আষাঢ়ের জুলাইয়ের একদিন

  শফিক হাসান ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিনহাজের ঘুমটা গাঢ় হয়েছিল আষাঢ়ের বৃষ্টিতে। অঘোর ঘুমেই সুখ-সুখ অনুভব করছিল। ফোনের রিংটোনে ঘুম ভাঙল তার। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল গাছের সবুজ পাতা হাসছে বৃষ্টির স্পর্শে। বিকট শব্দে পরপর তিনটা মিসডকল এলো। বড় আপা দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কল ব্যাক করে বিরক্তির স্বরে বলল মিনহাজ- ‘সাতসকালে মিসডকল দিচ্ছো কেন?’

শাহনূরের কণ্ঠেও বিরক্তি- ‘মিসডসকল দেবো কেন!’ কল যাচ্ছিল না। নেটওয়ার্ক ভীষণ বাজে।’

‘আমি একবারেই পেয়ে গেলাম!’

‘কী করছিলি?’

‘ঘুমাচ্ছিলাম। চমৎকার বৃষ্টির মধ্যে ঘুমটা মাটি করে দিলে।’

‘বৃষ্টি পেলি কোথায়!’

‘বৃষ্টি কোথায় পাবো, আকাশে ছাড়া? নাকি তোমার বান্ধবী বৃষ্টির কথা বলছো!’

‘আষাঢ় মাসে কেন বৃষ্টি হবে?’

বিরক্তি ফিরে এলো মিনহাজের- ‘আজ আষাঢ়ের ৩০ তারিখ, ১৪২৬ খ্রিস্টাব্দ। জানো না, আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল।’

‘তুই বোধহয় ভুলে গেছিস এখন আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টি হয় না। শীতকালের শীত আসে অন্য কোনো কালে। বসন্ত আসে কেবল চারুকলায়!’

‘প্যাঁচাল রাখো। বৃষ্টির তোড় বেড়েছে।’

‘চাপা মারছিস কেন! আষাঢ়ে মাঠ শুকিয়ে কাঠ হবে, বৃষ্টি নামবে কোন দুঃখে?’

‘ভিডিও কল দিচ্ছি। স্বচক্ষেই দেখো।’

মিনহাজ মেসেঞ্জারে কল দিলে চোখ বড় বড় হয়ে যায় শাহনূরের। বিস্ময়ের আতিশয্যে তার হাত থেকে ফোন পড়ে যায় ফ্লোরে। মিনহাজের আর ঘুমানো হয় না। বাবা-মা ঈদে বাড়িতে গিয়ে ফেরেননি এখনও। তাকে খেতে হয় বাইরেই। একদিন রান্না করতে গিয়ে আলু সেদ্ধ করতে না পারলেও ডান হাত প্রায় সেদ্ধ হয়ে গিয়েছিল গরম পানিতে। আর রান্নাঘরমুখো হয়নি। কাছেই ভালো হোটেল আছে। সুনামের কারণে দূরের মানুষজনও আসে খালেক-মালেক হোটেলে।

অপেক্ষমাণ মিনহাজকে দেখে এগোলেন মালেক- ‘নাশতা হবে না। পাশের হোটেল থেকে আনিয়ে দিই?’

‘সমস্যা কী?’

‘পরোটার খামির আগের রাতেই বানিয়ে রাখি। ভোরে পরোটা বানাতে গিয়ে দেখি, দুইটা তেলাপোকা হাঁটছে খামিরে। পরোটা বানানো বাদ দিলাম। খদ্দের ফিরিয়ে দিচ্ছি।’

‘তুচ্ছ কারণে কেউ এত টাকার জিনিস নষ্ট করে? অনেক হোটেলে তো চিংড়িতে বরকত করার জন্য তেলাপোকা মেশায়।’

‘যেটা আমরা খাই না, তা অন্যদের খাওয়াই না।’

সরেজমিন দেখল, ঠিকই পরিত্যক্ত খামির পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে পাশের হোটেলে খেতে গেল। বিল দেয়ার সময় অবাক না হয়ে পারল না। বয় বোধহয় ভুল করে বিল কম করেছে। বর্ণনা দিলে ম্যানেজার বললেন, ‘ঠিকই আছে। আগে চাঁদাবাজির কারণে কসাইরা বেশি দামে মোষের মাংস বিক্রি করত। চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ায় এখন গরুর মাংসই বিক্রি হচ্ছে অর্ধেক দামে!’

‘চাঁদাবাজি বন্ধ কেন?’

‘তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। সব ছেড়ে বর্তমানে কৃষকের কাজে সহায়তা করছে।’

‘ফটোসেশন, সেলফির জন্য?’

‘না না! ছাত্র সংগঠনগুলোও সাহায্য করছে তাদের।’

‘ছাত্র সংগঠন সেখানে ব্যস্ত থাকলে ক্যাম্পাসগুলোতে মারামারি করবে কে?’

‘ওসব আর দেশে নেই। পুলিশ ঘুষ খাওয়া ছেড়ে দেয়ার পর কোনো অপরাধীকেই ছাড় দিচ্ছে না।’

‘পুলিশ ঘাস-ঘুষ খায় না, এটা কৌতুক!’

‘এখন সবাই দেশপ্রেমী। মানুষকে ঠকানো মানে দেশকেই অবজ্ঞা করা।’

কাছেই থানা। মিনহাজের মামা পুলিশ অফিসার। বিষয়টা যাচাইয়ের জন্য রিকশায় উঠল সে। নামার পর চালক ভাড়া রাখল প্রচলিত ভাড়ার অর্ধেকেরও কম। আজ সবারই ভুল হচ্ছে কেন! আরও টাকা দিলে জিহ্বা কামড়ালো চালক- ‘এটাই ভাড়া।’

‘ইনসাফ’ করে দেয়ার পরও ভাড়া নিয়ে ক্যাচাল লাগে। নিজ থেকেই কম রাখছেন কেন!’

‘ন্যায্য ভাড়া রেখেছি।’

‘আপনাদের আন্দোলনের খবর কী? রাজপথে শুয়ে-বসে আর কতদিন কাটাবেন?’

‘আন্দোলন গতকালই শেষ! আন্দোলনকারীরা বুঝতে পেরেছে রিকশা আসলেই ঢাকায় যানজট সৃষ্টি করছে। নানাভাবে ক্ষতি হচ্ছে দেশের। তাই যাদের বাড়িতে জমিজমা আছে তারা গ্রামে ফিরে গেছে। যাদের সেই সুযোগ নেই তারা ঢুকেছে চাকরিতে। প্রাইভেট কারের মালিকরা ঘোষণা দিয়েছেন তারা এখন থেকে বাসে চলাচল করবেন!’

‘বাসে চড়ে কি ফুটানি দেখানো যায়! আর এত চাকরি এলো কোত্থেকে! ছাত্ররাই চাকরি পাচ্ছে না। বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৫ করার দাবিতে আন্দোলন করছে। পুলিশের মার খাচ্ছে।’

‘সেই গল্প বর্তমানে চলে না। সবাই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে।’

‘একদিনেই এত পরিবর্তন?’

‘অসম্ভব কী! রাতের পরেই তো দিন আসে।’

চেষ্টা করেও রিকশাচালককে দুইটা টাকা বেশি দিতে পারল না মিনহাজ। থানায় ঢুকে মামাকে দেখা গেল, দাগি আসামিদের সঙ্গে খোশগল্প করতে। মিনহাজকে দেখে বললেন, ‘বস। পরিচয় করিয়ে দিই। এরা হচ্ছে...।’

‘কাইল্যা জাকির, বোমা মিজান! কুখ্যাত সন্ত্রাসী।’ মামার কথা কেড়ে জানাশোনা ঝাড়ল মিনহাজ।

‘সেটা আগের কথা। বর্তমানে এরা রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার রাখছে। দেখ, থানাটাও কেমন ঝকমকে করেছে।’ দেখানোর জন্য উঠে দাঁড়ালে মিনহাজ খেয়াল করল ওসি মতিউর রহমানের ভুঁড়িটা নেই। রাতারাতি উধাও হল কীভাবে! বুঝতে পেরে মামা বললেন, ‘ঘুষ খাওয়া বাদ দেয়ার পর শরীর ফিট হয়ে গেছে!’

‘ঘুষে অরুচি কেন?’

‘হারাম খায় হারামির বাচ্চারা। আমি ভদ্রলোকের সন্তান!’

বাসায় ফিরে মিনহাজ দেখল বাড়িওয়ালা তার অপেক্ষায় আছেন। তিনি জানালেন, চলতি মাস থেকে বাসা ভাড়া তিন হাজার টাকা কমানো হল। প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই চলে গেলেন তিনি। দরজা বন্ধ করার সময় একঝলক আলোর মতো রুমকির প্রবেশ। বিয়ের সাজে সজ্জিত। মোটা বেতনের বর পেয়ে যাওয়ায় সম্পর্কটা ভেঙে দিয়েছিল সে। মেনেও নিয়েছে মিনহাজ। আবার এ কোন নাটক! রুমকি আছড়ে পড়ল মিনহাজের বুকে- ‘আমার ভুল বুঝতে পেরে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছি। ওই ছেলে অনেক বেশি টাকা রোজগার করে সত্য; কিন্তু তাকে কি আমি ভালোবেসেছি!’

‘ফিরে যাও। তোমার বাবা-মায়ের সম্মানহানি হবে।’

‘সব শুনে বাবাই বললেন, নির্দোষ একটি ছেলেকে কেন কষ্ট দিবি?’

রুমকিকে ভেতরে এনে টেলিভিশন চালাল সে। বিটিভির খবরে একবারও সরকারসংশ্লিষ্ট কারও কথা বলা হল না। উল্টো টকশোতে বসে কয়েকজন দিব্যি সরকারের সমালোচনা করছেন।

এই আষাঢ়-জুলাইয়ে কী হচ্ছে এসব- ভেবে কুল বা কূল কোনোটাই পেল না মিনহাজ! তবে কি সব ভুল, বিলকুল?

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×