মাঝরাতে মশার উৎপাত

  ইমন চৌধুরী ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তালির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। হৃদয় ভেঙে গেলেও আমি এতটা কষ্ট পাই না, যতটা কষ্ট পাই কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে। ভুল বললাম, কাঁচা না বলে পাকা বলাই ভালো। কারণ ঘুমটা এরই মধ্যে পেকে গেছে! রাত তিনটা। চোখ কচলে উঠে বসতেই বউ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘একটা কাজও যদি তোমাকে দিয়ে হতো! জীবনে কী করেছ! একটা মশাও তো মারতে পারো না!’

‘আমি মশা মারতে যাবো কেন? আমি কি সিটি কর্পোরেশনে চাকরি করি! মশা মারার জন্য সিটি কর্পোরেশন আছে। তাদের কাজ তাদের করতে দাও। যার কাজ সে করে না দেখেই তো দেশে এত বিশৃঙ্খলা!’ চামে হালকা একটা লেকচার দিয়েই আবার শুয়ে পড়ার ফন্দি করলাম।

কিন্তু বউ আমার ডান হাতটা খপ করে টেনে ধরে আবার বসিয়ে দিল। বলল, ‘সিটি কর্পোরেশন যদি মশা মারতে পারত তবে আমাকে মাঝরাতে উঠে মশা মারতে হতো না। ঘুম যখন ভেঙেছে বসে বসে মশা মারো। তোমার জন্যই মশারির ভেতর মশা ঢুকে।’

‘আমার জন্য ঢুকে মানে!’ আমি অবাক হওয়ার ভান করলাম।

‘এতো বার বের হলে ঢুকবেই তো! কথা না বাড়িয়ে মশা মারো!’

‘বললেই হবে। আমাকে মশা কামড়ায় না। তোমাকে কামড়ায় তুমি মারো!’ বলে আরেক দফা শুয়ে পড়ার পাঁয়তারা করলাম।

ফের আমার ডান হাত খপ করে ধরে আমাকে বসিয়ে দিল বউ, ‘তা কামড়াবে কেন! মশারও একটা রুচি আছে। আমি বলেই এমন অখাদ্যের সঙ্গে সংসার করে যাচ্ছি। অন্য কেউ হলে অনেক আগেই চলে যেত!’

বুঝলাম তর্ক করে খুব একটা সুবিধা হবে না। তারচেয়ে বসে বসে মশা মারাই উত্তম! কিন্তু মশা যে মারব তারও উপায় নেই। মশা কি আর কম ত্যাঁদড়! আমি মারার আগেই ঠিক সটকে পড়ে।

কবি বলেছেন, একবার না পারিলে দেখো শতবার। সুতরাং কিছুতেই হাল ছাড়া যাবে না। আমি মরিয়া হয়ে ফের চেষ্টা চালাই। একের পর এক তালি ঠুকতে শুরু করি। কিন্তু প্রতিবারই বেয়াড়া মশা হাত ফসকে যায়। নাকের ডগা হয়ে, মাথার ওপর দিয়ে, কানের পাশ দিয়ে, দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে- আমাকে কাটিয়ে ঢাকার অটোরিকশা চালকদের মতো ঠিক বেরিয়ে যায় মশা।

মিনিট পাঁচেক এভাবে তালি ঠুকতে ঠুকতে হাঁফিয়ে উঠি। তারপর আড়চোখে একবার তাকাই বউয়ের দিকে। আমাকে মশা মারার নির্দেশ দিয়ে বউ শুয়ে পড়েছে কোলবালিশ জড়িয়ে। কোলবালিশটাকে মাঝে মাঝে হিংসা হয় খুব। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের মশাটাকে খুঁজতে থাকি। মিনিট পাঁচেক বাদে আবারও ত্যাঁদড় মশা ফিরে এলো। শুরু হল আবারও তার সঙ্গীত চর্চা। আমিও দ্বিগুণ উৎসাহে ফের তালি ঠুকতে শুরু করলাম। কিন্তু এবেলায়ও ব্যর্থ হলাম। কিছুতেই বজ্জাত মশাটাকে বাগে আনতে পারলাম না। শেষতক মাথায় একটা অন্য বুদ্ধি এসে ধরা দিল। ভাবলাম মারার চেষ্টা না করে বরং মশাটাকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা করে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। বউয়ের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মশারির এক পাশ তুলে ধরলাম। মিনিট দুয়েক সময় দিলাম মশাটাকে বেরিয়ে যেতে।

তারপর নিশ্চিন্তে মশারি ফেলে শুয়ে পড়তেই দেখি বউ উঠে আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। আমি কোমল কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি ঘুমাওনি?’

বউ আরও কোমল কণ্ঠে বলল, ‘এটা কী হলো?’

‘কোনটা কী হলো?’ যেন ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানি না এমন ভঙ্গিতে বউকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম।

‘তোমাকে আমি কী বলেছি?’

‘মশা মারতে বলেছ।’

‘তুমি কী করেছ?’

‘মশাটা মারার চেষ্টা করেছি। কিন্তু মারতে পারিনি দেখে বুদ্ধি করে মশারির এক পাশ তুলে মশাটাকে বের করে দিয়েছি!’

‘আমার সঙ্গে ফাজলামো করো! তোমার ওই একটা মশা বের করতে গিয়ে যে নতুন করে একঝাঁক মশা ভেতরে ঢুকেছে সেটা কি বুঝতে পারছ!’

তাই তো! এটা কেন আমার মাথায় ঢুকল না! আমি মাথা চুলকে কিছু একটা বলতে যাবো তার আগেই বউ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘তুমি ইচ্ছে করেই করেছ। আমি বুঝি না ভেবছ! আমাকে মশায় কামড়াক এটাই তো তুমি চাও।’

কী মুশকিল! কী থেকে কী হয়ে গেল! আমি রোমান্টিক দৃষ্টিতে বউয়ের দিকে তাকালাম। তারপর তার বাম হাতটা টেনে ধরতেই বউ এক ঝটকায় সেটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘বুদ্ধি করে আমাকে কামড়ানোর জন্য মশারির ভেতর যত মশা ঢুকিয়েছ সব এক এক করে মারবে। আমি গুনে দেখব কয়টা মেরেছ। তারপর তোমার ঘুম।’ তারপর রাত যত গভীর হতে থাকে আমার তালি ঠোকার শব্দ তত বাড়তে থাকে! কিন্তু মশারির ভেতর বজ্জাত মশার সংখ্যা তবু কিছুতেই কমে না।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×