মহল্লার চায়ের দোকানে বিশেষ অজ্ঞদের ক্রিকেট যুদ্ধ

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রোহিত হাসান কিছলু

বাতেনের বাপের চায়ের দোকানে উপচেপড়া ভিড়। না, বাতেনের বাপের দোকানের চা এমন আহামরি কোনো চা নয়। তবুও এ ভিড়ের কারণ, বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ হেরে গেছে। দলে দলে বিশেষ অজ্ঞরা এসে চায়ের দোকান গরম করে ফেলেছে। কী আর করবে? এদের তো আর কোথাও যাওয়ার জায়গাও নাই!

‘কইরে বাতেন, আমার চা কই?’ ধমকে উঠলেন এক বয়স্ক বিশেষ অজ্ঞ। বাতেন দোকানের এক কোনায় চায়ের কাপ ধুচ্ছিল। সেখান থেকেই সে জবাব দিল, ‘দিচ্ছি চাচা, পানিটা একটু ফুইটা লক। আপনি ততক্ষণে টস হারাটা নিয়ে আরেকটু বয়ান করেন।’

বয়স্ক বিশেষ অজ্ঞ বয়ানে ব্যস্ত হয়ে গেলেন,‘আসলে ম্যাচটা আমরা শুরুতেই হেরে গেছি! টস জেতাটা জরুরি ছিল!’

পাশ থেকে আরেক তরুণ বিশেষ অজ্ঞ বলে উঠলেন,‘টসে জিতলেই কি ম্যাচ জেতা যায়? আগে ক্রিকেটটা আরেকটু বুঝতে শিখুন।’

বয়স্ক বিশেষ অজ্ঞ রীতিমত চেতে গেলেন। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন বাতেনের বাপ। দোকানে একটা গ্যানজাম লেগে গেলে বেশ ফায়দা হয়। গত ম্যাচের পরও তার দোকানে ক্রিকেট বিশেষ অজ্ঞদের একটা গ্যানজাম বেধে গিয়েছিল। এই সুযোগে সে চিনি ছাড়াই চা বানিয়ে সবাইকে খাইয়ে দিয়েছে। চিনির খরচাটা বাইচা গেছিল। পাবলিক এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে চায়ে চিনি না দেয়ার বিষয়টি কেউ টেরই পায়নি! আজ সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, সেদিনের মতো আরেকটা গ্যানজাম বাধলে চায়ের লিকার ও দুধের খরচাটাও বেঁচে যাবে! তবে এর জন্য বেশ বড় একটা গ্যানজাম বাধতে হবে। যাতে এই বিশেষ অজ্ঞরা কোনো মতেই বুঝতে না পারে তারা আসলে চায়ের বদলে গরম পানি খাচ্ছে!

বয়স্ক বিশেষ অজ্ঞ তখনও উত্তেজিত হয়ে বলছেন, ‘মিয়া আমারে ক্রিকেট নিয়ে জ্ঞান দিয়ো না। তোমার বাপ-মায়ের বিয়া খাইছি। তোমার থেকে অনেক বেশি ক্রিকেট দেখছি।’

তরুণ বিশেষ অজ্ঞ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। উত্তেজনার চোটে দোকানের বিশেষ অজ্ঞরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেল। যখন গ্যানজাম চরম আকার ধারণ করবে করবে ভাব, ঠিক তখনই এলাকার লোটন কাকু চলে এলো। উনি এই পাড়ার সবচেয়ে বড় একজন বিশেষ অজ্ঞ। দল জিতলে তালি দেন। আর যেদিন হারে সেদিন সবাইরে মন খুলে গালি দেন। দোকানে ঢুকেই তিনি হাঁক দিলেন, ‘ওই বাতেন, গরম পানি দিয়ে কাপ ধুয়ে এক কাপ চা দে।’

লোটন কাকুকে পেয়ে চায়ের দোকান আরও গরম হয়ে উঠল। সবাই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হারের বিষয়ে লোটন কাকুর একটা মতামত জানতে চায়। লোটন কাকুও একটা চেয়ারে বসে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলা শুরু করলেন, ‘ওই ম্যাচে বোলিং বইলা আসলে কিছু ছিল না। সিরিয়াসনেস কম ছিল সব কয়টা খেলোয়াড়ের। আরে বাবা সিরিয়াসনেস না থাকলে খেলতে গেছোস ক্যান?’

দোকানের সবাই একসঙ্গে বলল,‘ঠিক ঠিক।’

লোটন কাকুও সঙ্গে সঙ্গে টপ গিয়ারে চলে গেলেন। পায়ের ওপর পা তুলে বেশ ভাবের সঙ্গে বললেন, ‘সারা বছর এই একই জিনিস খেলো- তাও এর কোনো মান উন্নয়ন হয় না! আমি জানি না নির্বাচকরা কী দেখে এদের নেয়!’

এর মধ্যে একজন শিক্ষানবিশ বিশেষ অজ্ঞ হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলল, ‘কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তো আমরা জিতছি। জিতলে মাথায় তুলে নেয়া আর হারলে ছুড়ে ফেলে দেয়া, এটা কি ঠিক?’

শিক্ষানবিশ বিশেষ অজ্ঞের কথা শুনে লোটন কাকুসহ দোকানের সব বিশেষ অজ্ঞ চোখ পাকিয়ে তাকাল। লোটন কাকু তো বলেই বসলেন, ‘কার ছেলেরে তুই? বেয়াদবের মতো কথা বলিস? থাপ্পড়ে একদম সীমানার বাইরে নিয়ে ফেলব!’

শিক্ষানবিস বিশেষ অজ্ঞ ভয়ে চুপসে গেল। লোটন কাকু আবার শুরু করলেন,‘হ্যাঁ, তা যা বলছিলাম, খেলোয়াড়দের মধ্যে মনোযোগের বেশ অভাব লক্ষ্য করা গেছে! এভাবে তো চলতে পারে না।’

পাশ থেকে আরেক হাফ পাকনা বিশেষ অজ্ঞ বলে উঠল,‘ওইদিন আসলে স্পিনার দিয়ে বোলিং শুরু করা দরকার ছিল। তাইলে ভালো হতো।’

বিশেষ অজ্ঞদের বয়ান জমে উঠে। সবাই কিছু না কিছু বলতে চায়। কারও কথা কেউ শুনতে চায় না। উত্তেজনা এখন চরমে। এমন সময় বাতেনের বাপ বাতেনকে ইশারা দিয়ে বলে, সবাইকে চা দেয়ার জন্য।

বাতেন সবাইকে চায়ের নামে গরম পানি দিতে দিতে অবাক হয়ে গল্পগুলো শুনতে থাকে। আর ভাবে তাদের দোকানে আসা এই লোকগুলো মনে হয় ক্রিকেট খুব ভালো বোঝে!

গল্প শুনতে শুনতে একটা পর্যায়ে বাতেন তার বাবাকে প্রশ্ন করে বসে, ‘আচ্ছা বাবা, আমাদের দোকানে যারা আসে তারা ক্রিকেট খুব ভালো বোঝে, তাই না?’

বাতেনের কথা শুনে তার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওনারা আসলে কিছুই বোঝেন না, আর কিছু করতেও পারেন না। তাই তো নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে আমার দোকানে এসে এর ওর নামে বলে খানিকটা সুখ কামিয়ে নেয়। আর আমিও ওদের চায়ের নামে একটা বুঝ দিয়ে চামে চুমে দুইটা পয়সা কামিয়ে নেই।’

বাতেন তার বাবার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না।

তবে বাতেন কিছু না বুঝলেও এলাকার সবচেয়ে বড় ক্রিকেট বিশেষ অজ্ঞ লোটন কাকু বুঝতে পারছেন আজ তার খবর আছে। কারণ তার বউ মাছ হাতে দোকানে চলে এসেছেন। মনে হয় আজও তিনি বাজার থেকে পচা মাছ কিনেছেন। তারপর হঠাৎ কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোটন কাকুর বউ মাছটা লোটন কাকুর দিকে ছুড়ে মারলেন। মাছটা ধাপ করে গিয়ে লাগল তার কপালে। সঙ্গে সঙ্গে লোটন কাকু জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। চায়ের দোকানের বিশেষ অজ্ঞদের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে উঠল,‘আরে বাহ! ভাবী ওইদিন বল করলে অস্ট্রেলিয়ারে আমরা শূন্য রানে অলআউট করে দিতে পারতাম!’

লোটন কাকুর বউ কথায় কান দেন না। তিনি লোটন কাকুর জ্ঞান হারানো দেহটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সামান্য বাজার করতে পারে না, আবার ক্রিকেট নিয়ে বড় বড় কথা বলে! অকম্মা কোথাকার!’

[email protected]