চলো বদলে যাই

  মো : রায়হান কবির ২৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্মার্টফোন বের করে বাইক থেকে নামল সুজন। না, নিজের বাইক নয়। অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া করা বাইক। আমরা যতটা ধীরে ধীরে বলছি ব্যাপারটা বাস্তবে কিন্তু খুবই দ্রুত ঘটছে সবকিছু। গন্তব্যে আসার আগ থেকেই অন্যান্য গাড়ি বা রিকশাওয়ালাকে ধমকাচ্ছে, যাতে জ্যাম না করে। বাইক থামার আগেই বাইকারকে বলছে তাড়াতাড়ি রাইড শেষ করতে। কেননা দ্রুত ভাড়া মিটিয়ে অফিসে ঢুকতে হবে। আজকেও প্রায় লেট হয়ে যাচ্ছে! আসলে প্রতিদিনই অন টাইমে ঢুকতে চেষ্টা করে বেচারা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। রিকশা থেকে অটোরিকশা, বাস থেকে বাইক সবকিছুতেই চেষ্টা করেছে। বাহনের সঙ্গে বদলেছে রাস্তাও। কিন্তু ফলাফল সেই লেট।

মাঝে মাঝে সুজন চিন্তা করে অফিসের পাশে বাসা নিই। তাহলে আর লেট হবে না। কিন্তু চিন্তা চিন্তা পর্যন্তই থেকে যায়। যাই হোক, প্রতিদিনের মতো আজকেও যথারীতি লেট। অফিসে ঢুকে সেই পুরনো দৃশ্য চোখে পড়ল। সবার ডেস্কে খালি চায়ের কাপ পড়ে আছে, আর সেটা তুলে নিতে পিয়ন ডেস্ক থেকে ডেস্কে যাচ্ছে। আর নিজের ডেস্কে চায়ের কাপের ওপর পিরিচ দিয়ে ঢেকে রাখা। এইচআর থেকে মেইল, ফোনে কিংবা সরাসরি ঝাড়ি প্রতিদিনই খাচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তন শুধু এক জায়গাতে। হয় কখনও ২ মিনিটের লেট অথবা ১২ মিনিটের লেট! অবশ্য আরও এক জায়গায় পরিবর্তন আছে। আগে লেটের জন্য দেশের ভিআইপিদের দায়ী করা হতো, আর এখন সেটা বদলে ‘মেট্রোরেলকে’ করা হচ্ছে। সুজন এমনিতে খুব সজ্জন মানুষ। অফিসের সবাই তাকে বেশ পছন্দ করে। তাকে যতই গালমন্দ করা হোক, সে রাগ করে না। মুখের ওপর অপমান সহ্য করার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে তার। তাই এমন মানুষের ওপর সহজে কেউ রাগ করে থাকতে পারে না। এমনকি কাজে ভুল করে ফেললেও তাকে ফেলে দেয়া যায় না। তা না হলে দিনের পর দিন এভাবে অফিস রুল ভেঙে লেট করেও কীভাবে যেন তার চাকরি টিকে যায়।

তবে সবকিছুর শেষ আছে। অফিসের আগের এমডি চলে গেছেন। তার জায়গায় নতুন কাউকে নেয়া হবে। সবাই খুব আতঙ্কে। না, নিজেদের জন্য নয়। সুজনের জন্য। এই বেচারার বুঝি আর চাকরি টিকল না। কেননা সবাই তো আর ছাড় দিবে না। সুজন নির্বিকার। সে লাঞ্চ ব্রেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে হালকা করে টানতে টানতে বলে, জব মানুষের যায় আসে। এগুলো নিয়ে ভেবে প্যারা নিয়ে লাভ নেই। সিগারেটটা ভালোভাবে টানতে দিন!

ঠিকই এমডি হিসেবে নতুন একজন জয়েন করলেন। এই নতুন এমডি খুব কঠিন প্রকৃতির মানুষ। ওনার সবকিছু সময়মতো হওয়া চাই। পিয়ন থেকে শুরু করে সবাই বেশ আতঙ্কে থাকে। কখন কার ডাক পড়ে তার চেম্বারে তার ঠিক নেই। কলিং বেল থাকলেও উনি ডাকেন ওনার চেম্বারের গ্লাসে টোকা দিয়ে। গ্লাসে টোকা দেয়ার অর্থ উনি কাউকে ভেতরে ডাকছেন। কেউ একজন গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, স্যার কাকে? তখন স্যার নাম বলেন। উনি এসেছেন ১৫ দিন হল। সুজন কিন্তু আগের মতোই। সেই সকালের লেট আর দুপুরের আয়েশি সিগারেট! এবারের টোকা পড়তেই এইচআরের লোকের ডাক পড়ল। পরের টোকাতেই সুজন!

আর যায় কোথায়? পারলে পুরো অফিসের সব এমপ্লয়ি এমডি স্যারের চেম্বারের বাইরে ভিড় করে। সবার আগ্রহ কী টাইপের ঝাড়ি খায় সুজন তা শোনার। এমডি স্যার কড়া হলেও কথা বলেন আস্তে। তাই ঝাড়ির অংশ বিশেষ আর বাইরে এলো না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সুজন বাইরে এলো। অনেক বছরের চেনা হাসি হাসি মুখটা এই প্রথম একটু থমথমে। বোঝাই যাচ্ছে বেচারার ওপর ঝড় গেছে অনেক। সবাই জানতে চাইল, কী বললেন স্যার? সুজন মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে বলল, স্যার বদলে যেতে বলেছেন, তা না হলে অফিস বদলাতে বলেছেন। সবাই এবার নিশ্চিত সুজন বদলাবেই। আর কেউ না পারুক এবার নতুন এমডির কড়া শাসনে বদলাতে তাকে হবেই। তা সেটা কতটা সময় নেবে এটাই ছিল দেখার বিষয়। অর্থাৎ নতুন এমডি দায়িত্ব নেয়ার ১৫ দিনের মাথায় এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পরের দিন সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে অফিসের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন কোনো চিফ গেস্ট আসবেন। সবাই ভেবেছিল ১০টার আগেই হয়তো সুজন চলে আসবে। গ্রেস টাইমে আর যাবে না। ১০টা ১০ মিনিট পর্যন্ত গ্রেস টাইম। দেখতে দেখতে ১০টা ১০ পেরিয়ে ১১ মিনিট হয়ে গেল। লেট যেন অফিসের সবার হচ্ছে এমন টেনশন। সুজন তাও আসে না কেন? কেউ কেউ আশঙ্কা করলেন তাহলে কি সুজন নিজেকে না বদলে অফিসই বদল করল? সবাইকে আর বেশি টেনশনে না রেখে ১০টা বেজে ১৫ মিনিটে যথারীতি সুজন প্রবেশ করল। কিন্তু এ কোন সুজন? জিন্স, টিশার্ট বাদ দিয়ে পুরো ফর্মাল ড্রেস, চুলেও নতুন কাটিং। সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ কর্পোরেট লুক। অফিসে ঢুকেই যথারীতি অজুহাত, আজকে নতুন একটা বাসে উঠলাম, ভাবলাম দ্রুত আসবে। কিসের কী? ‘বাদশা’ নামের এই বাস নাকি আগে ‘ফকির পরিবহন’ ছিল। কে জানত এটা নতুন বাস না। উঠে ধোঁকা খেলাম। না হলে আজকে ঘুম থেকে আগেই উঠেছি অথচ অফিসে সময়মতো আসতে পারলাম না। এবার এইচআর প্রধান বললেন, ঠিকই বলেছেন, বাসের নাম বা রং যতই বদলাক, ড্রাইভার তো সবাই আগেরই রয়ে যায়। সুতরাং বাসের নাম বা রং বদলালে যেমন দুর্ঘটনা কমে না, তেমনি পোশাক বদলালেও লেট কমে না! বদলাতে যদি কিছু চান, পোশাক না বদলে কমিটমেন্ট বদলান। হ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×