পাত্রপক্ষের আগমন

  জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য ১৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনে প্রথমবার ছেলেপক্ষ আমাকে যখন দেখতে এসেছিল আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের বয়স না। কিন্তু আমি একটা গুরুতর অপরাধ করেছিলাম। স্কুল থেকে আসার পথে যে ছেলেটা রাস্তার ওপাশ থেকে আমার পাশে পাশে আসত সে আমার হাতের ভেতর একটা ফোন নম্বর গুঁজে দিয়েছিল। আমি সেই নম্বরে টেলিফোন করে দুই-তিনদিন গল্প করেছি। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি স্কুলে অনুষ্ঠানের নাম করে তার সঙ্গে দেখা করতে চলে যাই। কপাল খারাপ! সেখানে আমার মামাত ভাই আমাকে দেখতে পেয়ে টেনে-হিঁচড়ে বাসায় নিয়ে আসে।

স্বাভাবিকভাবে মেয়েদের অন্যায় মায়েরা লুকাতে চেষ্টা করে। আমার মা তেমন ছিলেন না। অন্যদিকে আব্বু আমাকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। আমার সারাদিনের যাবতীয় দুষ্টামির কথা আব্বুকে নালিশ দিয়ে মা তেমন সুবিধা করতে পারতেন না। তবে এটাতে কাজ হল। আব্বু অনেক চেঁচামেচির পর সিদ্ধান্ত নিলেন আমার বিয়ে দিয়ে দেবেন। তখন আম্মুরই খারাপ লাগতে লাগল! উনি আমাকে এসে কানে কানে বললেন, ‘চিন্তা করিস না, তোর বিয়ে আমি ভেঙে দেব।’

যাই হোক, ছেলেপক্ষ আমাকে দেখতে এলো। ছেলের রাজশাহীতে শাড়ির দোকান। সারাজীবন আমি প্রচুর রাজশাহী সিল্ক পরতে পারব, আর সবাইকে ডিসকাউন্টে কিনিয়ে দিতে পারব।

পাত্রপক্ষের ভেতর একজন বয়স্কা মহিলা ছিলেন, পাত্রের খালা। এ ধরনের মহিলারা পাশের বাসার আন্টি হওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন।

যাই হোক, ওনারা জানতেন না আমার বয়স এত কম। ভদ্রমহিলা আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘এতটুকু মেয়ে! কিছু মনে করবেন না, মেয়ে কি প্রেম-ট্রেম করে নাকি? এ যুগে কোনো কারণ ছাড়া কেউ এতটুকু মেয়ে বিয়ে দেয় না!’

আম্মু খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘ধরেছেন ঠিকই। আপনাদের বাড়িতে যাবে কিছু লুকানো ঠিক হবে না। আমার মেয়েটা দুনিয়ার বদ। বিয়ে দেয়া ছাড়া এখন আর আমাদের কোনো উপায় নেই।’

ভদ্রমহিলার চোখ কপালে উঠে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘রান্না পার?’

আমি কিছু বলার আগেই আম্মু জবাব দিলেন, ‘কী বলেন, ওর বাপ ওকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছে। একমাত্র মেয়ে। রান্না তো পরের কথা- এক গ্লাস পানি ঢালতে দিলেও গ্লাস ভেঙে পানি ফেলে সব একাকার করে।’

ভদ্রমহিলা এবেলা চুপ হয়ে গেলেন। ছেলে আমার দিকে তাকাল। ছেলের বড় বোন বললেন, ‘ওদের কথা বলতে দাও।’

সবাই উঠে চলে গেল। আমি ভাবছি ছেলে কি বলতে পারে! ছেলে প্রশ্ন হাঁকাল, ‘রবীন্দ্রনাথ কত সালে নোবেল পুরস্কার পান জানো?’

আমি ধাক্কার মতো খেলাম। আস্তে করে বললাম, ‘জি না।’

সে বলল, ‘আচ্ছা, বল তো, কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম কী?’

‘জানি না!’

‘আশ্চর্য, নাইনে পড়, জেনারেল বিষয়গুলোই জান না? কী কর সারাদিন? পড়াশোনা কর তো?’

আম্মু পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে বলল, ‘প্রেম করে! দুনিয়ার বদ মেয়ে, খালি প্রেম করে বেড়ায়। ওর বাপকে বলেছিলাম, এই মেয়েকে কারোর ঘাড়ে চাপিয়ে কেন তার জীবনটা নষ্ট করতে চাইছ! তা শুনবে কেন? মেয়ে পার করতে পারলেই খুশি।’

ছেলে চোখ বড় বড় করে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর আমার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে পাত্রের খালা বললেন, ‘ঠিকমতো পড়ালেখা কর বাপু!’

ছেলে আমার দিকে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নেমে গেল।

আব্বু বললেন, ‘মেয়ে পছন্দ হয়েছে?’

ছেলের বড় ভাই বিনয়ী গলায় বললেন, ‘কাল জানাব।’

কিন্তু সেই কাল আর আমার জীবনে আজ পর্যন্ত এলো না!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×