখন আধুনিক যুগ। আমাদের দাঁতও আধুনিক। আমরা দাঁত মাজি আধুনিক পেস্ট দিয়ে। তোমার দাঁত মাত্র তিনটা।

আর আমার ত্রিশটা। তোমার চেয়ে দশগুণ বেশি।’

দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার বাবা সেই মর্যাদার বরখেলাপ করছে প্রতিনিয়ত। কথায় কথায় তিনি বত্রিশ দাঁত ফেলে দেয়ার চিন্তা করেন। সেদিন বাবা ডাকলেন। তিনি ডাকলেই সাধারণত দেশের আপামর ঘটনা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাবেন। তারপর জ্বালাময়ী ভাষণ দেবেন কিছুক্ষণ। এই ভাষণটা আমার কাছে বেশ বিরক্তিকর মনে হয়। ভাষণ দেবেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। বাবা কেন? তিনি তো আমজনতা!

আমি তার সামনে যাই। তিনি পত্রিকা পড়া থেকে মাথা তুলে দেশের সমস্যা নিয়ে তুমুল আলোচনা করতে লাগলেন। কিছু মানুষ আছে খবর দেখতে দেখতে হয়রান হয়ে যায়। বিশ্ব খবর বিশারদ। তার কাছে গেলে তাবৎ বিশ্বের কোথায় কী হচ্ছে, তার পুরোটা জানা যাবে। তারা হল বিবিসি ওয়ার্ল্ড। আমার বাবা সেই ওয়ার্ল্ডের পর্যায়ে পড়ে। আর মা হয়েছে তার উল্টো। তিনি শান্তিপ্রিয় জনগণ। কোথায় কী হচ্ছে সেটা জানা তার ধাঁচের মধ্যে পড়ে না। তিনি রাঁধেন, খান, আর টিভি দেখেন। বিশ্বের কোথায় কী হল সেটা জেনে তার কাছে কোনো লাভ নেই। তবে স্টার জলসা আর জি বাংলায় কোথায় কী হল সেটা তাকে জানতেই হবে। না জানলে এক আর এক-এর যোগফল দুই-এর জায়গায় দশ হয়ে যাবে!

মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চলে গেলে মা বিড়বিড় করে বলতে থাকেন,‘কী হতো বিদ্যুতটা টান না দিলে। আমরা তো আর বিল না দিয়ে থাকি না। প্রতি মাসে গুনে গুনে টাকা দিয়ে দিই।’ মা আফসোসে মরে যান অবস্থা। আমি মায়ের পক্ষে থাকি সর্বদা। তবে ‘জলসা’ আর ‘জি বাংলা’ বিরোধী। যাই হোক, আমি বাবার দিকে না তাকিয়ে কথা বলি, ‘যা হচ্ছে হোক। অত চিন্তা করলে তো আর হবে না। তোমার একার চিন্তায় তো হবে না। সবাইকে চিন্তাতে জাগ্রত বিবেক হতে হবে এবং সেই চিন্তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা বাঙালিরা গালে হাত দিয়ে শুধু চিন্তাই করি। চিন্তার মাধ্যমে কোনো সমাধানে আসি না।’

আমি থামি।

জানি কিছু একটা হবে এখন। হয় বাবা চিৎকার করবেন, না হলে গম্ভীরভাবে বসে থাকবেন। প্রথমটাই হল। চিৎকার করলেন বাবা, ‘খামোস! বলি তোকে জন্ম দেয়াটাই ভুল হয়েছে আমার। তোর মতো বজ্জাতের বাচ্চার এই পৃথিবীতে না আসাটাই উত্তম ছিল। এক চড়ে তোর বত্রিশ দাঁত

ফেলে দেব!’

আমি বাবার কথা ধরে বসি,‘বজ্জাতের বাচ্চা বললে তোমার ওপরই দোষ যায় বাবা। আর আমার তো বত্রিশটা দাঁত নেই। মোটে ত্রিশটা দাঁত আছে। উপরের পাটিতে পনের। নিচের পাটিতে পনের। কেন যে সবাই দাঁত বত্রিশটা বলে বুঝি না।’

বলেই আমি আর দাঁড়ানোর সাহস পাই না। শেষে না জানি বিরাশি সিক্কা চড় বসিয়ে দেন বাবা। এমনিতেই দাঁতের অবস্থা খুব একটা ভালো না। ত্রিশ দাঁতের একটা দাঁত আমার সঙ্গে বিট্রে ঘোষণা করেছে। গত কয়েকদিন হল দাঁতটা বেশ ব্যথা করছে। বিষটা বেশ হতাশাজনক। হতাশা দূরে ঠেলে আশার আলো দেখার জন্য ডাক্তারের কাছে গেলাম। সেখানে গিয়ে বুঝলাম, ‘দেশের আপামর জনসাধারণের অনেকেই দাঁতের ডাক্তারের কাছে আসে। দাঁত নিয়ে আমাদের চিন্তার কোনো অন্ত নেই। না হলে এত বড় সিরিয়াল কেন! আমার সিরিয়াল পঁয়তাল্লিশ। আমার ডাক পড়তেই প্রবেশ করলাম ডাক্তারের চেম্বারে। আমাকে পেশেন্টদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় শুতে বললেন। তারপর মুখ খোলার জন্য আংটা ব্যবহার করলেন। তারপর ডাক্তার বললেন, ‘আপনার কোন দাঁতে সমস্যা?’ আমি একটু অবাক হলাম। এমন বড় সাইজ মুখ হা করা পরিস্থিতিতে আমি কীভাবে বলব, কোন দাঁতে সমস্যা। ডাক্তার আমার এমন অসহায় অবস্থা দেখে নিজেই আমার প্রতিটি দাঁতে হাতের আঙুল ঠেকিয়ে বলতে লাগলেন,‘এই দাঁত, এই দাঁত?’

অবশেষে তার হাতের আঙুল আমার মুখের ইশারা পেয়ে থামল। দাঁতটা তিনি অনেকক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন,‘এই দাঁত রাখা সম্ভব না। রাখলে পাশের দাঁতের অনেক ক্ষতি হতে পারে।’ আমি ডাক্তারকে ইশারায় বললাম, তিনি যেন আমার মুখ থেকে আংটাটা খুলে দেয়। যাতে আমি কথা বলতে পারি। সেটাই হল। আমি ডাক্তারকে বললাম,‘দাঁত রেখে কোনোভাবে চিকিৎসা করানো যায় না?’ ডাক্তার আমার কথা কোনোভাবেই মানতে পারলেন না। তিনি শুধু বললেন, ‘দেখুন দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝুন। নইলে অন্য দাঁতের

ক্ষতি হবে।’

অন্য দাঁতের ক্ষতি হবে ভেবে আমি দাঁত ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। আমার জীবনের বড় এক সিদ্ধান্ত। অবশেষে আমার এক দাঁতের অকাল প্রয়াণে আমি ব্যথিত এবং শোকস্তব্ধ জীবন পার করছি। আমার এখন দাঁতের সংখ্যা ত্রিশ থেকে কমে ঊনত্রিশটা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×