মতিন ভবনের জবান‘বন্দি’

  শফিক হাসান ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেয়ালেরও কান আছে এমন প্রবাদের জন্মদাতাদের প্রতি দুঃখমিশ্রিত এক ধরনের করুণাই অনুভব করে মতিন ভবন। দেয়ালের শুধু কান কেন, প্রতিটি ভবনের পঞ্চেন্দ্রিয়ের পাশাপাশি মস্তিষ্কও রয়েছে। নিজেদের শ্রেষ্ঠ দাবি-করা মানুষগুলো সেসব জানেই না!

মতিন ভবনের মালিকের নাম মতিনুর রহমান। নিজের নাম বাড়ির ঘাড়ে চাপিয়ে তিনি যারপরনাই আনন্দিত! ভবনের যেহেতু নিজস্ব নাম নেই, অমুকের বাড়ি তমুকের বাড়ি নামেই পরিচিত হয়ে থাকে। আশপাশের এবং প্রতিবেশী ভবনগুলো এ নামেই পরস্পরকে সম্বোধন করে থাকে। খাচ্ছর ‘মনিবের’ প্রতি বিরাগবশত মতিনুর রহমানের বদলে সে নিজের নামকরণ করেছে মতিন মিয়া। এ নামেই তার ইয়ার-দোস্তরা সম্বোধন করে।

মতিন মিয়া চিরদুঃখী; জন্ম থেকেই কত মানুষের লাথি-গুঁতা সহ্য করে যাচ্ছে। তার ওপর আছে সময়ে-অসময়ে ঠোকাঠুকি, সংস্কার কিংবা আলোকসজ্জার জ্বালাতন। সে রক্তাক্ত হলেও কাউকে দেখাতে পারে না। অকৃতজ্ঞ মানুষগুলোকে নিজের বুকে আগলে রাখে, বিনিময়ে বঞ্চনাই পায় প্রতিনিয়ত। রাবীন্দ্রিক এবং সংবেদনশীল মানুষরা ধীরলয়ে হাঁটলেও ছেলে-বুড়ো অনেকেই হাঁটার ‘ডাইস’ ভালো না। কাকে জানাবে মনোবেদন! দুঃখ মনেই থেকে যায়, যেহেতু তার জবান নেই। জবান নেই তো সেটাকে ‘বন্দি’ করার সুযোগও নেই। জীবনের প্রতি বেশি বিতৃষ্ণ হলে মাঝে-মধ্যে ভাবে, একবার- যদি একটিবার ফিরে পেতো জবান, অনেকের মুখোশ খুলে দিতো সে। উন্মোচিত হতো ভদ্রবেশী বদমাশদের চেহারা। সেই অনেকের মধ্যে প্রথমেই থাকবে গৃহমালিক মতিনুর রহমান। অন্যের জায়গা দখল করে কত সহজেই সে সাড়ে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের ভবনটিকে দফায় দফায় উন্নীত করেছে ২২ তলায়। এত বড় ধাপ্পাবাজ ও হারামখোর ৩৬ বছরের জীবনে কমই দেখেছে মতিন মিয়া।

জীবনের লাইফ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। নতুন করে শুরু হয়েছে আগুন আতঙ্ক। সবাই শুধু ভবনে আটকাপড়া এবং পুড়ে কয়লা হওয়া বাসিন্দাদের জন্য আহাজারি করে। কিন্তু যে ভবনটি তাদের ধরে রেখেছে বুক আগলে, তার অঙ্গার হওয়ায় কারোরই কিছু যায়-আসে না। হায়রে মনুষ্যকুল, কবে তোরা মানুষ হবি! পাপী মানুষদেরই আগুনে পোড়ার কথা, আজকাল নিরীহ মানুষ এবং ভবনগুলোকেও পুড়তে হচ্ছে। সারা দেশেই আগুন আতঙ্ক। রাজধানীর নিমতলী ট্রাজেডি থেকে চুড়িহাট্টা- এ আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে, সব প্রাণে! তারপর শুরু হল মচ্ছব; আজ বনানীতে আগুন তো কাল গুলশানে, এখানে-ওখানে সবখানে অগ্নিকাণ্ড। গত বৃহস্পতিবার খিলগাঁও কাঁচাবাজারের আগুনে অসংখ্য দোকানের প্রাণ হারানোতে বুক ফেটেছে, নীরব অশ্রু ঝরেছে তবুও কিছুই করতে পারেনি মতিন মিয়া। সেদিনই আবার শান্তিনগরে আগুন! এই যদি হয় ‘শান্তি’র অবস্থা, কোথায় মুখ লুকাবে মানুষ, কোথায় যাবে সংশ্লিষ্ট ভবন! মতিন মিয়াও অপেক্ষা করছে নিজের মৃত্যুর। নিশ্চিন্তে থাকার উপায় নেই।

ডাবল ইউনিটের ২২ তলার মতিন ভবনে থাকে ৪৩ ভাড়াটিয়া। একটিতে ভবন মালিক। ভাড়াটিয়ারা কেউ আবাসন বানিয়েছে, কেউবা অফিস। একটি জায়গায় অনেকের মধ্যেই মিল- টিকে থাকার জন্য ভালোমন্দ অনেক কিছুই করে। আদম ব্যবসায়ীরা দরিদ্র মানুষকে সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ঠেলে দেয় প্রবাসে মৃত্যুমুখে। মতিনুর রহমান প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েও সুযোগ পেলে দুর্নীতি করতে ছাড়েন না। ভবন না, যেন মুরগির খোঁয়াড় বানিয়েছেন। যে কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যুর স্বাদ মোকাবেলা না করে উপায় নেই।

প্রতিবেশী সখিনা মঞ্জিলে আগুন লাগলে ভীষণ মুষড়ে পড়ে মতিন। সখিনা তার দীর্ঘদিনের সুখ-দুঃখের প্রেমিকা ছিল। তাদের বিয়েপ্রথা নেই, দূর থেকেই কথা হতো, বিনিময় হতো সুখ-দুঃখ। সখিনা ভবনের বাসিন্দাদের অনেকেই পুড়ে ছাই হল। তাদের নিয়ে রাজনীতি করতেও ছাড়ল না অনেকেই। এতগুলো মানুষ যে মারা গেল, শুধু তাদের পরিবারই জানে কে গেল, কী হারাল!

এর মধ্যেই এলো ষড়যন্ত্রের আভাষ! মতিন ভবনের বাসিন্দারা অগ্নিকাণ্ডে মালিককে অনুরোধ জানাল প্রয়োজনীয় সংস্কারের। অর্থলোভী মালিক তাতে কর্ণপাত না করে বললেন, ‘পোষালে থাকেন নইলে ভাগেন!’ এমন না-হক আচরণে হোঁচট খেল অনেকে। কিন্তু কোথায় যাবে, ঢাকা শহর যেখানে অগ্নিকুণ্ড সেখানে পালানোর জায়গা কই! নতুন জায়গায় বাসাভাড়া নিলে কমসে কম মাসে দুই হাজার টাকা বেশি গুনতে হবে।

বিক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের মতলব জেনে আঁতকে উঠল মতিন মিয়া। এরা খাচ্ছর মালিককে আচ্ছামতো ধোলাই দেবে। একদিন পরিকল্পনামাফিক মতিনুর রহমানের বাসায় প্রবেশ করলেন দুই ও তিনতলার দুজন ভাড়াটিয়া। দোতলার বাসিন্দা শাহিন বলেন, ‘অবিশ্বাস্য কারবার, আপনার মরিচ গাছে দেখছি গোলাপ ফুল ফুটেছে!’

ঘাগু মাল মতিনুর রহমান। গালগল্পে ভোলার ব্যক্তি নন। তিন তলার বাসিন্দা প্রসেনজিৎ হালদার বললেন, ‘এমন কাণ্ড জীবনেও দেখিনি!’ বাধ্য হয়েই বলতে হল ‘চলেন তো দেখি!’ তিন জন মিলে রওনা হয় ছাদের দিকে। এদিকে মতিন মিয়ার বুক ফেটে যায়। লোকটাকে আরেকটু সুযোগ দেয়া যেত। সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টরা চাইলে কী না পারে! অথচ নিরাপত্তার স্বার্থে এরা নিজেদের হাতে তুলে নিতে যাচ্ছে আইন!

দীর্ঘদিনের মনিবের প্রতি করুণার বদলে বিরক্তি অনুভব করে মতিন মিয়া- ‘কত্ত বড় বেকুব তার

মনিব, মরিচ গাছে কখনও গোলাপ ফোটে রে!’

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×