মূল্যহ্রাসের ফাটা বাঁশ

অর্ধ লাখ টাকা দামের জুতা বিশেষ ছাড়ে অবশেষে ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনল। জুতাটি দেখতে-শুনতে মনোহর! বউ কতটা খুশি হবে শতকরা হিসাব করতে করতে বাসায় পৌঁছায় মফিজ। বিধি বাম, কিছুক্ষণ পর বাজখাঁই আওয়াজে ছাল ছেড়ার জোগাড়- ‘ওই মফিজের বাচ্চা, এটা কী এনেছিস?’

  শফিক হাসান ২৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মতিন ব্র্যান্ডের জুতা দিচ্ছে ৯৫ শতাংশ বিশেষ ছাড়! আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে জুতা দেয়া হচ্ছে। লোভনীয় এ অফারে ভোক্তা মহলে দারুণ সাড়া জাগল। কে কার আগে ছুটবে, চলছে অলিখিত প্রতিযোগিতা! ইঁদুর দৌড়ে না গেলেও মফিজ শামিল হল খরগোশ-কচ্ছপ দৌড়ে। পেরেশান না হয়ে দুলকি চালে গেল মতিনের শোরুমে।

সেলসম্যানরা সাদর সম্ভাষণ জানাল তাকে। সম্বোধন করল স্যার বলে। মফিজ জানে, যতই সে স্মার্ট হোক, দেখতে-শুনতে ভালো হোক তার নাম শুনলেই এরা হাসি চাপবে। অফিসের ছোট পদের চাকুরে সে, রিসেপশনের ছেলেমেয়েরা মফিজ স্যার বলতে গিয়ে চাপা হাসি হাসে। মফিজ ভেবে পায় না, সমস্যাটা কোথায়! বেশি রাগলে বউ মোনালিসাও তাকে ‘মফিজের বাচ্চা’ বলে কটূক্তি করে!

একমাত্র বউয়ের অনুরোধেই মতিন ব্র্যান্ডের শোরুমে আসা। যদিও বউ নিজেই পছন্দ করে জুতা কেনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল, মফিজ নিরস্ত করেছে। ৯৫ শতাংশ ছাড়ের খবরটা না জানানোই ভালো। এই সুযোগে সে কম দামে ‘দামি’ জুতা উপহার দিতে পারবে! টাকা বাঁচল, সংসারও বাঁচল। বউকে বলেছে- ‘এমন জুতা কিনব, তোমার পছন্দ না হয়ে যাবেই না!’

অর্ধ লাখ টাকা দামের জুতা বিশেষ ছাড়ে অবশেষে ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনল। জুতাটি দেখতে-শুনতে মনোহর! বউ কতটা খুশি হবে শতকরা হিসাব করতে করতে বাসায় পৌঁছায় মফিজ। বিধি বাম, কিছুক্ষণ পর বাজখাঁই আওয়াজে ছাল ছেড়ার জোগাড়- ‘ওই মফিজের বাচ্চা, এটা কী এনেছিস?’

কাছে গিয়ে দেখে বউ পা গলানো মাত্রই ছিঁড়ে গেছে জুতার ঊর্ধ্বাংশ। এ জুতা কিছুতেই পায়ে রাখা যাবে না। সঙ্গে যদি রাখতেই হয়, হাতে নিয়ে হাঁটতে হবে! মফিজ নিজেও তাজ্জব হল বড় শখের জুতার পরিণতি দেখে। দোকানির এত সম্মানের এই প্রতিদান! প্রত্যাশিত জবাব না পেয়ে মোনালিসা ক্ষেপল আরও- ‘কোত্থেকে এনেছো, আমাকে নিয়ে চলো! আজ আমার একদিন কী ওর কয়েকদিন!’

মফিজ পড়ল ফাঁপরে। যে উচ্চমূল্যের কথা বউকে শুনিয়েছে, এখন তাকে যদি সরাসরি নিয়ে যেতে হয় সহজেই দেখে ফেলবে ৯৫ শতাংশ ছাড়ের বিষয়টি। রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ থাকবে না। মফিজ আশ্বস্ত করল বউকে- ‘মাথা ঠাণ্ডা করো, ব্যাপারটা আমি দেখছি!’

জুতা নিয়ে সে আবার পৌঁছাল শোরুমে। সেলসম্যান অভিযোগ শুনে বলল, ‘৯৫ শতাংশ ছাড়ের জুতা ছিঁড়বে না তো চুল ছিঁড়বে?’

রসিকতায় মজে যাওয়ার সময় এটা নয়। মফিজের মাথায় জ্বলছে অপমানের আগুন। অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে সেলসম্যান একটু নরম হল, ‘সমাধান আপনার হাতেই। স্কচ টেপ দিয়ে বাঁধতে পারেন, রশি দিয়ে মুড়িয়ে দিতে পারেন অথবা মুচি দিয়ে সেলাইও করাতে পারেন!’

‘নতুন জুতার এই হাল?’

‘ভুলে যান কেন, ছাড়ের জুতা। ফিতা না-ই যদি ছিঁড়বে, এতটা ছাড় দেব কোন দুঃখে?’

‘জুতা লাগবে না। টাকা ফিরিয়ে দিন।’

সেলসম্যান দেখিয়ে দিল মাথার ওপর ঝোলানো অমিয় বাণী- বিক্রিত মাল ফেরত নেয়া হয় না।

পৃথিবীর কোনো খদ্দেরই দোকানির সঙ্গে টক্কর দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না। মফিজও পারল না। নামকরা ব্র্যান্ড মতিনে অর্ধচন্দ্র খেয়ে চোখে অন্ধকার দেখল সে। বুদ্ধিও বের করল তৎক্ষণাৎ। বাসায় ফিরে বউকে বলল, ‘ওই বাজে জুতায় তোমাকে মানাবে না। ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে এসেছি। চল তোমাকে একটা আনারশি শাড়ি কিনে দিই!’

শাড়ি কেনার কথায় বউ জুতার দুঃখ ভুলল। অন্যথায় এতক্ষণে পুরনো জুতাগুলো ফণী হয়ে বয়ে যেত মফিজের মাথার ওপর দিয়ে!

টানা তিন ঘণ্টা মেকআপ নিয়ে মোনালিসা যখন বের হল, মনে আক্ষেপ- আরেকটু সময় পেলে রূপচর্চাটা ভালোভাবে করতে পারত। যেনতেনভাবে তো বাইরে যেতে পারে না, একটা প্রেস্টিজ আছে না!

আনারশির শো রুমের সেলসম্যান মোনালিসাকে এত দরদ দিয়ে আপা ডেকে আহ্বান জানাল, চমকালো দুজনই। নিজের ভাই কখনও এতটা মধুর সুরে ডাকেনি। সম্বোধনেই গলল মোনালিসা। ড্রইং রুমের আয়েশে বসে গেল। এটা নামান, ওটা দেখি, অমুক কালারটা হবে না? দফায় দফায় সাড়ে চারশ’ শাড়ি নামিয়ে পাঁচ ঘণ্টা পর শান্ত হল সে। এই ফাঁকে মফিজ তিনবার বাইরে চা খেয়ে এসেছে, সিগারেট টেনেছে দুইবার। একটি শাড়ি পছন্দ হলেও মোনালিসার মনে খুঁতখুঁত রয়েই গেল। পাড়টা কেন লাল হল না, অনুযোগ জানালেও সমাধান মিলল না। দোকানি শাড়ির দাম পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হাঁকালে মফিজ বিষম খেল- ‘বলেন কী!’

সেলসম্যান হাসিমুখে বলে, ‘কী যে বলেন স্যার, শাড়ির এমনই দাম। আপা অভিজ্ঞ মানুষ, ভালো জিনিস ঠিকই চেনেন!’

এমন দামে মোনালিসাও হকচকিয়ে যায়। তার পুরু মেকআপ গলে চিকন ঘাম নামে। তাই বলে ঠাঁটবাট ছোট করা যায় না। সে বলে, ‘উচিত দাম বলেন!’

শুনতে হয় সেই পুরনো ‘নীতিবাক্য’- ‘টাকা-পয়সা হাতের ময়লা! ময়লা ঝেড়ে পছন্দের শাড়িটি কিনতে পারবেন না, এটা কেমন কথা আপা?’

শেষমেশ দাম দশ হাজারে রফা হয়। মফিজের মাথায় চিন্তা- বাকি মাস কীভাবে কাটবে! তাতেও যদি রক্ষা হতো! মোনালিসা পরদিন বড় মুখ করে পাশের বাসার ভাবিকে শাড়িটা দেখাল। ভাবী বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বললেন, ‘এটা তো জাকাতের কাপড়! আপনাকে ভেজাল জিনিস গছিয়ে দিয়েছে!’

সেদিন মফিজ অফিস থেকে ফিরলে মোনালিসা কাঁদো কাঁদো গলায় ঠগ দোকানদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। শুনে মফিজের মাথা ঘুরতে থাকে দুরন্ত কিশোরের লাটিমের মতো!

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×