বাজেটের জেট

  রোহিত হাসান কিছলু ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘অনেক সাধনার পরে আমি, পেলাম তোমার মন...!’ রাহির এখন গুনগুন করে এই গান গাওয়ার কথা। কিন্তু ভয়ে-টেনশনে তার গলা শুকিয়ে আসছে। সে গান গাইবে কী করে? রাহি পানির বোতল থেকে ঢকঢক করে প্রায় হাফ লিটার পানি পান করে ফেলল। নাহ! তাতেও তার গলাটা ভিজল না। রাহি আবার পানির বোতল হাতে তুলে নিল। ঠিক তখনই পাশ থেকে তার বন্ধু মটকু বাবু বলে উঠল, ‘এই নিয়ে দশ মিনিটে তুই তিন লিটার পানি খেয়েছিস! এই যে এত পানি খাচ্ছিস, মনে করে একটা অ্যাডাল্ট ডায়াপার পরে যাস। নয়তো টিনার সামনে বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। মনে রাখিস, একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না।’

রাহি চোখ পাকিয়ে মোটকু বাবুর দিকে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও বলে না। মোটকু বাবু ঠিকই বলেছে। ছোট-খাটো একটা নিুচাপ রাহি এখনই অনুভব করছে। আবার এই মুহূর্তে মোটকু বাবুর সঙ্গে কোনো গ্যাঞ্জাম করতেও ইচ্ছে করছে না। আজ একটা শুভ দিন। এই শুভ দিনে কোনো গ্যাঞ্জাম করা ঠিক হবে না। তাছাড়া তিন দিন টানা দিন-রাত জেগে এই মোটকু বাবু তাকে অনেক সাহায্য করেছে। রাহি মনে মনে মোটকু বাবুকে মাফ করে দিল।

রাহি আজ তার মনের মানুষের কাছে ভালোবাসার বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। এতদিন সে ছিল শুধুই ক্র্যাশ। তিন দিন আগে রাহি টিনাকে তার মনের কথা জানায়। জবাবে টিনা বলে, ‘আগে বাজেট পেশ করো! বাজেটের জেট ঠিকমত ছোটাতে পারলে আমি রাজি আছি তোমার সঙ্গে প্রেম করতে।’ তারপর তিন দিন তিন রাত জেগে মোটকু বাবুর বিশেষ সহায়তায় রাহি একটা ভালোবাসার বাজেট তৈরি করেছে। যার গতি জেট বিমানের চাইতেও দ্রুত। আজ বিকালে টিনার সামনে সেই বাজেট পেশ করার কথা। সেই ভয়েই তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রাহি কাঁপা কাঁপা হাতে তার তিনশ’ বিশ পাতার ভালোবাসার বাজেট বের করল। তারপর টিনার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলতে গিলতে বলল, ‘শুরু করব মাননীয় প্রেমিকা?’

টিনা ঝাড়ি দিয়ে বলল, ‘আগেই প্রেমিকা বলছ কেন? এখন তো আর আগের যুগ নেই যে চোখে চোখ পড়লেই প্রেম হয়ে যাবে। এখন বাজেট পেশ করা লাগে! বাজেটের জেট ঠিকমতো ছুটলে তবেই প্রেম হবে।’

ঝাড়ি খেয়ে রাহির গলা আরও শুকিয়ে গেল। শুকনো গলায় বার কয়েক ঢোক গিলে রাহি বলল, ‘তাহলে তোমাকে কী বলব?’

‘কী বলবে মানে? ক্র্যাশ বলো! ক্র্যাশ! যদি বাজেটে পাস করো তবেই প্রেমিকা বলার অনুমতি পাবে। নয়তো সারা জীবন ক্র্যাশ বলেই ডাকবে!’

রাহি লম্বা করে একটা দম নিয়ে শুরু করল, ‘আগামী বছরে তোমার শপিং খাতে আমার বাজেট হল এক লাখ বিশ হাজার টাকা।’

বাজেটের মাঝখানেই টিনা উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘এক বছরে মাত্র এক লাখ বিশ হাজার টাকা! তুমি কী আমার সঙ্গে ফাইজলামি করতে আসছো?’

রাহি আমতা আমতা করে বলল, ‘মাননীয় ক্র্যাশ, চাইলে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ান যাবে।’

‘কত বাড়াবে শুনি?’

‘দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা।’

‘এটা কী চিংড়ি মাছের বাজার পাইছো? মুলামুলি করছো কেন? বিশ লাখ টাকা বাড়াতে পারবা?’

রাহি বড়সড় একটা ঢোক গিলে বলল, ‘জি, পারব।’

টিনা খুশি হয়ে বলল, ‘গুড বয়! এবার সামনে আগাও। সময় কম।’

রাহি আবার তার বাজেট পেশ করতে শুরু করল, ‘খাদ্যদ্রব্য মানে রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া খাতে বরাদ্দ দুই লাখ টাকা।’

টিনা আবারও বাধা দিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, খাওয়া-দাওয়ায় মাত্র দুই লাখ! তুমি কী আমাকে পানি খাওয়ায় রাখবা নাকি?’

রাহি থতমত খেয়ে বলল, ‘পানি খাওয়াবো ক্যান? যা খাইতে চাও খাওয়াব।’

‘আমি সব জায়গার খাবার খাই না। ফাইভ স্টার হোটেল ছাড়া পানিও খাই না।’

‘তাইলে তুমিই কও, এই খাতে কত বরাদ্দ দিব?’

‘ত্রিশ লাখ টাকা রাখতে পারবা?’

‘জি, পারব।’

‘গুড বয়! যাও, সামনে আগাও। আমার সময় কম।’

রাহি আবার বাজেট বলা শুরু করল, ‘ঘুরাফিরা খাতে দশ হাজার টাকা বরাদ্দ রেখেছি।’

কথাটা শুনেই টিনা আবারও উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘মানে কী? এরকম ফকিন্নি বাজেট নিয়ে তুমি আসছো আমার সঙ্গে প্রেম করতে? আরে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কী এই দশ হাজার টাকায় যাওয়া যাবে?’

রাহি এবার অবাক হয়ে বলল, ‘বিয়ের আগেই হানিমুনে যাবা?’

‘জি না, সব কিছু এত সহজ মনে কইরেন না। যাব তো শুধু আমি। খরচ দিবা তুমি।’

‘আচ্ছা ঠিকাছে।’

টিনা এবারে সন্দেহের দৃষ্টিতে রাহির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝছি, তোমার পুরো বাজেটই আবার ঠিক করতে হবে। তুমি আমাকে এক কথায় বল তো, তোমার মোট বাজেট কত?’

‘তোমার কথা মতো শপিং ও খাওয়া-দাওয়া খাতে বিশ ও ত্রিশ লাখ ধরলে বছরের মোট বাজেট ষাট লাখ টাকা।’

টিনা নাক ছিটকে বলল, ‘ইমা! ছিঃ কী ঘেন্না! এটা কোনো বাজেট হল! তুমি জানো আমার একটা টেডি বিয়ারের দামই পাঁচ লাখ টাকা। বাপি সিঙ্গাপুর থেকে এনে দিয়েছে।’

রাহি বার কয়েক ঢোক গিলে বলল, ‘তাহলে তুমিই বল, মোট কত টাকার বাজেট হলে তোমার আমার প্রেম হবে?’

টিনা একটু চিন্তা করে বলল, ‘বেশি না, মাত্র দশ কোটি টাকা হলে সবদিক থেকে ঠিক হবে।’

‘দশ কোটি!’ রাহির মনে হচ্ছে সে এখনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। দশ কোটিতে কয়টা শূন্য হয় সে তাই জানে না। টিনার সঙ্গে প্রেম করার জন্য দশ কোটি টাকা সে কোথায় পাবে?’

টিনা তাগাদা দেয়, ‘কী ভাবছো? তুমি রাজি কিনা তাড়াতাড়ি বল? সন্ধ্যায় বাতেন তার বাজেট পেশ করবে। আমাকে সেখানে যেতে হবে।’

রাহির মাথা ঘুরছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। টিনার কথায় রাহি কোনোরকমে বলল, ‘আমি রাজি।’

টিনা খুশি হয়ে বলল, ‘গুড বয়! আচ্ছা এই যে দশ কোটি টাকা তুমি বছরে আমার পেছনে খরচ করবে, এই টাকাটা তুমি কোন উৎস থেকে আয় করবে?’

রাহি হাসি মুখে বলল, ‘তোমাদের বাসায় চুরি করব!’

টিনা চোখে মুখে ঘেন্নার ভাব ফুটিয়ে বলল, ‘ছিঃ ছিঃ তুমি চুরি করবে? নাহ, একটা চোরের সঙ্গে আমার প্রেম হতে পারে না। তুমি বাদ। তুমি চোর!’

টিনা চলে যাচ্ছে। রাহি টিনার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘হায়রে! যার জন্য করব চুরি, সেই কয় চোর!’

আর এভাবেই ক্র্যাশ ল্যান্ডিং-এর পর মুখ থুবড়ে পড়ল বাজেটের জেটটা।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×