প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষা নাশ

  কাজী মাহমুদুর রহমান ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষা নাশ

মাথা নষ্ট, ম্যান!

আজকালকার পোলাপান বেশি উত্তেজিত হয়ে গেলে একটা ডায়লগ দেয়, মাথা নষ্ট, ম্যান! প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল দেশের এনালহগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তারা যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছেন, তাতে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো বিহিত হোক আর না হোক পাবলিকের মাথায় পোলাপানের ডায়লগটা কিন্তু চলেই আসে। এইতো, সেদিন প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে বন্ধ হল ইন্টারনেট। ঝিকে মেরে বউকে কে কখন কী শেখাতে পেরেছেন জানি না তবে হবু রাজার গবু মন্ত্রী মহোদয়ের মতো তুঘলকী এসব মাথা নষ্ট সিদ্ধান্তে পাবলিকের বিনোদন আর ফেসবুকের স্ক্রল এই দুই ক্ষেত্র বাম্পার ফলন দেখেছে।

জুতা আবিষ্কার

হবু রাজা আর গবু মন্ত্রীর কথা যখন এসেই গেল, রবিঠাকুরের জুতা আবিষ্কার কবিতাটি একটু স্মরণ করা যাক। রাজার মাথায় মহাচিন্তা, ‘মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায়, ধরণী মাঝে চরণ ফেলা মাত্র!’ সভাসদ সবার মিলিত বুদ্ধিতে সাড়ে সতেরো লাখ ঝাঁটা কিনে শুরু হল ঝাড়ু দেয়া। ফলাফল চমৎকার, ‘করিতে ধুলা দূর, জগৎ হইল ধুলায় ভরপুর’। সুতরাং এল নতুন ফর্মুলা। এবার ছুটল একুশ লাখ ভিস্তি। কলসির জলে স্থলভাগ গেল ডুবে, পুকুর খাল নদী গেল শুকিয়ে। ‘কহিল রাজা,’ এমনি সব গাধা, ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা।’ এভাবে নানা রকম ফন্দি ফিকির করেও যখন কাজ হল না তখন ঠিক করা হল, চামার ডেকে যদি পুরোপৃথিবী চামড়া দিয়ে মুড়ে দেয়া যায় তবেই ধুলি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। উপযুক্ত চামার আর যথাযোগ্য চামড়ার খোঁজে হন্যে হল সবাই।

চামার কুলপতি এসে শেষমেষ বলল, বলিতে পারি করিলে অনুমতি সহজে যাহে মানস হবে সিদ্ধ নিজের দুটি চরণ ঢাকো তবে ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।’

ওরে মাথা নষ্ট, ম্যান! প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, ছাপা, বিতরণ এর বাইরে কারও সুযোগ আছে ফাঁস করার? ওইসব জায়গায় হাত না দিয়ে চিলের (থুক্কু ইন্টারনেটের) পিছু নিয়ে মাথা নষ্ট করার কী মানে?

ফার্মগেট পদচারী সেতু

মাথা নষ্ট ব্যাপারগুলো কেন ঘটে? প্রশ্নটা সহজ, উত্তর সহজ নয়। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা দেখে ব্যাপারটা কিছুটা আন্দাজ করা যায় বৈকি। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা নমুনা হতে পারে ফার্মগেট ফুট ওভারব্রিজের চালচিত্র। হাত-পা নেই ভিক্ষুকের, চলছে ভিক্ষা কালেকশন কর্মসূচি, চলছে হরেক রকমের হকারের বাণিজ্য। হাজার মানুষের এসব ভিড় ঠেলে যাওয়ার বেলায় কখন যে পকেটমার হয়ে যায়, আন্দাজও থাকে না। আমাদের নানামুখী শিক্ষা আর তার তুঘলকি ব্যবস্থাপনায় কেমন যেন বল্গাহারা, লাগামছাড়া। প্রশ্নপত্র ফাঁস তাই এখানে কোনো অঘটন নয়, এমনকি অনিয়মিতও নয়। প্রশ্নফাঁস এখন সর্বজনীন মানবাধিকার। শিক্ষার্থী, শিক্ষক অভিভাবক কেউ প্রশ্নফাঁসকে অস্বাভাবিক ভাবতে রাজি নয়।

হ্যামিলনের বাঁশিওলা

এক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী ছিলেন এহসানুল হক মিলন। হ্যালিকপ্টারে করে দেশের নানা প্রান্তে ছুটে বেড়িয়ে তিনি সমালোচনার স্বীকার হয়েছেন। অথচ সেই ছুটে বেড়ানোটা প্রমোদ ভ্রমণ ছিল না, ছিল পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ। সর্বগ্রাসী নকলের যুগে মিলন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো নকলের সলিল সমাধি দিতে চেয়েছিলেন। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী তো সততার একজন মূর্ত প্রতীক। কিন্তু তিনি কি পারবেন প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে? নাকি সর্বনাশা প্রশ্নফাঁসের শিকার হয়ে আমাদের শিশুরাই তলিয়ে যাবে অথৈ জলে? যেমনি করে হ্যামিলন শহরের শিশুরা একদিন হারিয়ে গিয়েছিল!

পদত্যাগ সমাধান নয় তবে-

নেপোলিয়ন যদি আমাদের দেশে এসে প্রশ্ন ফাঁস দেখতেন অথবা তার যদি একটিও ফেসবুক আইডি থাকত তিনি হয়তো আমাদের বলতেন, আমাকে একটি ফাঁস করা প্রশ্ন দাও, আমি পুরো জাতিকে পঙ্গু করে দেব। আমাদের ভবিষ্যতের সমস্ত সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য প্রশ্ন ফাঁস নামের এই একটি ব্যবস্থাই যথেষ্ট। প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ে ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ অথবা অপসারণ চেয়ে সংসদে দাবি তুলেছেন একজন সংসদ সদস্য। একটি উকিল নোটিশও দিয়েছেন একজন আইনবিদ। কিন্তু একজনের আসা-যাওয়ায় কি এসে যায়? প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো হয়তো খুব অসম্ভব কিছু নয়। কানের খোঁজে চিলের পিছু নিয়ে নয়, শর্ষের মাঝে চেপে থাকা ভূত তাড়ালেই তো হয়!

[email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.