সংরক্ষিত পাঠক আসন

পড়া ফাঁকি

  হিমু চন্দ্র শীল ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মছিওল্লা স্যার খুব সাদাসিধে মানুষ ছিলেন। আমরা স্যারের সঙ্গে যত্তসব দুষ্টুমি আছে সবই করতাম। স্যার চোখ বুঝে সব সহ্য করতেন। মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত হয়ে গেলে সর্বনাশ! স্যার বরফের মতো শীতল হলেও, রেগে গেলে আগুনের চেয়ে গরম হয়ে যেতেন।

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। মছিওল্লা স্যার আমাদের পড়াতেন বিজিএস। সবসময় তিন-চারটে করে বড় বড় প্রশ্ন হোম ওয়ার্ক হিসেবে শিখে আসার জন্য দিতেন। আর পরদিন ক্লাসে বেছে বেছে দুষ্টু ছেলেদের কয়েকজন থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর জিজ্ঞাসা করতেন। পারলে তো সাতখুন মাফ। আর না পারলে বাপরে বাপ। দু’তিনটে বেত এক করে এমন পিটুনি দিতেন যে পরদিন আর কেউ স্যারের পড়া না শিখে স্কুলে আসার দুঃসাহস করত না। তবে ব্যতিক্রম ছিলাম আমরা ক’জন। যারা ক্লাসে দুষ্টু ছেলের দল হিসেবে পরিচিত ছিলাম। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, হোমওয়ার্ক হিসেবে দেয়া মছিওল্লা স্যারের সেই পড়াগুলো আমি কখনও সম্পূর্ণ শিখে স্কুলে যায়নি। হয়তো অর্ধেক শিখেছি, নয়তো একেবারেও শিখিনি। পড়া না শিখলেও স্যারের পিটুনি থেকে রক্ষার জন্য টমাস আলভা এডিসনের মতো উদ্ভাবন করেছিলাম দুই-তিনটে পদ্ধতি। যদি নোবেল প্রাইজের জন্য আবেদন করতাম নির্ঘাত দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এতদিনে নোবেল প্রাইজ পেয়ে যেতাম! ভাগ্যিস আবেদন করিনি।

যেদিন স্যারের পড়া শিখে আসতাম না ওই দিন মাঝখানের সাড়িতে বেঞ্চের ঠিক মাঝখানে গিয়ে বসতাম। পিটুনি থেকে রক্ষা পেতে স্কুল ড্রেসের ভেতর কয়েকটা খাতা এমনভাবে গুঁজে রাখতাম যাতে স্যার মারলে বেতের বাড়ি ওই খাতাগুলোর উপরই পড়ে। তাছাড়া স্যারের কানে একটু কম শোনার সমস্যা ছিল। তো স্যার যখন পড়া ধরতে আসতেন, তখন গুনগুন করে গেয়ে উঠতাম অচেনা কোনো গান। স্যার মনে করতেন আমি সত্যি সত্যি পড়া বলছি। এভাবে মিনিট দুয়েক করার পর স্যারকে বলতাম, ‘স্যার, পড়া শেষ!’

স্যার খুশি হয়ে বলতেন, ‘ভেরি গুড ব্যাটা, বস।’ আমিও স্যারের নাকের ডগা দিয়ে বন্ধুদের সামনে নিজেকে বিজয়ীর বেশে উপস্থাপন করে বসে পড়তাম। বন্ধুরা আমার এই কূটকৌশল দেখে হাঁ হয়ে যেত। দিনে দিনে আমার তৈরি করা মেথড বন্ধুদের মাঝখানে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করল। একদিন স্যার ভীষণ রেগে গিয়ে কতগুলো হোম ওয়ার্ক দিলেন আর সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘যদি কাল পড়া শিখে না আসিস তাহলে একটা বেতও আস্ত রাখব না।’ যথারীতি পরদিন স্যার অগ্নিমূর্তির রূপ ধারণ করে এক বান্ডেল বেত বগলধাবা করে ক্লাসে ঢুকলেন। শুরুতে কয়েকজন মেয়ের কাছ থেকে পড়া নিলেন। তারপর ছেলেদের মধ্য থেকে রাকিব নামের আমাদের এক সহাপাঠীকে দাঁড় করালেন। পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। রাকিবও হিরোর মতো দাঁড়িয়ে পড়া বলা শুরু করল। হাঠাৎ স্যার তাকে থামতে বললেন। রাকিব তথমত খেয়ে থেমে গেল। স্যার রেগে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘হারামজাদা, পড়া না বলে গান করিস! নিজেকে খুব চালাক মনে করিস! এত বড় সাহস কোথা থেকে পাস!’ স্যার রাকিবের গায়ে প্রথম বেতের বাড়িটা দিতেই চটাং করে একটা অদ্ভুত আওয়াজ হল। দ্বিতীয় বাড়িতেও একই আওয়াজ। এত জোরে মারার পরও রাকিব মুচকি মুচকি হাসছে দেখে স্যারের কেমন জানি সন্দেহ হল। স্যার বললেন, ‘দেখি তোর শার্টের ভেতর কিছু আছে কি না।’ রাকিব কিছুটা গাঁইগুঁই করলেও একসময় স্যারের জোরাজুরিতে শার্ট খুলতে বাধ্য হল। ওর পেট আর পিঠ দেখে সবাই অবাক। রাকিবের পিঠটা খাতা দিয়ে এমনভাবে মোড়ানো ছিল যাতে স্যার মারলে ব্যথা না পায়। ক্লাসের সবাই হু হু করে হেসে উঠল। স্যারও তাজ্জব বনে গেলেন। আর হুংকার দিয়ে বললেন, ‘এবারের মতো মাফ করলাম। সামনে যদি এরকমটা দ্বিতীয়বার হতে দেখি তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে বলে দিলাম।’ সেদিন থেকে আমরা সবাই মছিওল্লা স্যারের পড়া নিয়মিত শিখে যেতাম।

কক্সবাজার সরকারি কলেজ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×