ভিন গ্রহের গল্প

  রোহিত হাসান কিছলু ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হরিপদ সাহেব হলুদ খামটা অফিসারের দিকে এগিয়ে দিতেই তিনি জিভ কেটে বললেন, ‘আহা! আহা! এসব কী করেন? কোনো দরকার নাই এসবের!’

হরিপদ সাহেব নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। এসব তো টেবিলের নিচ দিয়েই দিতে হয়। তিনি বোকার মতন টেবিলের ওপর দিয়ে দিতে গিয়ে ঝামেলা পাকিয়ে ফেললেন! মনে মনে লজ্জিত হয়ে টেবিলের তলা দিয়ে হলুদ খামটা আবার দেয়ার চেষ্টা করলেন। এবারও অফিসার তার জিভখানা বের করে বললেন,‘আহা! আহা! এসব কী করেন?’

হরিপদ সাহেব আর থাকতে না পেরে অফিসারকে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, ‘ইয়ে মানে আমার কী কোন ভুল হচ্ছে? আমি জানি এসব জিনিস এভাবেই দিতে হয়!’

অফিসার হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনার দেয়ার মধ্যে কোনো ভুল নেই। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, দেশে এখন আর এমন হলুদ খাম নেয়া হয় না!’

হরিপদ সাহেব মন খারাপ করে বললেন, ‘তাহলে কোন রঙের খাম নেয়া হয়? সত্যিই আমি আসলে জানি না। জীবনে প্রথম এই জিনিস দিচ্ছি। নিয়ম-কানুন ও খামের রং নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।’

অফিসার হেসে বললেন, ‘খামের রং না। এসব আর এখন চলে না। আমরা সবাই ভালো হয়ে গেছি। এখন ফাইল ছোটাতে কোনো খামেরই প্রয়োজন হয় না।’

হরিপদ সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। অফিসার তাই দেখে হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই যে আপনার কাজ হয়ে গেছে। বাসায় চলে যান।’

হরিপদ সাহেব অফিস থেকে বের হয়ে এলেন। একটু আগে তার সঙ্গে যা ঘটল তা তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। হরিপদ সাহেব রাস্তা দিয়ে হাঁটা ধরলেন। মনে মনে ভাবলেন, টাকাটা যখন বেঁচেই গেল, তাহলে একটু বাজারটা ঘুরে যাওয়া যাক। আষাঢ় মাস। যখন-তখন বৃষ্টি নেমে যাচ্ছে। বাসায় ইলিশ মাছ কিনে রাখলে খিচুড়ি ও ইলিশ ভাজা খাওয়া যাবে।

বাজারে এসে হরিপদ সাহেব খুশি হলেন। বেশ বড় বড় ইলিশ উঠেছে। কত দাম যে হয় কে জানে! যত দামই হোক, আজ একটা বড় ইলিশ কিনতেই হবে। খামের মধ্যে পুরো টাকাটা তো বেঁচেই গেছে।

হরিপদ সাহেব ভয়ে ভয়ে একটা বড় সাইজের ইলিশ মাছের দাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটার দাম কত ভাই?’

‘একদাম চারশ টাকা।’

দাম শুনে হরিপদ সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। এত বড় একটা ইলিশের দাম মাত্র চারশ’ টাকা! এটা কী স্বপ্ন নাকি? হরিপদ সাহেবের মনে এখন সন্দেহ হল, মাছটা মনে হয় ভালো না। তাই মাছ বিক্রেতা দাম কম বলে তাকে গছিয়ে দিতে চাচ্ছে। হরিপদ সাহেব মাছটা ভালো করে টিপে-টুপে দেখলেন। নাহ, মাছও তো একদম তাজা। তাহলে সমস্যা কোথায়?

হরিপদ সাহেবকে চিন্তিত দেখে এবার মাছ বিক্রেতা নিজেই বলে উঠল, ‘স্যার মনে হয় আমারে বিশ্বাস করতেছেন না। একদম তাজা মাছ।’

‘তাহলে এত কম দাম কেন?’

‘বাজারে কোনো চাঁদাবাজি নাই। তাই মাছের দাম ঠিক ঠাক রাখতে পারতেছি। আগে তো বাজারে চাঁদাবাজ ছিল। রাস্তায় চাঁদাবাজ ছিল। মাছের দামের সঙ্গে চাঁদার টাকাটাও তাই যোগ করে দেয়া লাগত!’

হরিপদ সাহেব মাছ কিনতে কিনতে ভাবতে লাগলেন, ‘তার চারপাশে এসব কী হচ্ছে? সব কিছু এত বদলে গেল কী করে? তিনি কী কোনো ভিন গ্রহে চলে এসেছেন?’

ইলিশ মাছ কিনে হরিপদ সাহেব বাজার থেকে বের হয়ে এলেন। কিছুতেই তার হিসাব মিলছে না। ঘুষের স্বর্গ যেই অফিস সেখানে তার ঘুষ নিল না। বাজারে যেখানে দামের কোনো লাগাম নেই সেখানে সবকিছু ন্যায্যমূল্যে বিক্রি হচ্ছে!

হরিপদ সাহেব বাসার দিকে হাঁটছেন। শরীরটা অসুস্থ লাগছে। এতদিন চারপাশে অসুস্থ সব পরিবেশ দেখে এসেছেন। আজ সবকিছু সুস্থ হয়ে যাওয়াতে নিজেরই অসুস্থ লাগছে। হরিপদ সাহেব রাস্তার দিকে তাকালেন। রিকশা গাড়ি সব সিগন্যাল মেনে চলছে। সবই নিজ নিজ লেনে আছে। বাইকগুলো ফুটপাতের ওপরে উঠছে না, বা সিগন্যাল পড়লে চিপা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে না। সবকিছু অদ্ভুত সুন্দর এক নিয়মে চলছে। হরিপদ সাহেব বেশিক্ষণ তাকাতে পারলেন না। তার মাথা ঘুরে এলো।

বাসার কাছাকাছি আসতেই হরিপদ সাহেব খেয়াল করলেন তার পেছন পেছন কিছু গুণ্ডামার্কা ছেলে আসছে। হরিপদ সাহেব এবার ভয় পেয়ে গেলেন। তার হাতের বাজারের ব্যাগে ইলিশ মাছ ও আরেক ব্যাগে তার রিটায়ারমেন্টের সব টাকা। বলতে গেলে তার সারা জীবনের সম্বল। এই টাকা ছিনতাই হয়ে গেলে তিনি তো মরবেনই সঙ্গে তার পুরো পরিবারও পথে বসবে।

ছেলেগুলো কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা কিছু বলছে না। চুপচাপ তার পেছন পেছন আসছে। হরিপদ সাহেব এবারে থমকে দাঁড়ালেন। ছেলেগুলোর মধ্যে যে একটু নেতা টাইপ সেই ছেলেকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা আমরা পিছু নিয়েছ কেন? কী চাও বাবারা?’

নেতা গোছের ছেলেটা এবার তার পকেট থেকে মোবাইল ফোন সেট বের করে দিয়ে বলল, ‘স্যার এটা মনে হয় আপনার। আপনি একটু আগে মাছ বাজারে ফেলে চলে এসেছেন।’

হরিপদ সাহেব তার নিজের পকেট হাতড়ে দেখেলেন, ছেলেটা সত্যিই বলছে। এটা তারই মোবাইল। হরিপদ সাহেব মোবাইলটা নিয়ে ছেলেটাকে মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে দিলেন।

এখন তার আরও অসুস্থ লাগছে। এসব কী হচ্ছে? নাকি তিনি স্বপ্ন দেখছেন। যা একটু পরেই ভাঙবে! তিনি উঠে দেখবেন সব আবার আগের মতো হয়ে গেছে!

স্বপ্ন ভাঙার জন্য হরিপদ সাহেব তার নিজের হাতে চিমটি কাটতে থাকেন। প্রতি চিমটিতেই তিনি ব্যথা পেতে লাগলেন। তাহলে কি আজ যা ঘটছে সব বাস্তব? সব কী সত্যি?

প্রিয় পাঠক, এতটুকু পড়ে আপনাদের কী মনে হয়? স্বপ না সত্যি? আমি বলব এটা স্বপ্ন নয়। তাহলে বাকি থাকে সত্যি কিনা? না এটা সত্যিও না! এটা একটা আষাঢ়ে গল্প!

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×