গরুর হাট থেকে বলছি

  রোহিত হাসান কিছলু ০৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর একটা মলিন টি-শার্ট পরে গরুর হাটে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। ঠিক এমন সময় টিনার ফোন।

‘অ্যাই, কই তুমি?’

‘এই যে গরুর হাটে যাবো। রেডি হলাম।’

‘‘ওয়াও! দেখি দেখি কীভাবে যাচ্ছো? তোমার একটা ছবি তুলে পাঠাও তো। ফেসবুকে ‘ইটিস-পিটিস’ নামক গার্লস গ্রুপে একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে। সবাই সবার বয় ফ্রেন্ডের হাটে যাওয়ার ছবি দিচ্ছে! আমিও দিব। তাড়াতাড়ি ছবি পাঠাও।’

কী আর করা। ছবি তুলে টিনাকে পাঠালাম। সঙ্গে সঙ্গেই আবার টিনার ফোন।

‘নাহ, ছবি ভালো হয় নাই। তোমাকে কাউবয় কাউবয় লাগছে না!’

‘কী করলে কাউবয় কাউবয় লাগবে?’

‘একটা ময়লা আর ছেঁড়া গেঞ্জি পরো। আর সঙ্গে লুঙ্গি।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

‘ঠিক আছে বললেই হবে না। আমাকে এখুনি ছবি তুলে পাঠাও।’

বাসার দারোয়ান চাচার ছেঁড়া লুঙ্গি আর বুয়ার ঘর মোছার একটা ছিঁড়া গেঞ্জি পরে আমি ছবি তুলে পাঠালাম। ওপাশ থেকে টিনার রিপ্লাই এলো, হুমমম... একদম পারফেক্ট কাউবয় লাগছে! এবার দ্রুত হাটে চলে যাও।

কোরবানির হাটে এলাম। চারদিকে শুধু গরু আর ছাগল। এত গরু-ছাগলের ভিড়ে নিজেকেই গরু-ছাগল মনে হচ্ছে! একটা গরুর দাম করতে যাবো এমন সময় টিনার ফোন।

‘গরু কিনে ফেলেছো?’

‘না, এখনো কিনিনি। দাম দর করছি।’

‘‘শোনো একটা মোটাতাজা গরু কিনবা। ফেসবুকের ‘ফকিন্নি’ গার্লস গ্রুপে একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে। কার বয়ফ্রেন্ড কেমন গরু কিনল তার ছবি পোস্ট হচ্ছে।’

‘ও আচ্ছা, তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ তাই। তুমি ঝটপট গরু কিনে ছবি পাঠাও। সবাই পোস্ট দিয়ে দিয়েছে। আমি এখনও পারলাম না।’

‘এই তো। আরেকটু সবুর করো। এক ঘণ্টার মধ্যেই গরু কিনে ফেলব!’

ফোন রাখতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আমি আবার গরু দেখায় মনোযোগ দিলাম। বাপরে বাপ! গরু কেনায় কত ঝামেলা! গরুর শরীরে থাবড়া দিয়ে দেখ কোনো ওষুধ খাওয়ানো হয়েছি কি না। যদি থাবড়া মারার পর শরীর ডেবে যায় তাহলে বুঝতে হবে গরুতে ঝামেলা আছে। গরুর দাঁত দেখো। গরুর অ্যাক্টিভিটি দেখো। গরু যদি ঝিমায় তাহলেও বুঝতে হবে গরুতে ঝামেলা আছে।

আমি এখন যেই গরুটা দেখছি সে বসে বসে ঝিমাচ্ছে। পকেট থেকে ‘সহজে সতেজ গরু চিহ্নিত করার সহজ উপায়’ বইটা বের করলাম। বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে গরু দেখছি। এমন সময় আবার টিনার ফোন।

‘গরু কিনেছ জানু?’

‘না, এখনো কিনি নাই। গরু বিষয়ে একটু পড়ালেখা করছি।’

‘কী করো? সামান্য একটা গরু কিনতে এতক্ষণ লাগে? এদিকে সবাই যার যার বয়ফ্রেন্ডের গরুর ছবি পোস্ট করে দিয়েছে। আমিই পিছিয়ে আছি।’

‘এই তো সোনা, এখনই কিনে ফেলবো।’

‘শোন পিংক কালার বা বটল গ্রিন কালারের গরু কিনবা! সবাই কালো আর সাদা কালারের মধ্যে গরু কিনেছে। তোমার গরুটা পিংক বা বটল গ্রিন হলে বেশ ইউনিক হবে!’

আমি ফোন রেখে দিলাম। আবারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। আমি গরু কেনায় মনোযোগ দিলাম। একটা গরু বেশ পছন্দ হয়েছে। দেখতে বেশ তাগড়া। কেমন রাগী রাগী চেহারা। শরীরটাও বেশ নাদুস নুদুস। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। আমি দাম দর করা শুরু করলাম। ব্যাপারি চাইলো এক লাখ টাকা! আমি ষাট হাজারের তাকে পটানোর চেষ্টা করছি। এমন সময় আবারও টিনার ফোন।

‘শোন একটা জরুরি কথা বলতে ভুলে গেছি।’

‘কী?’

‘‘গরুটা কিন্তু দুই থেকে তিন লাখের মধ্যে কিনবা। ফেসবুকের ‘বলদামি’ নামের গার্লস গ্রপে গরুর দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা হচ্ছে- তোমার বয়ফ্রেন্ডের গরুর দাম কত? কম দামি গরু কিনলে হেরে যাবো তো!’’

‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

নব্বই হাজার টাকা দিয়ে কুচকুচে কালো গরুটা কিনে ফেললাম। গরু নিয়ে বাসায় ফেরার সময় শুরু হলো একের পর এক ঝামেলা। প্রথম ঝামেলা হলো টিনার ফোন আসার পর। আমি গরুর গলার কাছের দড়ি ধরে ছিলাম। টিনার ফোন আসায় মোবাইলের রিং বাজতেই গরুর মাথা গরম হয়ে গেল। সে এক লাফ দিয়ে আমার হাত থেকে দড়ি ছুটিয়ে দৌড় দিলো। গরুর পেছন পেছন দৌড় দিলো আমাদের বাসার দারোয়ান। আমি টিনার ফোন রিসিভ করলাম।

‘এই, তোমার ঘটনা কী? এখনও গরুর ছবি দিচ্ছো না কেন! আমি কী আপলোড করবো?’

‘ছবি তোলার আগেই গরু ছুটে গেছে!’

‘মানে কী? আমি এখন গ্রুপগুলোতে কী দিবো? এই তোমার সঙ্গে রিলেশনে জড়িয়ে আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল। সামান্য একটা গরু ধরে রাখতে পারো না তাহলে আমাকে কীভাবে ধরে রাখবে?’

‘আরে বললাম তো গরু ছুটে গেছে! এখন ধরতে যাবো। ধরা হলে ছবি দিবো।’

‘ধুর! তোমার আগে বাতেন ভাই আমাকে প্রোপোজ করেছিলো। আমি পাত্তা দেইনি। একটু আগে দেখি সে বিশাল এক গরু কিনে এনেছে। এখন মনে হচ্ছে, তখন বাতেন ভাইকে হ্যাঁ বললে আমি ওই গরুর ছবিটা আপলোড দিতে পারতাম!

ফোন কেটে দিলাম। এবার নিজেকে সত্যিই গরু মনে হচ্ছে। কেমন করে এই মেয়ের সঙ্গে আমি পাঁচ বছর ধরে রিলেশন করছি? আমি আসলে মানুষ না। আমি গরু।

টিনাকে ফোন দিলাম।

‘গরু ধরা পড়েছে?’

‘না, ধরা পড়েনি।’

‘তাহলে ফোন করেছো কেন?’

‘একটা খবর জানাতে ফোন করেছি, ফেসবুকে একটা বয়েজ গ্রুপ আছে, নাম হায় কোরবানি হায় কোরবানি!’

‘বলো কী! ওখানে কিসের প্রতিযোগিতা হচ্ছে?’

‘এবার কে কী কোরবানি দিচ্ছে তার ছবি দিচ্ছে সবাই।’

‘তুমি কিসের ছবি দিবা? তোমার তো গরুই ছুটে গেছে!’

‘আমি তোমার ছবি দিয়েছি। এবার আমার জীবন থেকে তোমাকে কোরবান করে দিচ্ছি!’

‘মানে?’

‘মানে তুমি বাতেন ভাইয়ের গরুর ছবি আপলোড দাও!’

টিনা ম্যাসেঞ্জারে একের পর এক টেক্সট করে যাচ্ছে। আমার এসব দেখার আর সময় নেই। গরু ছুটে গেছে। গরুটা ধরতে হবে। আমি ছুট লাগালাম।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×