নোমান মামার হাতে এনজিওর নিবন্ধন

  শফিক হাসান ১৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নোমান মামার হাতে সচরাচর পত্রপত্রিকা দেখা যায় না। কস্মিনকালে দেখা গেলেও বুঝতে হবে সেটা কেউ ভুল করে রেখে গেছে! আজকের ঘটনা ভিন্ন। মামা নিজেই নগদ ১০ টাকায় কিনে এনেছেন পত্রিকাটি। দরদাম করতে করতে ৮, ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায় উঠেছিলেন। শেষমেশ বিক্রেতা দয়াপরবশ হয়ে কোত্থেকে যেন খুঁজে বের করে দিয়েছে ১০ পয়সার ৫টা মুদ্রা। ৫০ পয়সা ছাড় পাওয়ায়ও কম খুশি নন মামা, মুদ্রা সংগ্রহকারী কারো কাছে চড়া দামে বিক্রি করা যাবে!

নির্দিষ্ট একটি সংবাদ মামা বারবারই পড়েন। একবার। দুইবার। তিনবার। পাঠতৃষ্ণা মেটে না। শেষমেশ আমার সাপোর্ট চান- ‘বল দেখি, এটা কীভাবে সম্ভব?’

‘কোনটা! আরও কোনো চা-ওয়ালা প্রেসিডেন্ট হয়েছে নাকি?’

‘আরে না। এই দ্যাখ, রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি টাকার ২৫ শতাংশও তাদের পেছনে খরচ হয় না। মাঝখানে মজা লোটে কিছু কিছু এনজিও কর্মকর্তা। এদের উদ্দেশ্য নাকি অসৎ, যেটা মন্ত্রী বলেছেন।’

মামার কথায় বিস্মিত হই না। সু চির শুচিতা যখন নষ্ট হল, মিয়ানমার থেকে ধাপে ধাপে হাজার হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে আসতে শুরু করল বাংলাদেশে। তখন এদেশেরই কিছু মানুষ রমরমা ব্যবসা করেছে। টাকার বিনিময়ে ‘নিরাপদ’ গন্তব্যে রোহিঙ্গাদের পৌঁছে দিয়েছে তারা। একদিকে মানুষের অসহায়ত্ব, অন্যদিকে রমরমা ব্যবসা! এভাবেই চলছে পৃথিবী রঙ্গমঞ্চ।

আমাকে নিরুত্তর দেখে মামা রেগে যান। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলি, ‘আমাদের বলির পাঁঠা বানিয়ে এনজিওগুলো বছরের পর বছর ফান্ড আনছে না? ধুধু মাঠে ছাগল, বন্যাপ্লাবিত এলাকা দেখিয়ে তারা কম টাকা এনেছে? দেশের মানসম্মান ডুবালেও তারা শনৈ শনৈ ভেসেছে আর্থিক উন্নতির জোয়ারে।’

এ কথায় প্রাণ ফিরে পান যেন মামা। হর্ষধ্বনি দিয়ে বলেন, ‘চল, আমরাও এনজিও বানাই!’

‘তাতে কী হবে?’

‘টাকা হবে, পদ হবে। আমি হবো চেয়ারম্যান, তুই পিয়ন!’

এবার আমার রাগার পালা- ‘তা কী করে হয়? চেয়ারম্যানের পরের পদ পিয়ন?’

‘রাগ করিস না, তোর যে যোগ্যতা তাতে...।’

‘ওহ, তোমার যোগ্যতা অনেক বেশি, না? এনজিও কোম্পানি হতে বেশি দরকার ভালো ইংরেজি জানা। আমি আজই বই কিনে ফেলব। বইয়ের নাম : ইংরেজি শিখুন এক সপ্তাহে।’

মামাও উৎফুল্ল হন- ‘আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়? এই ধর, যারা বড় এনজিও কোম্পানির মালিক হয়েছে, তাদের কাছে গিয়ে জেনে আসি, কে কোন গাইড পড়ে ইংরেজি শিখেছেন।’

‘ধুর, তোমার মাথায় বুদ্ধি নেই! তাদের অফিসের দারোয়ানরা ভেতরে ঢুকতে দিলে তো!’

‘তাহলে উপায়?’

‘কঠিন কিছু না। চলো আমরা আগে কাজে নামি। একটা নাম নির্ধারণ করে এলাকা থেকেই সাহায্য তুলি। সবাইকে আহ্বান জানাই- আর্ত মানবতার সেবায় এগিয়ে আসুন!’

বিকালের মধ্যেই দাঁড়িয়ে যায় আমাদের এনজিওর নাম- দেশি-বিদেশি মানবকল্যাণ পরিষদ। বাজার থেকে স্বপন আর্টিস্টকে ডাকিয়ে এনে নানার একটি পতিত জমিতে টানিয়ে ফেলা হয় সাইনবোর্ড। তাতে লেখা হয় ভুঁইফোড় এনজিওটির নাম। দ্বিতীয় লাইনে ‘প্রস্তাবিত ভবন’। সাহায্য চাইলে এলাকাবাসী না-ও দিতে পারে। তাই প্রাথমিকভাবে ভুয়া একটি এনজিওর নিবন্ধন বানাই। বাজারের একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে প্রিন্ট নিয়ে ফটোকপি করি। এক কপি মামার, এক কপি আমার! থানা-পুলিশ বা যে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে আপাতত এটাকেই নিবন্ধন হিসেবে চালানো যাবে।

পরদিন মোরগডাকা ভোর থেকে শুরু হয় প্রচারাভিযান। মামা নিবন্ধন দেখিয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে সাহায্য তোলা শুরু করেন। আমিও সোৎসাহে হাত-পা চালাই। হাজার হোক, আমি এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা! রাতেই শিখে নিয়েছি ভূপেন হাজারিকার গান- মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য...। যেখানেই গানটা গেয়ে সাহায্য চাইতে যাই, লোকজন বেশি গাইতে দেয় না! বলে, দোহাই তোর, আর আগাইস না। একটু বেশিই নিয়া যা!

নানা একদিন মামাকে ডাকেন। বলেন, ‘তোর মতো সীমার মানুষের জন্য কাজ করছে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না রে!’

মামা জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলেন, ‘সীমার নই আব্বাজান, সীমাহীন দয়ালু! এখন সাহায্য দেন। কাঁদছে আমাদের রোহিঙ্গা ভাইবোনরা। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায়-অপ্রতুল বাসস্থান... ইয়া মাবুদ’। মামা ডুকরে কেঁদে ওঠেন। এ কান্না চলে সিন্দুকের চাবি খোলার আগ পর্যন্ত। যেই না হাতে চলে আসে অনুদানের অর্থ, মামা কান্না থামিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে আমাকে বলেন, ‘চল!’

এই ফাঁকে আমি নানাকে প্রাপ্তিস্বীকার রশিদ দিয়ে দিই। নানা সেটি পকেট রাখতে রাখতে বলেন, ‘শুনেছি, রাজাকারের সন্তানরাও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাহায্য দিচ্ছে। তোরা তাদের সঙ্গে মিশবি না তো!’

নোমান মামার গলায় এবার ঝাঁজ-‘আমরা কি ভোটের রাজনীতি করি যে জনসেবার নাম করে জনসমর্থন আদায় করবো!’

এ কথায় ক্ষুব্ধকণ্ঠে নানা বলেন, ‘তোর কণ্ঠই বলে দিচ্ছে, নেতা হতে বাকি নেই! দে, আমার টাকা ফিরিয়ে দে। নেতা মানুষ, লোপাট করে দিতে পারিস!’

আমি ঘোষণা দিই, ‘রিসিট কাটা হয়ে গেছে, এখন ফেরত দেয়ার সুযোগ নেই!’

এই ফাঁকে কিছু ভুঁইফোড় অনলাইন পত্রিকার প্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে আমাদের পক্ষে কিছু নিউজও করাই। অনলাইন পত্রিকায় ছাপা হয় আমার ও মামার ছবি- মানবসেবায় তারুণ্য : নতুন দিগন্তের উন্মোচন!

চতুর্থ দিনের মাথায় তিন ট্রাক ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আমরা রওনা হই কক্সবাজার অভিমুখে। ট্রাকের সামনে লেখা আমাদের এনজিওর নাম। ব্যানারের দুই পাশে আমার ও মামার ছবি। মামা বলেন, ‘এবার অর্ধেক টাকা মেরেছি, আগামীতে নিশ্চয়ই বড় দাঁও মারতে পারবো!’

মামা এনজিওর নিবন্ধনটা মেলে ধরেন সামনে। আমি বলি, ‘ভুয়া এ সনদই হবে তোমার স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি! ইশ, যদি আরও আগে পত্রিকায় খবরটা ছাপা হতো!’

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×