তুমি এমনি ভেজাল পেতেছো সংসারে!

  মো. রায়হান কবির ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল সকাল মেয়েকে বকা দিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হাসমত আলী। তার ভাষ্য, তাদের সময় সকাল হওয়া মানেই ছিল বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু। ছাত্রজীবনে সকাল মানে বই আর দুপুর মানে ঘুম- এই নীতিতে বড় হয়েছেন হাসমত আলী। অথচ এখন সকাল নেই, বিকাল নেই, এমনকি রাত-দুপুরেও বই হাতে থাকে ছেলেমেয়েদের!

তাহলে হাসমত আলী কেন বকছেন মেয়েকে- যদি বই হাতেই কাটে সারাবেলা? না বললেও সবাই বুঝে নিয়েছেন, এই বই বা বুক টেক্সট বুক না, এটা ফেসবুক। টেক্সট বুক যেমন জ্ঞান বাড়ায়, এই বইও বাড়ায়। তবে তা অজ্ঞানতা। কেননা ফেসবুকে বিনোদনের পাশাপাশি অনেক মিশ্র তথ্য ঘোরাফেরা করে। ঘোরাফেরা করে অনেক মিথ্যা তথ্যও। ফলে সত্য জানা যেমন জ্ঞানের তেমনি মিথ্যা জানা অজ্ঞানের। এই অজ্ঞানতা ঘটাতে পারে অনেক বড় বিপদ। সে কারণেই হাসমত আলী সকাল সকাল মেয়ের হাতে স্মার্টফোন দেখে ক্ষেপে গেছেন। হাসমত আলী শিক্ষক মানুষ। তাই একটু অপ্রচলিত বাংলা বলতে ভালোবাসেন। যেমন ইন্টারনেটকে অনেকে আক্ষরিক বাংলায় অন্তর্জাল বলে থাকেন। হাসমত আলীর বিষয়টা মনে ধরেছে। তাই তিনিও ইন্টারনেটকে অন্তর্জাল বলেন। মেয়েকে শাসন করে স্ত্রীর কাছ থেকে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বাজারের পথ ধরলেন। বাজারের ব্যাগ চাইতে গেলে স্ত্রী প্রতিদিনই বলেন, ‘আজকাল বাজারে সব কিছুই পলিথিনে দিয়ে দেয়। আপনি শুধু শুধু একটা ব্যাগ কেন বয়ে নিয়ে যান? আবার বাজার থেকে আসার পর সেটা ধুয়ে রাখতে হয় পরের দিনের জন্য। কেন এতো ঝামেলা করেন?’

হাসমত আলী কিছু বলেন না। গ্রামে বড় হওয়া হাসমত আলী হাট-বাজার বলতেই বুঝেন হাতে ডুলা কিংবা ঝুড়ি অথবা ব্যাগ। আগে বাজারে গেলেই এসব হাতে নিয়ে বের হতো মানুষজন। সেই স্মৃতি লালন করে তিনিও একটি ব্যাগ হাতে বের হন। এই যুগে ডুলা বা ঝুড়ি নেয়াও যায় না আবার তেমন পাওয়াও যায় না। কিন্তু স্ত্রীকে অতশত বোঝাবে কে?

বাজারের উদ্দেশ্যে মাত্র দরজা পার হবেন, এমন সময় স্ত্রী চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘লিকুইড দুধ নেই, আসার সময় নিয়ে এসো।’ একই সঙ্গে মেয়েও চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘বাবা, দোকান থেকে প্যাকেট দুধ কিনো না, দুধে ভেজাল পাওয়া গেছে! এইমাত্র ফেসবুকে দেখলাম।’ বলেই মেয়ে মুখে হাত দিয়ে ফেলল। বাবা কেবল ফেসবুক চালাতে নিষেধ করে পাঠ্য বই পড়তে বলে গেছেন। অথচ ফেসবুকের কথা বলে বাবার কাছে ধরা পড়ে গেল বেচারা। বাবার ঝাড়ি খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মেয়ে। কিন্তু বাবা শান্ত স্বরে জানতে চাইলেন, ‘কোন কোন কোম্পানির দুধে ভেজাল পাওয়া গেছে?’ উত্তর শুনে বুঝলেন ঠগ বাছতে গা উজাড়ের পালা। কোন কোন কোম্পানির দুধ ভালো আছে সে প্রশ্ন করাই বোধহয় শ্রেয় ছিল। আগে হলুদ-মরিচ কিংবা ধনিয়ার গুঁড়ায় ভেজাল পাওয়া যেত। মানুষ ভয়ে আবার পাটা-পুতা ব্যবহার শুরু করল। কেউ কেউ নিজে মরিচ-হলুদ কিনে এলাকার মেশিনে ভাঙিয়ে খাওয়া শুরু করল। কিন্তু দুধেও যদি ক্ষতিকর ডিটারজেন্ট ফিটারজেন্ট পাওয়া যায়, তবে কি শহরেও মানুষ গরু পালন শুরু করবে?

ঈদের আগে অর্ধশতেরও বেশি পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেল। পাওয়া গেল রেস্তোরাঁর খাবারে। ইফতার থেকে শিশুদের খাবার- কোথায় নেই ভেজাল? হাসমত আলী সহজ-সরল আদর্শবান মানুষ। তিনি বাজারের উদ্দেশ্যে হাঁটছেন আর ভাবছেন ভেজালেরও একটা সীমা আছে। কিন্তু খাদ্য এমন একটা জিনিস অথচ এখানেও মানুষ ভেজাল দেয়! মানুষের বিবেকই তো এখন ভেজাল। তা না হলে আগে গ্রামের মেঠোপথেও যদি কেউ পা পিছলে পড়ে যেত মাঠ থেকে কত মানুষ ছুটে আসত তাকে সমবেদনা জানাতে বা সাহায্য করতে। নিজের পিপাসার জন্য রাখা পানি দিয়ে হয়তো ধুয়ে দিতো আহত অচেনা পথচারীর পা।

দিন কয়েক আগেই হাসমত সাহেব দেখলেন, ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার না করে কেউ কেউ তাদের পকেট হাতাচ্ছিল যদি কিছু চুরি করা যায়! হাসমত সাহেব ভেঙে পড়েন। একেবারেই ভেঙে পড়েন এই ভেবে- এমন ভেজাল সমাজের অংশীদার তিনি নিজেও। তার মানে কি হাসমত সাহেবরা সেই শিক্ষা বা মূল্যবোধ ছাত্রদের দিতে পারেননি? যা তাদের বিবেককে নাড়া দেয়? হাসমত সাহেব নিজের কাছেই প্রশ্ন করেন, মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আমরাও কি ভেজালের অংশীদার নই? আমরাও কি বিবেক বিসর্জন দিই না তুচ্ছ লোভ কিংবা লাভের আশায়? তা না হলে কিভাবে একজন স্ত্রীর সামনে দিনে-দুপুরে মানুষ কোপায় আর অন্যরা তা ভিডিও করে সাহায্যে এগিয়ে না এসে? সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার কথা ভেবে ফার্মের মুরগির চাষ শুরু হয়েছিল। সেই শুভ উদ্যোগে কোন বিবেক ভেজাল বা এন্টিবায়োটিক নামক বিষ দেয়ার সাড়া দিল? হাসমত সাহেব হতাশ হয়ে তার প্রিয় গানের (শুভদা ছবির গান, তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে) প্যারোডি নিজের মনে মনে গাইতে লাগলেন- তুমি এমনি ভেজাল পেতেছো সংসারে!

আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৬ ২৬
বিশ্ব ৯,৬২,৮৮২২,০৩,২৭৪৪৯,১৯১
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×